মন ভোলানো মিজোরাম

উত্তর-পূর্ব ভারতের দক্ষিণতম রাজ্য মিজোরাম। ১৯৮৭ সালে মিজোরাম ভারতের ২৩তম রাজ্য হিসাবে স্বীকৃতি পায়। আর মিজোরামের একেবারে পুবে চামফাই জেলা। মিজোরামের বিরাট অংশে সীমান্তবর্তী অংশ হল বিদেশ– মায়ানমার ও বাংলাদেশ। চামফাই জেলার পুরো পুবের সীমান্ত তো মায়ানমারের সঙ্গে। মিজোরামে একটাই বিমানবন্দর লেংপুই। কলকাতা থেকে সরাসরি সংযোগ রয়েছে এই লেংপুইর সঙ্গে। আর লেংপুই থেকে মিজোরামের রাজধানী আইজলের সড়ক দূরত্ব ৪২ কিমি।

আইজলে দুদিন, লুংলেইতে ২ দিন আর খার্ডবং-এ একটা দিন কাটিয়ে আমরা চামফাইয়ের দোরগোড়ায়। আমাদের সঙ্গে ড্রাইভার টাইটি ও গাইড বাইরা। দুজনেই মিজো খ্রিস্টান। টাইটি মধ্যবয়স্ক আর বাইরা তো একেবারে যুবক, সবে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে। মিজোরামের পুরোটাই প্রায় পার্বত্য অঞ্চল, গ্রামের রাস্তাঘাট বেশ খারাপ তবে শহরের রাস্তাঘাট মন্দের ভালো। চামফাই নীল পাহাড়ে ঘেরা এক সবুজ উপত্যকা। ধান চাষের জন্য এ অঞ্চল বিখ্যাত তাই বলা হয় Rice Bowl of Mizoram। বিশাল এলাকা জুড়ে ধানখেত অধিকাংশ জায়গায় ধানকাটা হয়ে গেছে তবে কিছু এলাকায় এখনও পাকা সোনালি ধানে খেত ভরা।

ধানখেতের মধ্যে দিকে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা পাহাড়ে উঠছি। গন্তব্য চামফাইর টুরিস্ট লজ। চামফাই জেলা সদর উচ্চতা ১৬৭৮ মিটার। যতদূর দেখা যায় শুধু ঢেউখেলানো নীলাভ পাহাড়ের বিস্তার। যতই ওপরে উঠছি, এবার একটা দুটো করে বসত বাড়ির দেখা মিলছে। নিরালা নিভৃতে টুরিস্ট লজের অবস্থান। টুরিস্ট লজ ঘিরে গাছগাছালিতে ভরা বাগান আর রয়েছে পর পর টুরিস্ট কটেজ। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে একটি টুরিস্ট কটেজে।

প্রত্যেকটি কটেজই খুব সুন্দর। বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্রে সাজানো। ঘরের সেন্টার টেবিলে একটি বাইবেল রাখা রয়েছে। ঘরের পিছনে খোলা বারান্দা। বড়ো বড়ো শাল ও সেগুন গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে চামফাই উপত্যকা দেখা যাচ্ছে। দূরে নীলপাহাড় আর উপত্যকায় ধানজমি, দু-একটা বাড়িঘর আর তার মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা একদম ছবির মতো। এখনও দিনের আলো রয়েছে, বিকেল ৪টে বাজে। এক কাপ করে কফি আর টোস্ট-ওমলেট খেয়ে আমরা চামফাইয়ের পথে নামি। বাইরা আমাদের নিয়ে চলল সানসেট পয়েন্টের উদ্দেশে। জানাল এখানে দুটি সানসেট পয়েন্ট আছে, একটি হল সারকিট হাউস চত্বর– আর একটি হল শহরের জল সরবরাহের ট্যাঙ্কের ছাদ থেকে।

বেলা যত পড়ছে শীতের প্রকোপও তত বাড়ছে। গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে নিলাম। সার্কিট হাউস এখন বন্ধ রয়েছে– সামনে বিশাল সিমেন্ট বাঁধানো চত্বর। চত্বরটি রেলিং দিয়ে ঘেরা তার গা বেয়ে গভীর খাদ নেমে গেছে আর তা জঙ্গলে ঢাকা। বাড়িটির অবস্থান একেবারে পাহাড়-চূড়ায়। চত্বরে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে। সূর্যাস্তের কয়েকটি ছবি তুলে আমরা দ্বিতীয় পয়েন্টের দিকে এগিয়ে চলি। জল সরবরাহ দফতরের বাড়ির ছাদ থেকে ঠান্ডা হাওয়ার দাপটের মধ্যেও দেখলাম সূর্য অস্ত গিয়ে তার বিচ্ছুরিত আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে দিগন্তে।

Travelogue Mizoram

এবার অন্ধকার নেমে আসছে। সাড়ে পাঁচটাও এখনও বাজেনি। ঝপাঝপ দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাইরা জানান এখানে এটাই রীতি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে টুরিস্ট কটেজে ফিরে এলাম। কথা হয়ে গেল কাল সকালে আমরা বিদেশে পাড়ি জমাব। এখান থেকে মায়ানমার সীমান্ত মাত্র ৩০ কিমি।

কটেজে ফিরে এসে উপভোগ করতে লাগলাম এক অনাবিল নিস্তব্ধতা। ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। দূরে শুধুই অন্ধকার তবে পাহাড়ের গায়ে যেন মাঝে মাঝে কেউ প্রদীপ জ্বালিয়ে দিচ্ছে। লজের কর্মীরা ঠিক সাড়ে সাতটায় ডিনার দিয়ে গেল। মেনু এগ চিকেন চাউমিন আর চিলি চিকেন। ডিনার সেরেই একেবারে লেপের তলায়।

পরের দিন ভোরে ঘুম ভাঙল। বেড-টি ৭টার আগে দেবে না। তবুও উঠে বারান্দায় বেরোলাম। দেখলাম এক অপূর্ব অসামান্য সূর্যোদয়। পাহাড়গুলো তো ডুবে রয়েছে মেঘ কুয়াশায় শুধু চূড়াগুলো যেন ভাসছে মেঘের সমুদ্রে। সেই মেঘ-পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যোদয়। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে যেন মেঘ-কুয়াশার ডানায় ভর করে অনন্ত নীলিমায়। সূর্য যত ওপরে উঠছে তাপ ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে। কুয়াশা মেঘ সবই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

এবার নজর দিই উপত্যকার দিকে। বিশাল ধানের জমিতে অধিকাংশ জায়গায় ধান কাটা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে খেতের মধ্যে সেচের জন্যে রয়েছে পুকুর। পাম্প লাগিয়ে পুকুরের জল ছড়ানো হচ্ছে জমিতে। সুদূর পাহাড়ের কোলে হারানো শস্যক্ষেত্রের দৃশ্য ওপর থেকে ভারি চমৎকার। রেশম চাষও এখানে ভালো হয়। ফল উৎপাদনও শুরু হয়েছে চামফাই-এ। পাহাড়ি ঢালে দ্রাক্ষা লতা, ফলের মধ্যে কিউই ফলের চাষ করা হচ্ছে প্রচুর।

খেতের মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো টিলা আর তার মাথায় দু-একটা বাড়িঘর।

পুরি-সবজি ওমলেট কফি খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। সঙ্গে নিয়ে নিয়েছি কেক, বিস্কুট, কমলা প্রভৃতি শুকনো খাবার। লাঞ্চ যদি না মেলে! চামফাই থেকে মায়ানমারের সীমান্ত শহর জোখাউথার। সবুজ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল দূরে সারিবদ্ধ পাহাড় ঘেরা মায়ানমারের সীমানা অভিমুখে। পথের দু’ধারে টুকরো টুকরো চাষের খেত। এখনও কিছু খেত হলুদ পাকা ধানে ভরা, অবশ্য বেশির ভাগ জায়গাতেই ধান কাটা হয়ে গেছে। রাস্তার অবস্থা মোটেই ভালো নয়। বড়ো বড়ো ট্রাক লরি এ পথে যাতায়াত করছে। মাঝে মাঝে গ্রাম রুয়ান্ডলাং, মুয়ালকই, মেলবুক।

নীল আকাশে সাদা মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা পিঠে স্কুল ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। আমাদের দেখে তারা হাত নাড়ছে। মাঝে মাঝে রাস্তা বেশ সরু, শাল বাঁশের জঙ্গলও পড়ছে মাঝে মাঝে। এগিয়ে আসছি ভারতের শেষ সীমানার দিকে। আঙুরের খেত, কলাবন, বাতাবি লেবু, মুসম্বি গাছও রয়েছে অনেক। গ্রামের বাড়িঘর সব টিনের চাল, পাকা দেয়াল তবে দরমার দেয়ালও আছে।

রাস্তা এখন পাকে পাকে ঘুরে ঘুরে উঠছে। রাস্তায় অধিকাংশ জায়গায় এখন পিচের অস্তিত্ব নেই। পাথর মাটির পথ আর বড়ো বড়ো গর্ত। মাল বোঝাই ট্রাক-লরির যাতায়াত তো অব্যাহত। ২৭ কিমি পথ অতিক্রম করতে ঘন্টা দেড়েক সময় পেরিয়ে গেল। প্রথমে ভারতীয় চেক-পোস্ট তারপরেই তুইরাল চু (নদী) বয়ে চলেছে। একটি ব্রিজ দুই দেশের মধ্যে যোগসূত্র। এই ব্রিজ পেরিয়ে প্রচুর মালপত্র আদানপ্রদান হচ্ছে, তবে মায়ানমার থেকে অনেক বেশি মাল ঢুকছে ভারতে।

জোথাউথারের উচ্চতা ২৪০০ ফুট। ছোটো জনপদ হলেও ভারত-মায়ানমার বাণিজ্য এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমাদের সরকারি গাড়ি সেহেতু ভারতীয় চেকপোস্টে কোনও চেকিং-এর বালাই নেই। তবু গাড়ির নম্বর নথিভুক্ত করে আমাদের ওপারে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল। আমাদের ইনার লাইন পারমিটও চেকিং হল না। এবার তুইরাল নদী পেরিয়ে বর্মা মুলুকে পদার্পণ। মায়ানমারের দিক থেকে ঠেলাগড়ির মতো স্টিয়ারিং লাগানো ভ্যানে প্রচুর মাল ঢুকছে। ভারতের দিক থেকে অবশ্য অনেক কম মাল ঢুকছে বর্মা দেশে। ভারতীয় সীমান্তেও বেশ কিছু দোকানে বিদেশি জিনিস কেনাকাটা চলছে। কোনও পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই আমরা মায়ানমারে প্রবেশ করলাম।

ব্রিজ থেকে নেমে গাড়ি ডানদিকে বাঁক নিল। রাস্তা বেশি চওড়া নয় তবে অপেক্ষাকৃত মসৃণ। আমাদের এবার গন্তব্য রিহ ডিল। ‘ডিল’ অর্থে লেক। মিনিট পনেরোর মধ্যে (৫ কিমি) পৌঁছে গেলাম লেকের সামনে। এটি বেশ বড়ো প্রাকৃতিক হ্রদ। চারদিকে সবুজ গাছপালা, মনোরম পরিবেশ, লেকটির আকৃতি অর্ধগোলাকৃতি। একদিকে কয়েকটি কটেজও চোখে পড়ল। মায়ানমারের পৌরাণিক রিহ ডিল সরোবর। শান্ত আবহে এই স্থির জলাশয়কে শাশ্বতকালে যাত্রাপথের প্রবেশদ্বার বলে মনে করা হয়।

বেশ কয়েকজন ভ্রমণার্থী লেকের ধারে দাঁড়িয়ে লেকের রূপসুধা পান করছে, তার মধ্যে একটি বাঙালি পরিবারও রয়েছে। মোটরবোট লেক প্রদক্ষিণ করছে ৫০০ টাকার বিনিময়ে। তবে বোটের সংখ্যা মাত্র একটি তাই অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বোটে বসতে পারে ৬ জন (সর্বাধিক)। একটু অপেক্ষার পর বোট মিলল। তিনটি স্থানীয় মেয়ে বোটে আমাদের সঙ্গী হল। প্রচলিত বিশ্বাস এই লেকের জলে আত্মারা স্বর্গে যাওয়ার আগে বিশ্রাম করে।

ভট ভট শব্দ তুলে বোট যাত্রা শুরু করল। লেকের ধারে ঘাস বন থেকে বোটের শব্দে বেশ কয়েকটি পাখি উড়ে গেল। দূরের লেকের কিনারায় একটি বিশাল বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। বোট লেকটিকে চক্রাকারে ঘুরে আসতে মিনিট পনেরো সময় নিল, লেকের ধারে বেঞ্চ পাতা আছে। মেঘলা আবহাওয়ায় মৃদুমন্দ হাওয়া দিচ্ছে, বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসে লেকদর্শন ভালোই লাগল।

একটু দূরে একটা বেশ বড়ো রেস্তোরাঁ। সেখানে অনেকে ভিড় জমাচ্ছে। অনেকের হাতেই বিয়ারের বোতল। মিজোরামে মদ্যপান নিষিদ্ধ তাই বোধহয় রিহ ডিল রেস্তোরাঁর এত আকর্ষণ। ফেরার পথে একটু মার্কেটিং। অধিকাংশ দোকানগুলিই সামলাচ্ছে মহিলারা। সব ছোটো ছোটো দোকান। অধিকাংশই চিন, থাইল্যান্ড, বর্মা,

ফিলিপাইন্স-এর জিনিসপত্র। জামাকাপড়, জ্যাকেট, গরম জামা, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, সাবান, কসমেটিক্স, মদ, ওয়াইন, জুতো, ব্যাগ সবই পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোনও রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না। এবার ফিরতে হবে, সন্ধ্যায় আবার জেলাশাসকের বাংলোতে ডিনার।

টুরিস্ট লজ থেকে প্রায় ৪ কিমি দূরে জেলাশাসকের বাংলো। সন্ধ্যা ৭টা-তেই রাস্তাঘাট একেবারে শুনশান। দোকানপাট তো অনেক আগেই সব বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলের বাংলো। সামনে বাগান কম্পাউন্ড পাঁচিলে ঘেরা।

ডিনারের পদগুলি অধিকাংশ মিজো শৈলীতে রাঁধা সেটাই বোধহয় স্বাভাবিক। স্টিকি রাইস (লাল ভাত ফ্যান না গেলে চটচটে ভাব) রুটি, ডাল, মিজোদের নিজস্ব পদ পাতা সেদ্ধ, মটর পনীর, চিকেন ভাজা, স্থানীয় মাছের ঝোল ও স্যালাড। কোনও মিষ্টান্ন বা মিষ্টি পদ নেই। খাবার যে খুব একটা উপভোগ করলাম বলতে পারি না। তবে আন্তরিকতার অভাব ছিল না। টুরিস্ট লজে ফিরে আসতে রাত দশটা বেজে গেল।

travel Mizoram

পরের দিন সকালে আমাদের আইজল ফেরা। তবে পথে তামডিল লেক দর্শনের পরিকল্পনা আছে। ব্রেকফাস্ট সেরে চামফাই থেকে তামডিল হয়ে আইজল দুশো কিমিরও বেশি পথ। রাস্তার অবস্থাও বেশ খারাপ তবে ড্রাইভার আশ্বাস দিল যাত্রাপথের শেষের অংশে রাস্তা অনেক ভালো। সেই পাহাড় জঙ্গল ঘেরা রাস্তা, মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম, আকাশে সাদা মেঘের লুকোচুরি খেলা। পৌঁছে গেলাম খাউজল টুরিস্ট লজের দোরগোড়ায়। বাইরে লেখা রয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থসাহায্যে নির্মিত হয়েছে এই হাইওয়ে রেস্তোরাঁ। রাস্তা থেকে একটা লম্বা সেতু দিয়ে এই লজ যুক্ত। তিনতলা বিশাল লজ। দোতালায় বিশাল ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁ।

অসাধারণ পরিবেশ। চারদিক ঘিরে রয়েছে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়। এটি যেন পাহাড়ের গায়েই এক ঝুল বারান্দা। তবে কোনও টুরিস্ট নেই। রান্নাঘরে খোঁজ নিয়ে জানলাম চা আর ওমলেট ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। অগত্যা চা-ওমলেট দিয়ে লাঞ্চ সারলাম।

কেইফাং মোড় থেকে তামডিলের রাস্তা আলাদা হল। কেইফাং থেকে ৪ কিমি দূরে সাইটুয়াল বেশ বড়ো জনপদ। সাইটুয়াল থেকে তামডিল লেক আরও ৭ কিমি। রাস্তার দুপাশেই জঙ্গল– বেশ গা ছমছমে পরিবেশ। ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে গাড়ি ঝাঁকানি খেতে খেতে আমরা এগিয়ে চলি। সাইটুয়ালে টুরিস্ট লজ আছে তবে সেখানে রাত্রিবাস আমাদের প্রোগ্রামে নেই। তামডিল একটি প্রাকৃতিক হ্রদ। চারদিকে জঙ্গল গাছপালায় ঘেরা। পর পর কতকগুলি কটেজ রয়েছে হ্রদের ধারেই।

বোট স্ট্যান্ড থেকে বোট পাওয়া যাবে লেক পরিক্রমা করার জন্য। তবে সবই প্যাডল বোট। লেক পরিক্রমা করা বোধহয় আমাদের সময় হবে না। লেকের এক কোণ থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে একটি সুন্দর বাড়ির অন্দরে। সেখানে একটি ঘরে Interpretation Centre লেখা রয়েছে তবে সেখানে ঢোকার চাবিকাঠি অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া গেল না। সুন্দর একটি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে তার শীর্ষ থেকে লেকের শোভা যেন আরও সুন্দর। ছবিও তোলা হল অনেক।

রহি ডিলের মতো আকারে বড়ো না হলেও তামডিলের সৌন্দর্যও কম নয়। ওয়াচ টাওয়ার থেকে আবার লেকের ধারে চলে আসি, সেখানে কিছু পর্যটক মুক্ত অঙ্গনে আগুন জ্বেলে রান্না করছে। মিজোদের প্রিয় সর্ষে শাক ও ভাত। এদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশি বিদেশিনিও রয়েছে। এবার তামডিলের মায়া কাটিয়ে ফেরার পথ ধরি।

সাইটুয়াল ফিরে কিউফাং সেলিং হয়ে গাড়ি আইজলের দিকে চলল। তামডিল-কে যেন ভোলা যায় না। শহরের কাছেই আদিম কুমারী অরণ্যের মাঝে এই তামডিল লেক। তামডিল থেকে আইজল ৮৩ কিমি পথ। তবে এবার রাস্তা মসৃণ। সন্ধ্যার আগেই আমরা আইজলের স্টেট গেস্ট হাউসে পৌঁছে গেলাম।

চিকেন চমৎকার

জিভে জল আনা ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চিকেন। সহজেই রান্না হয় অথচ লা-জবাব। জিভে জল আনা ২টি  অতি পরিচিত চিকেনের ডিশ রইল পাঠকদের জন্য।

তন্দুরি চিকেন

উপকরণ – ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের একটি আস্ত মুরগি পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন। তারপর কাঁটা দিয়ে বিঁধে নিন। পরিমাণ মতো টকদই, আদা-রসুনবাটা, পেঁয়াজবাটা, লংকার গুঁড়ো, ৩ চা-চামচ বাদামতেল, সামান্য পাতিলেবুর রস, ধনে ও জিরেগুঁড়ো মাখিয়ে ৩-৪ ঘন্টা রেখে দিন। আমচুর, গরমমশলার গুঁড়ো ও কসুরি মেথি একসাথে মিশিয়ে রাখুন।

প্রণালী -মুরগির গায়ে সমস্ত বাটা মশলা ও দই মাখিয়ে নিন। উপর থেকে তেল ছড়িয়ে আস্ত মুরগিটা গ্রিলারের মধ্যে লোহার শিকে অথবা গরম তন্দুরের মধ্যে স্কিউ করে রেখে দিন। যতক্ষণ পর্যন্ত না মাংস, রোস্টেড হয়ে নরম হচ্ছে, ততক্ষণ শিক ঘোরাতে থাকবেন। বের করার আগে সামান্য বাদাম তেলের সাথে গুঁড়ো-মশলাটা ছড়িয়ে দিন। আরও একটু সেঁকে নিলেই তৈরি তন্দুরি চিকেন।

Recipe of Chicken Chanp

চিকেন চাঁপ

 উপকরণ– চাঁপের আকারে কাটানো মুরগি ১টি, ৭ কোয়া রসুন, আদা বেশ খানিকটা, ৩ টেবিল চামচ পোস্ত, ১ চামচ করে গরমমশলা, জিরে, লংকাগুঁড়ো, ১ কাপ কুচো পেঁয়াজ, ২ চা-চামচ ধনেগুঁড়ো , ১ কাপ টকদই, ১ টি আস্ত দারচিনির টুকরো, ২৫০ গ্রাম বাদামতেল এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী- রসুন, আদা ও পোস্ত একসঙ্গে বেটে নিন। সমস্ত বাটা এবং গুঁড়ো-মশলা চাঁপের আকারে কাটা চিকেনে মাখিয়ে রাখুন। তেল গরম করে পেঁয়াজের টুকরো এবং দারচিনি অল্প ভেজে নিন।মশলা মাখানো চাঁপ অল্প জল দিয়ে ঢিমে আঁচে রান্না করুন। মুরগির টুকরো সেদ্ধ হলে নামিয়ে রাখুন। গরমগরম পরিবেশন করুন।

ফুসকুড়ি দূর করুন সহজে

বয়ঃসন্ধিকালে, পেট পরিষ্কার না থাকলে এবং আরও নানা কারণে মুখে ফুসকুড়ির সমস্যা দেখা যায়। আর ফুসকুড়ি মানেই মুখের সৌন্দর্য নষ্ট।  ঠিকঠাক চিকিৎসায় ব্রণ বা ফুসকুড়ির হাত থেকে মুক্তি মেলে ঠিকই, কিন্তু তার জন্য যে সব ওষুধ বা ক্রিম বাজারে উপলব্ধ সেগুলি যেমন ব্যয়বহুল, তেমনই তা থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ও থেকে যায়। ফুসকুড়ি হবার একটি অন্যতম কারণ হল অপরিষ্কার ত্বক। তাই ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে। নিয়মিত স্ক্রাবিং ত্বককে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে৷ তাই, এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি। জেনে নিন ফুসকুড়ির সমস্যা থেকে পরিত্রাণের ঘরোয়া উপায়।

ঘরোয়া টোটকা

১. এক কাপের মতো পাকা পেঁপে চটকে নিন । এর সঙ্গে মেশান এক চামচ পাতিলেবুর রস এবং প্রয়োজন মতো চালের গুঁড়ো। মিশ্রণটি মুখের ফুসকপড়ির উপর লাগান। ২০-২৫ মিনিট মাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। পেঁপে ছাড়াও ব্যবহার করতে পারেন ঘৃতকুমারীর রস।

২. পুদিনা পাতার রস করে নিয়ে সেটা দিয়ে আইস কিউব তৈরি করুন।এই আইস কিউব ঘষুন ১০-১৫ মিনিট। ফুসকুড়ির নিরাময়ে এটা বেশ কার্যকর৷ এতে ফুসকুড়ি ও ব্রণের সংক্রমণ তো কমবেই, সেই সঙ্গে ত্বকের জ্বালাপোড়া ভাবও দূর হবে।

ফুসকুড়িতে নাজেহাল হলে, জানা জরুরি

  • ফাইবার-যুক্ত খাবার খান বেশি পরিমাণে
  • তিন থেকে চার লিটার জল খান প্রতিদিন
  • কোনও প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহারের ফলে যদি ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তাহলে তখনই সেই প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ করুন
  • নিমপাতা পিষে, তার সঙ্গে মুলতানি মাটি এবং গোলাপজল মিশিয়ে টানা সাতদিন ফুসকুড়ির উপর লাগান, সুফল পাবেন
  • ফিটকিরি জলে ভিজিয়ে হালকা ভাবে ফুসকুড়ির উপর ঘষুন, উপকার পাবেন
  • ফুসকুড়ি শুকিয়ে গেলে দই এবং শসার পেস্ট বানিয়ে লাগান, দাগ দূর হয়ে যাবে।

বিশেষ সতর্কতা : ফুসকুড়ি নখ দিয়ে খুঁটবেন না।

বয়ফ্রেন্ডের মা-বাবা ছেলের সঙ্গে আমায় ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছেন

আমার বয়স ২০ বছর। দুই বছর ধরে একটি ছেলেকে ভালোবাসি। ওর সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্কও রয়েছে। কিছুদিন আগে ছেলেটি আমাকে ওর বাড়িতে ডাকে। ওর মা-বাবা বাড়িতে ছিলেন না। ছেলেটি বলেছিল ওনারা সারাদিনের জন্য কোথাও গেছেন, ফিরতে রাত হবে। কিন্তু হঠাৎ-ই ওনারা বাড়িতে ফিরে আসেন এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলেন। আমরা বসার ঘরেই ঘনিষ্ঠ হয়ে ছিলাম। এরপর আমি যতবারই ওদের বাড়ি গিয়েছি ছেলেটির মা আমার মুখ দেখলেই বিরক্ত হয়ে ওঠেন এবং ওর বাবা মিটমিট করে মুখ টিপে হেসে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে সান্ত্বনা দেয় যে আমাকে নিয়ে ওনাদের কোনও সমস্যা নেই, ওনারা গোটা ঘটনার কথা ভুলে গেছেন কিন্তু ওদের বাড়ি যেতে আমার এখন খুব এমব্যারেসড লাগে। ওনাদের সঙ্গে সরাসরি এ ব্যাপারে কথা বলে নেওয়া কি আমার উচিত হবে?

 

এটা তো খুবই স্বাভাবিক যে এরকম একটা ঘটনার পর ছেলেটির বাড়িতে যেতে আপনার দ্বিধা হচ্ছে। ছেলেটির এখানে ভুল রয়েছে। ওর আগেই আপনাকে সাবধান করা উচিত ছিল। এছাড়াও বিয়ের আগে নিজের বাড়িতেই এরকম একটা পদক্ষেপ নেওয়া ওর কখনওই উচিত হয়নি। ওর ভাবা উচিত ছিল যেকোনো মুহূর্তেই মা বাবা তাঁদের নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসতে পারেন। ছেলেটির অবশ্যই উচিত নিজের মা-বাবার সঙ্গে  এ ব্যাপারে কথা বলা এবং আপনার উচিত হচ্ছে তাঁদের কাছে এরকম একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। বিস্তারিত ভাবে তাদের বুঝিয়ে বলুন, তাদের অপমান করা কিংবা চমকে দেওয়ার আপনার কোনও ইনটেনশন ছিল না। আপনার ভুল হয়ে গেছে সেটাও স্বীকার করে নিন ওনাদের কাছে।

আপনার বয়ফ্রেন্ড হয়তো পুরো ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে দিতে চাইছে কিন্তু আপনি বিবেক-কে প্রাধান্য দিন । এছাড়াও ছেলেটির মা-বাবার সঙ্গে আপনার মিউচুয়াল রেসপেক্ট বজায় রাখাটা দুই পক্ষের জন্যই জরুরি। আপনি যে ওদের বাড়িতে বউ হয়ে আসতে চান সেটাও ওদের বুঝিয়ে বলুন।

 

 

 

 

 

 

 

বিয়েবাড়ি

অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতে যাব, ঠিক এমন সময় শীলা সেই মর্মঘাতী সংবাদটি ফের একবার মনে করিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার মনে আছে তো, আজ সন্ধেয় কিন্তু বিমলবাবুর ছেলের রিসেপশন। আমাদের যেতে হবে। আমি একটু পরে বের হব ভাবছি। একটা প্রেজেন্টেশন তো কিনতে হবে! তোমার দ্বারা যদি একটা কোনও সংসারের কাজ হয়।’

শীলার চিরকালীন অভিযোগের কোনও জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিয়ে তো অনেক দূরে কোন একটা জায়গায় যেন, তাই না? আমি তো ভুলেই গেছিলাম!’

শীলা মুখঝামটা দিয়ে বলল, ‘ভুলবে যে, সে তো জানি। বিনা পয়সায় সেক্রেটারি পেয়েছ যে! তোমার সব কথা মনে করে রাখবে।’

আমি তার চিবুক ধরে মিনমিন করে বললাম, ‘কেন এত রাগ করো?’

সে এক ঝটকায় মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘থামো। আর আদিখ্যেতা করতে হবে না। আজকাল সব কথাই তুমি ভুলে যাচ্ছো। কী ব্যাপার বলো তো? নতুন করে কারও প্রেমে পড়েছ নাকি?

জিভ কেটে বলি, ‘ছিছি! কী যে যা-তা কথাবার্তা বলো তুমি ইদানীং! মুখে যেন কিছু আর আটকায় না। অফিসে তো যেতে হয় না, যন্ত্রণাটা বুঝবে কী? কাজের যেন কোনও শেষ নেই। কাজের লোক কম, কিন্তু কাজ গাদা-গাদা। দম ফেলার ফুরসত নেই। যাক গে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমার মোবাইল ফোনে একবার ফোন করে মনে করিয়ে দিয়ো। আমি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব–!’

বলে আমি দরজার দিকে পা বাড়াতে গেছি, শীলা পিছন থেকে আমার জামার হাতা টেনে ধরল। বিরক্ত মুখে তাকিয়ে দেখি, তার চোখমুখ বিস্ফারিত। বলল, ‘কী বললে? পাঁচটা? অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে তোমার এক ঘণ্টা সময় লাগে। তারপর তৈরি হতে কম করে আধঘণ্টা। তারপর কখন অত দূরে পৌঁছোব গো? আবার ফিরতে তো হবে, নাকি! ওসব জানি না, তুমি পাঁচটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবে।’

শেষ বাক্যটায় শীলা এমন সুকৌশলে আদুরে অভিমান মেশাল যে ‘না’ করতে পারলাম না। বললাম, ‘আচ্ছা, চেষ্টা করব।’

ঠিক বেরোনোর মুখে শীলার সঙ্গে কথার মারপ্যাঁচে জড়িয়ে যাওয়ায় অফিসে পৗঁছোতে স্বভাবতই দেরি হয়ে গেল বেশ একটু। ব্যস্তসমস্ত হয়ে অফিসে ঢুকে বরং বেশ চমকে গেলাম। সন্দেহের বশে কবজি উলটে হাতঘড়িটা দেখলাম। এই সময়ের মধ্যে গোটা ফ্লোরটাই নানা কিসিমের কর্মীদের কার্যকলাপে ভরে থাকে। অথচ আজ এক অদ্ভুত শান্ত নীরবতা বিরাজ করছে। কম্পিউটারের কী বোর্ডগুলিতে আঙুলের মার্চপাস্ট নেই। ফাইলগুলি স্কুলের বাধ্য মনিটরের মতো অবাধ্য পাতাগুলিকে সযত্নে সামলে রেখেছে। ফ্যানগুলোর অধিকাংশই বন্ধ আছে বলে, খটখট শব্দটাও বাজি ফোটার মতো কর্ণপটাহে এসে আঘাত করছে না। সবটাই যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।

নিজের কেবিনে ঢুকে চেয়ার টেনে বসে, ঢকঢক করে এক গ্লাস জল পুরোটা খেয়ে নিলাম। ইতিউতি তাকাচ্ছি, হঠাৎ তমাল এল। তমাল এই অফিসের একনিষ্ঠ অ্যাসিস্ট্যান্ট। তাকে ছাড়া একটিও ফাইল এঅফিসে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

প্রত্যেকদিনের মতোই সে এসে জানতে চাইল, ‘চা খাবেন তো সুবীরদা?’

রোজই খাই। তবু সে রোজই জানতে চাইবে। বারণ করলে বলবে, জিজ্ঞেস করাটা তার দায়িত্ব। উপরন্তু, এঅফিসে তাকে ডাকাডাকির লোক অনেক, কিন্তু তার কথা বলার সুযোগ কম।এই সুযোগে সে একটু খেজুরে আলাপ করে নেয় আর কি!

হাতের তলা থেকে সকালের খবরের কাগজের গোছাটা সে টেবিলে আমার চোখের সামনে রাখে। আমি খুব অবাক হওয়া গলায় প্রশ্ন করি, ‘তমাল, গোটা অফিসটা আজ এত ফাঁকা লাগছে কেন ভাই? সকলে গণছুটি নিল নাকি?’

তমাল কথা না বলে, খবরের কাগজের একটা খবরে আঙুল রেখে দেখাল। শিরোনামে লেখা হয়েছে, শহরে আজ নাকি রেকর্ড সংখ্যক বিয়ে হচ্ছে। কারণ শাস্ত্রমতে এমন শুভদিন নাকি আর হয় না। শহরের বড়ো বড়ো বিয়েবাড়িগুলো তো অনেক আগে থেকেই বুকড। যারা বিয়েবাড়ি পায়নি, তারা রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে শামিয়ানা খাটিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে লেগে পড়েছে। সব মিলিয়ে গোটা শহরে আজ উৎসবের আমেজ। অফিসে হাজিরা মাত্রাতিরিক্ত কম হবে অনুমান করে, অনেক কর্তৃপক্ষ অফিসে ছুটি ঘোষণা করে দিয়েছে আগেভাগে। সরকার চিন্তিত এই ভেবে যে, যত মানুষ সন্ধেবেলা পথে নামবে, তাদের যাতয়াতের জন্য এত বাস কোথায় পাওয়া যাবে! শহরের ট্র্যাফিক পুলিশরা চিন্তিত, নিশ্চিত যানজট ছাড়ানো, ঘোরালো ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী নাকি মন্ত্রী ও অফিসারদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। রাজ্যে বন্যা হলে যেরকম বৈঠক হয়। সকলেই একমত, শহরের বুকে এরকম পরিস্থিতি নাকি এর আগে কস্মিনকালেও ঘটেনি।

ওরে বাবা! খবরের কাগজটা দ্রুত ভাঁজ করে শূন্য দৃষ্টিতে তমালের দিকে তাকালাম। আমাকে বিহ্বল দেখেও সে দেঁতো হেসে বলল, ‘কাগজে লিখেছে, শহরে আজ দশহাজার বিয়ে হচ্ছে। যাদের কোনওদিন বিয়ে হবে বলে কেউ ভাবেনি, যারা কনফার্মড ব্যাচেলর, তাদেরও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে সুবীরদা। আগামী দুবছর আর কোনও বিয়ে হবে কিনা, সেই ভেবে বাড়িওলা, ক্যাটারার, ডেকোরেটরদের মাথায় হাত। আজ আমারও নেমন্তন্ন আছে। টুনির মাকে আসবার সময় বলে এলাম, বিকেলে সেজেগুজে তৈরি থেকো–!’

এইসময় ‘সুবীর তুমি এসেছ?’ বলেএগিয়ে এল শ্যামল মুখোটি। সে আমাদের এই কোম্পানির ম্যানেজার। প্রায় ফাঁকা অফিসে আমাকে দেখে তার যেন হালে পানি পাওয়া অবস্থা। আমার উলটোদিকের চেয়ারটা টেনে বসে শ্যামলদা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, ‘কী কাণ্ড!’ ‘কী কাণ্ড’–শব্দবদ্ধটা শ্যামল মুখোটির একটা অভ্যাস। নিজের পিতৃবিয়োগের সংবাদটিও তিনি অফিসে ‘কী কাণ্ড’ সহযোগে পেশ করেছিলেন, বেশ মনে আছে।

শ্যামলদা গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল, ‘দ-শ-হাজার বিয়ে? ভাবতে পারো ভায়া? কী কাণ্ড! আমার হয়েছে বিপদ। আদ্ধেক বলেকয়ে ছুটি নিয়েছে। বাকিদের বেশিরভাগ না জানিয়ে ডুব মেরেছে। আর যে-গুটিকয় দয়া করে এসেছে, আমায় ধন্য করতে, তারাও বলছে লাঞ্চের পরে তাদের ছেড়ে দিতে হবে। বলো দেখি, কী কাণ্ড! আরে এটা অফিস, না থেটার?’

শ্যামল মুখোটি উত্তেজনায় হাত পাকিয়ে টেবিলে ঘুসি মারল। মেরে নিজেই মুখ বেঁকিয়ে ফেলল ব্যথায়।

তমাল তখনও যায়নি। সব শুনে পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, ‘সেই দলে তো আপনিও পড়েন শ্যামলবাবু!’

‘কী আমি পড়ি? মানে কী?’

‘মানে, আপনারও ছুটি চাই লাঞ্চের পর। বউদিকে ফোনে বলছিলেন, তৈরি হয়ে থাকতে, শুনিনি ভাবছেন? ফিসফিস করে বললেই কি সব কথা চাপা দেওয়া যায়?’

শ্যামলদা খেপে গিয়ে বলল, ‘দূর হ। দূর হ হতচ্ছাড়া। শ্যামল মুখোটির পিছনে লাগতে এসেছে? জানে না–!’

তমাল মুচকি হেসে পালাল।

শ্যামল মুখোটি গলা বাড়িয়ে চাপা স্বরে শুধোল, ‘কী কাণ্ড! কী করি বলুন তো মশাই? ম্যানেজমেন্ট কাগজেকলমে ছুটি দেবে না। এদিকে সকলেরই নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার আছে। সেনসিটিভ ইস্যু। কাউকে বাধা দেওয়াও যাবে না। আপনারও আছে নাকি? নিমন্ত্রণ?’

শীলার সকালবেলার হুমকি মনে পড়ে গেল। আঁতকে উঠে বললাম, ‘আছে বইকী! আমাকেও, মানে একটু তাড়াতাড়ি ছাড়তে হবে শ্যামলদা–!’

‘আরে ছিছি, এটা কোনও কথা হল নাকি একটা?’ শ্যামল মুখোটি বিগলিত ভঙ্গিতে বলে, ‘সবাই যাচ্ছে, আমি-আপনিও যাচ্ছি। ম্যানেজমেন্টকে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝবে। আমার ছেলেটা ছোটোবেলায় কী দুষ্টু আর দুরন্ত ছিল জানেন? কিন্তু ওই, …বুঝিয়ে বললে, কী কাণ্ড, একেবারে শান্ত!’

‘কিন্তু শ্যামলদা, একটা সন্দেহ কিন্তু আমার রয়েই যাচ্ছে!’– রহস্যভেদীর দৃষ্টিতে চোখ সরু করে বললাম।

‘কী সন্দেহ, সুবীরবাবু?’

‘এই যে বিয়েবাড়ি যাবে বলে অফিস ফাঁকা করে সকলে চলে যাচ্ছে, ঞ্জরা সবাই কি বিয়েবাড়িই যাচ্ছে? নাকি একদিন এই ছুতোয় একটা ছুটি নিয়ে নিচ্ছে?’

শ্যামল মুখোটি খপ করে আমার হাতটা ধরে বলল, ‘আপনি আমার মনের কথাটা বলেছেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই যে কাউকে আপনি সন্দেহ করতে পারবেন না। দশ হাজার বিয়ে। তার মানে প্রত্যেক বিয়েতে যদি গড়ে তিনশো ইন্টু দশ হাজার। ভাবতে পারছি না মশাই। এত লোক আছে শহরে?’

‘তা কেন!

এক-একজনের দু-তিনটে করে নিমন্ত্রণও থাকতে পারে’, বিজ্ঞের মতো বললাম।

শ্যামল মুখোটি বলল, ‘আপনারও তো বিকেলে নিমন্ত্রণ!’

‘হ্যাঁ! আমাকেও বের হতে হবে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, যেতে ইচ্ছে করছে না শ্যামলদা। বউ বলছে যেতে। তাই যাব। নাহলে তো গৃহশান্তি নষ্ট হবে।’

‘কী কাণ্ড! যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না কেন? বউদির বাপের বাড়ি যাবেন তো! তাহলে তো স্পেশাল আদর… মানে ইয়ে আদর কথাটা কিএকটু স্ল্যাং হল? তাহলে সমাদর… স্পেশাল সমাদর পাবেন!’– শ্যামলদা চোখ টিপে রসিকতা করে।

‘আরে না, শ্বশুরবাড়ির অনুষ্ঠান এটা নয়। আমাদের উপরের ফ্ল্যাটে বিমলবাবু থাকেন। ওরই ছেলের বিয়ে। বরযাত্রী যেতেই হবে, খুব করে ধরেছে। আর সে বিয়ে কোথায় হচ্ছে জানেন?’

শ্যামলদা দুপাশে ঘাড় নাড়ে।

‘আমিও জানি না দাদা। তবে শুনেছি কমপক্ষে দু-ঘণ্টা লাগবে শুধু সেখানে পৗঁছোতে!’

শ্যামল মুখোটি অবশ্য আর কথা বাড়াতে চাইল না। ভেবেছিল আমার কাঁধে বন্দুক রেখে, অফিসটাকে খোলা রেখে ম্যানেজমেন্টকে খুশি করবে। কিন্তু সেটি না হওয়ায় বেশ দমে গেছেন ভদ্রলোক। মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে আমি কাজে মন দিলাম।

বিকেলে ঠিক পাঁচটায় জামার পকেটে ফোনটা নড়েচড়ে উঠল। শীলা তাগাদা দিল, ‘কই গো, কখন বের হবে!’

বললাম, ‘এই তো এক্ষুনি…!’

তমালও কেবিনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সুবীরদা, গোটা অফিস খালি হয়ে গেছে। এখন আপনি এগোলে, আমিও বের হতে পারি।’

বললাম, ‘হ্যাঁ, এই তো হয়ে গেছে…!’

যৌথ তাগাদায় শেষপর্যন্ত ফাইলপত্র বন্ধ করে উঠতেই হল। গুনগুন করে একট সুর ভাঁজতে ভাঁজতে অফিসের বাইরে এসে স্কুটারে সওয়ার হলাম। ফেরার সময় রোজই ট্র্যাফিক জ্যামে আটকাতে হয়। অফিস থেকে বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু পৌঁছোতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়।

অথচ আজ এই পড়ন্ত বিকেলে রাস্তাঘাট আশ্চর্যরকম ফাঁকা। বোধহয় সকলেই বাড়িতে বসে নিজেদের সন্ধ্যার প্রদর্শনীর জন্য প্রস্তুত করছে। হয়তো একটু পরেই সুন্দর ও সুন্দরীরা শহর জুড়ে ক্যাটওয়াকে বেরোবেন।

বাড়ি গিয়ে দেখলাম শীলা খুব ব্যস্ত। এককাপ চা আর বিস্কুটের গোটা কৌটোটাই আমার সামনে ধপ করে বসিয়ে হুড়মুড়িয়ে চলে যেতে যেতে বলল, ‘ঝট করে তৈরি হয়ে নাও। সোসাইটির সকলেই কিন্তু একসঙ্গে যাবে বলে ঠিক করেছে। সময়ের মধ্যে বের হতে হবে–!’

আমি শেষতম বার মরিয়া গলায় বলি, ‘শীলা, যাওয়াটা সত্যিই কি খুব জরুরি? তুমি তো জানো ভিড় আমার ভালো লাগে না!’

‘অবশ্যই জরুরি,’ শীলা আড়াল থেকে জবাব দেয়, ‘একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকি, দুবেলা দেখা হয়– যাব না? তা ছাড়া উমাদি, মানে বিমলবাবুর বউ আমাদের কিটি পার্টি গ্রুপের মেম্বার! না গেলে আস্ত রাখবে?’

‘দুর! এত ভয় পাও কেন?’– আমি মিহি হেসে বললাম, ‘বলে দিলেই হবে, আমি অসুস্থ ছিলাম। ওরা কি সেটা সরেজমিনে দেখতে পুলিশকুকুর পাঠাবে নাকি?’

‘ভয় কে পাচ্ছে?’ শীলা এবার অন্তরাল থেকে মুখ বাড়াল। বলা ভালো, মুখোশ বাড়াল। সারা মুখে নানা রঙের কী সব মেখেছে, দেখাচ্ছে ঠিক টিভি সিরিয়ালের খল চরিত্রের মতো। সহসা শীলাকে চিনতে না পেরে আঁ-আঁ করে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম। তারপর চেনা গলা শুনে ধাতস্থ হলাম।

শীলা বলল, ‘ভয় কে পাচ্ছে? উমাদি বড্ড বড়ো বড়ো কথা বলে। আমরা কিটি পার্টির বাকি মেম্বাররা ঠিক করেছি, বিয়েতে গিয়ে চারদিকে কড়া নজর রাখব। সেইজন্যেই যাওয়াটা জরুরি। বুঝলে?’

নিজেকে সশব্দে সোফায় ছুড়ে ফেলে জানতে চাইলাম, ‘ছেলেমেয়ে তাহলে একাই থাকবে বাড়িতে? শুধু আমরা দুজন যাব?’

শীলা কোনও উত্তর দিল না। তবে মৌনং সম্মতি লক্ষণম্।

অন্তরাল থেকে শীলা এরপর লাজুক মুখে যখন সামনে এসে দাঁড়াল, সত্যিই চোখ ফেরাতে পারলাম না। এই রূপ ও কোথায় লুকিয়ে রাখে অন্য আর পাঁচটা সাধারণ দিনে? যখন মুখ ঝামটা দেয়, গলগল করে ঘামতে ঘামতে ব্যাগে ভরে দেয় আমার লাঞ্চ বক্স, তখন সৌন্দর্যের এই ব্যাখ্যাতীত বিচ্ছুরণ ও কী দিয়ে ঢেকে রাখে?

অস্ফুটে, সেই আগের মতো, প্রেমিক-প্রেমিক গলায় বলে উঠলাম, ‘অপূর্ব দেখাচ্ছে। আজ বিয়েবাড়িতে সকলের নজর তোমার দিকে ঘুরে যাবে মনে হচ্ছে। বিয়ের কনেও পাত্তা পাবে না।’

শীলা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ছাড়ো। আদিখ্যেতা!’

বিমলবাবু একটি বেশ বড়োসড়ো মাপের বাসের বন্দোবস্ত করেছেন। শীলা জানলার পাশের একটি সিট পেয়ে গেল। আমিও গুটিগুটি পায়ে তার পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। ভালোই হল। অনেকদিন দুজনে মিলে এরকম সান্ধ্যভ্রমণ হয় না। আলো ঝলমলে শহরটার মধ্য দিয়ে হাওয়া আর যানজট কেটে এগিয়ে যেতে থাকল আমাদের বাসটা।

শীলাকে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার কি সত্যিই মনে হয়, আজ শহরে দশহাজার বিয়ে হচ্ছে?’

শীলা পালটা জবাব দিল, ‘এমনভাবে জিজ্ঞেস করছ যেন আমি পুরোহিত বা রাশিবিজ্ঞানী! আমি কী করে জানব?’

তার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে আমি বললাম, ‘আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, একটু বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। খুব বেশি হলে ৩-৪ হাজার বিয়ে হচ্ছে হয়তো! দশ হাজার কি মুখের কথা?’

বাসের মধ্যে তারস্বরে রেডিয়ো চলছে। আজ সন্ধেয় সবাই রাস্তার যানজট নিয়ে চিন্তিত। থেকেথেকেই ট্র্যাফিকের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে – ‘অমুক রাস্তা ধরে যাবেন না। তমুক রাস্তা এখন এড়ানোই ভালো।– ইত্যাদি। যান-ঝঞ্ঝাটে বিরক্ত ড্রাইভার নিজের মনেই গরগর করে উঠলেন, ‘স্টুডিয়োয় বসেএসব কথা বলা খুব সোজা। রাস্তায় নেমে দ্যাখ একবার!’

চালক যেন দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছেন বেচারা ঘোষকদের। তখনই পাশের একটি গাড়ি থেকে চালক মুখ বের করে আমাদের গাড়ির চালককে প্রায় হুমকির সুরে বললেন, ‘দাদা গাড়িটা একটু পিছনে নিয়ে যান তো! সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাব। রেডিয়োয় বলছে, মোড়ে বহুত জ্যাম! রাস্তা ‘আটকা!’

সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাসের যাত্রীরাও হইহই করে উঠলেন চালকের উদ্দেশ্যে, ‘দাদু, ঘুরিয়ে নিন, গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। অন্য রাস্তা ধরে চলুন!’ অবস্থার চাপে সকলের শরিফ মেজাজেই উচ্চণ্ড হয়ে গেছে।

চালকও খেপে গিয়ে বললেন, ‘কী বলছেন? ঞ্জই গাড়িগুলো ঞ্জলোমেলো লেনে ঢুকে গিয়ে, জ্যামটাকে আরও পাকিয়ে তুলবে, ঞ্জটা বুঝতে পারছেন না?’

চালক এরপর এমনকি প্রস্তাব দিলেন সুবেশ যাত্রীদের মধ্যে কাউকে স্টিয়ারিং-এ এসে বসতে। তাতে মোক্ষম কাজ হল। হইহইটা স্তিমিত হয়ে গেল। তবে, শীলা তখনও ফিসফিস করে খুব উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘লোকটা এমন বিশ্রীভাবে গাড়ি চালাচ্ছে কেন বলো তো? কখন পৌঁছোবে, কে জানে! আর, কী গরম পড়েছে, তাই না!’

‘হ্যাঁ, খুব গরম পড়েছে। তোমার মেক-আপ তো গলতে শুরু করেছে!’

আমার মন্তব্য শীলার অন্তরাত্মা পর্যন্ত উষ্ণ করে তোলে। মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘যাও, যাও, তোমাকে দেখতে হবে না।’ বলে সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্যাবলি দেখতে থাকে।

 

ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে আসতে আড়াই ঘণ্টা লেগে গেল। বাস থেকে যখন নামা হল, প্রত্যেকের পোশাক ঘামে গায়ের সঙ্গে লেপটে বসেছে। বাস থেকে ছোটো ছোটো মেয়েরা রাংতায় মোড়া গোলাপফুল হাতে তুলে দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। মৃদু ভলিউমে সানাই বাজছে। নানারকম পারফিউমের গন্ধ হাওয়ায় কোলাকুলি করছে। অনেক পুরোনো ঞ্জকটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যেতে মনটা খুশি হয়ে উঠল। লাজুক চোখে শীলার দিকে তাকালাম। সে অবশ্য ততক্ষণে অ্যাপার্টমেন্টের অন্যান্য লাবণ্যময়ীদের দলে ভিড়ে গেছে।

পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস গুপ্ত যেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ‘আরে শীলা, কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে! বাঃ, গলার নেকলেসটাও তো দারুণ। কবে বানালে গো?’

শীলার নেকলেসটা দু-আঙুলে অল্প তুলে ধরে মিসেস গুপ্ত নিশ্চয়ই তার দামটাও মেপে নিতে চাইলেন।

পাশ থেকে মিসেস দত্ত-ও ঝুঁকে পড়লেন, ‘সত্যি তো!’

দেখতে দেখতে নেকলেসের উপর ঝুঁকে পড়া মাথার সংখ্যা বাড়তে থাকল। ক্রমশ শীলাই হারিয়ে গেল ওকে ঘিরে থাকা ভিড়ের মধ্যে। ক্ষুণ্ণ মনে সেটাই দেখতে থাকি। এক-এর বি-এর অর্ণব মজুমদার আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। সকালে প্রায় একই সময়ে আমরা অফিসের উদ্দেশ্যে বের হই। তখন দেখা আর কথা হয় অল্পস্বল্প। তাইতেই সে আমাকে বন্ধু ঠাউরে নিয়েছে। দিব্যি কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আরে সুবীরদা! এখানে এই মহিলাদের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছ? ওদিকে চলো। ছেলেদের আলাদা আড্ডা বসেছে ও ঘরে। তোমাকে সবাই ডাকছে।’ অগত্যা অর্ণবের সঙ্গে মিঃ দত্ত, মিঃ গুপ্ত এবং মিঃ দত্তগুপ্তদের আড্ডায়এসে ভিড়লাম।

মিঃ দত্ত চারপাশে তাকিয়ে, তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে বললেন, ‘ভাই, বিমলবাবু কিন্তু বেশ সরেস বেয়াইবাড়ি জুটিয়েছেন, যাই বলুন। যথেষ্ট খরচাপাতি করেছে। মনও খুবও ভালো। বন্দোবস্ত দেখেছেন?’

অর্ণব বলল, ‘আপনিও যেমন দত্তদা! ভিতরের কথা বলছি, আমার কাছে শুনুন। বিমলবাবুকে জোটাতে হয়নি, পাত্র নিজেই জুটিয়েছেন। এই মেয়েটার সঙ্গে বিমলবাবুর ছেলেকে আমি অনেকদিন দেখেছি লাভার্স পার্কের ওখানে!’

মিঃ দত্তগুপ্ত মুখটা বড়ো করে হাঁ করে বললেন, ‘তুমি ওখানে কী করতে গেছিলে হে?’

অর্ণব থমকে গিয়ে ঢোঁক গিলে বলল, ‘আরে কী আশ্চর্য! পার্কের কাছেই তো আমার অফিস!’

মিঃ দত্তগুপ্ত চোখ মটকে বললেন, ‘অফিসটাও বেছে বেছে খুব ভালো জায়গায় জুটিয়েছ দেখছি!’

মিঃ দত্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে বললন, ‘আহা ওকে বলতেই দিন না! ঝেড়ে কাশো দেখি অর্ণব। পরচর্চা বেশ ভালোই লাগে। একথা বউদের আবার যেন বোলো না!’

অর্ণব গলা নামিয়ে বলল, ‘দুজনে একই কলেজে, একই ক্লাসে পড়ত।’

তারপরই অর্ণবের চোখ পড়ল আমার দিকে। সে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘সুবীরদা মিটমিট করে হাসছে। কী সুবীরদা, হাসছেন যে বড়ো!’

আমি গলাটা কেশে সাফ করে নিয়ে বললাম, ‘আমি ভাবছিলাম, সবই যখন ঠিকঠাক হয়েই ছিল, তখন এত খরচা করার দরকার কী ছিল! এত বড়ো বাড়ি ভাড়া নেওয়া, এত এলাহি খাওয়াদাওয়ার আয়োজন, সাজগোজ, গয়নাগাটি– এসব ফালতু খরচ না?’

‘আসলে কী জানেন সুবীরবাবু’, দত্তগুপ্ত চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘মেয়েপক্ষের টাকাপয়সার কোনও অন্ত নেই। বিরাট সমুদ্র থেকে

দু-এক ঘটি জল তুলে নিলে সমুদ্রের কি কোনও ক্ষতি হয়?’

আমি ক্ষুণ্ণ মুখে বললাম, ‘তা বলেই কি জলের মতো পয়সা খরচ করা উচিত?’

হাতা ধরা ঠান্ডাপানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে অন্য এক কোণ থেকে তেতলার মনোজ ঘোষ কথা বলে উঠল এবার, ‘এই সুবীরবাবুটা না,… কেমন যেন… বেশ মজা করছিলুম! দিল মুডটা খারাপ করে!’

আমি খানিকক্ষণ ব্যাজার মুখ করে বসে রইলাম। তারপর গুটিগুটি পায়ে সরে এলাম মশগুল ভিড় থেকে।

নিমন্ত্রিতদের ভিড়টা ক্রমশ বাড়ছে। অনেকটা ঘুরে শেষপর্যন্ত শীলাকে পাওয়া গেল। ফুচকার কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে মহানন্দে মুখে পুরছে। কাছে গিয়ে কানেকানে বলি, ‘রাত হচ্ছে।এবার খেয়ে নিলে হয় না? বাস কখন ছাড়বে জানি না। দেরি হলে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব। তুমি কী বলো?’

শীলা এমন চোখে তাকাল, মনে হল যেন, আমি গর্হিত কথা বলে ফেলেছি। বলল, ‘এত তাড়ার কী আছে? এখনও কেউ চলে গেছে কি?’

‘না, বলছিলাম কি, সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে তো! অফিসে। তারপর এই ভয়ানক যানজট পার হওয়া। বাড়ি পৌঁছোতেও ঘণ্টা দুয়েক লাগবে।’

‘বাচ্চাদের মতো কথা বোলো না তো!এসে থেকে খালি খাই-খাই আর যাই-যাই!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘বেশ, তাহলে আমি ওই সোফাটায় বসে আছি কেমন? তোমাদের খাওয়ার সময় হলে ডেকো–!

মুখ না ফিরিয়েই শীলা বলল, ‘আচ্ছা!’

ঘরের একমাত্র নিরালা কোণে রাখা আছে সোফাটা। নরম তুলতুলে গদি। ধুপ করে শরীরটাকে তাতে ফেলতেই আধশোয়া হতে ইচ্ছে হল। আর, আধশোয়া হতেই চোখদুটো যেন বন্ধ হয়ে এল আপনিই।

কতক্ষণ কেটেছে জানি না, হঠাৎ কারও প্রবল ধাক্বায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলাম। স্থান এবং কালের বোধ সহসা মাথায় খেলল না। চোখ কচলে নিয়ে দেখি মিস গুপ্ত দাঁত বের করে হাসছেন।

‘কী ব্যাপার, অ্যাঁ, সুবীরবাবু? কোথায় আনন্দ করবেন, তা না, ঘুমোচ্ছেন! ক’টাকা খসেছে প্রেজেন্টেশনে?’

‘জানি না তো। শীলা কিনেছে।’

‘সেটাও জানেন না? কী লোক মশাই আপনি, অ্যাঁ? যাই হোক, টাকাটা তো উশুল করে নেবেন নাকি? ফুচকা প্রায় শেষ হতে চলল, চাটের অবস্থাও তথৈবচ, জিলিপিওলা তো অনেকক্ষণ হল উঠেই গেছে। আপনি মশাই স্রেফ ঘুমিয়ে এই এতগুলো মিস করলেন।’

গুপ্তবাবু আমার হাত ধরে টেনে তুললেন। না হলে নরম গদির গর্ভ থেকে নিজেকে টেনে তোলা প্রায় অসম্ভবই মনে হচ্ছিল। গুপ্তবাবু বললেন, ‘দেখুন, দেখুন, বিমলবাবু কেমন নাচছেন!’

সত্যিই, বিরাট হলঘরেরএকটা পাশে তারস্বরে লাউডস্পিকার চালিয়ে নিমন্ত্রিতরা নাচছে। বিমলবাবু বাতের রোগী। পা নাড়াতে পারছেন না। কেবল কোমরের উপর থেকে ল্যাগব্যাগ করছে।

কিন্তু সেদিকে মন দেওয়ার উদ্দেশ্য আমার নেই। আমার চোখ শীলাকে খুঁজে বেড়াতে লাগল।

শীলাকে দেখতে পেয়ে করুণ মুখে তার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম। হাতঘড়িটা তুলে দেখালাম! মিসেস দাস কুলকুল করে বলে উঠলেন, ‘শীলা তোর বর কেন বারবার মেয়েদের পাড়ায় চলে আসছে বল তো?’

নম্রভাবে বললাম, ‘দাসবউদি, কাল সকালে অফিস আছে কিনা! সারা রাত না ঘুমোলে কাজ করব কী করে? দয়া করে শীলাকে আপনারা যাওয়ার অনুমতি দিলে আমি প্রাণে বেঁচে যাই!’

‘কী ছেলেমানুষি করছ বলো তো? সবাই তো ফিরবে নাকি? সবারই তো অফিস আছে!’– শীলা যথারীতি ঝাঁঝিয়ে উঠল।

অতএব আমি ব্যর্থমনোরথ হয়ে সোফার শরণ নিলাম। এবার কোনওদিকে না তাকিয়ে লম্বা হলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে মেঘ ডেকে বৃষ্টি আসার মতো, নাক ডেকে ঘুম এল। ঘুম ভাঙল শীলার ধাক্বায়। কৌতূহলী মজা পাওয়া মানুষের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে অস্বস্তির গলায় সে বলল, ‘তুমি কী গো! দিব্যি ঘুমিয়ে নিলে? চলো, সবাই খেতে যাচ্ছে!’

কবজি উলটে দেখলাম রাত একটা বেজে গেছে।

খাওয়াদাওয়ার পর আবার গাড়ি চলতে শুরু করল ঢিমে তালে। বিয়েবাড়ি আসার সময়কার উৎসাহ সকলের মধ্যেই নির্বাপিত। বাসের মধ্যে শ্মশানের শান্তি। থেকে থেকে মৃদু নাসিকাগর্জনও কানে আসতে লাগল।

বাড়ির দরজা খুলে দিল, দশ বছরের ঋজু। আমাদের বড়ো ছেলে। মুন্নির বয়স আট চলছে। সে তার ঘরে যথারীতি ঘুমোচ্ছে।

ঋজু খুব গম্ভীর গলায় বলল, ‘এত রাত হল ফিরতে? কাল অফিসটফিস যেতে হবে না, নাকি?’

বড়ো করে একটা নিশ্বাস ফেলে ভাবলাম, কে বলে পুরুষ হলেই সে স্বাধীন হয়? শৈশবে পিতামাতা, যৌবনে স্ত্রী, পড়ন্ত যৌবনে পুত্রকন্যারা অভিভাবকের চেয়ারটায়একবার না একবার ঠিকই বসে যায়।

হেসে বললাম, ‘কীসের ছুটি রে? গুচ্ছের কাজ রেখেএসেছি।এখন শুলে আর দুপুরের আগে ঘুম ভাঙবে না। তাই ভাবছি, একটু কফি করে খাব।’

বাড়িতে ফিরেই শীলা বদলে গেছে। এখন তার মেক-আপ ঘরোয়া। চিনতে অসুবিধা হয় না। যত্নবতী  স্ত্রীর মতোই বলল, ‘তুমি বোসো আমি করে আনছি। তারপর মর্নিং ওয়াকে বের হব।’

আমরা পুরো পরিবার প্রত্যেকদিন সকালে অ্যাপার্টমেন্টের সামনের পার্কে প্রাতর্ভ্রমণ করতে যাই।

মিষ্টিমিষ্টি মন ভালো করা হাওয়া দিচ্ছে। দুটো-চারটে নাম না জানা ছোটো রঙিন পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-ওখানে। জীবন কত সুন্দর। যেন প্রকৃতির মধ্যে মিশে আছে। সেখানে কোনও দেখানেপনা নেই। মেক-আপ নেই। গয়না নেই। পরচর্চা নেই।

শীলাকে বললাম, ‘মানুষের দেখানেপনা এসবের কাছে কত তুচ্ছ মনে হয়, তাই না? একে অন্যের আড়ালে কথা বলাও কত গৌণ লাগে!’

শীলা বলল, ‘যা বলেছ! কাল আমার একদম ভালো লাগেনি!’

আমি বললাম, ‘আমারও।’

গোটা পার্কটা এখনও সাদা কুয়াশায় ঢেকে আছে। প্রথমে ভেবেছিলাম জনহীন পার্কে আমরা বোধহয় একাই। কুয়াশা কেটে এগোতেএকে একে সকলের সঙ্গেই দেখা হতে থাকল। মিঃ দত্ত, মিঃ গুপ্ত, মিঃ ঘোষ, মিঃ দত্তগুপ্ত, মিসেস দাস– সকলেই মেক-আপ তুলে, আঙরাখা খুলে রেখে এসেছেন।

কেশকাঞ্চন

চুলের ব্যাবসা করবি?

প্রশ্ন শুনে বেটাকে আচ্ছা করে গাল পাড়ল তারাপদ। শ’কার, ব’কার, খ’কার, কিছুই বাদ গেল না।  হয়তো মেরেই দিত। চুলের আবার ব্যাবসা কী?  মশকরা করার জায়গা পায় না? আর পঙ্গু মানুষকে নিয়ে কেউ মশকরা করে? নেহাত পুরোনো বন্ধু তাই বেশি কিছু বলল না। বিড়ি ধরিয়ে রাস্তায় মন দিল।

বাসন্তী হাইওয়ে পিচঢালা, মসৃণ। পাশেই খাল। অবজ্ঞা, অবহেলা সয়েও একনিষ্ঠ। নিঃশব্দে বহন করে চলেছে কলকাতার নিকাশি। ওপারে ধাপা। আবর্জনার পাহাড়ে যেন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া। সায়েন্সসিটি ব্রিজের নীচে পুবমুখী রাস্তাটাই বাসন্তী হাইওয়ে। সোজা চলে গিয়েছে বাসন্তী। সেখান থেকে মাতলা পেরিয়ে গোসাবা হয়ে সুন্দরবন, অথবা রাজারহাট-বসিরহাট-বনগাঁ হয়ে বাংলাদেশ। মাঝে বানতলা, বামনঘাটা, ভোজেরহাট, ঘটকপুকুর, ভাঙ্গড়, মালঞ্চ। রাজনৈতিক মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে নিজগুণে। মারামারি, খুনোখুনি লেগেই আছে। অঞ্চলের বেশিরভাগটাই ভেড়ি। মিষ্টিতে যেমন পিঁপড়ে, মাছের ভেড়িতে তেমনি ক্রিমিনাল।

দুপুর সময়টা বড়োই গ্যাঁড়াকলের। নিষ্কর্মা মানুষকে উদোম করে দেয়। সকালটা কাটিয়ে দেওয়া যায় প্রাতঃকৃত্য, চুল-দাড়ি কাটা, স্নান, চায়ের দোকান, এটা-সেটা করে। খবরের কাগজ তো ত্রাতা মধুসূদন। ‘অনেক কাজ পড়ে আছে’ বা ‘যেতে হবে বহু দূর’ও মানানসই। কে আর সত্যান্বেষণ করছে! আঁধার তো খুবই সুবিধের। দিব্যি লোকচক্ষুর আড়াল হওয়া যায়। যা হোক দুটি পেটে ফেলে শুয়ে পড়লেই হল। ঘুম আসুক না আসুক, সুখনিদ্রার ভানে অসুবিধে নেই। ঘুম অবশ্য দুপুরেও দেওয়া যায়। তবে লাভ নেই। কর্মব্যস্ত ধরণীতে দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা একান্তই দৃষ্টিকটু। নিষ্কর্মার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তা ছাড়া অত ঘুমও কি মানুষের আসে? কাঁহাতক ভালো লাগে মটকা মেরে শুয়ে থাকতে?

রোজ দুপুরে বানতলা বাজারে এসে বসতেই হয় তারাপদকে। গাছতলা, পুকুরপাড়, ভাঙা মন্দির, কোনওটাই তেমন জুতসই নয়। যেন আরও উদোম হওয়া। তার চেয়ে রাস্তার ধারই ভালো। গাড়িঘোড়া, মানুষজনের মাঝে দিব্যি মিশে থাকা যায়। চোখে লাগে না অতটা। ভরদুপুরে মানুষজন সামান্যই। গাড়িই ভরসা। গুনতি করে সময় মন্দ কাটে না। তবে মুশকিলও আছে। বেকার মানুষ পেলেই লোকের উপদেশ দেবার বাসনা উশখুশ করে। সেই কারণেই বটকেষ্টর, ‘চুলের ব্যাবসা করবি?’

কলকাতার এত কাছে, তবুও জীবন যেন এখানে থমকে আছে। হাইওয়ের উপর বিশাল চর্মনগরী, ছোটোখাটো কারখানা বা দু’একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থাকলেও, গ্রামের ভিতরে প্রায় উলটো চিত্র। বিদ্যুৎ থাকলেও সব রাস্তা পাকা নয়! সর্বসাধারণের স্কুল মাধ্যমিক পর্যন্ত। কাছের হাসপাতাল বলতে পার্কসার্কাসের চিত্তরঞ্জন। মানুষের রোজগার মূলত ভেড়ি থেকে। এখনও হাট বসে। রাস্তার দু’ধারে সার দেওয়া ‘কাঁটা, ওজন করার যন্ত্র। আশপাশের ভেড়ি থেকে মাছ এসে কাঁটায় ওঠে। শুরু হয় ‘অকশন। যার ডাক বেশি সেই দাবিদার। মিষ্টি জলের রুই, কাতলা, ট্যাংরা, ভেটকি, পাড়ি দেয় গড়িয়াহাট, লেকমার্কেট, যদুবাবু বা মানিকতলা বাজারে। হইচই, হল্লাগুল্লায় হাট সরগরম। ঝগড়াঝাঁটি লাগলেও, বাজারে মাছ পৌঁছোনোর তাড়ায় আমল পায় না। মাছের সঙ্গে তরিতরকারিও থাকে। কলকাতার বাবুরা চলে আসে টাটকা মাছ-সবজির সন্ধানে। সস্তাও হয়! শপিং মল বা ফুডমার্টের চেয়ে তো বটেই। শুধু একটু চিনতে আর দরদাম করতে হয়। তাছাড়া গাড়ি হাঁকিয়ে হাটে আসার অ্যাডভেঞ্চার তো আছেই। সাইট সিয়িং ফাউ।

সার দেওয়া কাঁটাগুলো বিশ্রামে! জেগে উঠবে সকালে। নির্ধারণ করবে লাভ-লোকশান। দীর্ঘশ্বাস ফেলল তারাপদ। আবার বিড়ি ধরাল। বিড়িও অন্যতম অবলম্বন। ‘কিছু একটা করছি’বা ,শেষ করেই যাব অন্যখানে। দু’টান মেরেই ফেলে দিল। মুখটা তিতকুটে। মনও। এই হাটেই একসময় কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যেত টেরও পেত না। মানিকতলা বাজারের বিধু সাহার মাছ সওদা করত। অগাধ আস্থা ছিল বিধুর। মাছ চেনার ব্যাপারে তারাপদরও জুড়ি ছিল না। কোন কাঁটায় কারচুপি আছে সেও ছিল নখদর্পণে। ফলে সেরা দামের সঠিক ওজনের মাছ চালান যেত বিধুর আড়তে। বিধুও গুণীর কদর করত। মাস গেলে প্রাপ্য মেটাতে কসুর করত না।

বিধু কদর করলেও, ভেড়িওয়ালারা তারাপদর গুণপনায় অতিষ্ঠ। বিধুর মতো বড়ো খরিদ্দারের কাছে মাছ গছাতে পারলে একসঙ্গে অনেকটা মাছেরই হিল্লে হয়। কিন্তু তারাপদর জ্বালায় সে উপায় নেই। সেরা মাছ ছাড়া তুলবে না। ওজনেও একচুল এদিক-ওদিক করবার জো নেই। ভগবানও বোধহয় ব্যাপারীদের সহায়। একসময় দুটো পা’ই অসাড় হতে লাগল তারাপদর। ডাক্তারবাবুরাও ধরতে পারল না অসুখটা। হেকিমি, কবিরাজিতেও লাভ হল না। ধীরে ধীরে দ্বিপদ থেকে চতুস্পদ বনে গেল তারাপদ।

কোনও যুক্তি না পেলে সহজতম গ্রাম্য সমাধান, ‘কেউ কিছু খাইয়ে দিয়েছে’ অথবা ‘বাণ মেরেছে’। এক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। তবে কারওরই ‘কেউ’ বা ‘কিছু’ সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেই। বাণ জিনিসটাও ভজকট। তন্ত্রের সঙ্গে সম্বন্ধ থাকলেও, কেউই চাক্ষুষ করেনি কখনও। তাই পরিবার ভেড়িওয়ালাদের দিকে আঙুল তুললেও, প্রমাণ করতে পারল না কিছুই। বিধু অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা করেছিল। সহকারী রেখে তারাপদ তদারকি করবে। করলও কিছুদিন। তারপরে আস্তে আস্তে ভাটা পড়ল। কাঁহাতক আর ভালো লাগে অন্যের বোঝা হতে? তা ছাড়া গুরুত্বও কমছিল। সবার চোখেই দয়া, করুণা, অনুকম্পা। একদিন যেখানে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, সেখানে এই দুর্দশা মেনে নিতে পারল না। লাইনই ছেড়ে দিল। তারপর কাঠ বেকার।

‘একবার ভেবে দেখলে পারতিস। লাইনটা খারাপ কিছু নয়। বসেই তো থাকিস…’

তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল তারাপদ। শব্দ করে একদলা থুতু ছেটাল।

‘আমি বসে থাকি তো তোর বাপের কী রে? তুই কি খাওয়াস না পরাস?’, মনে মনে গজরাল। চৈত্রের গনগনে রোদে তর্ক জুড়তে ইচ্ছে হল না।

‘প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হবে। তারপর দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে। ইনকামও মন্দ নয়’, বটকেষ্ট নাছোড়বান্দা।

‘তা সে ইনকাম তুই কর না। আমার পেছনে পড়েছিস কেন?’, না বলে পারল না তারাপদ।

‘আমি তো চৌবাগা, ভিআইপি বাজার, পঞ্চান্নগ্রাম, এই এলাকাগুলো দেখছি। তুই এদিকটা দেখ না, বটকেষ্টর প্রস্তাব।

‘কেন রে শালা, আমি ছাড়া কি আর লোক নেই?’ পোঁদ ঘষটে আমাকেই গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরতে হবে?’, খিঁচিয়ে উঠল তারাপদ। হাঁটাচলা বলতে দু’হাতে ভর দিয়ে ঘষে ঘষে চলা। সব জেনেও বটা এইরকম প্রস্তাব দিচ্ছে? নাকি মজা করছে?

বটকেষ্ট পাকা ব্যাবসাদার। এ অঞ্চলে ব্যাবসা করা বিরাট ঝকমারি। লাইন দিয়ে টাকা নেবার লোক দাঁড়িয়ে। তোলা না দিয়ে এক পা-ও এগোনোর উপায় নেই। শালাগুলো কাজ-কম্ম কিছু করবে না, শুধু পরের ধনে পোদ্দারি মেরে মদ-মাংস খাবে। খাওয়া বেশি হলে পড়শির বউ-মেয়ের হাত ধরে টানবে। তবে তারাপদর কথা আলাদা। একে পঙ্গু তায় গ্রামের লোক। দয়া, করুণা, তাচ্ছিল্য যাই করুক না কেন, তোলা চাইবে না! ‘খোঁড়াটা আর কতই বা কামাবে’র যুক্তিতে ছাড়পত্র পাবে। এতসব না বলে হাসি মুখে বলল, ‘তুই আমার বন্ধু বলেই বলছি। তেমন হলে আমি নয় তোকে চাকা লাগানো গাড়ি বানিয়ে দিচ্ছি। ঠেলে ঠেলে ঘুরতে অসুবিধে হবে না।’

বিড়ি ধরাল তারাপদ। একটা হাতে চালানো সাইকেল গাড়ির জন্য কত তদবিরই না করেছে। নেতা থেকে এমএলএ পর্যন্ত। আশ্বাস ছাড়া জোটেনি কিছুই। অথচ ভোটটা কিন্তু ওই পার্টিকেই দিয়েছিল। কে জানে কেন, তালিকায় নাম আর উঠল না।।

তারাপদ চুপ করাতে বটকেষ্ট যেন ভরসা পেল। এদিককার গ্রামগুলো ছড়ানো-ছেটানো। দু’চারটে ঘুরতেই দিন কাবার। পড়তায় পোষায় না। লোক রেখেও সুবিধে হয় না। সকলেরই নজর ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে গৃহস্থের সঙ্গে বিউটি পার্লারও আছে। একলন্ধে চুল মেলে অনেকটা। তাই তারাপদ যদি রাজি হয়, তা হলে গাড়ি দিয়েও লাভ। পাশ ঘেঁসে বসে মোলায়েম স্বরে বলল, ‘নিজের কথা নয় নাই ভাবলি তোরা। সংসারের কথা তো একটু ভাবতে হয়। দু’পয়সা রোজগার করলে সংসারটার কি একটু সুরাহা হবে না?’

‘দু’পয়সা রোজগার করলে সংসারটার কি একটু সুরাহা হবে না?’ বটার এই কথাটাই টলিয়ে দিল তারাপদকে! সংসার বলতে বউ মালতী আর মেয়ে ঝুমুর। জমিজমা না থাকলেও বাড়িটা নিজের। একতলা। ইটের গাঁথনি, অ্যাসবেস্টসের চাল। প্লাস্টার বা রং করা হয়ে ওঠেনি। জমির প্রতি মোহ কোনওদিনই ছিল না তারাপদর। রক্ষণাবেক্ষণ ভয়ানক ঝামেলার। ব্যাংকে যাবারও প্রয়োজন বোধ করেনি কখনও। ঈশ্বর যখন বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী করেছেন, তখন চিন্তা কী? এক বিধু গেলে অন্য বিধু আসতে সময় লাগবে না।

খাটা-খাটনিও তেমন কিছু নয় যে শরীর ভেঙে পড়বে। সকালে খানিক দৌড়ঝাঁপ, খিস্তি-খেউড়, হম্বিতম্বি, তারপরেই অখণ্ড বিশ্রাম। ম্যাটাডোরে মাল চাপিয়ে বোতল খুলে বসা। নিখরচায়। দায় ভেড়িওয়ালাদের। তোয়াজ, তোষামোদে গদগদ। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হোক না হোক, শনি দেবতাকে তুষ্ট রাখতেই হয়। আমোদ-আাদে তোফা কাটছিল দিনগুলো। যেন রাজা-বাদশা!

গোল বাধল পায়ের অসুখটার পর। আচমকাই রুঢ় বাস্তবের মুখোমুখি। টাকার জোগান থাকলে অনেক কিছুই চোখে পড়ে না। যেমন পড়েনি মালতীকে। দিব্যি হাসিখুশি গৃহকর্মনিপুণা! ভালো-মন্দ রান্না করা, ঘর-দোর গুছিয়ে রাখা, আত্মীয়-কুটুম্বিতা দরাজ হাতে। চারিদিকে ধন্য ধন্য, ‘বউ বটে তারাপদর!’ তারাপদও কোনও ফাঁক পায়নি। শরীর, মন দুইয়েরই চাহিদা মিটেছে অগাধ। বেসামাল অবস্থায় যত্ন-আত্তি তো দেখার মতো! জামা-জুতো খুলে, গা-হাত-পা মুছিয়ে, মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঘুম পাড়াত। পরম তৃপ্তিতে মনে হতো, ‘যাক, শেষ বয়সটায় কষ্ট পেতে হবে না!’

বোঝা যায়নি। হয়তো যায়ও না। সবুজে ভরা বনভূমি দেখে কি মরুভূমির আঁচ পাওয়া যায়? নাকি টলটলে নদীতে চরের পূর্বাভাস থাকে? সুউচ্চ মিনার আচমকা ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ হবে, তা কী ভাবা যায়? না গেলেও, গেল একসময়। অভাব তাণ্ডব শুরু করতেই মালতী যেন ধূধূ মরুভূমি, রুক্ষ চর। প্রত্যাশার মিনার গুঁড়িয়ে চুরমার। শুরুতে মন দিয়েই চিকিৎসা করাচ্ছিল। আশা ছিল সুদিনের। যখন বুঝতে পারল দুর্দিন নিশ্চিত, তখনই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। প্রথমে ভাগ্যকে দোষারোপ, তারপর মানুষকে। তারাপদর মতো অবিবেচক মানুষ নাকি জীবনে দেখেনি। অথচ প্রতি রাত-সোহাগেই তারাপদর দিলদরিয়া স্বভাবের গুনগুনানি ছিল অনিবার্য। অনেক ভাগ্য করলে নাকি এমন স্বামী পাওয়া যায়।

বউয়ের তাগাদা, খ্যাচখ্যাচ, মুখঝামটায় ঠোঙা বানানোর কাজে হাত লাগাল তারাপদ। কিন্তু সারাদিন ঘরে বসে ঠোঙা বানানো পোষায়? কাজটাও ঘ্যানঘ্যানে, ম্যাদামারা টাইপের। মাছের কারবারের ছিটেফোঁটা উত্তেজনাও নেই। আর বানিয়েই বা লাভ কী? সব রোজগারই তো ঢুকবে সংসার ‘গভ্ভে’। এক ছিপি মালও বরাদ্দ হবে না নিজের জন্য। সবদিক বিবেচনা করে ঝিম মারল তারাপদ। হাজার মুখ ঝামটাতেও রা নেই। যেন বোবা, বধির।

ঠোঙা বানানো ছিল ফ্যামিলি বিজনেস। প্রথমে মেয়ে তারপর বাপ-মেয়েই ছিল প্রধান কারিগর। মালতী ঘরের কাজ সেরে হাত লাগাত। তারাপদ গুটিয়ে যাবার পর মসৃণ অ্যাসেম্বলি লাইনে ছেদ পড়ল। মা মেয়ের পক্ষে সামাল দেওয়া মুশকিল। মেয়ে হোলটাইমার হলেও মাকে ব্যস্ত থাকতে হয় ‘গুষ্টির গেলার জোগাড়ে’! আলুটা মুলোটা চেয়ে, গেঁড়ি-গুগলি জোগাড় করে তবে রান্না। মাঝেমধ্যে মরা মাছ জুটলেও, ভাতের বড়োই আকাল। উপায় না দেখে একসময় মালতী রান্নার কাজ নিল। আনন্দপুরের দিকটায় বড়ো-বড়ো ফ্ল্যাটবাড়ি। পয়সার কমতি নেই কারও! সেরকমই তিনটে বাড়িতে কাজ জোটাল। সাত সকালে বেরিয়ে মাঝ দুপুরে ফেরা। একবেলা খাওয়ার সঙ্গে হাজার পাঁচেক মাইনে। কোনওরকমে দিন গুজরান।

টাকার চেয়ে বড়ো জোর আর কিছুই নেই। এতএব ‘জোর যার মুলুক তার’ – এই যুক্তিতেই সংসারের রাশ মালতীর হাতে। তারাপদ যেন কীটাণুকীট, অপাংতেয়। নেহাত তাড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে সহ্য করা। তারাপদও মেনে নিল বউয়ের অহংকার, ঔদ্ধত্য। না মেনে উপায়ই বা কী? আত্মহত্যা? সম্ভব নয়! বড়ো ভয় জলে ডুবতে, গায়ে আগুন লাগাতে অথবা আচমকা গাড়ির সামনে পড়তে। দিনে দিনে আরও গুটিয়ে গেল। পারতপক্ষে রাতের আগে বাড়ি ফেরে না। ফিরেও চোরের মতো দুটো মুখে দিয়েই ঘুম। ঘুম মানে চোখ বুজে থাকা। মেয়েই খেতে দেয়। রাতে ঘুম না এলে পাশে এসে বসে কখনও-সখনও। মায়ের চোখে পড়লে মুখঝামটা, গালাগাল।

‘স্বামী তো নয়, শত্তুর।’

মেয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই গলার কাঁটা। রূপ না থাকলেও বেশিরভাগ মেয়েরই আলগা চটক বা লালিত্য থাকে। ঝুমুর যেন কুরুপার অধিক। চটক তো নেই-ই, লালিত্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আলকাতরার মতো রং, খরখরে চামড়া, মুখের দিকে না তাকালেই স্বস্তি! গুণ বলতে নম্র, গৃহকর্মনিপুণা, সরলমতি। একেবারে খাদহীন। কাদার তাল যেন! ওইসবের কদর বাপ-মায়ের কাছে থাকলেও, বাইরের লোকের দায় পড়েনি নজর করবার।

পায়ের গোলমাল শুরু হতেই মনে কু ডেকেছিল তারাপদর। মেয়ের বিয়েটা এইবেলা না দিলেই নয়। পাত্রী পছন্দ হবার প্রশ্ন নেই, তাই প্রথম থেকেই টাকার চার ফেলেছিল। মাছও এল! ছেলের বাড়ি জয়নগর। রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ে। দিল্লি, মুম্বাইতেও যায়। বাড়িতে বিধবা মা। জমিজমা না থাকলেও অভাব নেই। দেরি করল না তারাপদ। পঞ্চাশ হাজার টাকা বরপণে রাজি হয়ে গেল। সঙ্গে মোটরবাইক। দয়াপরবশ হয়ে হাজার তিরিশেক টাকা দিল বিধু সাহা। বোধহয় লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট। বাকিটা মহাজনের কাছে ধার! মোটরবাইকও ধারে। পড়শি নগেন পালের কাছে বিনা সুদে। আয়োজন তেমন কিছু ছিল না। কালীঘাটে বিয়ে আর বাড়িতে জনা পঞ্চাশের নিমন্ত্রণ। কাজ উতরাল নির্বিঘ্নে। ট্রেনে চড়ে মেয়ে চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। দ্বিরাগমনেও এল। বর ছ’মাসের জন্য দিল্লি যাচ্ছে। ফিরে এসে নিয়ে যাবে। সেই যে জামাই গেল, তিন বছর পার হতে চলল ফিরল না এখনও। জয়নগরে খোঁজ নিয়ে লাভ হয়নি। শাশুড়ির কাছেও হদিশ নেই। মোবাইল সুইচড-অফ। শুরু হল শবরীর প্রতীক্ষা।

শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে ঝুমুরও যেন পালটে গেল। যে-মেয়ে সাজগোজের ধারপাশ দিয়েও যেত না, সে নানারকম আবদার শুরু করল। ইচ্ছে থাকলেও সামর্থ্য আর নেই। চিকিৎসা, বিয়েতে সর্বস্বান্ত। মালতীকে টানতে হচ্ছে মোটরবাইক, মহাজনের ধার। ঝুমুরেরও যেন তাড়া নেই শ্বশুরবাড়ি ফেরার। রহস্য উদ্ঘাটন হল ছ’মাস পার হবার পর। বর নানারকম দাওয়াই বাতলে দিয়েছে ফরসা হবার। টিভিতে চাক্ষুষ করিয়েছে সিনেমার হিরো হিরোইনদের রূপ রহস্য। আশ্বাস দিয়েছে ফরসা হলেই ফেরত নিয়ে যাবে। নইলে সমাজে মান রাখাই দায়। ঝুমুরও বিশ্বাস করেছে সরল মনে! উপায় বাতলালেও, সংস্থানের কোনও ব্যবস্থা করেনি পতিদেবতা। অগত্যা পাড়ার মেয়েদের থেকে চেয়ে-চিন্তে ক্রিম, সাবান জোগাড় করে ঝুমুর। মনে দুর্বার আকাঙক্ষা। হবে সাধের উত্তরণ।

চোখে জল এসেছিল তারাপদর। তীব্র অভিমান হয়েছিল ঈশ্বরের উপর। মনটার মতো মেয়েটার চেহারাটা একটু সাদা করতে পারল না? কালো মনের সাদা মানুষ তো আকছার! বেশ বুঝতে পারল টোপ গিললেও মাছ বঁড়শিতে গাঁথেনি! মেয়ে আজও কুমারী। হয়তো আজীবনই থাকবে। টাকা, বাইকের সংস্থান হতেই পালিয়েছে জামাই বাবাজি। সেই থেকেই ঝুমুর একনিষ্ঠ রূপ সাধনায় ব্রতী। পাড়ার লোকে হাসে, ব্যঙ্গ করে, আবার কৗতূহলে খয়রাতিও করে। অপেক্ষা করে চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সের। মিলনান্তক না বিয়োগান্তক? মিলনান্তক হলে, ‘আমিই তো…’, অন্যথায় মুখ বেঁকিয়ে ‘বোকার হদ্দ কোথাকার। সাধ্য নেই, সাধ আছে ষোলোআনা’। ঝুমুর অতশত বোঝে না। যে যা দেয় তাই নিয়েই খুশি। চালায় নিরলস প্রচেষ্টা। ডাক আসবে প্রিয়তমের।

নিরুত্তাপ, নিস্তরঙ্গ জীবনেও একসময় সিঁদুরে মেঘ দেখল তারাপদ। মালতীর শরীর ভেঙে পড়ছে। আজকাল প্রায়ই হাঁপ ধরে, বুক ধড়ফড় করে। অপুষ্টি, অধিক পরিশ্রমে শরীর কাহিল। মেজাজও তিরিক্ষি। স্বামীর উপর ক্ষোভ উগরেও শান্তি হয় না। মেয়েকেও জুড়ে নেয়। এমন বাপ-মেয়ের জন্যই নাকি জীবনটা দুর্বিষহ হল। বাপ-মেয়ে দুজনেই সর্বংসহা। এতএব মেজাজ আরও তিরিক্ষি! তবে ঠান্ডা হলে ঠোঙা বানানোয় হাত লাগায়। তারাপদ হাত উঠিয়ে নিলেও, মা-মেয়েতেই চালাচ্ছে ফ্যামিলি বিজনেস। মোটরবাইক, মহাজনের ধার এখনও চলছে। শুধু রান্নার কাজের মাইনেতে বাড়িতে রান্না চড়ানো মুশকিল। কিন্তু মালতী হঠাৎ অসুস্থ হলে? কেমন করে বাঁচাবে হাবাগোবা মেয়েটাকে?

‘ঘুম আসছে না বাবা?’

চমকে উঠল তারাপদ। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে খেয়ালই করেনি কখন ঝুমুর শিয়রে এসে বসেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে মালতীকে খুঁজল। চাপা স্বরে বলল, ‘এই ঘুমব… তুই এখন যা। মা দেখতে পেলে অযথা মুখঝামটা শুনবি!’

‘মা তো ঘুমিয়ে পড়েছে, ঝুমুর হাসি মুখে জানায়।

নিশ্চিন্ত হল তারাপদ। মেয়ের হাতে হাত রেখে বলল, ‘বুঝলি মা, এবার একটা নতুন কারবারে হাত দিচ্ছি।’

‘কীসের কারবার?’

‘চুলের।’

চুল নিয়ে যে কারবার হয়, তারাপদর ঘুণাক্ষরেও জানা ছিল না। খদ্দের দেখে তাজ্জব হয়ে গেল। বুঝল মহিলা মহলে এই ব্যাবসা খুবই জনপ্রিয়। নিজের মাথার ঝড়তি-পড়তি চুল বেচে যদি দুটো পয়সা মেলে, মন্দ কী? তাই ফেলে না দিয়ে কাচের শিশি বা প্লাস্টিকে জমায়। পরিমাণমতো হলে বেচে দেয়। দেড় থেকে তিন হাজার টাকা কিলো।

তারাপদকে পেয়ে মহিলা মহল যেন বর্তে গেল। খাপছাড়া গ্রামগুলোয় কোনও ক্রেতা না থাকায় বাড়ির পুরুষ মানুষদের শরণাপন্ন হতেই হতো। বিস্তর সাধাসাধি, তোষামোদ। তারপর নেহাতই দয়াপরবশ হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ! তাও সব সময় যে সঠিক পয়সা ঘরে আসবে এমনটা নয়। ব্যস্ত পুরুষকুল উপকারের বিনিময়ে মাঝেমধ্যেই এক বান্ডিল বিড়ি বরাদ্দ করে নেয়। ঝরা চুল কিলোখানেক হবার প্রশ্ন নেই। সাকুল্যে হয়তো কয়েকগ্রাম। সেটুকুতেও যদি নজর পড়ে, সহ্য হয়! বলতে গেলে পালটা রাগ, দায়িত্ব অস্বীকারের হুমকি। সেদিক দিয়ে তারাপদ শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। চোখের সামনে পুরো পয়সা মিলবে। তা ছাড়া চেনা লোক, ওজনে মারবে না ধরেই নেওয়া যায়। তবে কেউ কেউ নগদের বদলে বাসন প্রত্যাশী। কারও কারও নগদ নিয়েও অসন্তোষ। তারাপদ নাচার। ছোটো গাড়িতে বাসনের বোঝা বয়ে বেড়ানো দুঃসাধ্য। নগদ বাড়াবারও উপায় নেই। তা হলে নিজের বাড়া ভাতেই ছাই পড়ে। তা ছাড়া সবাইকে সমান নগদ দেওয়াও যায় না। দাম মেলে চুলের দৈর্ঘ্য অনুয়ায়ী। তবুও হাতের কাছে অন্য ক্রেতা না মেলায় তারাপদর কপালেই বরাত জোটে। নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

সময় মন্দ কাটে না তারাপদর। বটকেষ্টর দেওয়া গাড়িটা বেশ মজবুত। কাঠের তক্তার উপর চাকা লাগানো। হাত দিয়ে ঠেলে দিব্যি গড়গড়িয়ে যাওয়া যায়। অন্যদের মতো ডুগডুগিও দিতে চেয়েছিল। এক কথায় নাকচ করেছে তারাপদ। চেনা লোকজনের মাঝে ডুগডুগি বাজিয়ে ফেরি করবে। এ কি ব্যাবসা নাকি বাঁদর নাচ দেখানো? জোর করেনি বটকেষ্ট। এলাকায় পরিচিতি এবং অন্য ক্রেতা না থাকার সুবাদে তেমন অসুবিধে হবে না তারাপদর। ‘চুল দেবেন গো’ হাঁক পাড়ারও দরকার পড়বে না। মেয়ে-বউরা এমনিই উজিয়ে আসবে। তাই গাড়ির সঙ্গে শুধু ওজন করবার সূক্ষ্ম যন্ত্রটা দিয়েছে, যাতে কয়েক গ্রামও অনায়াসে ওজন করা যায়। আর দিয়েছে ধার হিসেবে দশটাকার বান্ডিল। বেশিরভাগের প্রাপ্যই পঞ্চাশ, একশো ছাড়ায় না। খুচরো রাখতেই হয়। তারাপদ ঠকায় না কাউকেই। সেই কারণেই হয়তো বাড়তি খাতির মেলে। চাইলে জল পাওয়া যায়। সঙ্গে বাতাসাও আসে কখনও।

‘তুই করিস কী চুলগুলো দিয়ে?’

‘বেচে দি।’

‘কাকে?’

‘সে খোঁজে তোর দরকার কী? তুই কামাচ্ছিস কামা না’, বটকেষ্টর সাফ জবাব। এই হল মানুষের দোষ। নিজেরটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না, অন্যের দিকে নজর । একেবারে নিশ্চিত, পরের প্রশ্ন দাম সম্বন্ধীয়।

‘তুই কী দাম পাস?’

হো-হো করে হেসে উঠল বটকেষ্ট! মানুষ ঘাঁটা সার্থক। তারাপদর পিঠে চাপড় মেরে বলল, ‘তোর তাতে দরকার কি রে শালা? তোকে একটা লাইন চেনালাম, গাড়ি বানিয়ে দিলাম, হাজার টাকা ধার দিলাম, এই নিয়েই সন্তুষ্ট থাক না। জাহাজের খবর জেনে তুই আদার ব্যাপারী কী করবি?’

চুপসে গেল তারাপদ। নেহাতই কৗতূহলী জিজ্ঞাসা। বটা যে কিছু মনে করবে ভাবেনি।

‘শোন, তোকে আর একটা রোজগারের উপায় বাতলাই’, পরিস্থিতি হালকা করতে চাইল বটকেষ্ট। চুলের জট ছাড়িয়ে, সাবান দিয়ে ধুয়ে সাইজ অনুযায়ী আলাদা আলাদা বান্ডিল করবি। এ বাবদও কিছু পাবি। বিড়ি খরচটা উঠে যাবে।’

বিড়ির কথা উঠতেই হাত পাতল তারাপদ। দুটো আয়েশি টান মেরে বলল, ‘চুলগুলো কী কাজে লাগে বলবি?’

‘পরচুলা বানায়। বিদেশেও নাকি যায়। আমি সব জানিও না।’

চুলের জট ছাড়ানোর কাজটা বেশ পছন্দ হল তারাপদর। রোজগারও আছে, সময়ও কাটবে। পরে অনেকবারই বিড়ি বা ঠোঙা বানানোয় হাত লাগাবার কথা ভেবেছে। কিন্তু মালতীর রণংদেহি মেজাজের সামনে পড়তে মন চায়নি। তা ছাড়া, আবার যদি ভালো না লাগে? এবার আর রেয়াত করবে না মালতী। হয়তো ঘাড় ধাক্বা দিয়ে বেরই করে দেবে। কী দরকার যেচে ঝামেলায় জড়ানোর! তার চেয়ে অনন্ত সময় ধরে জট ছাড়ানো ঢের ভালো। যেন মা-মেয়ের সঙ্গে অলিখিত প্রতিযোগিতা। নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার মরিয়া চেষ্টা। সামান্য হলেও কিছু টাকা তো দিচ্ছে সংসারে। তবে লাভ যৎসামান্যই। একবার কেনার পর বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতেই হয়। গ্রামগুলোও বেশি বড়ো নয়। গাড়ি ঠেলে দূরে যাওয়াও মুশকিল।

ইদানীং মালতীর আচরণ যেন অদ্ভুত! দূরছাইও করে আবার টাকাও নেয়। যেন ধার দিয়েছিল। টাকা অবশ্য মেয়ের হাতে দেয় তারাপদ! খামোখা সন্মুখ সমরে লাভ কী? তা হলেও, একটু সহানুভূতি পেতে মন চায়। শুনতে চায় সুবুদ্ধির প্রশংসা। আগেরই সেই মাখোমাখো ভাব না থাকলেও, প্রত্যাশা করে নরম সুর। মরুভূমি সবুজ না-ই হতে পারে, তা বলে কী মেঘের ছায়াটুকুও প্রাপ্য নয়? দু’ফোটা বৃষ্টিও কী বেশি চাওয়া হল? হাজার হলেও স্বামী তো! প্রত্যাশার ধারপাশও মাড়ায় না মালতী। মেজাজ রুক্ষতর। দিনগত পাপক্ষয়ে ক্লান্ত। তারাপদ হতাশ। নিজের কর্মকাণ্ডে অতিমনোযোগী। খেয়াল থাকে না, মরা নদীতে জোয়ার আসে না।

ঝুমুর যেন বৈশাখী বাতাস। খরা-মনে শান্তির প্রলেপ। মা ঘুমিয়ে পড়লে চুপিচুপি আসে। জট ছাড়াতে হাত লাগায়। ধুয়েও দেয়। তারাপদ বিশ্রাম নেয়। মেয়েলি হাতে কাজ এগোয় তরতরিয়ে। একদিন কাজ করতে করতেই বলল,

‘বাবা… আমাকে একটা জিনিস এনে দেবে?’

‘কী’? তারাপদর প্রশ্রয়। সারা জীবনে মেয়েকে দেওয়া হয়নি কিছুই। কাজ আর মদ খাওয়ার ব্যস্ততায় ফুরসতও মেলেনি! বিয়েটাও দিয়েছিল যত না মেয়ের জন্য, তার চেয়ে বেশি দায়মুক্ত হতে।

ভাঁজ করা একটা কাগজ এগিয়ে দিল ঝুমুর। তারাপদ দেখল পাতা জোড়া ক্রিমের বিজ্ঞাপন। সাত দিনেই বদলে যাবে ত্বকের রং! মেয়ে জুলজুল চোখে তাকিয়ে। মায়া হল তারাপদর। কত না স্বপ্ন মেয়েটার চোখে। ক্রিম লাগাবে, ফরসা হবে, বর নিয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি। গড়ে উঠবে সংসার, আসবে সন্তান, সার্থক হবে নারী জনম!

ভাবনার মাঝেই মাথা নীচু করে ঝুমুর বলল, ‘অনেক দাম জিনিসটার। পাড়ায় কারও কাছে নেই। তুমি…’

‘তুই ভাবিস না মা! আমি নিশ্চয়ই কিনে দেব।’

‘দুশো টাকা!’

দাম শুনে আঁতকে উঠল তারাপদ। এ সপ্তাহে দুশো টাকাই জুটেছে। মালতী নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করবে। না পেলে কী কাণ্ড বাধাবে কে জানে! যা হয় হবে, মেয়ের শখপূরণ আজ করবেই। কত আশা করে রয়েছে মেয়েটা! জিনিসটা পেলেই হাসিতে ভরে উঠবে মুখ! মেয়ের হাসি মুখকে গুরুত্ব দিয়েই ক্রিমটা কিনে ফেলল তারাপদ। ঝড়-ঝাপটা যা আসে আসুক। ঠিক সামলে নেবে।

 

বাড়ির কাছাকাছি এসে কান্নার আওয়াজ পেল তারাপদ। তবে কি জামাই এল? মেয়ে চলে যাবে বলে মালতী কাঁদছে? নিশ্চয়ই তাই । ভগবান সবাইকেই একসময় সুখের মুখ দেখান। এবার নিশ্চয়ই মেয়ের কথা মনে পড়েছে! হয় জামাইয়ের মত বদল ঘটেছে অথবা মা অসুস্থ হবার কারণে বউয়ের প্রয়োজন পড়েছে। দুটোই মেয়ের পক্ষে মঙ্গল। শ্বশুরবাড়ি গেলে অনেকটাই নিশ্চিন্তি। একটা পেট কমলে মালতীর ভারও খানিকটা লাঘব হবে। অসুবিধে হবে তারাপদর। মেয়ের কল্যাণে যে দু’বেলা জুটত, সেটা হয়তো জুটবে না। চলতে হবে বউয়ের মর্জিমাফিক। সে হোক, মেয়ের সুখের জন্য এটুকু সওয়াই যায়। শুধু ক্রিমটার জন্য মন খচখচ করল। জামাই নিতে এসেছে মানে ওটার আর প্রয়োজন নেই। ফেরত না নিলে খামোখা গচ্চা।

বাড়ি পৌঁছে তারাপদ অবাক। সারা পাড়া ভেঙে পড়েছে উঠোনে। পড়শিদেরও নিশ্চয়ই মন খারাপ। দেখতে যেমনই হোক, সরল ব্যবহারে মেয়েটা সকলেরই মন টেনে নেয়। তাই চলে যাবার আগে সবাই দেখা করতে এসেছে। তারাপদরও দেখতে ইচ্ছে করল মেয়েকে। শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে নিশ্চয়ই লজ্জা লজ্জা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। অথবা কান্না জুড়েছে মায়ের সঙ্গে। কান্না বড়োই সংক্রামক। কিছুতেই বাঁধ দেওয়া যায় না। তবে শুভক্ষণে কাম্য নয় একেবারেই। খামোখা অমঙ্গলের আহ্বান। মা-মেয়েকে সামলাতে এগিয়ে গেল তারাপদ।

‘ও কে ওখানে!’

দোরগোড়ায় বসে মালতী কাঁদছে। সামনে শুয়ে ঝুমুর।

‘ও ওরকম ভাবে শুয়ে আছে কেন?’ মাথায় কিছুই ঢুকল না তারাপদর।

মালতীর কান্নার তোড় হঠাৎই বাড়ল।

সেই কান্নাই তারাপদকে জানিয়ে দিল, ঈশ্বরের বিধান সকলের জন্য সমান নয়। কাউকে কাউকে তিনি পৃথিবীতে পাঠান শুধুমাত্র দুঃখভোগের জন্যই। নইলে বাপ-মাকে সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয়? আচমকাই তারাপদর পৃথিবী যেন থমকে গেল। বাতাস বইছে না, পাখি ডাকছে না, চোখের সামনে শুধুই অন্ধকার। হতভম্বের মতো বসে রইল কিছুক্ষণ। খানিক বাদে বুঝল, পৃথিবী চলছে আপন গতিতে, শুধু তার মেয়েটাই থেমে গিয়েছে।

‘আর সাতটা দিন, তারপরেই শাপমুক্তি।’

ঘুম থেকে উঠেই মাকে বলেছিল ঝুমুর! বাবা আনবে বিশল্যকরণী। দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল মালতী। সরল মেয়েটার জন্য বুক ফেটেছিল। গড়িয়ে পড়েছিল দু’ফোঁটা জল। সবাই শুধু বাইরেটাই দেখল, ভিতরটায় ভুলেও চোখ বোলাল না কেউ। দুঃখ চাপা দিতেই যে রাগ, বোঝাতেও পারল না কাউকে। সন্তানের ব্যর্থতার দায়ভার তো বাপ-মায়েরই। রাগ হয়, কষ্ট হয়, অনুশোচনায় জর্জরিত হয় মন। কিছু করার থাকলে সান্ত্বনা মেলে, নয়তো তীব্র আক্রোশ! একমাত্র মুক্তি আত্মপীড়নে। সেও বা কতক্ষণ? কাঁহাতক আর না খেয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজেকে কষ্ট দেওয়া যায়? তাই রাগ গিয়ে পড়ে আপনজনদের উপর। অকারণেই রুঢ় ব্যবহার করে ফেলে মেয়েটার সঙ্গে। স্বামী যদি সহমর্মী হতো, তা হলে হয়তো মনের ভার কিছুটা কমত। কিন্তু সে মানুষটাও দুর্ভোগ, দুর্দশায় অনুভূতিহীন। দুর্বিপাকে কি মানুষ পড়ে না? পড়লে আবার কাটিয়েও তো ওঠে। কিন্তু মানুষটার কোনও চেষ্টাই নেই। সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে নির্বিকার, নির্লিপ্ত। ইদানীং চেষ্টা অবশ্য করছে। কতদিন স্থায়ী হয় কে জানে! আঁচলে ঠোঁট চেপে বিছানা ছেড়েছিল মালতী। তবে ভালো লেগেছিল মেয়ের প্রতি বাবার সামান্যতম দায়িত্ব পালন। কিছু তো করুক!

 

খবরটা দিয়েছিল বারুইবাড়ির ছোটো-বউ। বাপের বাড়ি জয়নগরে। নিজের চোখে দেখে এসেছে জামাইয়ের নতুন বউ। দিল্লি থেকে বিয়ে করে দিন সাতেক হল ফিরেছে। বিশ্বাস করেনি ঝুমুর। ছোটো বউ যেন প্রস্তুত হয়েই ছিল। অন্যের দুর্ভাগ্যে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করার সুযোগ ছাড়তে চায়নি। মোবাইলে ছবি তুলে এনেছিল। ঝুমুরের ছবিও তুলল। সতিন দেখার ফাস্ট রিয়েকশন। ছবি দেখে চুপ মারল ঝুমুর। তারপর দৌড়। মালতী, তারাপদ দুজনেই কাজে। ফাঁকা বাড়িতে গলায় দড়ি দিল।

মুখে কথা জোগাল না তারাপদর। হাতে তখনও বিশল্যকরণী। বুক ঠেলে কান্না উঠতে চাইলেও, কাঁদল না। কেনই বা কাঁদবে? তেমন করে আর মেয়েকে ভালোবাসল কই যে, হারাবার অনুতাপ করবে? ঝুমুরের মাথার কাছে ক্রিমের কৌটোটা রেখে দাওয়ায় বসল। পুলিশ এল খানিক বাদে। লাশ চলে গেল লাশকাটা ঘরে। প্রতিবেশিরা দু’একজন গেল সঙ্গে। বাকিরা নিজ নিজ কাজে। শূন্য উঠোনে সন্তানহারা বাপ-মা একাকী ।

ঝুমুর ফিরল পরদিন। খাটে শুয়ে, ফুলের মালা পরে। পাড়ার লোকেরাই ব্যবস্থা করেছে। শ্মশানে যাওয়ার ডাক পড়ল তারাপদর।

‘কোথায় যাচ্ছিস মুখপুড়ি? ধার শোধ না করে এক পা-ও নড়তে পারবি না তুই’ , হাউহাউ কান্নায় বলে উঠল মালতী। যদি আটকানো যায়!

রক্ত চলকে উঠল তারাপদর! ঘষটাতে ঘষটাতে ঘরে ঢুকল। বেরিয়ে এল হাঁসুয়া নিয়ে! সবাই হতবাক। মেয়ের শোকে পাগল হয়ে গেল নাকি বাপটা?

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারাপদ পৌঁছে গেল মেয়ের শিয়রে। নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। হাসি পেল ঈশ্বরের লীলায়। মেয়েটাকে সামান্যতম রূপ না দিলেও, দিয়েছেন এক মাথা চুল। কোমর ছাড়িয়ে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। ক্ষিপ্র হাতে হাঁসুয়া চালাল তারাপদ। প্রায় গোড়া শুদ্ধ উঠে এল এক ঢাল চুল।

সেই চুলের গোছা হাতে চিৎকার করে উঠল তারাপদ,

‘ধার শোধ…’

 

 

আমার বয়ফ্রেন্ড অতিরিক্ত দুর্বল নারীদের প্রতি

আমার সমস্যা আমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে। আমার সঙ্গে তার পাঁচবছরের বেশি সময় ধরে সম্পর্ক। কিন্তু তার মধ্যে নারীদের প্রতি অতি মাত্রায় দুর্বলতা দেখতে পাই। ধরুন তাকে যদি কোনও পার্টিতে নিয়ে যাই, সেখানে সে আমার বান্ধবীদের প্রতি হামলে পড়ে। তাদের গল্পে কথায় ভুলিয়ে, পাটিতে মধ্যমণি হয়ে উঠতে চায়। আমার প্রতি বয়ফ্রেন্ড-এর আর মনযোগ থাকে না। কোনও কোনও সময় সে আমার বান্ধবীদের ফোন নম্বর জোগাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের সঙ্গে ফোনে গল্প করে। একথা হয়তো পরে আমি অন্য কারও মাধ্যমে জানতে পারি। একই ভাবে সে আমার কাজিনদের ব্যাপারেও যেন বেশি উৎসাহী। আমার বোনেরা মাঝেমধ্যে আড়ালে অভিযোগ করে তার ব্যাপারে। সে যেন অতিরিক্ত গায়ে পড়া। কী করে তার স্বভাব পালটাই বলে দিন।

অনেকেরই হয়তে মনে হতে পারে আপনি সন্দেহপ্রবণ৷ কিন্তু আমরা আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারছি৷ আপনার ধারণা ভুল নয়৷ আপনি অতিমাত্রায় পজেসিভ, তা-ও নয়৷ বিয়ের পর স্ত্রীরা স্বামীদের মনোযোগ চায়৷ সেখানে যদি আপনার স্বামী বারবার অন্য নারীদের প্রতি আগ্রহ দেখান, সেটা ভয়েরই কথা৷

আপনার স্বামীকে নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা অমূলক নয়৷তার সবটুকু ভালোবাসা মোটেই আপনার প্রতি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে না৷ এই ধরনের মানুষরা চরিত্র বদলায় না। আপনি আপনার পরিচিত মহলেই দেখছেন তার কর্মকাণ্ড, আপনার আড়ালেও তার মানে তিনি একই কাজ করে বেড়ান। এই মানুষের সঙ্গে জড়ালে, ভবিষ্যতে নারীঘটিত নানা  সম্পর্কে তার জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে। এর কারণ আপনার বয়ফ্রেন্ড এই কাজকে অর্থাৎ সহজেই মহিলাদের মন জয় করাকে বিশেষ কৃতিত্ব মনে করেন। আপনি তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিন, সে যদি এই স্বভাব না বদলায়, আপনার পক্ষে সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে হুমকিতে কাজ হবে বলে মনে হয় না, কারণ সে তার চরিত্রে কোনও পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক হবে বলে মনে হয় না।তআি মন প্রস্তুত রাখুন৷ প্রয়োজনে আড়ো কড়া পদক্ষেপ নিতে হতে পারে৷

এক অপরিচিত পুরুষ আমার স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট

সম্প্রতি পাঁচমাস হল আমার বিয়ে হয়েছে। আমাদের লভ ম্যারেজ। কিছুদিন হল একটি ছেলে নাছোড়বান্দা হয়ে  আমার স্ত্রীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাইছে। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটিয়ে বসব। মাসে দুটো রবিবার আমরা, বউয়ের বাপের বাড়ি লাঞ্চে যাই। প্রথম তিনমাস ওখানে আমরা শুধু চারজনই একত্রিত হতাম। আমরা দুজন এবং বউয়ের মা-বাবা। কিন্তু গত তিনমাস থেকে ওনারা ওনাদের পাশের বাড়িতে আসা নতুন একটি দম্পতিকে নিমন্ত্রণ করতে শুরু করেছেন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ওই দম্পতিকে খুবই স্নেহ করেন এবং ওদের সঙ্গে অনেক জায়গায় বেড়াতেও যান। কিন্তু ছেলেটি আমার স্ত্রীয়ের সঙ্গে খোলাখুলি ফ্লার্ট করে এবং ও যে আমার স্ত্রীকে পছন্দ করে সেটা পরিষ্কার ওর চোখেমুখে ফুটে ওঠে। আমার স্ত্রীকে দেওয়ার মতো কমপ্লিমেন্ট যেন ওর ফুরোয় না এবং সকলের মাঝেও ওকে আলাদা করে ঘরের কোণে নিয়ে গিয়ে গল্প করতে থাকে। আমি চাই না স্ত্রী আমাকে ভুল বোঝে কিন্তু পুরো ব্যাপারটা আমাকে ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড অস্থির করে তুলেছে। আমি কী করব?

আপনার উচিত, মনের ভিতরের সব আশঙ্কা বউয়ের সঙ্গে শেয়ার করা।  হয়তো ব্যাপারটা কিছুই নয়। স্বাভাবিক ভাবেই হয়তো ছেলেটি আপনার স্ত্রীয়ের সঙ্গে গল্প করে এবং আপনার স্ত্রীয়ের কাছেও পুরো ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার নিজের মানসিক এই স্থিতি নিয়ে বেশিদিন আপনার পক্ষে চলা সম্ভব নয়। আপনার স্ত্রী হয়তো কিছুই বুঝতে পারছেন না কিন্তু অন্য ছেলেটির উচিত নয় আপনার স্ত্রীকে আলাদা করে ঘরের নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া। হয়তো ছেলেটি সরাসরি আপনাকে ওপেন চ্যালেঞ্জ জানাবার চেষ্টা করছে। কোনও মানুষই পারফেক্ট নয়, আপনি হয়তো ছেলেটির বউয়ের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কখনও করতেন না। সবথেকে ভালো হয় যদি শ্বশুর-শাশুড়িকে পুরোটা খুলে বলেন এবং আপনাদের সঙ্গে যাতে ওই দম্পতির নিমন্ত্রণের দিন ম্যাচ না করে সেই অনুরোধ তাদের কাছে করুন।

 

 

 

 

 

স্বপ্নের ভেনিস

গ্র্যান্ড ক্যানাল

এই তো সামনে ভেনিসের গ্র্যান্ড ক্যানালে!

কতদিন ধরে শব্দ দুটো শুনে আসছি, কতদিন স্বপ্ন দেখেছি, বসে আছি ভেনিসের বিশ্বখ্যাত গন্ডোলায়। শেষ পর্যন্ত পুত্র ঋতঙ্করের কল্যাণে তারই স্পন্সরশিপে হতে পারল আমার ভেনিস ভ্রমণ। কিন্তু মনে একটা আশঙ্কা ছিলই– শেষ পর্যন্ত ‘ইউরো ভিজিটেড’-এর অভিজ্ঞতা হবে না তো? প্রশ্ন জাগাবে না তো, ‘ইজ দিস ভেনিস’?

না। ভেনিসে পৌঁছেই মনে হল অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে অপেক্ষা করে আছে ভেনিস। জলের রহস্য আর স্থলভাগের মনোহারিণী রূপ নিয়ে ভেনিস অনন্যা। ভেনিস আপনাকে দেবে চমক, উত্তেজনা আর বিস্ময়।

এই তো সামনে ভেনিসের গ্র্যান্ড ক্যানেল। প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা, গভীরতা মাত্র পাঁচ মিটার, গড় প্রস্থ প্রায় পঞ্চাশ মিটার। এর বুকের ওপর ভাসছে নানা কিসিমের জলযান– ভাপোরেত্তি, গন্ডোলা। দু’পাশে জল ঘেঁষে, অপরূপ ফুলের সমারোহ নিয়ে চমৎকার চেয়ার টেবিল পাতা। মনোহারি সব ইটারি আর ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁ। গিজগিজ করছে পর্যটক। খাও, দাও, গান শোনো। ওই দ্যাখো, হিস্টোরিয়া রিগাটার ক্লক টাওয়ারে উড়ছে পাখাঅলা সিংহ। ভেনিসের ঐশ্বর্যের প্রতীক। ইতিহাসের ভেনিস, শিল্পের ভেনিস, রোমাঞ্চকর জলযাত্রার ভেনিস আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

কীভাবে ভেনিস, ‘ভেনিসহল ?

ইতিহাসবিদ এবং ভ্রামণিকেরা বলবেন ভেনিস পৃথিবীর সুন্দরতম শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি বলব ভেনিস পৃথিবীর সুন্দরতম বন্দর শহরের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। ব্যতিক্রমী এর চেহারায়, শহর পরিকল্পনায়, স্রেফ জলের ওপর দীর্ঘশতাব্দী ধরে ভেসে থাকার স্থাপত্য ভাবনায়। একদিন ছিল ছোটো ছোটো  দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা আঁশটে গন্ধঅলা জনপদ। মেছেলদের হই-হল্লা আর নেশাখোরদের গানে-গাঁজালিতে মেতে থাকা মনুষ্যাবাস। মধ্যযুগে, কীভাবে এই  দ্বীপগুলি বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের ছোঁয়ায় এসে বদলে গেল, হয়ে উঠল ঝলমলে, তাক লাগানো, ডিউক-শাসিত ‘দোজে’–সে এক রোমাঞ্চকর কাহিনি।

নবম শতকে রোম-এ তখন ফ্রাঙ্ক শাসকদের আধিপত্য। ভেনিস কিন্তু তাদের অধীনতা মেনে নেয়নি। গির্জা, ব্যাসিলিকা, সুরম্য প্রাসাদ, শিল্পপ্রদর্শশালায়, ভেনিস তখন একাই একশো। অহংকার করার মতো তার অনেক ঐশ্বর্য। ‘সেরিনিসিমা’ নামে খ্যাত ভেনিস হয়ে উঠল সমুদ্র বাণিজ্যের প্রধান মার্কোপোলো-র শহর। আদপে একটি গোলকধাঁধা ভেনিসকে যুক্ত করেছে ১১৭টা  দ্বীপ, ৪০০ সেতু, ১৫০টি খাল।

Travel Venice

জল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে ভেনিস

সর্বত্র জল, জল আর জল। এই জল সোহাগাভরে স্থলকে ঘিরে রেখেছে। পৃথিবীর বিস্ময় এই শহর-বন্দর-জেটি দেখে অবাক হতে হয়। এ কী করে সম্ভব? সম্ভব হয়েছে। ক্যানালগুলোর (স্থানীয় ভাষায় ‘রি’-Rii) ওপরে একদা ছিল শ’য়ে শ’য়ে দ্বীপ। এগুলিকে নতুন করে গড়া হল। জলের ওপর শক্তপোক্ত ভাবে ধরে রাখার জন্য ব্যবহার করা হল হাজার হাজার ‘পাইলন’ বা থাম– যেগুলি অনেক গভীরে শক্ত মাটির ওপর পোঁতা হল।

আগেই বলছি এই  দ্বীপগুলি মধ্যযুগে বাইজানটাইন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন ভাবে গড়ে উঠতে লাগল রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্তিত্ব হয়ে। তখন ইতালির মূলভূমি ‘লঙ্গোবার্ড’দের দ্বারা অধ্যুষিত। ভেনিস তখন মূলভূমির প্রভাবের বিপরীতে প্রবল শক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

পনেরো-ষোলো শতকে আক্রমণকারী তুর্কীদের হারিয়ে দিয়ে ভেনিস হয়ে উঠল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, সে ডেকে নিয়ে এল ইতালির বিখ্যাত সব ছবি-আঁকিয়েদের। এলেন বেলিনিস, কার্পাচিও, জর্গিওনে, টিটিয়ান, টিন্টোরেটো এবং ভেরোনাস। অথচ পাঁচ থেকে আট শতকের মধ্যে বারবার লুঠ হয়ে গিয়েছিল ভেনিস– হূন গথ, বার্বারিয়ানদের হাতে। অস্ত গিয়েছিল এর যাবতীয় গরিমা। তো সম্পূর্ণ নতুন এক শাসনব্যবস্থা চালু করে দিল ভেনিস– স্থানীয় ভাষায় ‘দোজে’ (মূল নাম ‘ডুচে)।

পনেরো-ষোলো শতকের নতুন ভেনিসের গৌরব ঝলমল করতে থাকে। প্রবাদপ্রতিম ‘ভেনিসিয়ান মার্চেন্ট’দের রমরমা তখন। ভেনিস হয়ে ওঠে প্রাচ্যদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের মূল সেতু। তখনই শুরু হয় গ্রেট ‘বিল্ডিং বুম’ –বড়ো বড়ো অট্টালিকা, মহার্ঘ্য প্রাসাদ তৈরির ধুম পড়ে যায়। কিন্তু ১৮৬৬-তে এসে আর একা রইল না ভেনিস। ইতিহাসের প্রয়োজনেই যেন মিশে গেল রোমের সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে।

লঞ্চ থেকে নেমেই চোখ ছানাবড়া। মিলান থেকে ভেনিস এসেছি লঞ্চে। সে এক বিস্ময়-যাত্রা। লঞ্চের ডানদিকে বিচিত্র অট্টালিকার মেলা। সেগুলির স্থাপত্য শৈলী দেখে হতবাক আমরা। রঙের শোভাযাত্রা। ভেনিসে নেমে আরেক বিস্ময়। ডানদিকে অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্র। সমুদ্রের ভেতরে ঢুকে আসা খাঁড়িতে জলযানের মেলা। ওয়াটার ট্যাক্সি, বড়ো বড়ো লঞ্চ, গন্ডোলা চালকদের হাঁকডাক। একটা একটা নাম না-জানা জেটিতে বিদেশি পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। বাঁয়ে, অনেকদূর পর্যন্ত চোখ চালিয়ে দেখলাম শিল্প-সুষমায় অলংকৃত সেতুগুলি আমাদের আহ্বান জানাচ্ছে। সারি দিয়ে, জলের প্রায় গা ঘেঁষে অভিজাত হোটেল রেস্তোরাঁ। সারা বিশ্বের পর্যটকদের লাইভ চ্যাট আর খানাপিনা চলছে।

রূপকথার গন্ডোলা

ট্রাভেল এক্সপি-তে দেখেছি। একদিকে উঠোনো, সরু সরু মনোহারি জলযান। এবার সামনাসামনি। একটার পর একটা গন্ডোলা চটকদার সেতুর তলা দিয়ে ঢুকছে। একেকটা গন্ডোলায় সাত আটজন নানান ভঙ্গিমায় বসে দাঁড়িয়ে, হেলান দিয়ে। ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, আফ্রিকা, ইন্ডিয়া –নানাদেশের নানান হাতনাড়া আর উল্লাস।

ভেনিসে এসেছি অথচ গন্ডোলায় চড়ব না?

জেটিতে স্টার্টিং পয়েন্টে দাঁড়ালাম। কিন্তু গন্ডোলা চালকদের কাঠকাঠ কথায় মনটা দুমড়ে গেল। আধঘন্টার জন্য ৮০ ইউরো! আমাদের মুদ্রায় প্রায় সাত হাজার টাকা। দু’মিনিটের কিন্তু কিন্তুর পর ভাবলাম জীবনে একবার স্বপ্নভ্রমণে এসেছি, গন্ডোলা না চড়াটা বোকামি হবে।

উঠে বসলাম টিকিট কেটে। গন্ডোলা চলল আদিম জলনালির সরু পেট ফুঁড়ে, কারুকার্যময় সেতুগুলোর তলা দিয়ে। দুপাশে আকাশছোঁয়া সব মধ্যযুগীয় প্রাসাদ– দাঁড়িয়ে আছে স্রেফ জলের বুকে। নীচ থেকে ওপরের দিকে তাকালাম। ইতিহাস যেন ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। নিশ্চুপ প্রাসাদের জানালায় কি কোনও চোখ আমাদের দেখছে? একটার পর একটা বাঁক পেরোচ্ছি, প্রাসাদ-আকীর্ণ গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ছি, চোখ বড়ো বড়ো করে গিলছি বিচিত্র-দর্শন প্রাসাদ, এক এক বাঁকে জল থেকে ওপরে উঠে সরু সরু সিঁড়ি বেয়ে শহর ভেনিসের হূদপিণ্ডে পৗঁছে যাবার হাতছানি, নানা রঙের নানা মানুষের বিস্ময়মাখা চিৎকার, হুল্লোড়। গন্ডোলা চালকের (নির্দিষ্ট বাঁকগুলোয়) পাশের প্রাসাদের গায়ে পা ঠেকিয়ে গন্ডোলার মুখ ঘুরিয়ে নেবার কসরত। খচাখচ ছবি উঠছে, হারিয়ে যাচ্ছে পথের চকিত রেখা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের একচিলতে আলো। তারপর ঘোর শেষ।

শহর ভেনিসের পথে পথে

এরপর শহর পরিক্রমা। কাকে ছেড়ে কাকে দেখব? প্রথমে দেখেছি বারোক রীতিতে বানানো, চার্চ অফ স্কালজি। মন কেড়ে নিয়েছে। অন্যদিকে পালাজেও (প্রাসাদ) পাসেরো, ডাইনে ফন্ডাও ডি চার্চি (চার্চ)। পালাজেও পাসেরোর পেটের মধ্যে আর্ট মিউজিয়াম– গালোরিয়া ডি আর্তে মোদের্না’ আবার প্রাচ্য দেশীয় শিল্পের মিউজিয়াম– মুসেও ডি আর্তে ওরিয়েন্টাল। বাঁদিকে বহুশ্রুত রিয়ালটো ব্রিজ, ব্রিজ অফ সাইজ-এর কাছে দু’দুটো ভেনিসিয়ান প্রাসাদ– পালাজেও লোরেদান, ডি ফার্গেটি।

হাঁ করে দেখতে হয়, চমকে যেতে হয়, ইতিহাসের শ্বাস পড়ে গায়ে। রিয়ালটো ব্রিজ তৈরি করেছিলেন খ্যাতনামা স্থপতি আন্তোনিও ডি পন্তি। আহা! সামনেই যে ভেনিসের সিগনেচার স্থাপত্য– ব্যাসিলিকা ডি সানমার্কো। কথিত, এটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল ৮৫০ বছর। স্থাপত্যরীতি অতশত বুঝি না, তবে এর কসমোপলিটান ইমেজটি মনে গেঁথে গেল।

বাইজানটাইন প্যাটার্ন-এর পেঁয়াজাকৃতি বাল্ব, গম্বুজ, গ্রিক রীতির ক্রস লে-আউট, গথিক রসেট-উইন্ডো, মিশরীয় মার্বেলের তৈরি দেয়াল। ভেতরে, প্রায় ৮৫০০ বর্গমিটার জুড়ে মোজাইক– ডোম অফ জেনেসিস, ডোম অফ হোলি স্পিরিট।

পা চলছে না আর। আগস্ট মাসের সূর্যও বড়ো ক্ষমাহীন। একেবারে রাগি চোখ যেন ঝলসে দিচ্ছে। সকালে, রাতে ঠান্ডা, দুপুরে বেশ গরম। কত দেখব? দিন চারেক থাকতে পারলে ধীরে সুস্থে দেখা যায়। তাও দেখলাম পিয়াজা সান মার্কো, (পিয়াজার অর্থ স্কোয়ার বা চত্বর) ডানদিকে আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম। ৮২৮ সালে ভেনিসে আনা হয়েছিল সেন্ট মার্ক ডি এভানজেলিস্ট-এর দেহাবশেষ, মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে চুরি করে। উরিববাস! বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সোনার বাহার দেখবার মতো। গথিক স্পায়ার, রোমান রাউন্ড আর্চ এবং সবশেষে নয়ের শতকে তৈরি দোজে প্রাসাদ। স্থপতি মাসেনে, রিজ্জো এবং দা পন্তের জাদু ছোঁয়ায় ষোড়শ শতকে সম্পূর্ণ দ্যুতিময় দোজে প্যালেস।

Travelogue Venice

দোজে প্যালেস দেখতে ভুলবেন না যেন

নবম শতকে তৈরি হয়েছিল দোজের প্রাসাদ। এর নির্ভার, হালকা গঠনশৈলী, একতলায় গথিক আর্চ বা খিলান, বারান্দা, চারদিক-খোলা প্রশস্ত, চক্বর মারার জায়গা– আপনাকে চমৎকৃত করবে। একটু সময় নিয়ে আসুন, তাড়াহুড়ো নয়। সিলিং-এ বা প্রাসাদের ওপরের দিকটায় ঢেউ খেলানো সাদা এবং গোলাপি নক্সাসমেত এই প্রাসাদ মনোরম, পর্যটক প্রিয়। এর প্রাঙ্গণে দৈত্যাকার সিঁড়ি (Scala De Giganti), সিনেট হল সিংহের মুখ বা বোকে দি লিওনে (Bocche de leone), সালা দেল দেই ত্রেকাপি,যেখানে অতি গোপনে রাজদ্রোহী বা বিদ্রোহীদের বিচার এবং প্রাণদণ্ড হতো (Sala Del Scrutinio)বা বিচারশালা আজও পৃথিবীর বিস্ময়।

 

দীর্ঘশ্বাসের সেতু

চলে আসুন Bridge Of Sighs বা দীর্ঘশ্বাসের সেতু দেখতে। সেতুটি দোজে প্যালেসকে যুক্ত করেছে। ষোড়শ শতকে তৈরি, ডিজাইন করেছিলেন আন্তোনিও কন্তিনি, সতেরো শতকের ব্যারোক রীতিতে (স্থাপত্যবিদ্যার পাঠকেরা বা বেত্তারা ভালো জানেন)। তবে, কোনও রোমান্টিক নায়ক নায়িকার (লোনাভালার মতো) দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় না এখানে। এখানে কান পাতলে শোনা যায় রাজদ্রোহী, বিদ্রোহী বা কোন না কোন অপরাধে দণ্ডিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ন্যায়ে হোক, অন্যায়ে হোক, ইতিহাস বড়ো বিচিত্র।

আকাদেমিয়া দি পিতোরিয়ে স্কালতোরি

ভেনিসে থাকবেন অথচ ‘Accademia dei Pittori দেখবেন না? তাহলে আপনার জীবন বৃথা। ১৭৫০ সালে তৈরি, হেড কোয়ারটার্স ছিল সান মার্কোর গিয়ার্ডিনেত্তিতে। পিয়াজেতা ছিলেন এর প্রথম ডিরেক্টর। পরে ডিরেক্টর হন স্বনামখ্যাত তিওপোলো, ১৭৫৬ সালে।  ১৭০০ সালে এটি উঠে এসেছিল গ্র্যান্ড ক্যানালের ধারে চারিতা কনভেন্ট-এ (Convento delca Carita)। শুরু হয়েছিল চিত্রকলা শিক্ষণের স্কুল হিসেবে। পরে কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম আর্ট গ্যালারি হয়ে ওঠে। গ্যালারির প্রথম চিত্রসংগ্রহশালা উৎসর্গ করা হয়েছে ১৪ শতকের ভেনিসিয়ান স্কুলের নামে। যাঁরা চিত্রশিল্পী বা ছবির কদর বোঝেন, তাঁদের কাছে এটি স্বর্গরাজ্য। আমাদের মতো মুগ্ধ দর্শকদের কাছে এ যেন মায়া সাম্রাজ্য। প্রধান কাজ বা সৃষ্টিগুলির মধ্যে রয়েছে পাওলো ভেনেজিয়ানের Coronation of the Virgin, লরেঞ্জো ভেনেজিয়ানোর Mystic Marriage of Saint Catherine এবং Annuciation Alterpiece. রয়েছে জ্যাকোবেলো ডেল , আন্তোনিও ভিভারিনির শিল্পকর্ম।দু’নম্বর প্রদর্শশালায় এরকম অসংখ্য মণিরত্ন প্রদর্শিত আছে ২১টি কক্ষে। একসঙ্গে এত দেখা অবশ্য খুবই কষ্টকর।

সান্তামারিয়া গ্লোরিওসা দেই ফ্রারি

এখানে রয়েছে পৃথিবীর বিরলতম শিল্পসংগ্রহ। দেখতে পারেন তিশিয়ান-এর বিখ্যাত– মাস্টারপিস। একটি উঁচু বেদির পেছনে, Madonna di Cs Pesaro

পিয়াজালে রোমা

ভেনিসে ঘুরতে ঘুরতে অসুবিধেয় পড়লে পৌঁছে যান পিয়াজালে রোমা-তে। ১৯৩৩ সালে তৈরি Ponte della Liberta-র সেতু পেরিয়ে। এখান থেকেই আপনি পেয়ে যাবেন শহরের আশেপাশে অনেকদূর পর্যন্ত বাস যোগাযোগ। Fondamenta De Santa থেকে আপনি ৩০ মিনিটে পৌঁছে যাবেন গ্র্যান্ড ক্যানালে ধরে Vaporetti (দ্রুতগামী জলযান) নিয়ে বিখ্যাত Piaza San Marco-তে। কাছেই Rail Road Station. ১৮৪৬ সালে উদ্বোধন হয় এই স্টেশনটির। শান্তা লুসিয়া নামের ষোড়শ শতকের এক সন্ত-এর নামে এটি উৎসর্গীকৃত হয়। তৈরি করতে লেগেছিল ৭৫০০০ পাইলন বা থাম।

পিয়াজা সান মার্কো

প্রথমে ছিল ঘাসের গালিচা পাতা ভূখণ্ড। ভেতর দিয়ে চলে গিয়েছে একটা খাল। দুদিকের প্রান্তদেশে ছিল দুটো ছোটো গির্জা– সান তেওদোরো, সান জেমিনিয়ানো। কিন্তু পরের দিকে এই জায়গাটাই নতুন সাজে অলংকৃত হয়ে, হয়ে উঠল পৃথিবীর জীবন্ত স্কোয়ার বা চত্বরগুলির অন্যতম। শহরের ধর্মীয় প্রাণকেন্দ্রও বটে। এর

ওপেন-এয়ার পার্লারে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে পারেন, ফুর্তি করতে পারেন, পুরোনো দিনের ঐতিহাসিক কাফেতে কফির স্বাদ নিতে পারেন। কেনাকাটাও করতে পারেন, তবে এখানে বেশ কিছু স্থাপত্য দেখবার মতো, তারিফ করার মতো। এর বেল টাওয়ার এবং ক্লক টাওয়ার ইতিহাস-প্রসিদ্ধ। কথিত, যখন Clock Moors-বা Terrace-এর ঘণ্টাগুলি বাজাতো তখন Clock Tower-এর ঘণ্টাগুলিও একসঙ্গে বেজে উঠত।

হাঁ, কষ্ট হলেও ছেড়ে যাবেন না বিব্লিওটেকা নাজিওনাল মারাসিয়ানা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগ্রহে মহার্ঘ্য এই লাইব্রেরি। পনেরো শতকের গ্রিক মানবতাবাদী পণ্ডিত কার্ডিনাল বেসারিওনে বিপুল

সংখ্যায় দুষ্প্রাপ্য বই দিয়ে সমৃদ্ধ করেন এই লাইব্রেরি। লাইব্রেরির নকশা করেছিলেন জ্যাকপো স্যানসোভিনো। এই বাড়িতে এখন দুটি মূল্যবান দর্শনীয় স্থান- বিব্লিওটেকা নাজিওনালে মার্সিয়ানা এবং আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম। গ্রিক এবং রোমান স্থাপত্যের মহাসম্মিলন।

দ্বীপের নাম মুরানো

শিল্পকীর্তি অনেক দেখলেন, ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। আজ বিশ্রাম নিন। পরের দিন চলুন অন্য ভ্রমণে। চলুন মুরানো গ্লাস-এর  দ্বীপ

‘মুরানো’-তে। সকাল সকাল জেটিঘাট থেকে টিকিট কেটে উঠে পড়ুন লঞ্চে। অতীতে এর নাম ছিল Amurianum দশম এবং একাদশ শতকে হুনদের আক্রমণে দিশেহারা, ছত্রভঙ্গ হয়ে আলতিনোর মেইনল্যান্ড থেকে লোকেরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল এই দ্বীপে। কালক্রমে এটি হয়ে দাঁড়ায় Major Lagoon Centre. তেরো শতকের অক্লান্ত পরিশ্রমে Glass Blowing-এর কাজ করতে করতে শরণার্থীরা মুরানোকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

পনেরো শতকে এসে সারা বিশ্বকে চমকে দেয় এখানকার তৈরি Barovier Cup, মুরানো দ্বীপটি ঘুরে দেখতে হাতে সময় রাখবেন। বাসের টিকিট connecting লঞ্চের টিকিটের টাইমিং ঠিকমতো দেখে নেবেন। মুরানো গেলে অবশ্যই হাঁটবেন Canaled Degli Angeli-র ধার ঘেঁষে এবং নদী Rio Dei Vetrai-র তীরভূমি বরাবর। গ্লাস মিউজিয়ামটিতে দেখতে ভুলবেন না গ্লাস ফ্যাক্টরির লাইভ ডেমো। অবাক হওয়ার মতো সব নির্মাণ হতে শুরু করবে আপনার সামনে।

বুরানো

এরপর চলুন বুরানো দ্বীপে। যদিও আপনার এনার্জি প্রায় শেষ। কিন্তু বৈচিত্র্য আপনাকে এনার্জি দেবে। নতুন ল্যান্ডস্কেপ, ওয়াটারস্কেপ আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে। ভেনিস বেড়াতে গেলে মুরানোর সঙ্গে বুরানোর টার্গেট-টি আপনাকে রাখতেই হবে। তা নাহলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে অনেক কিছুই। মূলত জেলেদের বাস ছিল বুরানোতে। চারটে ছোটো ছোটো দ্বীপের সমষ্টি। পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতকে আলটিয়াম থেকে পালিয়ে আসা লোকজনই এই  দ্বীপের আদি বাসিন্দা। হূন সম্রাট আটিকার আক্রমণে ঘরবাড়ি ছেড়ে এঁরা পালিয়ে আসেন এই  দ্বীপে। তারপর জীবন সংগ্রাম।

মুরানো যদি তার গ্লাস ওয়ার্কের জন্য বিখ্যাত হয়ে থাকে, বুরানো খ্যাতি অর্জন করেছে তার Lacework-এর জন্য। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এই Lacework আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে।

এবার এই অফুরন্ত সৗন্দর্য, শিল্প কীর্তি, হই হই জলবিহার, রহস্যময় দ্বীপভূমির হাতছানিকে বিদায় জানিয়ে আপনার বাড়ি ফেরার পালা। আমাদের তো আরেকটি বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল– ইতিহাসের রোম। আপাতত ভেনিসকে বিদায় জানিয়ে রোম-এ যাওয়া।

মহিলাদের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি

একটা সাম্প্রতিক সার্ভেতে দেখা গেছে, ভারতে ১৪ থেকে ১৭ বছরের মেয়েদের মধ্যে, অন্তত ২০ শতাংশের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে। বয়স বাড়লে এই ঘাটতির কারণেই বাড়ছে নানা শারীরিক সমস্যা। এর কারণ হল প্যাকেজেড এবং ফাস্ট ফুড নির্ভর জীবনশৈলী। আমরা অনেকেই এখন পেট ভরানোর জন্য এই ধরনের খাবারের উপর নির্ভর করি। এতে শরীর প্রযোজনমতো পুষ্টি পায় না। চাহিদামতো ক্যালসিয়ামেরও যোগান দেওয়া হয় না শরীরকে। ফলে দাঁত, নখ, হাড়ের উপর পড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব।

হাড়ের ক্ষয়, ব্রিটল বোন্স ও সহজে ফ্র্যাকচার হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে থাকে মধ্য বয়সে পেঁছোনোর আগেই। অস্টিয়োপোরোসিস-এর সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীরে ব্যথা, মাসল্ ক্র্যাম্প হওয়া, ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় করা এসবই এই সমস্যার সাইড এফেক্টস। তখন ওষুধের উপর ভরসা করতে হয় ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে।

তাই উচিত হবে শুরু থেকেই ডায়েট-এ পরিবর্তন আনা এবং ক্যালসিয়াম-এ সমৃদ্ধ খাবারদাবার দৈনিক খাদ্য-তালিকায় শামিল করা।

ক্যালসিয়ামের ঘাটতির আরও কিছু কিছু বয়সজনিত কারণে হয়। মেনোপজের সময় অর্থাত্ ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সে পেঁছে যখন এস্ট্রোজেন হরমোন-এর স্তর কমতে থাকে, তখন ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয় শরীরে। এছাড়া হরমোনাল ডিসঅর্ডার-এর কারণে হাইপোথাইরযেইজম-এর মতো সমস্যার শিকার হলেও, ক্যালসিয়ামের ভযাবহ ঘাটতি দেখা দেয়।

মহিলারা বেশির ভাগ সময়টা কিচেন-এ কাটান অথচ তারা জানেন না, এই কিচেনেই মজুত রয়েছে এমন অনেক জিনিস, যা ডায়েট-এ শামিল করলে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টস্ গ্রহণ করতে হবে না।

  • রাগি : এই দানাশস্য-টিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে। রাগি দিযে তৈরি রুটি খেলে ক্যালসিয়ামের প্রযোজন অনেকটাই মিটবে। ১০০ গ্রাম রাগিতে প্রায় ৩৭০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।
  • সোয়াবিন : পর্যাপ্ত মাত্রায় ক্যালসিয়াম পাবেন সোয়াবিনে। ১০০ গ্রাম সোয়াবিনে ১৭৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। তাই এটি অবশ্যই রাখুন খাদ্য-তালিকায়।
  • পালংশাক : ১০০ গ্রাম পালংশাকে থাকে ৯০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। তবে পালংশাক রান্না করার আগে এতে অক্স্যালিক অ্যাসিডের মাত্রা কমাতে ভাপিয়ে নেবেন।
  • ডাবের জল : নারকেল বা ডাবের জলও দারুণ উপকারী। প্রতিদিন একটা করে ডাবের জল খাওয়া দরকার। এছাড়া ভিটামিন ডি-এর উত্স সূর্যকিরণ, হাড়ের ক্যালসিয়ামের শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। প্রতিদিন সকালের রোদটা গায়ে লাগাবেন অন্তত ২০ মিনিট।
পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব