অপাত্র (পর্ব-০৬)

ছোটো ভাই ডাক্তার। ওর প্রেম আছে আর এক লেডি ডাক্তারের সঙ্গে। মেডিকেল কলেজে একসঙ্গে পড়তে পড়তে ভাব। এখন বয়স হচ্ছে বলে মেয়ের বাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে। ওদের ভালোবাসা মেজভাইয়ের বিয়ের পর বাড়িতে জানাজানি হয়। তাছাড়া ছটু পেশেন্ট দেখে ভালো রোজগার করে। ইন্দ্ররও যদি প্রেম থাকত তাহলে তার জন্য আর কাউকে মেয়ে দেখতে হতো না। শহরাঞ্চলে এখন সবাই প্রেম, মিউচুয়াল বনিবনায় ব্যস্ত। প্রেম করে বিয়ে করা একসময় ছিল একটা ক্যালি। এখন না করতে পারলেই যেন ব্যতিক্রমী!

সরকারি চাকরি না হোক মামার মুখ থেকে শুনেছে যে-সিরিয়াল কোম্পানিতে ইন্দ্র চাকরি করে, তারা সবচেয়ে বেশি সিরিয়াল বানায়। ছেলে যে একদম অপাত্র নয় তা বিজ্ঞাপন দিতে যতগুলো সম্বন্ধ এসেছে, তা থেকেও প্রমাণিত। তাছাড়া বয়সও হচ্ছে। ওর জন্যই বড়ো জ্বালা। ইন্দ্রর বিয়ে হয়ে গেলে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যাবে। মায়ের খুব বেড়াবার শখ। ইন্দ্রের ছুটি কম। তাতেই ইন্দ্রকে নিয়ে একবার নৈনিতাল গেছিল। পুরী তো জলভাত হয়ে গেছে। মেজভাই বিদেশে থাকার সময় সপরিবারে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ঘোরা হয়ে গেছে। তখন ইন্দ্র চাকরি করে না। চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে। বিদেশ যাত্রা ভাগ্যক্রমে হয়।

কৃষ্ণেন্দুর সিঙ্গাপুরে পোস্ট ডক্টরেট চলছে। মাস ছয়েক পরে ইউরোপ যাবে। ইন্দ্র ভেবেছিল যাবে না কিন্তু এই সুযোগ হাতছাড়া করতে নেই। তাছাড়া বাবা, মা, ছটু গেলে একা বাড়িতে থাকার অসুবিধে। বুড়ো বয়সে ইন্দ্রর জন্যই তো ঘুরতে পারে না। ইন্দ্রর বেকার জীবনে তারাও সমব্যথী তবুও অন্য দুই ছেলের সাফল্যে আত্মহারা হবার বাধা যদি ইন্দ্রই হয় সে অনুভব ইন্দ্রের হয়েছে। তাই অনেক কিছু ভেবেই সায় দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত হতে বয়স লাগলে যা হয় আর কী!

পরীক্ষার প্রস্তুতি না হোক একমাস ভালো ভাবে ঘুরেছিল ইন্দ্র। এমনই ভালো লেগেছিল যে, ইন্দ্র ভাইকে বলেছিল যা হোক চাকরির সন্ধান করলে ওখানেই থেকে যাবে! ভালো ভাবে ঘোরালেও চাকরির ব্যাপারে, দাদা শুধু বিএসসি পাশ বলে উদাসীনই ছিল ভাই কৃষ্ণেন্দু! এখানে সবাই গবেষণার চাকরির জন্য মাথা ফাটাচ্ছে। কৃষ্ণেন্দু পোস্ট ডক্টরেট করছে। এমটেক করার পর বহু বহুজাতিক সংস্থায় ভালো চাকরি ছেড়েছে। ছোটো বয়সে ইন্দ্র কৃষ্ণেন্দুর চেয়ে পড়াশোনায় যথেষ্ট ভালো ছিল। ভাগ্যের পরিণতি যে এমন হবে তা কে জানত?

এদিকে ইন্দ্রর বিএসসি-র রেজাল্ট খারাপ হবার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দর রূপের অহংকারও বিসর্জন দিয়েছিল কমলবাবুর মেয়ে ঈপ্সিতা! ইন্দ্র পরে শুনেছিল যে ওরা নাকি ওইরকমই। প্রেমের বিষদাঁত ভাঙাই নাকি ওদের ব্রত। ইন্দ্রর বুঝতে দেরি হয়ে গেছে। তার ওপর একটা চাকরি পেলেও না কথা ছিল। ফলে ইন্দ্রর না হল প্রেম, না হল বিয়ে। প্রেম থাকলে এই অবস্থায় একটা বিয়ে অন্তত হতো। ঈপ্সিতার বিয়েও নাকি প্রেম করেই হয়েছে।

আগে শহুরে ব্যস্ততায় ব্যাপারটা সামলে নিলেও পরে ইন্দ্রর মনে হয়েছিল রূপলাবণ্যের কাছে সে পরাজিতই হয়েছে। কারওর কাছে স্ট্যাটাস মেনটেইন করা, কারুর কাছে বন্যায় ভেসে যেতে যেতে খড়কুটো আঁকড়ে ধরা। দূরাবস্থা হয় বন্যাপীড়িতদেরই। চাকরি যে হবে না এমনটা ভাবাও আগে হয়নি। বুড়ো বয়সে কল্পনার প্রতি দাবিটাও এখন যেন ঠেকে শেখা।

(চার)

মেমারি এসেছে মা আর ইন্দ্র। রবিবার একদিন ছুটি তাই এই দিনগুলিতেই মেয়ে দেখার কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে। আজ মেমারি থেকে দূরে বড়া নামে একটা গ্রামে তাদের মেয়ে দেখতে যেতে হবে। মেয়ের দাদা ফোন করেছিল। বাবা মারা যাওয়ায় উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়েনি। বয়স তেত্রিশ বছর। মেমারি স্টেশন থেকে বড়া যাবার বাস এক ঘন্টা অন্তর। একটু আগেই বাস চলে গেছে। মাঝপথের বাস ধরে রাধাকান্তপুরে এসে একটা রিকশাওলা পেয়ে, মেয়ের দাদাকে ফোন করতে মোটর সাইকেলে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।

(ক্রমশ…)

প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (পর্ব-০১)

অন্যের থেকে শুনে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া-র মাধ্যমে আপনি হয়তো প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (পিএমএস) শব্দগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন মাত্র, এর বেশি কিছু জানতে পারেননি। কিন্তু আপনি জানেন কি যে, প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম ভোগ করা মহিলারা কতটা কষ্ট পান? তাহলে জেনে নিন, শারীরিক কষ্ট ছাড়াও, মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন এই রোগীরা। কষ্টের তাড়নায় কথায়- কথায় রেগে গিয়ে অন্যের সঙ্গে বাজে ব্যবহারও করে ফেলেন। তাই, রোগটি সম্পর্কে বিশদে জেনে নিয়ে, সঠিক চিকিৎসাকে মাধ্যম করা উচিত। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অপরূপা ওঝা।

প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএস এবং প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বা পিএমডিডি ঠিক কী?

প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম হল উপসর্গের একটি অংশ মাত্র। যেমন ফুলে যাওয়া, স্তনের শিথিলতা, মেজাজের কিছু পরিবর্তন (সবসময় উদ্বিগ্ন বোধ করা, সহজেই বিরক্ত হওয়া প্রভৃতি) এবং অন্যান্য লক্ষণ যা মহিলারা মাসিক ঋতুচক্র শুরু হওয়ার আগে এবং ওই কয়েকদিন অনুভব করেন। অন্যদিকে প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার হল প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোমের একটি গুরুতর রূপ। ডিসফোরিয়া শব্দটি মহিলাদের পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগে মেজাজ হারানো, হতাশা এবং অন্যান্য আবেগপূর্ণ উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার আগে ডিসফোরিক ডিসঅর্ডারের রোগীদের মেজাজের পারদ ওঠা-নামা, জৈবিক কার্যকারিতার পরিবর্তন (অনিদ্রা/ হাইপারসোমনিয়া, ক্ষুধায় পরিবর্তন, দুর্বলতা, ক্লান্তি) এবং শারীরিক উপসর্গ যেমন শরীর ফুলে যাওয়া, ব্যথা এবং পেশিতে টান লাগা প্রভৃতি দেখা যায়। এর ফলে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়। আপনি যখন বড়ো হচ্ছিলেন সেই সময়ের কথা চিন্তা করুন। স্কুলের দিনগুলিতে আপনি হয়তো এমন একজন বন্ধুর কথা মনে করতে পারেন, যিনি প্রায়ই অসহ্য ব্যথা এবং অন্যান্য উদ্বেগের কারণে তার ঋতুচক্র চলাকালীন ছুটি নিতেন।

প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডারে ভুগছেন এমন মহিলারা প্রায়শই কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন বলে মনে করেন। সাধারণত দেখা যায় যে, এই আচরণগত এবং শারীরিক পরিবর্তনগুলি কারও কারও পিরিয়ডের প্রায় এক সপ্তাহ আগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার কয়েক দিন পরে ঠিক হয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা যারা ঋতু পূর্ববর্তী ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার সম্পর্কে ব্যাপক ভাবে গবেষণা করেছেন— তারা ১.৮ শতাংশ মহিলাদের (ডিএসএমভি) মধ্যে এই সমস্যা দেখতে পেয়েছেন। গুজরাতের কলেজ ছাত্রীদের নিয়ে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, তাদের মধ্যে ৩.৭ শতাংশ প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার-এ ভুগছেন। পিএমডিডি-র তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, অস্বাভাবিক ঋতুচক্রের কারণে মহিলারা প্রচুর কষ্ট ভোগ করেন। তাই এখন কিছু অফিসে ‘পিরিয়ড লিভ’-ও চালু হয়েছে।

আচরণগত পরিবর্তনের প্রকৃতি মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের মাধ্যমে হরমোনের ওঠা-নামাকে স্পষ্ট ভাবে নির্দেশ করে। মাসিক চক্রের সময় ফলিকুলার পর্বে প্রোজেস্টেরন নিঃসরণ কম থাকে এবং পিরিয়ডের শুরুতে দ্রুত হ্রাস পায়। গবেষকরা জানতে পেরেছেন যে, প্রোজেস্টেরন নিঃসরণে এই আকস্মিক পতনের ফলে আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে, বিশেষ করে বিরক্ত বোধ করা এবং মেজাজ হারানো।

মজার বিষয় হল— আরেকটি হরমোন ইস্ট্রোজেনও ঋতুকাল শুরুর আগে ডিসফোরিক ডিসঅর্ডারের ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের উপর প্রভাব ফেলে। নিউরোট্রান্সমিটার হল রাসায়নিক পদার্থ যা বার্তা প্রেরণের জন্য সিন্যাপসে মুক্তি পায় এবং এর ফলে ঋতুমতী নারীদের আচরণকে প্রভাবিত করে। এটা লক্ষ্য করা যায় যে, ঋতুচক্রের শেষের দিকে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম থাকে। ইস্ট্রোজেনের নিম্ন স্তর সেরোটোনিন নামক একটি নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়।

অপাত্র (পর্ব-০৫)

(তিন)

মেজ ভাইয়ের কথা টিকল না। সবাই ফটো পাঠাতে চাইছে না। সবারই এক কথা— ‘না মানে দেখতে আসুন না, মেয়ে আপনাদের পছন্দ হবেই। চোখের দেখাই ভালো, আসলে মেয়ের ফটো ফেস ভালো নয়।’ তাই ইন্দ্রের মা ঠিক করল, যে-কুড়িটা সম্বন্ধ এসেছে তাদের সবাইকেই দেখতে যাবে।

অনেকে আবার ফোন করতে বলেছে, “আমার বোনের মেয়ে। দাঁড়ান ওদের বাড়িতে একবার জিজ্ঞেস করতে হবে।’ ইন্দ্র ভাবে যদি এখনও জিজ্ঞেস করতে হয় তবে ফোন করাই কেন ন্যাকামি করে।

কেউ কেউ আবার জানতে চায়— ‘এতদিন ছেলের বিয়ে হয়নি কেন? কোনও ভাবটাব বা অন্য কিছু নেই তো? না মানে চাকরিটা আসলে যে-লাইনে করে!”

গ্রামের দিক থেকেই অনেক সম্বন্ধ এসেছে। শেষমেশ দশটা মেয়ে দেখাতে রাজি হল। চল্লিশের কাছাকাছি বয়সের ইন্দ্র ভাবল, এই দশটার মধ্যেই বিয়ে করতে হবে, না হলে আর বিয়ে হবে না। এই ফরসা রূপবান সুশ্রী ছেলেটার বিয়ে হয়নি কেন অনেকেই বলে! তবে বাস্তবটা ইন্দ্ৰ একাই বুঝতে পারে। যে-চাকরিটা করে তার তুলনায় জিনিষপত্রের যা দাম। তবে বিয়ে করলে চলে যাবে এটুকু জানে।

একদিকে ছোটো ভাইয়ের তাড়া অপর দিকে নিজের কাছে বিয়ের বয়স পার হয়ে যাবার ভয়। এই তো বাড়ি সবই ঠিক আছে তবু বাবা-মার অবর্তমানে, ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই হলে তখন কে দেখবে ইন্দ্ৰকে? এই যে অ্যাকট্রেস কল্পনা তার সঙ্গে যেভাবে মেশে তাতে ইন্দ্র তাকে নিয়ে অনেক কিছুই ভেবেছিল। ইন্দ্রদের ভিডিওট্রিক্স কোম্পানির দু-চারটে মেগা সিরিয়ালের নায়িকা কল্পনা। পেমেন্ট ইন্দ্রর হাত দিয়ে হয় বলে খুব ভাব জমিয়েছিল। প্রথম প্রথম ইন্দ্রের খুব অসুবিধা হতো। প্রেম করার সমস্ত আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছিল প্রথম প্রেম করার চেষ্টা বিফল হওয়ায়! এমনিতেই এ ব্যাপারে লাজুক তার উপর প্রথম চেষ্টা অকৃতকার্য হওয়ায় আর প্রেম করার তাগিদ আসেনি।

চাকরি হলে বিয়ে করবে এমন চিন্তাই ছিল। মাঝে দু-একটা সম্বন্ধ এলেও ইন্দ্রের মা-ও বলেছিল, চাকরি পেলেই বিয়ে হবে। এ প্রসঙ্গে না এগিয়ে চাকরির চেষ্টাই করছিল, তবে চাকরিও ভালো হল না। এদিকে প্রথম প্রেমের চেষ্টাতে ঘরজামাইয়ের প্রতি ইন্দ্রের একটা দুর্বলতা হয়ে গেছিল। তার থেকেই রোজগেরে মেয়েদের প্রতি আনুগত্য ইন্দ্ৰকে অনেকটা নিষ্কর্মা করেছিল। আজকাল মেয়েরাও অনেকেই চাকরি করছে। তবে সাকার ছেলে বেকার মেয়ে বিয়ে করলেও সাকার মেয়ে বেকার ছেলে বিয়ে একদমই করে না! তবুও প্রেমে সবই সম্ভব!

বছর দুয়েক চাকরি করার ফলে মনে একটা স্বস্তি এসেছে। সরকারি চাকরি করলে আরও আসত আর বিয়ের জন্য অনেক কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা তখন কথা বলত। কাগজের পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনে সরকারি চাকরিজীবীরাই বেশি আকর্ষিত হয়। সরকারি চাকরিতে যেমন মাইনে ভালো খাটুনি কম। ফাঁকিবাজি করা যায় আবার বিয়ের বাজারেও বেশ দামি। দশটা সম্বন্ধের ব্যাপারে মা একদিন বলেই ফেলল, “বাবা যদি একটা সরকারি চাকরি করতিস!”

মায়ের কথার জবাবে ইন্দ্ৰ বলে, ‘ওই জন্যই তো বিয়ে করব না বলছি।’

—সে আবার হয় নাকি? তাছাড়া তোর বিয়ে না হলে ছটু বিয়ে করতে পারছে না। ইন্দ্র মাকে একটু নিজের পক্ষে ভাবে, তার মুখেও বাড়ির ভাবনার কথা এখন বুঝতে পারে।

সত্যি ইন্দ্র এখন বোঝে সরকারি চাকরির গুরুত্ব কত। এখানে এত খেটেও বেতন অল্প। টিএ, ডিএ একটু এদিক ওদিক করলে অবশ্য কিছু পকেটে আসে, সকাল ন’টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা ডিউটি আওয়ারস। শ্যুটিং চললে যেতে হলে একটু অন্যরকম। তাও ইন্দ্রকে আউটডোর শ্যুটিংয়ে ডিউটি দেয় না এখনও।

(ক্রমশ…)

অপাত্র (পর্ব-০৪)

ইন্দ্র নীচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘বড়োটার সঙ্গে তোর আছে নাকি?’

—না মানে আমাকে লাইক করে। দ্যাখে ট্যাখে।

বাসস্থান অল্পদিনের হলে বেড়াতে এসেছে মনে হয়। ইন্দ্রর মনের অনুভূতিগুলি সেরকম এখন। তাই দুর্গাপুজোয় পাড়ার মেয়েগুলোকে জ্যান্ত দুর্গা মনে হয়। স্টুডেন্ট লাইফে বন্ধুরা মিলে কলকাতার অন্য জায়গায় ঠাকুর দেখতে যেত দল বেঁধে যেমন— কলেজ স্কোয়ার, মহম্মদ আলি পার্ক আরও কত জায়গায়। বেলুড়ে থাকতে মঠের পুজো ছেড়ে দু’বছর হোস্টেলের বন্ধুদের সাথে গেছিল। সারারাত ঘোরা খাওয়ার আনন্দই আলাদা।

সপ্তমীর সকালবেলায় ঈপ্সিতাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখেছে। হাসি হাসি মুখে ইন্দ্রর দিকে একবার তাকাল প্যান্ডেলের মধ্যে। ব্যাপারটা বোঝার আগেই ইন্দ্র ধরে নিয়েছিল মেয়েটা তাকে চাইছে। এখনকার প্রেম করার থিওরি বেশ আলাদা। ইন্দ্ররই অভ্যাস নেই। তাছাড়া মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা বোধ করে। প্যান্ডেলে যতক্ষণ ইন্দ্র ছিল মেয়েটা ছিল একটু দূরে দূরে। হঠাৎ দেখে, নেই! ইন্দ্র বাড়ি যাবার জন্য উঠতেই একজন বলে উঠল— ‘ও আবার আসবে।’ যে বলল কথাটা তাকে মেয়েটার সঙ্গে দেখেছে। এ পাড়ারই অন্য একটা মেয়ে।

প্যান্ডেল ছেড়ে ভাইয়ের বন্ধু গোরাদের বাড়ি ক্যারাম খেলতে গেছে ইন্দ্র। হঠাৎ দেখে মেয়েটা একটা বন্ধুকে নিয়ে এই দিকেই আসছে। নির্মাল্যকে ইন্দ্রদের পাড়ায় বারোয়ারিতে অষ্টমীতে বেশ ভালো ভাবে পাওয়া গেল। লেখাপড়ায় ভালো হলেও নির্মাল্য বেশ পাকাই। নির্মাল্যকে, ইন্দ্র কমলবাবুর মেয়ের ব্যাপারটা বলাতে ও

প্রেম-পরিণতির ব্যাপারে কমলবাবুর মেয়েই কেন জানতে চাওয়ায় ইন্দ্ৰ বলল, “বিএসসি-র রেজাল্ট তো খারাপ হলই!”

নির্মাল্যর সঙ্গে একসঙ্গে সমান তালে পড়লেও এখন নির্মাল্যের কেরিয়ারের চাবুকেই তার পরিণতি, প্রেম সব আছে। হয়তো সে ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করবে কয়েক বছর বাদেই। কোনও রূপসি রাজকন্যার গলাতে বরমাল্যও পড়াবে। বিয়ের বাজারে ইঞ্জিনিয়র, ডাক্তারদের যেমন অগ্রাধিকার থাকে! কোনও রূপসি হয়তো নির্মাল্যর জন্য এখন থেকেই ওত পেতে আছে। এদিকে ইন্দ্রর সেইসব স্বপ্ন চূর্ণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কমলবাবুর মেয়ে ইন্দ্রর প্রেমে পড়তে চাইছে! কমলবাবু ইউনিভার্সিটির ডিন। এমএসসি কোথাও পেল না। তবে নির্মাল্য প্রযুক্তিবিদ্যার ছাত্র, পড়াশোনা করে নিজের কেরিয়ার প্রায় গুছিয়ে এনেছে।

বন্ধু ইন্দ্রের পরিণতি নিজের মনের মতো ভাবলেও বাঁকা কথাবার্তায় জিজ্ঞেস করল, “কমলবাবুই যদি তোর পছন্দ হয় তবে বড়ো মেয়েটাকে দ্যাখ। এই মেয়েটাই চায় মনে হয়। আসলে টিনএজারদের প্রেম করা সহজ, এদের ভবিষ্যৎ চিন্তা থাকে না।’ এ অবস্থায় এই কথাটায় অ্যাসিড ছিল তা ইন্দ্ৰ বুঝল। ভবিষ্যৎ টবিষ্যৎ নিয়ে ইন্দ্রর চিন্তা করতে ভালো লাগে না এখন। তবে সে-ও বোঝে নিছক রূপের দৌলতেই তার এই প্রেমের সুযোগ।

যাইহোক অষ্টমীর রাতেরবেলায় ঠাকুর দেখতে দেখতে ইন্দ্র আর নির্মাল্য অন্য একটা প্যান্ডেলে মেয়েটাকে দেখে বন্ধুদের সঙ্গে। নির্মাল্যের প্রেরণায় ইন্দ্র হঠাৎ মেয়েটাকে আচমকা ডেকে বলে, ‘এরা আবার কেন? তুমি কি কিছু বলবে?” মেয়েটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ইন্দ্ৰ ভেবেছিল সব ঠিকই আছে শুধু একবার কথা বলা, জীবনে এ ব্যাপারে প্রথম কথা বলা ৷

মেয়েটা চমকে উঠে বলল, ‘কই কিছু না তো৷’

ইন্দ্র অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “অনেকদিন থেকেই দেখছি কিছু বলার চেষ্টা করছ তুমি।”

মেয়েটা আবার বলল, ‘কই কিছু না তো।’ তারপর নেহাতই আটপৌরে হয়ে, ‘তুমি কেকার দাদা তো?” বলে রেগে চলে গেল।

কেকা ইন্দ্রর বোন। একই স্কুলে পড়ে হয়তো। ইন্দ্র কোনওদিন কেকার সঙ্গে দেখেনি। ফিরে আসতে ইন্দ্র নির্মাল্যকে বলল, ‘তাহলে তোর অনুমান ঠিক নয়।’

তবু ইন্দ্ৰ আশা ছাড়ল না। ভাবল বোনের নাম করেছে, হয়তো তার মাধ্যমে প্রেম করতে চায়। নিভৃতে বোনকে জানাতে বোন কেকা শুনেছিল, সেদিন নাকি ঈঙ্গিতা ইন্দ্রকে চড় মেরে দিত! ছেলেটাকে ভালো মনে হয়েছিল বলে রসিকতা করেছিল। ব্যাপারটা ইন্দ্রের মনে হয়েছিল সুযোগ পেয়েও, আনাড়িপনার জন্য তার প্রেম হয়নি! এ ব্যাপারে বন্ধুদের বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি।

(ক্রমশ…)

মুক্তি পেতে চলেছে বাপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘আমার লবঙ্গলতা’

আর কিছুদিন বাদে মুক্তি পাবে বাপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘আমার লবঙ্গলতা’। ‘শ্রী গণেশ এন্টারটেইনমেন্ট’-এর ব্যানারে এই ছবিটি প্রযোজনা করেছেন রঞ্জনা গঙ্গোপাধ্যায়। সম্প্রতি কলকাতা-র এক স্টার হোটেলে ছবিটির ট্রেলার লঞ্চ করা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে। পরিচালক এবং প্রযোজক ছাড়াও এই ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এই সিনেমার নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। সেইসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এই ছবির অভিনেতা ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় এবং চিত্রনাট্যকার সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘রজনী’ উপন্যাসটি অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘আমার লবঙ্গলতা’ শীর্ষক ছবিটি। আর এই উপন্যাসটি যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে, এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র রজনী এক জন্মান্ধ যুবতী। কিন্তু এই রজনী ছাড়াও এই উপন্যাস-এ সমান্তরাল ভাবে আরও যে চরিত্রটি গুরুত্ব পেয়েছে, সেই চরিত্রটির নাম—লবঙ্গলতা। যে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং মানবিক। শুধু তাই নয়, সে সবকিছু মানিয়ে নিতে পারে।

লবঙ্গলতা-র অনুমতি ছাড়াই ওর বড়োলোক দাম্ভিক বাবা তাঁরই বয়সি এক প্রৌঢ়-র সঙ্গে লবঙ্গলতা-র বিয়ে দেন। এই অন্যায় সত্ত্বেও, ওই প্রৌঢ় স্বামীকে ভালোবাসতে কার্পণ্য করেনি লবঙ্গলতা।  বৃদ্ধ রামসদয়ও লবঙ্গলতা-র নিশর্ত ভালোবাসায় মুগ্ধ ছিলেন। তাই তিনি আদর করে ডাকতেন–ললিত লবঙ্গলতা। অবশ্য রামসদয় ছাড়াও, আরও যে লবঙ্গলতা-র রূপে, গুণে মুগ্ধ ছিল, সে  ছিল অমরনাথ। কিন্তু এই অমরনাথের মনের ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল কি? এই প্রশ্নেরই উত্তর দেবে ‘আমার লবঙ্গলতা’ শীর্ষক ছবিটি।

মুখ্য চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছাড়াও, অমরনাথের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত এবং রামসদয়ের চরিত্রে রূপদান করেছেন বাংলাদেশের আলমগীর। এছাড়া,  ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, তানিয়া কউর, পার্থ সারথি দেব, রিতা দত্ত চক্রবর্তী, ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়, প্রয়াত শ্রীলা মজুমদার, গৌরীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, পূজা দত্ত প্রমুখ অভিনয় করেছেন এই ছবির বিভিন্ন চরিত্রে।

এই ছবিটিতে কয়েকটি গান আছে। গানগুলি লিখেছেন গৌতম সুস্মিত। প্রয়াত বাপ্পী লাহিড়ি এই ছবির সংগীত পরিচালক। ছবিতে ব্যবহৃৎ গানগুলি গেয়েছেন শান, অলকা ইয়াগনিক, বন্দনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধনা সরগম, অন্বেষা এবং বাপ্পী লাহিড়ি স্বয়ং।

‘আমার লবঙ্গলতা’ ছবির চিত্রগ্রহণের কাজ করেছেন প্রেমেন্দু বিকাশ চাকি এবং সম্পাদনায় অতীশ দে সরকার। মেক-আপ-এ ছিলেন কিশোর দাস। প্রসঙ্গত পরিচালক বাপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, আগামী লোকসভা ভোটের পরে মুক্তি পাবে ‘আমার লবঙ্গলতা’ ছবিটি।

অপাত্র (পর্ব-০৩)

বেলুড় মঠের পাশেই তাদের কলেজ ও ভেতরে হোস্টেল। তাই বিকেলে মঠে যাওয়া ইন্দ্রদের কাছে খাঁচাবন্দি বাঘের মুক্তির মতো ছিল। বেলুড়ে ভয় টিসি আর গার্জেন কলের। তবু হোস্টেল লাইফে লুকিয়ে চুরিয়ে অনেকেই সিনেমা দেখতে যেত। আগে রোগা থাকলেও হোস্টেল লাইফে শরীরে বাঁধন এসেছিল ইন্দ্রর। ফরসা, সুন্দর মুখের গড়ন, শরীরে স্মার্টনেস – এক অন্য সৌন্দর্য।

পাড়াটা ভালো, কয়েকজন কলেজ, ইউনিভর্সিটির প্রফেসরের বাড়ি এ পাড়ায়। দু’একজনের সঙ্গে পরিচয়ও হয়ে গেছে। মায়ের মাসির ছেলে সম্পর্কে ইন্দ্রর মামার, এ পাড়ায় খুব নাম ডাক। ডাক নাম চঞ্চল, ইন্দ্ররা চঞ্চলমামা বলে। কর্মসূত্রে টাটা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়র। ব্যবহারটা খুব ভালো। আপদে বিপদে ইন্দ্রদের পাশে থাকে। ইন্দ্রদের এ পাড়ায় জমি কেনা ও বাড়ি করার পেছনে অনেক সহযোগিতা করেছে চঞ্চলমামা।

খিদিরপুরের মতো এলাকায় জায়গা পাওয়া সহজ কথা নয়। চঞ্চলমামার এক বন্ধুর জায়গা ছিল এটা। বন্ধুদের বাড়ি আসা যাওয়া আছে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের অধ্যাপক কমলকান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি আর একটু গেলে। চঞ্চলমামার সঙ্গে আলাপ আছে। ইন্দ্রকে নিয়ে গেছিল এমএসসি অ্যাডমিশনের ব্যাপারে। সব নাম্বার অনুযায়ী হয়েছে। ভদ্রলোকের কিছু করার ছিল না।

ভদ্রলোকের দুটি মেয়ে। বড়োটি বাংলা অনার্স, ছোটোটি ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। ইন্দ্রকে ওই ব্যাপারে বাড়ি যাওয়ায় চিনে গেছিল। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ইন্দ্রকে যেন কেমন করে দেখছিল ছোটোটা! দেখতে শুনতে ভালো। তবে এই মেয়ে যে ইন্দ্রকে পছন্দ করে, তা পরিষ্কার হয়েছিল নতুন বাড়িতে আসার কিছুদিন বাদেই।

বাইরের পাঁচিলটা তখনও হয়নি। পাঁচিল নিয়ে পাশের বাড়ির একটু অবজেকশন ছিল। মিউনিসিপ্যালিটিতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পাঁচিল দেবার পারমিশন পেয়েছে। একদিন বিকেলে পাঁচিলটা কেমন হবে ইন্দ্র মায়ের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলোচনা করছে। হঠাৎ দেখে মেয়েটা উলটো দিকে একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে আর চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়াচ্ছে। ওদের বাড়িটা রাস্তার এ ধারে উলটোদিকের গলিতে। প্রথমে না বুঝতে পারলেও ইন্দ্রকে ভেংচি কাটাতে বুঝতে পারল। ইন্দ্র যা যা অঙ্গভঙ্গি করছে মেয়েটা তাই করছে। আর মাঝে মাঝে হাসছে। এমনটা দেখে ইন্দ্ৰও হেসে ফেলল।

এমন চিন্তা এই প্রথম জন্মাল ইন্দ্রের মনে, কেউ একজন তাকে চায়! হোস্টেলের অনেক ছেলেরই প্রেম ছিল। চারদিকে যা প্রেমের পরিস্থিতি তাতে ইন্দ্ররও প্রেম করতে ইচ্ছে করত। তবে প্রেম ও বিয়ে তখনও তার মনে সম্পূর্ণতা লাভ করেনি। সেদিনের সেই ঘটনা বন্ধুদের বলতে অনেকেই উৎসাহ দিল। অনেকে কমলবাবুর বড়ো মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করতে বলল। এলাকায় কমলবাবুর নাম আছে।

খিদিরপুরের ইস্কুলের বেশকিছু বন্ধু এই অঞ্চলে থাকত। তার মধ্যে সুব্রত, নব, প্রকাশ আছে। এদের সঙ্গে ইন্দ্রর নতুন করে দেখা হয়েছে। তবে এখানকার বন্ধুত্বের চেয়ে হোস্টেলের যেরকম বন্ধুত্ব ছিল তার রীতিনীতিই আলাদা ছিল। তিন বছরের জন্য এক জায়গায় অন্তত রাত্তিরের থাকবার জায়গাগুলো হওয়ায় বেশ মাখামাখি ছিল। সেই অভ্যাসেই খিদিরপুরে ফিরে প্রথম প্রথম বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়িয়ে দিয়েছিল ইন্দ্র। সুব্রতর অঙ্কর অনার্স কেটে গেছে। নব এমকম পড়ছে। প্রকাশ বাবার ব্যাবসায়। ইন্দ্রদের স্কুলের ফার্স্টবয় নির্মাল্য এখন যাদবপুরে বিই পড়ছে। নির্মাল্য ওদিকের পাড়াটায় থাকে। মাঝে মাঝে বাড়ি এলে এ পাড়ায় আড্ডা জমায়।

ইন্দ্রদের নতুন পাড়ায় একটা দুর্গাপুজো হয়। সে বছর নতুন আসায় পুজোটা বেশ ভালোই লেগেছিল। দুর্গাপুজো মানেই চার-পাঁচদিন বাড়ির বাইরে অনেকেরই সঙ্গে মেলামেশা হয় রাতদিন। নব, সুব্রত, প্রকাশ তো ছিলই নির্মাল্যও এসে পাড়ার আড্ডায় যোগ দিয়েছিল। এই অবসরে কমলবাবুর মেয়ের নামটাও জেনে নিয়েছে। ঈপ্সিতা। প্রকাশই নামটা জানিয়েছে আর বলেছে, ‘ওর দিদির নাম ইন্দিরা। তুই যদি এটাকে চাস, আমি তাহলে বড়োটাকে।’

(ক্রমশ…)

অপাত্র (পর্ব-০২)

শ্রীরামপুর থেকে খিদিরপুরে এসে প্রথমে ইন্দ্ররা ভাড়া থাকত মায়ের মাসিদের বাড়ির কাছে। এখানে তারা পাঁচ বছর কাটিয়েছে। পরে ইন্দ্রর বাবা সেখান থেকে খানিকটা দূরে খিদিরপুরেই নতুনপাড়ায় বাড়ি করে। যে-বছর ইন্দ্র ফিজিক্স অনার্স পাশ করে, সে বছরই ওর বাবা এখানে বাড়ি করে বসবাস শুরু করে। বাড়িটা এখন দোতলা হয়েছে। তার মধ্যে ছোটোভাইয়ের চেম্বার আছে। বোনের বিয়ে হয়েছে দুর্গাপুরে। বোন ইতিহাসে এমএ।

বিয়ের কথা হলেই ইন্দ্রর মনে পড়ে যায় বোনের বিয়ের কথা। কত আনন্দ হয়েছিল। বাড়ির প্রথম বিয়ে। অন্তত এ বাড়িতে। শ্রীরামপুর থেকে ইন্দ্ররা ছিন্নমূল হলেও ওখান থেকে খিদিরপুরে অনেকেই এসেছিল। ঠাকুমার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় কলকাতায় বাবার অফিসের সুবিধের জন্য মাসির প্রস্তাব একবাক্যে গ্রহণ করেছিল ইন্দ্রর মা। মায়ের মাসি কাছাকাছি থাকায়, ইন্দ্রদের মামারবাড়ির টানটাই বেশি। শ্রীরামপুরের তুলনায়। চলে আসার পরও, ছুটি থাকলেই ইন্দ্ররা শ্রীরামপুর যেত। তাতেও ঠাকুমা কথা শোনাত, ‘তোরা তো কলকাতার লোক, শ্রীরামপুরে ফিস্ট করতে এসেছিস!’

কাকাদের সঙ্গে যৌথবাড়ি ইন্দ্রদের। মাঝে মাঝে মন খারাপ হলেও খিদিরপুরের মতো জায়গায় থাকায় তাতে অসুবিধা কিছু হতো না। সুযোগ সুবিধা বেশি থাকায় তা পূরণ হতো। কলকাতায় থাকার আনন্দই আলাদা। সুযোগ সুবিধা তো আছে। লোকে বলে কলকাতায় বাঘের দুধও মেলে! তার ওপর খিদিরপুরে একটা ফ্যান্সি মার্কেট আছে।

ইন্দ্ৰ তখন ক্লাস এইটে উঠেছে, তখনই ওরা শ্রীরামপুর ছেড়ে খিদিরপুরে চলে আসে। খিদিরপুরে একটা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়। ওখান থেকেই বারো ক্লাস পাশ করে স্টার মার্কস নিয়ে। জয়েন্টে সেবার ভালো কোচিং নেয়নি। বেলুড়ে আবাসিক কলেজে ভর্তি হওয়ার পরের বছর আর জয়েন্ট দেওয়া হয়নি।

ইন্দ্রর অনার্সের রেজাল্ট ভালো না হওয়ায় কোনও ইউনিভার্সিটিতে এমএসসি অ্যাডমিশন পেল না। ফলে তার আর মাস্টার্স করা হল না। মাথায় তখন ডব্লুবিসিএস, আইএএস, ফরেস্ট সার্ভিস ও অন্যান্য পিএসসি-র বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় বসার চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু চাকরি পাওয়া যে এত শক্ত তা কে জানত! ফিজিক্স-এ অনার্স থাকলে প্রসার ভারতীতে আবেদনপত্র দেওয়া যায়। কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিতে কেস বাধা হয়ে পড়ল৷

দেখতে দেখতে ইন্দ্রর এসএসসি পরীক্ষার বয়স সাঁইত্রিশ পার হয়ে গেছে। যদিও ইন্দ্র যখন পাশ করেছিল স্কুলে চাকরির জন্য এমএসসি হয়নি। যখন এমএসসি হল ইন্দ্রর বয়স তখন প্রায় ত্রিশ। ফিজিক্স অনেকটাই ভুলে গেছে। বত্রিশ পর্যন্ত পিএসসি-র চাকরি। সব নিয়ে পড়তেই হবে কেন না এমএসসি, বিএড থাকলেও হতো।

চাকরি থেকে অবসর জীবনে একবার বসে গেলে, বসে যেতেই হয়। ইন্দ্রের বাবার যেমন হয়েছে, তেমন পড়াশোনার জীবন থেকে বসে গেলে চাকরি পেতে বেশি ভোগান্তি হয়। তার ওপর কিছু রোজগারের তাগিদে টিউশন করতে হয়। টিউশন করলে জ্ঞান বাড়ে ঠিকই কিন্তু অনেক টিউশন শুধু টিউশনই করা এই যা! কলকাতায় টিউশনির বেতন ভালো, শুধু টিউশন করে অনেকে প্রতিষ্ঠিত হলেও ইন্দ্রর এইদিকে কোনওদিনই ইচ্ছা ছিল না। চাকরির পরীক্ষার পোস্টাল অর্ডার ও হাত খরচা চালাতেই ওকে টিউশন করতে হতো।

বেলুড় থেকে ইন্দ্রদের আসা আর নতুন বাড়িতে উঠে আসার আগে, মাঝে খিদিরপুরে পাঁচ বছর কাটানো ইন্দ্রর কাছে নতুন নতুন ঠেকে ছিল। বেলুড়ে তিনবছর থাকাই এর প্রধান কারণ। বেলুড়ে যাওয়ায় ইন্দ্রর চরিত্রে একটা সর্বজনীন ব্যাপার এসেছে, যেটা কলকাতায় অনেক লোকের মধ্যেই আছে— মিশুকে, কূপমণ্ডূক নয়। তার আগে পড়াশোনা নিয়ে থাকলেও বন্ধু-বান্ধব হয় বিভিন্ন জায়গার ছেলের সঙ্গে, তবে বেশিরভাগই মেদিনীপুরের গ্রামের ছেলে।

(দুই)

বেলুড়ে গিয়ে বর্তমান সময়ে যাকে ‘পাকা” বলে সেরকম ইন্দ্র একটু হয়ে উঠেছিল। আগে খিদিরপুরে কো-এড পড়ার সুযোগ পায়নি ইন্দ্ৰ৷ বেলুড়েও সেই একই অবস্থা।

(ক্রমশ…)

ব্যায়ামের পরে Almond খেলে কী কী উপকার পাবেন জানেন কি?

ক্যালিফোর্নিয়ার Almond বোর্ড-এর পক্ষ থেকে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে সম্প্রতি। জানানো হয়েছে, মধ্যবয়সী কয়েকজন পুরুষ এবং মহিলা প্রতিদিন ৫৭ গ্রাম (দুই আউন্স) কাঁচা Almond খাওয়ার আট সপ্তাহ পরে, ৩০ মিনিটের ডাউনহিল ট্রেডমিল রান পরীক্ষা করে ভালো ফল পেয়েছেন।  ব্যায়ামের পর পেশীর উপর কতটা এবং কী প্রভাব পড়ে, তা দেখার জন্য  ট্রেডমিল পরীক্ষাটি করা হয়েছিল। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের পর Almond খেলে পেশী এবং কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক হয় খুব দ্রুত।

পেশীর কার্যকারিতা এবং রক্তের সঞ্চালন ব্যায়ামের আগে, ব্যায়াম চলাকালীন এবং ব্যায়ামের পরে কেমন থাকে,  এই বিষয়টি তিনটি টাইমপয়েন্টে একটি ভিজ্যুয়াল স্কেল ব্যবহার করে পরীক্ষা করেছিলেন গবেষকরা। সেইসঙ্গে,  ব্যায়ামের পরে Almond খাওয়ার পর পেশী এবং কর্মক্ষমতা কেমন থাকে তাও পরীক্ষা করে দেখেছিলেন তাঁরা। এই পরীক্ষাটি গবেষকরা একটানা চালিয়েছিলেন আট সপ্তাহ এবং তাঁরা দেখেছেন যে, ব্যায়ামের পর প্রতিদিন ৫৭ গ্রাম Almond খেলে কার্ডিওমেটাবলিক স্বাস্থ্য, মেজাজ, খিদে এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। গবেষকরা প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, যারা ধুমপান করেন না, তারা ব্যায়ামের পর Almond খেলে আরও ভালো ফল পাবেন।

কিংস কলেজ অফ লন্ডন-এর এক্সারসাইজ মেটাবলিজম অ্যান্ড নিউট্রিশনের সিনিয়র লেকচারার ড. অলিভার সি উইটার্ড জানিয়েছেন, ‘Almond প্রাকৃতিক ভাবে প্রোটিন, গুড ফ্যাট এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন-ই প্রভৃতি পুষ্টিকর উপাদানে সমৃদ্ধ। এগুলি ফিটনেসের জন্য উপযুক্ত উপাদান হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।’

ড. অলিভার আরও জানিয়েছেন, ‘এক আউন্স (২৮ গ্রাম) Almond ৬ গ্রাম প্রোটিন, ৪ গ্রাম ফাইবার এবং ৭৬ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম (২০% ডিভি), ৭.৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন-ই (৫০% ডিভি) এবং ২১০ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম (৪% ডিভি) সহ ১৫টি প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।’

ম্যাক্স হেলথ কেয়ার-এর আঞ্চলিক প্রধান-ডায়েটেটিক্স রিতিকা সমাদ্দার এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে, নিয়মিত ভাবে আমার রোগীদের প্রতিদিন Almond খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। কারণ, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যালমন্ডস বোর্ড-এর করা নতুন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে,  প্রতিদিন Almond খাওয়া পেশীর ব্যথা কমাতে পারে এবং পেশীর কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।  যারা ব্যায়াম করতে অভ্যস্ত নন, তাদের উৎসাহিত করার জন্য Almond খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এখন। তাছাড়া, একজন ডায়েটিশিয়ান হিসাবে আমি সুপারিশ করছি, ডায়েটে Almond  অন্তর্ভুক্ত করার। কারণ, প্রোটিন, হেলদি ফ্যাট, ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সহ অত্যাবশ্যক পুষ্টি সরবরাহ করে Almond এবং ত্বকের স্বাস্থ্যও ভালো রাখে।’  

পুষ্টিবিদ রোহিনী পাতিল জানিয়েছেন, ‘নিয়মিত Almond খেলে পেশীর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। এটি যে একটি নিরাপদ এবং কার্যকর খাদ্য উপাদান, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।’

চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিভাগে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালিদের সম্মান জানাল ‘অ্যাঞ্জেল ক্রিয়েশনস’

বিগত বছরে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিভাগে যে-সব বাঙালিরা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের অনেককে এক মঞ্চে সম্মান জানালেন অভিনেত্রী সংগীতা সিনহা।

কলকাতা-র আইটিসি রয়্যাল বেঙ্গল হোটেলে আয়োজিত এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘বাংলার জাতীয় গর্ব’। সংগীতা যে প্রতিষ্ঠানের ফাউন্ডার এবং এমডি, সেই ‘অ্যাঞ্জেল ক্রিয়েশনস’-এর ব্যানারে আয়োজন করা হয়েছিল ‘বাংলার জাতীয় গর্ব’ শীর্ষক এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি।

অভিনেতা, পরিচালক, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, শিল্প-নির্দেশক প্রমুখ যাঁরা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদেরকেই মূলত পুরস্কৃত করা হল এই অনুষ্ঠানে। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরি, অশোক বিশ্বনাথন, রামকমল মুখোপাধ্যায়, শর্মিষ্ঠা মাইতি, রাজদীপ পাল, অভিনেত্রী অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মুখোপাধ্যায়, গায়ক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, গায়িকা ইমন চক্রবর্তী, শিল্প-নির্দেশক ইন্দ্রনীল ঘোষ প্রমুখের হাতে মেমেন্টো তুলে দেওয়া হয় মহা-সমারোহে। তবে এঁরা ছাড়াও শুভ্রজিৎ মিত্র-সহ আরও অনেকেই ছিলেন পুরস্কার প্রাপকদের তালিকায়। মোট ৩৫জনকে পুরস্কৃত করা হয় ‘বাংলার জাতীয় গর্ব’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে।

প্রিয়া সিনেমা হল-এর কর্ণধার অরিজিৎ দত্ত, অভিনেতা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, ডা. বিডি মুখোপাধ্যায়, যশ, অভিনেত্রী নূসরত জাহান, নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায় প্রমুখের হাত দিয়ে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় কৃতিদের হাতে। আর এই অনুষ্ঠানে পুরস্কার প্রাপক, পুরস্কার প্রদানকারীরা ছাড়াও, অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র জগত এবং রাজনৈতিক জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এই তালিকায় ছিলেন মেয়র পারিষদ এবং বিধায়ক দেবাশিস কুমার, পরিচালক অনিন্দ্য সরকার, অভিনেতা জিতু কমল, ইন্দ্রজিত চক্রবর্তী, রুদ্রনীল ঘোষ, অভিনেত্রী সোনালী চৌধুরি, পাপিয়া অধিকারী, তনুশ্রী চক্রবর্তী, পল্লবী চট্টোপাধ্যায়, দেবলীনা কুমার প্রমুখ।

‘বাংলার জাতীয় গর্ব’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী ইন্দ্রাণী দত্ত-র ‘সৃষ্টি’ ডান্স ট্রুপ-এর নৃত্যশিল্পীরা। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন আরজে কৌশিক ভট্টাচার্য এবং মধুমন্তী মৈত্র। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সৌম্যজিৎ দাস। উল্লেখ্য, ‘বাংলার জাতীয় গর্ব’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন আগে সাউথ সিটি মলের স্ক্যাপইয়ার্ড রেস্তোরাঁয় এই অভিনব উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেছিলেন অভিনেত্রী এবং ‘অ্যাঞ্জেল ক্রিয়েশনস’-এর ফাউন্ডার ও এমডি সংগীতা সিনহা।

অপাত্র (পর্ব-০১)

(এক)

ফোনটা না ধরাই ভালো এমনটা ভাবছে ইন্দ্ৰ। তবু মনে হচ্ছে বাড়ির লোক যদি ঠিকমতো কথা বলতে না পারে। অ্যাডটা সে নিজেই দিয়েছে, তারপরে অবশ্য বাড়িতে জানিয়েছে।

আজ রবিবার ছুটির দিন। মেজভাই এলেও তার বউ আসেনি। ছোটোভাই নিজের চেম্বারে, ওর চাপ আর বয়স বাড়ছে- তাই ইন্দ্ৰ এই অ্যাডটা দিয়েছে। অবশ্য তার আগে কলকাতায় যার জন্য মুখিয়ে ছিল সেই অ্যাকট্রেস কল্পনা, ইন্দ্রকে ঠিক বিয়ে করার মতো ভালোবাসে না বলেছিল। তারপরই ইন্দ্র অ্যাড দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ইন্দ্রও ভেবেছিল কল্পনাকে এ বাড়িতে তোলা যাবে না! কল্পনা, ইন্দ্রর ভাঙা জীবনে এক অকল্পনীয় কল্পনার মতোই ফিরে এসেছিল।

ফিল্ম লাইনে দু’বছর চাকরি হয়ে গেছে, তাও মামার সুপারিশ ছাড়া এ চাকরিটাও জুটত না। প্রাইভেট কোম্পানি সিরিয়াল বানায়। মামা দূরদর্শনের কর্মী, অ্যাকাউন্ট্যান্ট। হাত দিয়ে বিল পাস হয়। টাকাই পৃথিবীর বস। ইন্দ্র এখানে চাকরি করে মাসে হাজার দশেক টাকা পায়। টেকনিক্যাল কাজ কিছু জানে না। ফিজিক্স-এ অনার্স পাশ হলেও, সাধারণ স্নাতক হিসাবে কাজ করে।

মামা ধুরন্দর লোক। চাকরি পাবার সময় ইন্দ্রকে বলেছিল, ‘ওখানে সময় সুযোগ করে টেকনিক্যাল কাজ কিছু শিখে নিবি, দাম আছে। যেমন এডিটিং, ডাইরেকশন, স্ক্রিপ্ট রাইটিং, ক্যামেরার কাজ এইসব। চাকরির বাজারে গতানুগতিক চাকর না হয়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে মাল পার্সোনালিটি হওয়াই শ্রেয়। এদের চাকরি করতে হয় না, কাজ এদের খুঁজে নেয়। তাছাড়া সামর্থ্য থাকলে ফ্রিল্যান্সেরও জবাব নেই।”

এদিকে দালানে মায়ের গলা, ‘আপনি কোথা থেকে বলছেন? অ্যাঁ, একটাই মেয়ে, বিএ পাশ। ওকে, আপনার ফোন নম্বরটা বলুন।”

পারবে বলে মনে হল ইন্দ্রর। দু’বছর আগে বোনের বিয়ের অভিজ্ঞতা আছে। তাই ইন্দ্রর অনেকটা হালকা লাগল। এখনও মনে আছে বোনের বিয়ে। মেজভাইয়ের যে প্রেম আছে, তখনও বাড়িতে কেউ জানত না। ইন্দ্র আর মেজভাই কৃষ্ণেন্দু দু’জনেই মিশনের ছাত্র। ইন্দ্রর শরীর খারাপ হওয়ায় ভালো রেজাল্ট হয়নি, কোনওরকমে অনার্সটা পেয়েছিল।

এদিকে কৃষ্ণেন্দু ফার্স্ট ক্লাস ফোর্থ হয়ে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটে এম স্ট্যাট তারপর এম টেক, পিএইচডি করে সিঙ্গাপুরে পোস্ট ডক্টরেট করতে গেছিল। পরে ইউরোপের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি ভিজিট করেছিল। বর্তমানে খড়গপুরের আইআইটি-র অধ্যাপক৷ দেখতে দেখতে পনেরো বছর পার হয়ে গেছে। খড়গপুরে জয়েন করার আগে আয়ারল্যান্ডে থাকতে, বাড়িতে এসে বিয়েটা সেরে গেছে। দু’জনের প্রেম স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটউট বা আইএসআইতে।

রাতে খেতে খেতে মা সকলের সামনে বলল, ‘কুড়িটা সম্বন্ধ এসেছে। সবার-ই ফোন নম্বর নিয়েছি। এবার দেখতে গেলেই হয়।”

কৃষ্ণেন্দু বলল, “পছন্দ হলে সেগুলোতেই যাওয়া হবে। দাদার বিয়ে হয়ে গেলে ছটু বিয়ে করবে।

বাবা বলল, “তোর বিয়ে কি দাদার বিয়ের জন্য আটকে ছিল? ছটুর বিয়েও ওইরকম হবে।’

এদিকে ছটু-ও গম্ভীর ভাবে বলল, ‘বয়স হচ্ছে কিন্তু বিয়ের কোনও চেষ্টাই নেই দেখছি!”

ছোটো ভাইয়ের ডাক নাম ছটু, ভালো নাম সায়ন। এমবিবিএস ডাক্তার। কিছুদিন আগে জানা গেছে ও এনগেজ। তাই ইন্দ্রর বিয়েটাই গলগ্রহ হয়েছে ফ্যামিলিতে। ভবিষ্যতে চাকরির সমস্যা যে হবে, পড়ার সময় ইন্দ্র তা ভাবেনি। অনার্সের রেজাল্ট খারাপ হলেও ভেবেছিল বিসিএস বা পিএসসি-র চাকরি একটা হয়ে যাবে! স্কুলে ভালো ছেলে ছিল। সব ভাইবোনের চেয়ে পড়াশোনায় ভালো ছিল। কিন্তু ওর ভাগ্যটাই যে এমন হবে, তা কে জানত!

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব