টিন-এজ লঞ্জিরি

বয়ঃসন্ধির সময়টাতে যখন স্তনবিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, তখনই আপনার কিশোরী মেয়েটির দিকে আপনাকে বিশেষ সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। দেহসৗষ্ঠব গঠনে Lingerie অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা হিসেবে আপনাকেই ওর জন্যে তৈরি করে দিতে হবে সঠিক ইনারওয়্যার চয়নের সচেতনতা।

এসময় অনেক মেয়েই যে-কোনও Lingerie পরে নেয় যে-কোনও পোশাকের সঙ্গে। অন্তর্বাস তো আর বাইরে থেকে দেখা যাবে না, সুতরাং কীই বা এসে যায়!

প্রথমেই বলি এই ধারণাটা ভুল। কারণ হল প্রত্যেকটি পোশাকের সঙ্গে আলাদা অন্তর্বাসের কিছু যৌক্তিকতা আছে। সেটা পরিষ্কার ভাবে আগে বুঝে নেওয়া দরকার।

ধরা যাক নতুন ইভনিং গাউনের সঙ্গে মেয়েটি তার চিরাচরিত ব্রা পরেছে। অথচ তার পরা উচিত ছিল প্যাডেড ব্রা। এই ক্ষেত্রে পোশাকটা বেশ বেমানান লাগবে। তাই মায়েদের বিশেষভাবে সচেতন হওয়া উচিত। টিনএজ কন্যাটি সঠিক অন্তর্বাস চয়ন করেছে কিনা, এব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন। নিজেও আপডেটেড থাকুন আর আপনার টিনএজার কন্যাকেও আপডেটেড রাখুন।

টি-শার্ট ব্রা – এই ধরনের ব্রা-তে সেলাইটা দৃশ্যমান নয়। অল্প প্যাডিং থাকে, যাতে টি-শার্ট পরলেও স্তনের আকার সুডৗল থাকে। আরামদায়ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা ঠিকঠাক ফিটিং-ও দেয় পোশাকটিকে।

স্ট্র্যাপলেস ব্রা – এই ধরনের ব্রা-তে স্ট্র্যাপ থাকে না। স্ট্র্যাপলেস ড্রেসের সঙ্গে ট্যাংক টপ, হল্টারনেক প্রভৃতি পোশাকের সঙ্গে স্ট্র্যাপলেস ব্রা-ই পরা উচিত। এগুলি কেনার সময় খেয়াল রাখবেন ব্রা-এর পিছনের অংশটি যেন চওড়া হয়। তা না হলে ব্রা সঠিক জায়গায় থাকবে না এবং স্তনের পজিশনও সঠিক হবে না। এর ফলে ফিটিং বিসদৃশ হবে।

পুশ আপ ব্রা – টিনএজার মেয়েদের অনেকেরই ধারণা, এই বয়সে পুশআপ ব্রা-এর কী প্রয়োজন? কিন্তু কিছু কিছু পোশাকের সঙ্গে ফিগার টানটান দেখাতে হলে, এই ধরনের ব্রা অপরিহার্য। এই ধরনের ব্রা-তে জেলযুক্ত কাপ্স থাকে যা স্তনের আকারে দৃঢ়তা ও ভরন্ত ভাব নিয়ে আসে। নানা ডিজাইন, কালার, প্রিন্ট ও লেস ওয়ার্ক করা পুশআপ ব্রা এখন বাজারে পাওয়াই যায়।

ওয়্যারলেস ব্রা– এই ধরনের ব্রা অত্যন্ত আরামদায়ক। যদি আপনার কন্যাটি আন্ডার-ওয়্যারার ব্রা পরে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব না করে, তাহলে ওয়্যারলেস ব্রা দিন ওকে৷ এটি যে-কোনও টপ, ড্রেস, সোয়েট শার্ট-এর নীচে পরা যায়।

প্যাডেড ব্রা – যাদের স্তনের আকার ছোটো, তাদের জন্য প্যাডেড ব্রা হল পারফেক্ট চয়েস। লো-কাট ড্রেস-এ যেখানে ক্লিভেজ দৃশ্যমান থাকে, সেই সব পোশাকের জন্য অনায়াসে প্যাডেড ব্রা ব্যবহার করা যায়। এর সাহায্যে অপুষ্ট স্তনও সুডৗল দেখতে লাগে।

মিনিমাইজার ব্রা – স্তনের আকার যাদের বড়ো, তারা নিজেদের শেপলি দেখানোর জন্য মিনিমাইজার ব্রা ব্যবহার করতে পারেন। এই ব্রা তাদের কাপ সাইজ কমিয়ে, লুক প্রেজেন্টেবল করে তোলে।

রিমুভেবল প্যাডিং ব্রা – এই ধরনের ব্রা-তে একটা পকেট থাকে, যাতে প্রয়োজনে প্যাডিং করা যায়। এই ব্রা-এর সুবিধা হল আপনি এটা প্যাড সমেত বা প্যাড ছাড়াও যখন যেমন প্রয়োজন ব্যবহার করতে পারেন।

সিলিকন প্যাডিং – এটি সরাসরি চামড়ার উপর স্টিক করে দেওয়া যায়। এটি ত্বকের মতোই নরম। এটা পরার পর মনেই হয় না কোনও ফ্যাব্রিকের ব্রা পরা হয়েছে। নিজস্ব চামড়ারই অনুভূতি দেয়। ব্যাকলেস ড্রেস, সেন্টার কাট ড্রেস-এর সঙ্গে স্বচ্ছন্দ্যে ক্যারি করা যায় এই ব্রা।

মনে রাখুন

  • Lingerie সবসময় ব্র্যান্ডেড কেনা উচিত, এর ফলে যিনি এটি বিক্রি করছেন তিনি প্রফেশনাল গাইডেন্স দিতে পারবেন।
  • পোশাকের সঙ্গে রং মিলিয়ে ন্যুড, ব্ল্যাক, হোয়াইট-এর পাশাপাশি প্যাস্টেল শেডস্-এর বেশ কয়েকটি ব্রা কিনে রাখা উচিত।
  • ব্রা-এর ফ্যাব্রিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে ত্বক খুব সংবেদনশীল হয়, ফলে শরীরের সংস্পর্শে থাকা জিনিসটির কোয়ালিটি যাচাই করে নেওয়া উচিত, ত্বকের সমস্যা এড়াতে।
  • ফ্যাশনেবল ও টেকসই-এর ব্যাপারটাও একই সঙ্গে মাথায় রাখা উচিত। এর ফলে আপনার মেয়ে ভেতর থেকে কনফিডেন্ট আর বাইরে থেকে সুন্দর হয়ে উঠবে।

আবেগপ্রবণ সঙ্গীকে সামলাবেন কীভাবে?

ইমোশনাল মানুষ সংখ্যায় কম হলেও আছেন এই সমাজে। এদের সঙ্গে সারাজীবন কাটানো খুব কঠিন মনে হতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। কখন কী কারণে ইমোশনাল হয়ে পড়বেন আবেগপ্রবণ লোকেরা, তা বুঝে ওঠা মুশকিল। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে সংবেদনশীলতা থাকবে অবশ্যই, কিন্তু তা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গেলে সমস্যা তৈরি করে। দাম্পত্য সম্পর্কে গভীরতা বজায় রাখতে গেলে পরস্পরের মতামতকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, ঠিক তেমনই সম্মান এবং ভরসা করতে হবে। সত্যি এটাই যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তখনই মধুর হবে, যখন একজন অন্যজনকে স্পেস দেবে।

অনেক দম্পতি পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকেন, কোয়ালিটি টাইম দেন, কিন্তু কখনও আবার পরিস্থিতি বদলে যেতেও দেখা যায়। যদি কারও জীবনসঙ্গী বেশি ইমোশনাল হন, তাহলে তিনি চান তার সঙ্গী সর্বদা যেন ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকে। ব্যক্তি স্বাধীনতা তেমন গুরুত্ব পায় না তার কাছে। তাই, আজীবন তাকে মানিয়ে নেওয়াও মুশকিল হয়ে ওঠে। কখন কোন বিষয় সঙ্গীর অপছন্দ হবে, তা বুঝে উঠতে না পারলে মনোমালিন্য, ঝগড়া ইত্যাদির আবহ তৈরি হতে পারে।

মনোবিদ ডা. সখুজা এ বিষয়ে জানিয়েছেন, বেশি সংবেদনশীল মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন মানিয়ে চলা অনেকের ক্ষেত্রে মুশকিল হয়। তাই, সংবেদনশীল মানুষটির সঙ্গী যদি ধৈর্য, বুদ্ধি এবং সংবেদনশীলতা দিয়ে পরিস্থিতি না সামলাতে পারেন, তাহলে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আসলে, বেশি সংবেদনশীল মানুষ বাস্তবের থেকে বেশি কল্পনাপ্রবণ চরিত্রের হন। তাই, আদর, ভালোবাসার ঘাটতি কিংবা তাকে গুরুত্ব কম দিলেই বিপত্তি। তার তখন মনে হতে পারে, সঙ্গী বা সঙ্গিনী অবহেলা করছে তাকে। এর থেকে তিনি ইনসিকিয়োর ফিল করেন। তাই, এমন মানুষের সঙ্গে বুঝেশুনে চলতে হবে।

কথার গুরুত্ব

আপনার সঙ্গী অথবা সঙ্গিনী যদি বেশি সংবেদনশীল হন, তাহলে তার সমস্ত কথা গুরুত্ব সহকারে শুনুন। তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীর মনের ভাব। আর সেই মনের ভাব অনুযায়ী ব্যবহার করুন তার সঙ্গে। যখনই আপনি অবসর পাবেন, তার সঙ্গে বসে কথা বলুন হাসিমুখে এবং অনুভব করুন তার সংবেদনশীলতা। আসল কথা, কথার মাধ্যমেই জেনেবুঝে নিতে হবে সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীর সুখ-দুঃখের কোমল জায়গাটা।

সত্যিটা জানার চেষ্টা করুন

যদি আপনার পার্টনার সবসময় আবেগপূর্ণ কথা বলতে থাকেন এবং আপনার উষ্ণ সান্নিধ্য চান, তাহলে কথা বলেই জেনে নিন এমন হাবভাবের কারণ। যদি তিনি সহজে মুখ খুলতে না চান, তাহলে ভালোবাসা দিয়ে বোঝান যে আপনি তার পাশে আছেন সর্বদা। স্লঁরা সাধারণত একটু ডিমান্ডিং প্রকৃতির হন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা সঙ্গীর অ্যাটেনশন ও সময় ছাড়া কিছুই চান না। তিনি কোনও সমস্যায় পড়লে, আপনি বন্ধুর মতো তাঁর পাশে দাঁড়ান, সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করুন। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে অন্তত ‘সমস্যা কেটে যাবে’ বলে মনোবল জোগান। আপনি এসব যদি সঠিক ভাবে করতে পারেন, তাহলে দেখবেন, তিনি অনেক সিকিয়োর্ড ফিল করছেন এবং সমস্যায় পড়লে কিংবা দুঃখ হলে, কথা লুকিয়ে না রেখে, আপনার কাছে সত্যি কথা উগ্রে দেবেন।

সান্নিধ্য বাড়ান

পার্টনার-কে আপনি যত সান্নিধ্য দেবেন, ততই আপনি তার মনের ভাব বুঝতে পারবেন সহজে। আপনার উষ্ণ সান্নিধ্য তাকে ভরসা জোগাবে, মনের জোর বাড়াবে এবং আবেগ কমাতে সাহায্য করবে। আর যত তিনি আপনার ভালোবাসা অনুভব করবেন, ততই তার ইনার পাওয়ার বাড়বে এবং তখনই যদি তাকে কল্পনা আর বাস্তবের তফাতটা বোঝাতে পারেন, তাহলে সুফল পাবেন। কারণ, ভালোবাসা ভরসা এবং বিশ্বাস জোগায়। আর বিশ্বাস তৈরি হলেই তিনি আপনার কথা মতোই কাজ করবেন।

কেন বেশি আবেগপ্রবণ?

আপনার পার্টনার কেন বেশি আবেগপ্রবণ, সেই কারণ জানার চেষ্টা করুন। খোঁজ নিয়ে কিংবা কথা বলে তার কোনও বিষণ্ণ অতীত আছে কিনা তা জানার চেষ্টা করুন। ছোটো থেকে তিনি কতটা সামাজিক কিংবা কতটা বাস্তববোধ রয়েছে তার, তা জানার চেষ্টা করুন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছোটো থেকেই অনেকে ঘরকুনো, বাড়ির বাইরে পা রেখে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হননি কিংবা অভিভাবকরা কেউ তাকে বাস্তব জ্ঞান দান করেননি সঠিক ভাবে। শুধু তাই নয়, সাহিত্য এবং সিনেমার অতি ভক্তরাও অনেকসময় বেশি কল্পনাপ্রবণ কিংবা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। সাহিত্য এবং সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের পার্থক্যটা তাকে সেভাবে কেউ বুঝিয়ে দেননি হয়তো কিংবা তিনি নিজেও বোঝেন না। তাই, এই বেশি আবেগপ্রবণ মানুষগুলোর আবেগের সঠিক কারণ জেনে প্রয়োজনে তাকে মনোবিদের কাছে নিয়ে গিয়ে কাউন্সেলিংকরান। কারণ, অতি আবেগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কুফলদায়ী।

ধৈর্য ধরুন

আবেগপ্রবণতা একদিনেই কমিয়ে দেওয়া যায় না, সময় লাগে। প্রথমে তাকে ভালোমন্দের তফাত বোঝান ভালোবাসা দিয়ে। তার অতি আবেগের প্রকাশে বিরক্তি কিংবা রাগ হলেও, উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্য নিয়ে তার মাথায় হাত রাখুন। ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিন। আপনার প্রতি তার বিশ্বাস এবং ভরসা বাড়ানোর উদ্যোগ নিন। ধৈর্য নিয়ে এসব করলে দেখবেন, আপনার পার্টনার-এর অতি আবেগ কমেছে এবং আপনাদের দাম্পত্যজীবন স্বাভাবিক হচ্ছে ধীরে ধীরে।                                                                                                        

ওভার এক্সারসাইজে ক্ষতি

এক্সারসাইজ করাটা সুস্বাস্থ্যের জন্য একান্ত জরুরি। কিন্তু আধুনিক জীবনশৈলীতে আমরা এতটাই ব্যস্ত যে, ব্যায়ামের জন্য সময় থাকে না। অথচ ব্যায়াম করার সুফল হল, এটা শরীরকে তরতাজা করার সঙ্গে সঙ্গে, মনকেও চাপমুক্ত করে। ফলে পরেরদিন আপনি কর্মক্ষেত্রে যেতে পারেন সম্পূর্ণ ফ্রেশ মুড-এ।

প্রত্যেকের শরীরই প্রতিদিন অল্প মাত্রায় হলেও সক্রিয়তার প্রয়োজন বোধ করে। অঙ্গ চালনা এই জন্যই একান্ত জরুরি। শরীরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমগুলোও এর ফলে সঠিক ভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু ভুললে চলবে না, ব্যায়ামেরও একটা পদ্ধতি আছে, যে-পদ্ধতি ভুল হলে শরীরে লাভের চাইতে ক্ষতি বেশি হবারই সম্ভাবনা থাকে।Over Exercise করার কুফল জানুন৷

সঠিক এক্সারসাইজ-এর সুফল

 আমাদের হৃৎপিণ্ডের সক্রিয়তা নির্ভর করে আমাদের কায়িক শ্রমের উপর। যারা কম পরিশ্রম করেন, দেখা গেছে তাদেরই হার্টের সমস্যা বেশি হয়।

ব্যায়ামে পর্যাপ্ত ঘুম

গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তারা রাত্রে ভালো ঘুমোন। এর কারণ শারীরিক পরিশ্রম করার ফলে শরীরের সার্কেডিয়ান রিদম সচল থাকে। এর ফলে আপনিও সক্রিয় থাকবেন এবং সারাদিনের কাজকর্মে অ্যাক্টিভ থাকবেন, আর রাতের ঘুমটাও ভালো হবে।

এনার্জি বাড়ায় ব্যায়াম

অনেকেই ভাবেন ব্যায়াম করলে শরীরের এনার্জি ক্ষয় হয়। অথচ বাস্তবে এর ঠিক উলটোটা ঘটে। এক্সারসাইজ করার ফলে আপনি দিনভর এনার্জেটিক থাকতে পারবেন। কসরত করার ফলে কিছু হরমোন নিসৃত হতে শুরু করে, যা আমাদের এনার্জি লেভেলকে বাড়াতে সাহায্য করে।

ব্যায়ামে বাড়ে আত্মবিশ্বাস

আপনার শরীরের অত্যধিক মেদ ঝরিয়ে আপনার ফিগারকে পারফেক্ট শেপ দিতে সাহায্য করে ব্যায়াম। এর ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, শরীরের শক্তপোক্ত গঠন আপনাকে আত্মবিশ্বাস দেয়। যে-কোনও ইতিবাচক ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলতে সাহায্য করে।

অতিরিক্ত ব্যায়ামের কুফল

ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটির কোনও বিকল্প নেই। জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিন ব্যায়াম-কে। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় কেউ কেউ ব্যায়ামের ব্যাপারে খুব অবসেসড হয়ে যান। অতিরিক্ত ব্যায়াম করতে শুরু করেন, আর তাতেই যা ক্ষতি হবার হয়। জেনে নিন অতিরিক্ত ব্যায়ামে কী কী সমস্যা হতে পারে।

  • মহিলাদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মেনোপজ হওয়াটা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এটা যখন স্বাভাবিক নিয়মে না হয়ে, অকালে এই পরিস্থিতি তৈরি হয় –বুঝতে হবে সমস্যা অন্যত্র। তিনমাস পিরিয়ড না হওয়ার কারণ কোনও কোনও সময় ওভার এক্সারসাইজ। ব্যায়ামের কারণে যে-এনার্জি শরীরে তৈরি হচ্ছে, তাকে সাপোর্ট করার মতো ক্যালোরি-যুক্ত ডায়েট গ্রহণ না করা হলে, মূলত অপুষ্টিজনিত কারণে পিরিয়ডে তার প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত ব্যায়াম ও ক্যালোরির ঘাটতি শরীরে ফার্টিলিটি প্রবলেমও সৃষ্টি করতে পারে। বস্তুত মেয়েদের যৗন ইচ্ছার অভাব ঘটতে পারে। মেদবহুল মহিলারা অতিরিক্ত ব্যায়াম করে অনেক সময়ই এই বিপত্তি ডেকে আনেন।           
  • ওবেসিটি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোন-এর মাত্রায় বৃদ্ধি হয়। এটাই পিরিয়ডের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং অনেক সময় ইনফার্টিলিটির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কম বয়সি মহিলারাও এক-এক সময় মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়াম করার ফলে এস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি হয়, যা তাদের ঋতুচক্রকে প্রভাবিত করে এবং সন্তানধারণে সমস্যা তৈরি করে
  • পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করে হেভি ওয়েট ট্রেনিং সেশন। এতে শুক্রাণুর সংখ্যায় তারতম্য ঘটে। শুক্রাণু কমে যাওয়ায়, ইনফার্টিলিটির সমস্যা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বেশি ওজন নিয়ে এক্সারসাইজ করা ক্ষতিকারক
  • অনেক সময় পুরুষরা অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে ক্লান্তি অনুভব করেন। শুক্রাণুর ঘাটতিও এই ক্লান্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে। ফলে এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি
  • হেভি রেজিসটেন্স ট্রেনিং অনেক সময় আপনাকে সুফল দেওয়ার পরিবর্তে বড়ো সমস্যার সম্মুখীন করতে পারে। এতে সরাসরি টেস্টোস্টেরন হরমোনের উপর প্রভাব পড়ে। ফলে পুরুষের উর্বরতা ক্ষমতা হ্রাস পায়। এর ফলে স্ত্রীয়ের গর্ভধারণে সমস্যা তৈরি হয়।

তাই নিয়মিত ব্যায়াম করার পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন। ডায়েট চার্ট ফলো করে ব্যায়াম বজায় রাখুন। সঠিক ক্যালোরি আপনার শরীরকে ঠিকমতো ক্রিয়া করতে সাহায্য করে। এনার্জির অভাবে শরীরে ক্লান্তি অনুভব করলেই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন। পুরুষরা ব্যায়াম করার রেজিম ফলো করুন, কিন্তু নিয়মিত স্পার্ম কাউন্ট চেক করান। মহিলাদেরও ফার্টিলিটি টেস্ট ও হরমোন টেস্ট করাতে হবে মাঝে মাঝেই। এক্সারসাইজ আপনার জীবনশৈলীকে সুন্দর করতে সাহায্য করে। কিন্তু নিয়ম মেনে ব্যায়াম করুন।

স্লিপ অ্যাপনিয়া

ঘুম মানুষের এক অতি আবশ্যক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া। তাই, ভালো ঘুম যেমন সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে, ঠিক তেমনই ঘুমের ঘাটতি নানা রোগের জন্ম দেয়। অতএব, ঘুম নিয়ে অবহেলা নয়। আর যদি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে কী হতে পারে কিংবা সতর্ক থেকে চিকিৎসা করালে কী সুফল পাবেন, জেনে নেওয়া দরকার৷

Sleep Apnea কী?

নিদ্রাকালীন শ্বাসব্যাঘাতকে বলা হয় ‘Sleep Apnea’। এটি ঘুম কম হওয়া এবং নাক ডাকার সমস্যা। নানা কারণে এক বা একাধিকবার ঘুমের মধ্যে শ্বাসব্যাঘাত ঘটলে তা বিপদসংকেত হিসাবে ধরে নিতে হবে।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ কী?

এক নয়, স্লিপ অ্যাপনিয়ার একাধিক লক্ষণ প্রকাশ্যে আসে। যেমন– নাকডাকা, দিবানিদ্রা, স্মৃতিভ্রম, ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কত রকমের?

স্লিপ অ্যাপনিয়ার তিনটি ধরন আছে– অবস্ট্রাক্টিভ, সেন্ট্রাল এবং মিক্সড। অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ওএসএ খুব কমন ফর্ম। বংশগত কারণে, ওজন বাড়লে, অ্যালার্জি থাকলে, শ্বাসনালি সংকুচিত হলে অথবা টনসিল বাড়লে অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার কবলে পড়তে হয়। সিএসএ বা সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়ার কবলে পড়লে শ্বাসপ্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটে। এটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা। সংখ্যায় কম হলেও, সিএসএ-র কারণে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এছাড়া, রয়েছে মিক্সড স্লিপ অ্যাপনিয়া। এটি অবস্ট্রাক্টিভ এবং সেন্ট্রাল-এর মিশ্রণে ঘটে। তাই, সবরকম কারণে সমৃদ্ধ এই ফর্ম।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কোনও বিশেষ কারণ আছে কি?

ধূমপান, মদ্যপান, দীর্ঘদিন রাত জাগা কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

এই রোগে আক্রান্ত হলে ক্ষতিকারক কী কী সমস্যায় পড়তে হয়?

স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হলে ব্লাড প্রেসার এবং ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে। রোগী যদি আগে থেকেই হাইপারটেনসিভ কিংবা ডায়াবেটিক হয়ে থাকেন, স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হলে ওষুধ খেয়েও এসব রোগ আয়ত্তে না থাকার সম্ভাবনা থাকবে। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হলে দিনের বেলাতেও যেহেতু ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসে মাঝেমধ্যে, তাই গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কমতে পারে স্মৃতিশক্তি। এছাড়া, কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়েও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। কারণ, কথা বলতে বলতে কিংবা কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন মাঝেমধ্যে। কমতে পারে দৃষ্টিশক্তিও। তাই, স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হলে সময়মতো চিকিৎসা করানো আবশ্যক। তা যদি না হয়, তাহলে মস্তিষ্ক সহ শরীরের ভাইটাল অরগান্স-এ অক্সিজেন পৌঁছোবে কম, ফলে নানারকম সমস্যা কিংবা অসুখের জন্ম নেবে। ত্বক রুক্ষ হতে পারে, চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়তে পারে, মেজাজ খিটখিটে হতে পারে, প্রাণোচ্ছলতা কমবে, যৗনমিলনে অনীহা তৈরি হবে, ফ্যাটি লিভার, হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিস, ব্রেন স্ট্রোক, কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ প্রভৃতিতে আক্রান্ত হতে পারেন। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও কমতে পারে শরীরে। শুধু তাই নয়, দৌড়োনোর সময় কিংবা সাঁতার কাটার সময় দম বন্ধ হয়ে হঠাৎই মৃত্যু ঘটতে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসা করা হয় কীভাবে?

প্রথমে একটা ফরমাল স্লিপ স্টাডি করা হয়। এই স্টাডি হোম-বেস্ড অথবা ক্লিনিক্যালি দু’রকম-ই করা হতে পারে। এরপর রোগী কী ধরনের স্লিপ অ্যাপনিয়া-য় আক্রান্ত তা দেখে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ‘পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার’ বা পিএপি। এ এমন এক ডিভাইস, যা ঘুমের সময় আপার এয়ারওয়ে-কে সচল রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া রয়েছে ‘ইএনটি সার্জিক্যাল প্রসিডিওর’। পলিপ কিংবা নাকের ভেতরের হাড় বেড়ে যাওয়ার কারণে যদি স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে এই সার্জারির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়। সেইসঙ্গে, রয়েছে আরও নানারকম চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে সবার আগে দেহের ওজন সঠিক পরিমাণে এনে এবং জীবনশৈলীর পরিবর্তন ঘটিয়ে সমস্যার প্রাথমিক সমাধান করা হয়। এক্ষেত্রে, ধূমপান এবং মদ্যপান বন্ধ করা বাধ্যতামূলক।

চিকিৎসক হিসাবে কী পরামর্শ দেবেন সাধারণ মানুষকে?

দেখুন, রোগের লক্ষণ দেখলেই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা করানো জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগে ভোগেন যতজন, তারমধ্যে মাত্র দুই শতাংশ মানুষ সঠিক সময়ে এসে চিকিৎসা করান। তাই বেশিরভাগ রোগীই হঠাৎ চরম বিপদে পড়েন, এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যায়। তাই, সবাইকে আরও সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে। বিশেষ করে মহিলাদের সাবধান থাকা উচিত আফটার মেনোপজ। কারণ, পোস্ট মেনোপজাল উয়োম্যান-রা ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’-য় (ওএসএ) আক্রান্ত হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর বংশানুক্রমিক স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে সবার আগে সতর্ক থাকতে হবে ওই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের। এদের যদি বিপদের ঝুঁকি এড়াতেই হয়, তাহলে রাত জাগা বন্ধ করে সাত থেকে আট ঘন্টা ভালো ভাবে ঘুমোতে হবে, ধূমপান এবং মদ্যপান বন্ধ করে রুটিন চেক-আপ করাতে হবে।

সিলিং সাজান মনের মতো

নতুন বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সিলিং-এর ডিজাইন, রং ইত্যাদি নিয়ে অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। আবার খুব বেশি ডিজাইনের বিকল্পও মনকে ধন্দে ফেলে দেয়। অথচ মন চায় বাড়ির সিলিং সুন্দর করতে কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য বা জ্ঞান আমাদের কাছে থাকে না।

বাজারে রোজই নতুন ফ্যাশনের সংযোজন ঘটছে। আগেরটা থেকে পরেরটা যেন আরও ভালো। কিন্তু সকলেরই ব্যক্তিগত পছন্দ রয়েছে যেটা সকলের নিজের নিজের রুচিরই প্রকাশ।

আগেকার দিনে অর্থবান ব্যক্তিদের বাড়ি অথবা ছবির পরদায় ডিজাইনার সিলিং চোখে পড়ত। ফলস সিলিং সে-সময়ও ছিল কিন্তু তা ছিল সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে। কিন্তু ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষও এই ধরনের সিলিং অ্যাফোর্ড করতে পারছেন। এই ধরনের সিলিং-এ নতুন সংযোজন হয়েছে লাইটের। আগের মতোই পিওপি অর্থাৎ প্লাস্টার অব প্যারিস-এর যুগ এখনও আছে তবে নানা রঙের আলোয় সিলিং-এর সৗন্দর্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আসুন জেনে নিই সিলিং-এর ডিজাইন সম্পর্কে।

ট্র্যাডিশনাল ডিজাইন

সাদামাটা সিলিং এখন আর কেউ পছন্দ করছেন না সুতরাং হালকা ডিজাইন-কে এখন অনেকেই প্রায়োরিটি দিচ্ছেন। অফ হোয়াইট এবং হালকা হলুদ রং-এর সিলিং এখন ধীরে ধীরে ফ্যাশনে ফিরছে এবং নতুন ডিজাইনের লাইট এতে লাগানো হচ্ছে। ইলেকট্রিক আইটেমের ভ্যারাইটি এখন বাজারে প্রচুর।

ড্রইংরুমের সিলিং প্লেন বা হালকা রঙের হলে তাতে নানা ধরনের লাইট লাগানো যাবে। সাধারণত ঘরের ঠিক মধ্যিখানে একটা বড়ো ল্যাম্প বা ঝাড়লণ্ঠন সিলিং থেকে ঝোলানো দেখতে ভালো লাগে এবং চার কোণে এলইডি বাল্ব ঘরের সৗন্দর্য বাড়াবে। ঘরের আকার অনুযায়ী আলোর সংখ্যাও বাড়ানো যেতে পারে।

ন্যাচারাল ডিজাইন

ফলস সিলিং-এর চল যখন পুরোপুরি শুরু হয়নি তখন ঘরের সৗন্দর্য বাড়াবার জন্য ছবি বা পোস্টার দিয়ে দেয়াল ও সিলিং সাজাবার চল ছিল। প্রাকৃতিক দৃশ্যের পোস্টারই ব্যবহার হতো বেশি যাতে নীল আকাশ, ঝরনা, পাহাড়, নদী, ফুল ইত্যাদির অলংকরণ চোখে পড়ত।

সিলিং-কে ন্যাচারাল লুক অনেক ভাবেই দেওয়া যায়। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের উপর। ট্রে-সিলিং-এর মাধ্যমে এখন অনেকেই ঘরের ছাদ ডেকোরেট করছেন।

জিওমেট্রিকাল ডিজাইনিং

প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কাস্টমার ঝোঁকেন জিওমেট্রিকাল ডিজাইনের সিলিং-এর দিকে। এই ধরনের ডিজাইন ঘরের শোভা বাড়িয়ে সাধারণ ঘরকেও আকর্ষণীয় করে তোলে।

এই ডিজাইনের মধ্যে বিভিন্ন আকারের ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, সমান্তরাল রেখা, সার্কল ইত্যাদি হয়ে থাকে এবং যে-দূরত্ব বা গ্যাপ রাখা হয়, সেগুলো পুরো মাপজোখ করেই রাখা হয়। এর মধ্যে পছন্দ অনুযায়ী লাইট লাগানো যেতে পারে। রং-এর পছন্দও নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী করা সম্ভব। তবে ইন্টিরিয়র ডিজাইনারদের মতে খুব ডার্ক কালার ব্যবহার করলে কিছুদিন পর রঙের পরত খসতে আরম্ভ করে সুতরাং হালকা রং ব্যবহার করাটাই এই ক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের হবে।

ক্লাসিকাল ডিজাইন

সিলিং-এ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র যেমন সানাই, ঢোলক, হারমোনিয়াম, বীণা ইত্যাদি আকৃতির অলংকরণও মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে তবে এর সংখ্যা খুবই কম। আর খুব কম এই ধরনের ডিজাইন দৃষ্টিগোচর হয় বলে অতিথিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেশি। তবে এই ডিজাইনের সঙ্গে লাইটের ব্যবহার খুব মানানসই হয় না।

অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ডিজাইনও চোখে পড়ে যেমন ডোকরার শিল্প, পোড়ামাটির কাজও সিলিং এবং ঘরের দেয়ালের সৗন্দর্য বাড়ায়। মার্কেটে এর বিশাল রেঞ্জ সহজলভ্য।

স্টাইলিশ ডিজাইন

স্টাইলিশ ডিজাইনের সিলিং-এ আলো এবং রঙের যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত বড়ো ড্রইংরুম বা বেডরুমের জন্য এর ব্যবহার উপযুক্ত।

ড্রইংরুমের মধ্যে একটা বড়ো ঝাড়লণ্ঠন এবং চারপাশের কোণায় চারটে ছোটো ঝাড় লাগানো যেতে পারে যেমনটা হোটেলে বা কর্পোরেট অফিসগুলিতে দেখতে পাওয়া যায়। নিজের পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইন বানানোও যেতে পারে আবার তৈরি অবস্থাতেই কিনতেও পাওয়া যায়।

অনলাইন-এর মারফতও এই ধরনের সিলিং কেনা যেতে পারে।

রোমান্টিক ডিজাইন

এই ধরনের ডিজাইন মূলত নব-দম্পতিদের প্রধান পছন্দ। বেডরুমের সিলিং সাজাতে এবং ঘরের পরিবেশ রোমান্টিক করে তুলতে এই রকমের ডিজাইন বেছে নেওয়া যেতেই পারে। গোলাপি রং এবং গোলাপফুলের ঝাড় সিলিং এবং দেয়াল অলংকৃত করে। আলোর রং-ও গোলাপি রাখা হয়। এই ক্ষেত্রে অনেক সময় ওয়ালপেপারও ব্যবহার করা হয় যেটা কিনা ঘরে ঢোকামাত্র রোমান্সের মুড তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে যেখানে দম্পতিরা একা একটি ফ্ল্যাট বা বাড়িতে থাকেন সেখানেই এই ডিজাইন কার্যকরী হতে পারে। একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতিতে এই রোমান্টিক মুড নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

 ওজন কমাতে কাঁচকলা

 

ওজন কমাতে চান ? খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন কাঁচকলা।

কাঁচকলার ফাইবার অনেকটা সময় পেট ভরিয়ে রাখে। এটি আঁশযুক্ত হওয়ায়, মেদ কমাতে সাহায্য করে।

বস্তুত কাঁচকলার অনেক গুণ। এটি শুধু যে আয়রনের যোগান দেয় তা নয়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্যেও কাঁচকলা উপকারী। আঁশযুক্ত হওয়ায় রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। ভিটামিন বি৬ গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করে টাইপ-টু ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

কাঁচকলাতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন ৪,৭০০ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম গ্রহণে, হৃদরোগের ঝুঁকি কনে যায়। তবে পটাসিয়াম সবার জন্য নিরাপদ নয়। উচ্চ রক্তচাপ অথবা কিডনির রোগে আক্রান্ত রোগীদের পক্ষে তাই কাঁচকলা খাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।
কাঁচকলা আঁশযুক্ত সবজি হওয়ায় এটি খুব সহজে হজম হয়। কাঁচকলা পেটের ভিতরের দূষিত ব্যাকটেরিয়া দূর করে দেয়।কাঁচকলায় থাকা ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাস দেহের হাড় মজবুত এবং হাড় ক্ষয় থেকে রক্ষা করে।

কাঁচকলা দিয়ে মুখরোচক খাবার বানাতে চান যাঁরা, তাঁদের জন্য রইল এই সুস্বাদু রেসিপি।

কাঁচকলার কচুরি

উপকরণ – ১ কাপ ময়দা, ১ বড়ো চামচ মাখন, ১টা কাঁচকলা, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলা, ১/২ ছোটো চামচ আমচুর, ১/২ বড়ো চামচ ঘি, ভাজার জন্য তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী – কাঁচকলা সেদ্ধ করে নিন। খোসা ছাড়িয়ে চটকে নিন। ময়দা ও মাখন অল্প নুন দিয়ে মেখে নিন। কড়ায় ঘি গরম করে সমস্ত মশলা দিয়ে কষতে থাকুন। এতে চটকানো কাঁচকলাটা দিয়ে পুর বানান। এবার ময়দা থেকে লেচি বানিয়ে পুর ভরে বেলে নিন। কচুরি ডিপ ফ্রাই করুন। ধনেপাতার চাটনি ও সস দিয়ে পরিবেশন করুন।

জয়ের শিখরে

বীর বাহাদুর রাণা

‘নমস্কার। পর্বতারোহী সংঘের বার্ষিক সভা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে। আপনারা একটু  ধৈর্য ধরুন। আমাদের আজকের সভার প্রধান অতিথি বিখ্যাত পর্বতারোহী অমৃতেন্দু মিত্র অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছোবেন। তার পরই আমরা সভার কাজ শুরু করব।’

সুন্দরী অল্পবয়সি ঘোষিকাটি মঞ্চের ডানদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। হলের মধ্যে পিন পতনের শব্দ হলেও বুঝি শোনা যাবে। এয়ার কন্ডিশনারের কৃত্রিম ঠান্ডা আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ আগেই হলে পৌঁছে, নিজের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বসে পড়েছিল রিনা। রিনা মল্লিক, কামেট শিখরে অভিযানকারী দলের সদস্য।

হলটা এখনও মোটামুটি ফাঁকাই। চেনাশোনা দু-চারজন রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। ঘাড় ঘুরিয়ে এসবই দেখছিল রিনা। হলে ঢোকার দরজাটা অল্প ফাঁক করে ঢুকে এল মন্দিরা যোশী। অতীতে বহু স্মরণীয় অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই সাহসী মহিলার নাম। এখন একটু বয়স হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চলাফেরায় তেজ দেখলে সেকথা কে বলবে?

রিনাকে দেখেই উল্লসিত হয়ে উঠলেন মন্দিরা। একগাল হেসে সৗজন্যের হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি কেবল তোমাকে জয়ী হতে দেখতে এসেছি রিনা। ওরা যখন বলল, পর্বতারোহণের ইতিহাস থেকে কলঙ্কজনক অধ্যায়টাকে ওরা মুছে ফেলতে চায়, তখনই আসতে রাজি হয়ে গেলাম। খানিকটা দেরি হয়তো হল, কিন্তু তোমার প্রাপ্য সম্মানটা তো ওরা দিতে চাইছে! ভুল তো মানুষ মাত্রেই হয়!’

মন্দিরা যোশীর আন্তরিক হাসিমুখটা দেখে মন ভরে গেল রিনার। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই, রিনা যেন এক বছর আগের এক অপ্রিয় অতীতে ফিরে গেল। পাহাড়ে তখন সন্ধ্যা নামছে। হাড়ের মধ্য দিয়ে ঢুকছে কনকনে ঠান্ডা। পোশাকের পর পোশাক চাপিয়েও সামলানো যাচ্ছে না শৈত্যের আগ্রাসন।

বিকেল পাঁচটা। কামেট শিখরে বেস ক্যাম্প ফেলেছে দশ সদস্যের পর্বতারোহী দল। একটু আগেই ডাক পড়েছে পাশের রান্নাঘরের টেন্টে। খাবার রান্না মোটামুটি শেষ। আড়ম্বর তো নেই কিছু। অতএব সেখানে বসে খেতে খেতেই পরের দিনের অভিযানের রূপরেখা তৈরি করে ফেলা হবে। এটাই নিয়ম। কেউ স্পষ্ট করে না বললেও সকলেই জানে। পর্বতে সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়ি। এমন নিরালা, নির্বান্ধব পরিবেশে বেশিক্ষণ জেগে থাকার প্রশ্ন নেই। চারদিকে কেবলই ধু-ধু বরফ। তার আড়ালে দিগন্তও ঢাকা পড়ে গেছে। আলো যত পড়ে আসে, ততই রহস্যময় হয়ে পড়ে সেই বরফের ময়দান। যেমন রহস্যময়, তেমনই ভীতিপ্রদ। দেখতে দেখতে ক্রমে সেই ভয়ও একঘেয়ে হয়ে যায়।

বরফের চাদর পেরিয়ে সকলেই কিচেন টেন্টে গিয়ে হাজির হল। টিমটিমে আলোর খুব সামনে দুটি মাথা ঝুঁকে রয়েছে। তাদের একজন নগেন্দ্র রাই। তার হাতে টোপো শিট। সেটিকেই বারবার তিনি খুঁটিয়ে দেখছেন। কারণ, খাওয়াদাওয়ার পর তাকেই অভিযাত্রীদের চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করতে হবে।

রিনা টেন্টের পর্দা সরিয়ে ঢুকে চারদিকে চোখ ফিরিয়ে অন্যান্য সদস্যদের দেখল একবার। কিচেন টেন্টের একেবারে কোণে শেরপা তামাং, বনরোত, লুসাইরা রাতের খাবারদাবার তৈরি করছে। বিউটেন গ্যাসের বার্নার জ্বলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অত উপরে অন্য কোনও গ্যাস, জ্বালানি হিসাবে কাজ করে না। বরফকে গরম করে তবে জল পাওয়া যায়। টেন্টের পর্দাটা টানটান করে আটকে দিল রিনা। বাইরে থেকে কনকনে বাতাস ঢুকে আসবে না হলে। টেন্টের বাইরে এখন মাইনাস আঠারো ডিগ্রি। ইতিমধ্যেই বরফের কামড়ে সদস্যদের কারও কারও আঙুলের ডগা বিশ্রীভাবে ফাটতে শুরু করেছে। রিনা গ্লাভস-এর মধ্যে হাতটা মুঠো করল।

নগেন্দ্র রাই কথা বললেন।

‘আপনারা জানেন, ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত, কামেটের শৃঙ্গে পৌঁছোনোর জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের অভিযান কালই শুরু করতে হবে আমাদের। ওই উচ্চতায় পৌঁছোতে হলে, আমাদের কাল শেষরাত ৩টের সময় এই বেস ক্যাম্প ছাড়তে হবে।’

নগেন্দ্র রাই তীক্ষ্ণ চোখে সকলের দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন। হাতে ধরা কাগজটি সামান্য তুলে ধরে বললেন, ‘কালকের অভিযাত্রী দলে যারা থাকবেন, তাদের নাম নিয়েই আমরা এতক্ষণ আলোচনা করছিলাম। সর্বসম্মতিক্রমে, এবং অবশ্যই ডা. যোশীর পরামর্শ নিয়ে আমরা সাতজন সদস্যের নাম চূড়ান্ত করেছি!’

টেন্টের মধ্যে এখন বুঝি পিন পতনের শব্দও শোনা যাবে। বাইরে শুধু হিম-বাতাসের কোলাহল। সকলেই নিশ্বাস বন্ধ করে সেই চূড়ান্ত ঘোষণার প্রহর গুনতে থাকল। এমন ঐতিহাসিক অভিযানে, অভিযাত্রী দলের সদস্য হতে চায় সকলেই।

নগেন্দ্র রাই তার অসম্ভব ব্যারিটোন গলায় বলতে থাকেন নামগুলো। একটি করে নাম উচ্চারিত হয় আর রিনা কড় গুনে হিসাব রাখে। এই বুঝি তার নামটিও ভেসে আসবে। সেই চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে সে। একসময় নগেন্দ্র রাই নাম পড়া শেষ করে চোখ তুলে তাকান। বলেন, ‘এই সাতজনকেই বেছেছি আমরা। বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানসিক জোর এবং তারপরই স্বাস্থ্য।’

রিনা আর না বলে পারল না। এই হিমবাতাসেও তার কপালে যেন ঘাম জমার মতো অনুভব হচ্ছে। জয়ের এত কাছে এসেও জয় অধরাই থেকে যাবে তার কাছে? এই ভাবনা তাকে পীড়িত করল।

‘স্যার আমার নাম কেন নেই এই তালিকায়?’ কথাগুলো যেন ছিটকে বের হল তার মুখ থেকে। বরফ ঝড়ের তীব্রতার মতোই।

নগেন্দ্র রাই সেই ক্ষুরধার দৃষ্টিতে তাকালেন রিনার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে এক ঝলক হাসি খেলে গেল। শেষে অত্যন্ত সুভদ্র গলায় বললেন, ‘আপনার সবচেয়ে বড়ো অসুবিধার জায়গা আপনার বয়স, ম্যাডাম। আপনাকে নির্বাচিত না করার মুখ্য কারণও এটাই। রাস্তাটা অত্যন্ত দুর্গম, আপনি জানেন। তা ছাড়া ডা. যোশী জানালেন, আপনার ব্লাডপ্রেশারও ফ্লাকচুয়েট করে ঘনঘন আর পায়েও একটা পুরোনো চোট আছে। ফলে, এই শারীরিক অবস্থায় আপনাকে এত উঁচুতে যাওয়ার অনুমতি আমি দিতে পারি না। এটা আমাদের অন্যান্য সদস্যদের উপরেও একটা খারাপ প্রভাব ফেলবে।’

রিনা বেশ অবাক-ই হয়ে গেল। বয়সটা তার পক্ষে একটা বাধা, সন্দেহ নেই। কিন্তু, শারীরিক কোনও অসুস্থতা এখানে আসা ইস্তক ভোগায়নি তাকে। ডা. যোশীও তাকে একরকম অভয় দিয়েই এসেছেন এতদিন। সেই তিনিই নগেন্দ্র রাইকে তার সম্পর্কে অন্যরকম রিপোর্ট দিয়েছেন দেখে ভারি অবাক হল রিনা। ডা. যোশী মাথা নীচু করে বসে রয়েছেন।

রিনা বলল, ‘কিন্তু স্যার, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। অভিযানের জন্য মানসিকভাবেও আমি প্রস্তুত। আপনি প্লিজ আমায় কালকের টিমে শামিল করে নিন।’

শেষদিকে রিনার কথাগুলো অনুনয়ের মতো শোনাল। কিন্তু নগেন্দ্র রাই নরম হওয়ার লোক নন। ততটাই কঠোর গলায় বললেন, ‘আমি আপনার ব্যাপারে কোনও ঝুঁকি নেব না ম্যাডাম!’

এক বাক্যে গোটা টেন্টে গভীর নীরবতা নেমে এল।

‘এটাই তাহলে আপনার শেষ সিদ্ধান্ত?’ রিনা প্রশ্ন করে।

‘সিদ্ধান্ত একবারই নেওয়া হয়,’ নগেন্দ্র রাই বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘এই সিদ্ধান্ত দলের ক্যাপ্টেনের। এরপর আপনি যদি কিছু করেন, সেটা আপনার দায়!’

নগেন্দ্র রাই উঠে পড়লেন। ডা. যোশীও। ফের রিনার দৃঢ় গলা চমকে দিল তাদের, ‘স্যার, আমি হেরে যেতে আসিনি। আপনি এবং দলের বাকি সদস্যরা শুনে রাখুন, কাল অবশ্যই আমি অভিযানে যাব। নিজের ট্রেকিং আমি নিজেই করবঃ!’

‘আপনি কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন ম্যাডাম,’ নগেন্দ্র রাই ফুঁসে উঠলেন রাগে, ‘এমন হলে ভবিষ্যতে আপনার ট্রেকিংয়ের কেরিয়ার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকী আপনার অতীতের কৃতিত্বগুলিও কেড়ে নেওয়া হতে পারে। সেটা মাথায় রাখলে আপনি ভালো করবেন বোধহয়!’

‘ডা. যোশী, আপনি কী মনে করছেন?’ ক্যাপ্টেনের কথার কোনও জবাব না দিয়ে রিনা সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয় দলের চিকিৎসকের দিকে।

ডা. যোশী না তাকিয়েই মৃদু গলায় বলে ওঠেন, ‘আপনার ব্লাডপ্রেশার আর স্বাস্থ্যের সার্বিক অবস্থা দেখার পরও ঝুঁকিটা নেওয়া উচিত হবে না ম্যাডাম!’

ডা. যোশীর দিক থেকে যে কোনও সাহায্যই পাওয়া যাবে না, সেকথা বিলক্ষণ বুঝে গেছিল রিনা। তাই বলল, ‘রাজ্যস্তরে আমাকে যখন নির্বাচন করা হয়, সেখানেও চিকিৎসকরা আমার শারীরিক অবস্থার পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন। আমি ঘুষ দিয়ে পাশ করিনি।’

প্রতিদ্বন্দ্বী আরও অনেকে ছিল। কিন্তু তারা আমাকেই যোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। এখন আপনারা অন্যরকম কথা বলছেন। তাহলে কি তারা ভুল ছিলেন?’

উত্তর এল না। উত্তরের প্রত্যাশাও করেনি রিনা। নিজের রাস্তা তাকে নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে, এ কথা সে বুঝে গেছে। রিনা অপেক্ষা করল না আর। টেন্টের পর্দা সরিয়ে বাইরে বরফের আস্তরণে পা রাখার আগে শেরপাদের বলে গেল, তার খাবারটা তার টেন্টে দিয়ে আসতে। এদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে লোকদেখানো টিমস্পিরিট দেখাতেও তার বিবমিষা এল।

টেন্টে ফিরে এসে সে পরের দিনের ইতিকর্তব্য ঠিক করতে বসল। একাএকা ট্রেকিংয়ের কথা বলে এলেও, বিষয়টা সহজ নয় মোটেই। যথেষ্ট ঝুঁকিও রয়েছে। ঠিক তখনই শেরপা রাজু টেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ভিতরে আসার অনুমতি চাইল। ঘড়িতে সময় দেখল  রিনা। ঠিক সাতটা বাজে। তার মানে, শেরপা রাজু রাতের খাবার নিয়ে এসেছে তার নির্দেশমতো। এ সময় মনে মনে সে যেন শেরপা রাজুকেই খুঁজছিল। উৎসাহভরে বলল, ‘ভিতরে এসো শেরপাঃ!’

খাটো চেহারার ভারি হাসিখুশি মানুষ শেরপা রাজু। বেশ করিতকর্মা অভিযাত্রী, আবার রাঁধুনিও বেশ ভালো। ধোঁয়া ওঠা গরম খাবার সামনের টেবিলে রেখে শেরপা রাজু হেসে বলল, ‘খেয়ে নিন ম্যাডাম!’

নগেন্দ্র রাইয়ের সঙ্গে তর্কবিতর্কের সময় শেরপা রাজু কাছাকাছিই ছিল। বোঝা যায়, সমস্ত আলোচনাটাই সে শুনেছে। তার দেহভঙ্গিমার মধ্যে, কেমন যেন তার প্রতি একটু হলেও সমবেদনার আভাস খুঁজে পেল রিনা। দলের বাকিদের বেশিরভাগই যে ক্যাপ্টেন রাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে না, তা হলফ করেই বলা যায়। প্রত্যেকের কাছেই কেরিয়ারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার মতো অবিমৃশ্যকারিতা দেখাতে প্রস্তুত নয় কেউ।

শেরপা রাজুকে দেখে একটু হলেও মনে বল পেল রিনা। জিজ্ঞেস করল, ‘শেরপা রাজু, এর আগে কতবার কামেট শৃঙ্গে উঠেছ তুমি?’

মুখে হাসি ধরে রেখে তিনটে আঙুল তুলে ‘তিনবার দেখাল শেরপা রাজু।

রিনা মুখ কালো করে বলল, ‘আমি যেতে পারব না ওখানে, শেরপা?’

শেরপা রাজু সহসা চোখ নামিয়ে নিল। তারপর হঠাৎ-ই রিনার চোখে চোখ রেখে খুব দৃঢ় গলায় বলে উঠল, ‘আমার মন বলছে, আপনি পারবেন ম্যাডাম। এত দূর যখন পৌঁছোতে পেরেছেন, তখন আর ওইটুকু উঁচুতে যেতে পারবেন না?’

তারপর একটু থেমে থেকে বলল, ‘কালকে আমাদের দলের গাইড তামাং শেরপা। আপনি ওর সঙ্গে চলে যাবেনঃ!’ সারারাত রিনার মাথার মধ্যে শেরপা রাজুর কথাটাই যেন গেঁথে রইল। তাকে ঘুমোতে দিল না। থেকে থেকে এপাশ-ওপাশ করতে থাকল রিনা। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, কামেট শিখরে যে করে হোক পৌঁছোতেই হবে তাকে। পরদিন শেষ রাত দুটোর সময় দলের অন্যরা যখন প্রস্তুত হতে থাকল, রিনাও তৈরি হয়ে নিল।

নগেন্দ্র রাই এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বোঝানোর মতো করে বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনাকে আমি শেষবারের জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। দয়া করে ঝুঁকি নেবেন না। এই দেখুন না কেন, আমার শরীরটা ঠিক নেই বলে আমিও যাচ্ছি না। সাতজনের দল গঠন করা হয়েছিল, এখন ছজন যাবে!’

নগেন্দ্র রাই উৎসুক চোখে রিনার দিকে চেয়ে রইলেন। চোয়াল শক্ত হয়ে রইল রিনার। কঠোর গলায় জবাব দিল, ‘আমি যাব। আপনি বেস ক্যাম্পে বসে থাকুন আর ক্যারম খেলুন!’

‘শাট আপ!’ রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠলেন নগেন্দ্র রাই, ‘আমার সঙ্গে তর্ক করবেন না–!’

চেঁচামেচি শুনে মুহূর্তে অন্য সদস্যরাও এগিয়ে এসেছিল। নগেন্দ্র রাইকে তারাই কোনওরকমে শান্ত করে অন্যধারে সরিয়ে নিয়ে গেল। নগেন্দ্র রাই তখনও গরগর করছিলেন ভয়ানক রাগে।

কিন্তু এসবের ফলে অভিযান শুরু করতে দেরি হয়ে যেতে পারে ভেবে, দলের সদস্যরা তড়িঘড়ি ধামাচাপা দিয়ে দিল বিষয়টাকে। চারদিকে এখনও বরফের মতো শীতল শক্ত অন্ধকার। অভিযাত্রীদের তীব্র টর্চের আলো ধীরে ধীরে সেই অন্ধকারকে কেটে এগোতে থাকল। গাইড তামাংয়ের পিছন পিছন বরফের ঘন আস্তরণে পা রাখল রিনা। ভারী জুতো পরে থাকায় বরফের মধ্যে পা বসে যাচ্ছিল। এক জায়গা থেকে পা তুলে অন্য জায়াগায় রাখতে অনেকটা সময় যাচ্ছিল। অভিযাত্রীদের গতি স্বভাবতই হয়ে পড়ছিল অত্যন্ত ধীর।

কত সময় গেল তার হিসাব কে রাখে। ধীরে ধীরে দিগন্তের অন্ধকারও যেন হালকা হচ্ছে।

ক্যাপ্টেন ডোগরা কখন পাশে চলে এসেছেন, খেয়াল করেনি রিনা। চমক ভাঙল কাঁধের কাছে তার কণ্ঠস্বর শুনে।

‘ম্যাডাম, আপনি ঠিক কাজ করলেন না। টিম লিডারের নির্দেশকে অমান্য করা তো দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের সমান!’ ক্যাপ্টেন ডোগরা ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে রীতিমতো যুঝছেন, সেটা তার হাঁফিয়ে কথা বলার ভঙ্গি থেকেই পরিষ্কার।

রিনা চলতে চলতেই বলল ‘ক্যাপ্টেন, সেনাবাহিনিতে এমন অনুশাসন চলে, কিন্তু আমাদের সিভিলে চলে না। আমার অতীতের রেকর্ড দেখেই আমাকে নির্বাচন করা হয়েছিল। আমি তো কলকাতায় ফিরেই নগেন্দ্র রাইয়ের নামে নালিশ জানাব!’

সূর্যোদয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল আকাশ। ঘড়ির কাঁটা ভোর পাঁচটার দাঁড়িতে স্থির হয়ে পেরিয়েও গেল। সূর্যের হালকা লাল আভা কামেটশৃঙ্গের উপর ছড়িয়ে পড়ে আশ্চর্য প্রাকৃতিক সুষমা সৃষ্টি করেছে।

সাধারণভাবে কোনও পর্বতশৃঙ্গে ওঠার জন্য ভোরের সময়টাকেই বেছে নেন পর্বতারোহীরা। কারণ এসময়ে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে বেশি। বরফ ঝড়ের সম্ভাবনাও অনেক কম থাকে। দলের অন্যান্য সদস্যরা ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে থাকল। রিনাও ক্যামেরা ঠিক করে শাটার টিপল। যতদূর চোখ যায় কেবলই বরফ। মাঝেমধ্যে কয়েকটি দুর্লভ প্রজাতির বড়ো গাছ।

হঠাৎ-ই দলটা দাঁড়িয়ে পড়ল। গাইড তামাং কিছু বলছে। উৎকর্ণ হল রিনা। তামাং সকলকে তাদের সেফটি বেল্টের সঙ্গে দড়ির প্রান্ত বেঁধে নিতে নির্দেশ দিচ্ছে। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায়।

উচ্চতা যতই বাড়তে থাকল, ততই অভিযাত্রী দলের সদস্যদের মাথাও ঘুরতে শুরু করল অল্পবিস্তর। আশপাশের বড়ো গাছগুলির পাতা ও কাণ্ড থেকে ভেসে আসা তীব্র কটু গন্ধে অনেকে বমি করতে শুরু করল। ডা. যোশী তাদের সকলকেই ওষুধ দিলেন। কিন্তু কলকাতার আর-এক অভিযাত্রী মৃদুল সরকার বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ল। ওষুধেও কমল না তার অস্বস্তি।

গাইড তামাং ঝুঁকি নিতে চাইল না। মৃদুলকে দলের এক শেরপার সঙ্গে বেস ক্যাম্পের দিকে রওনা করিয়ে দিল। ব্যবস্থাপনায় সময় গেল কিছুটা। তারপর, আবার সকলে সামনের দিকে যাত্রা শুরু করল। দু-কিলোমিটারের মতো হেঁটে, আরও দুজন সদস্যের শারীরিক অস্বস্তি বাড়তে থাকল। অদূরে বরফের মধ্যে সুদীর্ঘ পরিখা। অসতর্ক থাকলে তার মধ্যে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। ওই দুজন সদস্য তেমন মানসিক জোর পেলেন না। এক শেরপাকে দ্রুত পাঠিয়ে মৃদুলদের থামিয়ে, তাদের সঙ্গেই এই দুজনকেও বেস ক্যাম্পে পাঠানোর বন্দোবস্ত করল তামাং। ভীষণ শীত আর পায়ের তলায় পুরু বরফ থাকার জন্য হাঁটতে অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল। সদস্যদের দিকে ফিরে তাকিয়ে তামাং সতর্ক করল, আপনাদের মধ্যে কেউ যদি ফিরে যেতে চান তো এখনই উপযুক্ত সময়। এরপর আমরা বরফের গ্লেসিয়ার পাব। উচ্চতাও বাড়বে। অক্সিজেনের সমস্যাও হবে। মনে রাখবেন, আমরা কিন্তু অক্সিজেন ছাড়াই এই অভিযানে নেমেছি!’

তামাংয়ের সাবধানবাণী শুনে, পুষ্পা যাদব আর রীতা সান্যাল বেঁকে বসল। বেস ক্যাম্পের ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল তারা। ডা. যোশী রিনার কাছে এসে বললেন, ‘এখনও সময় আছে রিনাদেবী। আপনি আর-একবার ভেবে দেখুন।

মৃদু হেসে রিনা জবাব দিল, ‘আমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না ডাক্তাবাবু।’

সকাল আটটা বেজে দশ মিনিটে কামেট শিখরে পৌঁছে গেল অভিযাত্রী দলটি। অন্যান্য অনেক দেশের পতাকা দণ্ড এখনও সেখানে পোঁতা আছে। বরফ আর আবহাওয়ার অত্যাচারে পতাকার রং বেশ ধূসর। ডা. যোশী, তামাং আর ক্যাপ্টেন ডোগরার মুখে তৃপ্তির হাসি খেলে গেল। ডা. যোশী বরফের মধ্যে পুঁতে দিলেন পর্বতারোহী অ্যাসোসিয়েশন এবং দেশের পতাকা। সাফল্যের আনন্দে বিহ্বল হয়ে, এই অনন্ত পৃথিবীর বুকে চারটি আপাতনিঃসঙ্গ চরিত্র পরস্পরকে অভিনন্দনের বন্যায় ভাসিয়ে দিল।

ডা. যোশী হাসিমুখে এগিয়ে এসে রিনার হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন, ‘অভিনন্দন রিনাদেবী। আপনি আমাদের সব আশংকাকে ভুল প্রমাণিত করেছেন।’

‘ধন্যবাদ তো তামাং দাজু পাবে। সে আমাকে প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়ে গেছে, ঠান্ডায় হিহি করে কাঁপতে কাঁপতে কোনওরকমে বলল রিনা।

ক্যাপ্টেন ডোগরা ওয়াকিটকিতে বেস ক্যাম্পে নগেন্দ্র রাইকে বললেন, ‘স্যার, আমরা কামেট শৃঙ্গে পৌঁছে গেছি–!’ তার গলার উচ্ছ্বাস যেন কোনও বাধা মানছিল না।

ওপাশ থেকে নগেন্দ্র রাই জানতে চাইলেন, ‘রিনা মল্লিক সুস্থ আছেন তো?’

‘স্যার, শি ইজ পারফেক্ট.. আমরা তিনজনই সুস্থ আছি!’ ডা. যোশী আড়াচোখে একবার রিনার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠলেন।

ওয়াকিটকি বন্ধ করে দিলেন নগেন্দ্র রাই। খানিক ঈর্ষাও হল তার, সেইসঙ্গে অপমানও। মুখের মতো জবাব দিয়েছে রিনা, এর থেকে বেশি রাগের কারণ কী আর হতে পারে তার কাছে!

কামেট শিখরে অভিযাত্রী দলের সদস্যরা একে অন্যের ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রিনা তামাংকে বলল, পশ্চিমদিকে বরফের নীচে পড়ে থাকা অস্থি-পাঁজরের ছবি তুলে নিয়ে যাবে।

জাপানের এক সাহসিনী পবর্তারোহী ফু তরিকোর শবদেহ এই বরফের তলাতেই খুঁজে পাওয়া গেল। তার একটি হাতে পরে থাকা সোনার ব্রেসলেটটি তখনও অটুট। ক্যামেরায় ছবি তুলে নিল রিনা। তামাং তাড়া দিল, বরফপাত শুরু হওয়ার আগে বেস ক্যাম্পে ফিরতেই হবে।

বেস ক্যাম্পে সন্ধেবেলা সেলিব্রেশনের খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে রিনা রসিকতা করেই বলেছিল, ‘নগেন্দ্রজি, আপনি তো বলেছিলেন, শারীরিক অবস্থার জন্য আমি নাকি শৃঙ্গে পৌঁছোতেই পারব না। কিন্তু আমি পেরেছি!’

নগেন্দ্র রাই উত্তর দেননি।

পরের দিন বরফ ঝড় থামার পরে নীচের দিকে যাত্রা শুরু করল অভিযাত্রী দল। দিল্লিতে পৌঁছোল বারো দিন পরে। প্রশাসনের তরফে স্বাগত জানানোর জন্য কেউ না থাকলেও, পর্বতারোহী সংঘের কর্তারা ছিলেন। সেদিনই নগেন্দ্র রাইয়ের সই করা প্রেস বিজ্ঞিঀ৫ পৌঁছে গেল খবরের কাগজের অফিসে। পরের দিন সকালে বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছেপে বের হল খবরটা, আর সবকটা কাগজ খুঁটিয়ে পড়ে, রিনার চোখের জল যেন কোনও বাধা মানতে চাইল না। খবরে অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসাবে বাকি সকলের নাম থাকলেও, কোথাও নাম নেই তার। মনের বেদনা ক্রমে ভয়ানক ক্রোধে বদলে গেল। চোখের জল শুকিয়ে ঠিকরে পড়ল আগুন। রিনার নাম তো নেই-ই, এমনকী তামাংয়ের নাম-ও নেই। রাজনীতিটা বুঝতে অসুবিধা হল না রিনার। তামাং শেষ পর্যায়ের অভিযানের গাইড হলেও, রিনাকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য নগেন্দ্র রাইয়ের কোপে পড়েছে।

পরদিন থেকেই শুরু হল প্রকৃত যন্ত্রণাটা। অফিসে কিংবা পাড়ায়, যারই সঙ্গে দেখা হয়, সে-ই কৗতূহলী হয়ে নানা কথা জানতে চায়। সকলের কাছে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে ধরতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল রিনা।

পর্যটন সচিবকে চিঠি লিখল। কিন্তু জানতে পারল, সেই চিঠিও সচিবের টেবিলে পৌঁছোয়নি শেষমেশ। নগেন্দ্র রাই-ই যে-এর পিছনে রয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ রইল না রিনার। নানা কারণে কর্তাদের গুডবুকে রয়েছে নগেন্দ্র। ফলে, তার হাতটাও অনেক লম্বা।

কয়েকদিন পরে, অফিসে যেতেই এমডি-র ঘরে ডাক পড়ায় একটু অবাক-ই হয়েছিল সে।

এমডি সামনের চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলেছিলেন তাকে। তারপর চশমাটা খুলে কপালে উদ্বেগের রেখা ফুটিয়ে তুলে বলেছিলেন, ‘আপনার জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে।’

‘আপনি খবরের কাগজে ছাপা হওয়া খবরটার কথা বলছেন কি স্যার?’

এমডি চশমাটা পরে নিয়ে বলে উঠলেন, ‘না, না, সেসব নয়। তবে পর্যটন দফতর থেকে আপনার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের তদন্ত চালানোর নির্দেশ দিয়ে ফ্যাক্স এসেছে। সঙ্গে আপনাদের টিম লিডারের অভিযোগপত্রের কপি।’

‘কিন্তু স্যার, আমার সঙ্গে কার্যত প্রতারণা করা হয়েছে। আর এর জন্য টিম লিডার নগেন্দ্র রাই-ই দায়ী, রিনা প্রায় মরিয়া হয়েই বলে ওঠে, ‘আমি কামেট শৃঙ্গে উঠেছি। এই দেখুন তার ছবি। অসংখ্য ছবি তুলেছি, দেখুন না…!’

এমডি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি কী করব বলুন তো! আমার তো হাত-পা বাঁধা। আপনি নিজেই বরং পর্যটন সচিবের সঙ্গে দেখা করুন!’

রিনা বুঝল, এখানে কথা বাড়ানো বৃথা। তার অফিস এ ব্যাপারে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে। হয়তো খুব শিগগির নানা চার্জে সাসপেনশনের চিঠিও পৌঁছে যাবে তার বাড়িতে।

কিন্তু পর্যটন সচিবের সঙ্গে দেখা করার জন্য এমডি-র পরামর্শ মাথায় ঘুরছিল তার। ইতিমধ্যে খবরের কাগজগুলিতেও তার সাক্ষাৎকার বের হতে শুরু করেছে। পর্যটন সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়াটাও তাই মোটের উপর সহজ হল।

সচিব বললেন, ‘দেখুন ম্যাডাম, নগেন্দ্র রাই তার রিপোর্টে লিখেছেন, আপনি কামেট শিখরে পৌঁছোনইনি। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওনার নির্দেশ অমান্য করেছেন।’

‘স্যার, এই ছবিগুলো দেখুন। আর এই ব্রেসলেটটা। এই সবই তো কামেট শৃঙ্গের।’ স্পষ্ট

ভাষায় বলে উঠেছিল রিনা।

সচিব বললেন, ‘কিন্তু, দলের ক্যাপ্টেন যতক্ষণ না সেকথা মানছেন এবং সে ব্যপারে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, আমরা কী করতে পারি বলুন! আপনি বরং নগেন্দ্র রাইয়ের সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চেয়ে নিন। মানে, একটা ‘সরি’ বলা আর কি! সচিব হাসলেন।

শেষপর্যন্ত নগেন্দ্র রাইয়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা! মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না রিনা। খবরের কাগজগুলো এসময় ত্রাতা হয়ে দেখা দিল। মনে হচ্ছিল, যুদ্ধটা যেন তার একার নেই, সকলের। রিনার সমর্থনে রীতিমতো জনমত তৈরি হতে থাকল। পর্বতারোহী সংঘের দফতরে আর সরকারের কাছেও, প্রতিবাদীদের স্বাক্ষরের সংগ্রহ পৌঁছোল হাজারে হাজারে। চাপের কাছে মাথা নত করতেই হল কর্তাদের। নগেন্দ্র রাইয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হল। তার পরেরটুকু ইতিহাস। কামেট শৃঙ্গের মতোই, এই যুদ্ধটাও জিতে গেল রিনা।

সেই সংঘর্ষের আর সহনাগরিকদের ভালোবাসার কথা মনে পড়লে আবেগে চোখে জল চলে আসে আজও। সেরকম বিহ্বলতার মধ্যেই যেন অনেক দূর থেকে কেউ ডাক দিল তার নাম ধরে। যেন অনেক উঁচুতে সর্বোচ্চ শিখর থেকে পর্বতে পর্বতে ধাক্বা খেতে খেতে পৌঁছোল সেই স্বর, ‘আমরা রিনাদেবীকে মঞ্চে আসতে অনুরোধ করছি!’

সেই স্বর যেন বাস্তবে ফিরিয়ে আনল রিনাকে। দূরে ঝাপসা একটা মঞ্চ। সারা হল ফেটে পড়ছে করতালিতে।

বিব্রত রিনা, আর-একটা শৃঙ্গজয়ের দিকে এগোল।

Hair colouring-এর খুঁটিনাটি

হেয়ার কালারের ফ্যাশনটা এখনও বেশ তুঙ্গে। কলেজ গোয়ার থেকে ওয়ার্কিং উয়োম্যান– সকলেই চুলের রঙে মন রাঙাতে ব্যস্ত। কিন্তু কালার্ড হেয়ার মেনটেন করাটাও বিশেষ জরুরি।

রং নির্বাচন করবেন কী করে?

Hair colouring-এর জন্য বাজারে বিভিন্ন ধরনের আলাদা আলাদা রঙের শেডস্ পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রেই, কোম্পানি অনুযায়ী সেগুলির কোয়ালিটি, টেক্সচার এবং গুণগত মানও আলাদা। সুতরাং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিজের ত্বক, চোখের রং ও চুলের স্বাভাবিক রঙের নিরিখেই বেছে নিতে হবে সঠিক হেয়ার কালার ।

চুলের রং ত্বকের রঙের সঙ্গে মানানসই হবে কীভাবে?

আপনার ত্বক যদি ফরসা ও উজ্জ্বল হয়, তাহলে Hair colouring-এর জন্য যে-কোনও রংই সুন্দর লাগবে আপনাকে। ত্বকের রং মাঝামাঝি হলে শ্যাম্পেন, কুল ব্রাউন অথবা অ্যাশ ব্লন্ড কালারই মানানসই। স্কিন টোন গোলাপি হলে গোল্ডেন ব্লন্ড বা রেড হেয়ার কালার এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ এতে আপনার ত্বক আরও বেশি লালচে দেখাবে, যা বেখাপ্পা।

যেসব মহিলার ত্বক গমরঙা কিংবা অলিভ কমপ্লেকশন-এর, তাদের ডার্ক কালার ব্যবহার করাই উচিত। তেমনই আবার ভায়োলেট, বারগান্ডি এবং ব্লু টিন্ট, কৃষ্ণবর্ণের মহিলাদের আরও বেশি আকর্ষণীয় ও সেক্সি করে তুলবে। ঘন কালো চোখের কন্যাদের জন্য কপার, ব্রাউন, ডিপ রেড পারফেক্ট ম্যাচিং।

কী কী বিষয় মাথায় রেখে চুলের রং উচিত?

আপনার চুলের কন্ডিশন, চুলের শোষণ ক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতার উপরই নির্ভর করবে হেয়ার কালার নির্ধারণের বিষয়টি। কারণ শুধু রং করলেই হবে না, সেই রং যাতে চুল ধরে রাখতে পারে সেদিকেও নজর দিন।

লাইফ স্টাইলের কথা মাথায় রেখেই হেয়ার কালার বাছুন। অর্থাৎ আপনি কোন এনভায়রনমেন্ট-এ থাকেন, আপনার পোশাক প্রভৃতির উপর নির্ভরশীল। যদি চুল শুষ্ক ধরনের হয়, হলদেটে বা সোনালি শেড অ্যাভয়েড করুন কারণ এ ধরনের রঙের জন্য চুল আর্দ্র হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

এছাড়া মনে রাখবেন হেয়ার কালার সর্বদা কেমিক্যাল-যুক্ত। তাই কালার করার আগে অবশ্যই স্কিন টেস্ট করে নিতে ভুলবেন না।

হেয়ার কালার ব্যবহারের কি কোনও সাইড এফেক্ট আছে?

অবশ্যই এর সাইড এফেক্ট আছে। হেয়ার কালার স্ক্যাল্পে লাগানোর সময় কালারের সঙ্গে সঙ্গে, অ্যামোনিয়াও ঢুকে পড়ে চুলের গোড়ার ছিদ্রের মধ্যে। যেটা চুলের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। চুলের আর্দ্রতা তো হারিয়ে

যায়-ই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কালার ফেড হতে থাকলে চুল তার স্বাভাবিক রং হারিয়ে ফেলে এবং সাদা হয়ে যায়। এছাড়া চুল পড়া, অ্যালার্জি তো আছেই। মাথায় টাক পড়ারও সম্ভাবনা থাকে।

হেয়ার কালার করা চুলের দেখভাল করবেন কী করে?

একদিন অন্তর কালার স্টে শ্যাম্পু দিয়ে ভালো করে চুল ধুয়ে নিন।ঞ্জশ্যাম্পুর থেকে বেশি কন্ডিশনার ব্যবহার করুন। শ্যাম্পুর পর অন্তত ৫-র৫ মিনিট মাথায় কন্ডিশনার লাগিয়ে রাখুন।ঞ্জতারপর ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। ভিজে চুলে কখনওই চিরুনি চালাবেন না। সাধারণ তাপমাত্রায় চুল শুকিয়ে নিন। হেয়ার ড্রায়ার এড়িয়ে চলুন। বিভিন্ন ধরনের হার্বাল হেয়ার প্রোটিন প্যাক পাওয়া যায়। সেগুলি ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া হট অয়েল ট্রিটমেন্টও করতে পারেন। সূর্যের তাপ থেকে চুলকে বাঁচাতে ছাতা বা স্কার্ফ ব্যবহার করুন।

হেলদি হ্যাবিট ফর Working Pregnant

আজকাল বেশির ভাগ মহিলাই ওয়ার্কিং উয়োম্যান। প্রেগন্যান্ট অবস্থাতেও তাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে মাথার ওপর বড়ো কেউ থাকেন না অনেক সময়। তাই ওয়ার্কিং প্রেগন্যান্ট-কে নিজেই নিজের যত্ন নিতে হয়।

এই সময় শুধু নিজের দেখভাল নয়, প্রয়োজন নিজের গর্ভস্থ শিশুর পুষ্টির কথা ভাবা। কারণ তার শারীরিক বিকাশ হয় ভ্রূণ অবস্থা থেকেই। জেনে নিন, কীভাবে Working Pregnant নিজের ও শিশুর যত্ন নেবেন গর্ভকালীন অবস্থায়।

দিনের শুরু কীভাবে করবেন

মর্নিং সিকনেস প্রাথমিক ভাবে অনেক মহিলারই হয়। ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে দিন, যাতে ঘরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রোদ প্রবেশ করতে পারে। রোদে থাকে ভিটামিন ডি, যা আপনার ও ক্রমশ বাড়তে থাকা শিশুর হাড়ের জন্য উপকারী। সকালে চায়ের বদলে এক গ্লাস গরম দুধ খান। যদি মর্নিং ওয়াক-এর জন্য বাইরে না যেতে পারেন, চেষ্টা করুন ছাদে বা লনে একটু হাঁটতে। ৫-১০ মিনিট ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম অবশ্যই করুন। ব্যায়াম আপনাকে তরতাজা রাখবে এবং হাত-পায়ে ক্র্যাম্প ধরা থেকে বাঁচাবে। শরীরে রক্ত চলাচলও বৃদ্ধি পাবে।

সবসময় হেলদি ডায়েট

প্রেগন্যান্সির সময় ব্যালেন্সড্ ও হেলদি ডায়েট একান্ত জরুরি। তাই অফিসে গেলেও লাঞ্চ বক্স গুছিয়ে নিন। প্রয়োজনে দু-তিনটে কৌটো নিন, ছানা, ফল, ড্রাইফ্রুট্‌স রাখুন কাজের ফাঁকে খাবার জন্য। মেন-লাঞ্চ-এ অবশ্যই, চিকেন বা মাছ, ভাত বা রুটি, সবজি, ডাল নিয়ে যান। সহকর্মীরা কী ভাববে এত খেলে, এই ধরনের ধারণাকে প্রশ্রয় দেবেন না। এই সময় খিদে পাওয়া স্বাভাবিক। তাই নির্দ্বিধায় খিদে পেলেই কলা, আপেল বা গ্রিন স্যালাড খান। খালি পেটে কোনও সময়ই থাকবেন না।

লিকুইড ইনটেক বাড়ান

কর্মরতা মহিলাদের উচিত এই সময় যথেষ্ট পরিমাণে পানীয় গ্রহণ করা। জুস, সুপ, শেক, দুধ, হেলথ্ ড্রিংক–  যখনই সময় পাবেন এমন নানা ভাবে তরল পদার্থের সাহায্যে শরীরে জলীয় উপাদান বজায় রাখুন। অফিসে চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে টি ব্যাগ ব্যবহার করে লিকার টি পান করুন।

এছাড়া ডেয়ারি প্রোডাক্টস অবশ্যই গ্রহণ করুন। পনির, ছানা, দই ডায়েটে বাধ্যতামূলক। দিনে একবার অন্তত স্যুপ বা স্টিউ খান। সবজি ও চিকেন দিয়ে বানানো এই স্টিউ এসময় খুব উপকারী। ব্যস্ততার কারণে যদি রোজ স্টিউ না বানাতে পারেন, তাহলে একদিনই একটু বেশি করে বানিয়ে ফ্রিজে রাখুন যাতে আরও দুদিন গরম করে খেতে পারেন।

বিশ্রাম আবশ্যক

দৗড়োদৗড়ি ও ব্যস্ততা আপনার শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। কিন্তু অফিসের ধকল সামলেও সুস্থ থাকার সমাধান, পর্যাপ্ত ঘুম। অফিসে এক জায়গায় বসে অনেকক্ষণ কাজ করা, সারাদিন কম্পিউটারের পর্দায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা, প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই টানা কাজ না করে একটু হাঁটাচলা বা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। প্রতি এক ঘন্টা অন্তর কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে, চোখ বুজে বিশ্রাম নিন।

পলিউশনের সমস্যা গর্ভস্থ শিশুর জন্যও ক্ষতিকারক। প্রতিদিন সকালে বাগানে বা পার্কে হাঁটুন ফ্রেশ অক্সিজেনের জন্য। সবুজ শাক-সবজি খান।

প্রেগন্যান্সির সময় অফিসের কাজের স্ট্রেস বেশি নেবেন না। টেনশন অ্যাভয়েড করুন। ৫ মাস পেরোলেই সপ্তাহে এক বা দুদিন ছুটি নিন। গর্ভপাতের আশঙ্কা কর্মরতাদের সবসময় থাকে। তাই আপনার দায়িত্ববোধ সবচেয়ে বেশি থাকা উচিত এ সময়ে। তাই নিজেকে সুরক্ষিত রাখাটাও আপনার কর্তব্য।

পর্যাপ্ত ঘুম

ভালো ও গভীর নিদ্রা এ সময় অত্যন্ত জরুরি। ঘুমোনোর আগে দুশ্চিন্তামুক্ত হবার জন্য ভালো মিউজিক শুনুন, ভালো বই পড়ুন। লেট নাইট করবেন না, যতই কাজ থাকুক ঘুমের সময়টা বরাদ্দ রাখুন। অন্ততপক্ষে ৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। অফিসের কাজ বাড়িতে আনবেন না। যদি কোনও কাজ অসম্পূর্ণ থাকে সেটা পরের দিন অফিসে এসে সম্পূর্ণ করুন। প্রয়োজনে সহকর্মীদের সাহায্য নিন। ঘুমের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করবেন না ওয়ার্ক লোড-এর কারণে।

খুশি থাকুন, পরিবারের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম উপভোগ করুন। নবজাতকের পথ চেয়ে অপেক্ষা করুন। মাতৃত্বের অনুভব সবচেয়ে সুখকর অনুভব একজন নারীর জীবনে।

যক্ষের প্রশ্ন

অনুভা বিরক্ত বোধ করছিল। শহরে গাড়ির সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। গাড়ি চালানো দায় হয়ে পড়ছে। আর পার্কিং স্পেস পাওয়া একপ্রকার প্রায় অসম্ভব। হাসপাতালের পার্কিং লট-এও ঘুরে ঘুরে এতক্ষণে গাড়ি পার্ক করতে পারল অনুভা। এত সব কিছু ভাবতে ভাবতে সে হাসপাতালের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।

দোতলায় অনুভার বান্ধবী কাম সহকর্মী ভারতী ভর্তি রয়েছে। কিডনির পাথর অপারেশন হয়েছে গতকাল। আজ অনুভা ওকে দেখতে এসেছে।

ভারতীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে কেবিনটার চারপাশে চোখ বোলাল অনুভা। ভারতীকে নিয়ে মোট তিনজন পেশেন্ট রয়েছে। একজন তার মধ্যে বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলছে, অপরজন চুপচাপ বিছানায় বসে। অনুভার সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই খেয়াল করল মহিলাও একদৃষ্টিতে তারই দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ওরও চেনা মনে হল। মনে করার চেষ্টা করল অনুভা। মহিলার চোখদুটোও কেমন জানি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল অনুভাকে দেখে, যেন বহুদিন পর হঠাৎ করে পরম কোনও আত্মীয়র সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে।

দুজনেই দুজনের মনোভাব পড়ার চেষ্টা করে। হঠাৎ-ই অনুভার বিস্মৃতির পরদা সরে গিয়ে পুরোনো কিছু মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে মনে চমকে ওঠে অনুভা। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ওই মহিলার বিছানার কাছে। অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে, ‘নিভা না?’

ম্লান হাসি ফুটে ওঠে মহিলার ঠোঁটে, ‘চিনতে পেরেছ আমাকে?’

‘তুমি এখানে এই অবস্থায়?’ অনুভা কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল, ‘তোমার কী হয়েছে? আমি তো ভাবতেই পারছি না কোনওদিন তোমাকে এই অবস্থায় দেখতে পাব। কি চেহারা ছিল আর এখন কি চেহারা হয়েছে তোমার। কী করে এমন হল?’

বসে বসে বোধহয় হাঁপিয়ে উঠেছিল নিভা। ক্লান্তিও বোধ করছিল নিশ্চয়ই, অনুভাকে অনুরোধ করল খাটের পিছনের দিকটা উঠিয়ে দিতে যাতে পিঠটা বালিশে এলিয়ে দিতে পারে। ইশারায় অনুভাকে পাশে রাখা চেয়ারটায় বসতে বলল।

‘অনুভা, আমি জানি অনেকগুলো প্রশ্ন তোমার মনে এসে জমা হয়েছে… বুঝতে পারছি না কী করে সবগুলোর উত্তর দেব আর একদিনে এত কথা বলাও যাবে না… হাঁপিয়ে যাই… ফুসফুসের সমস্যা আমার।’

‘তোমার হয়েছে কী, সেটা বলবে?’ অধৈর্য হয়ে ওঠে অনুভা।

‘একটা রোগ হলে তো বলব… যখন একবার দেখা হয়েছে তখন জানতেও পারবে সবকিছু। রোজ এসে আমার কথা শোনার সময় আছে তোমার কাছে?’ ব্যাকুল শোনায় নিভার কণ্ঠস্বর।

‘হ্যাঁ, আমি আসব’, নিভাকে দেখে অনুভার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছিল। ওর খালি মনে হচ্ছিল, জগৎ সংসারে নিভা ছাড়া ওর যেন আর কেউ নেই এবং বেশিদিন ও নিভাকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারবে না। অনুভা, নিভার হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরে।

নিভার শরীরে শিহরণ জাগে, নতুন আশার সঞ্চার হয়। এত যুগ বাদে অনুভার কথা শুনে ওর মনে হয় আজও ওর খেয়াল রাখার জন্য কেউ অন্তত আছে। বাঁচার ইচ্ছে হয় নতুন করে।

অনুভা চারপাশটা দেখে আবার প্রশ্ন করে, ‘তোমার সাথে কেউ আছে… মানে তোমাকে দেখাশোনার… তোমার বাড়ির কেউ?’

নিভার দীর্ঘশ্বাস কানে যায় অনুভার, ‘না। কেউ নেই।’

‘কেন বাড়ির লোকজন?’

‘অনুভা, যারা আমার নিজের ছিল তাদের আমি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি, আর জীবনের চলার পথে যাদের আমি নিজের বলে মনে করে নিয়েছিলাম তারা আমাকে মাঝ রাস্তায় ছেড়ে চলে গিয়েছে। এখন আমি সম্পূর্ণ একাকী। নিজের বলতে কেউ নেই আমার। আজ কত বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা। মনে হচ্ছে আবার সেই পুরোনো দিনগুলোয় ফিরে গেছি। এটা কি স্বপ্ন অনুভা… তুমি আবার আসবে তো?’

‘হ্যাঁ, নিভা। আমি আবার আসব। শুধু দেখা করার জন্য নয়, দেখাশোনা করারও তো কাউকে চাই… তোমার হাসপাতালের খরচা কে দিচ্ছে?’

ম্লান হাসিটা আবার নিভার ঠোঁট ছুঁয়ে মিলিয়ে যায়, ‘আছে একজন ভালোবাসার লোক। কিন্তু আমার এই অসুখটার জন্য আমার থেকে সে এতটাই দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে যে হাসপাতালে আমাকে দেখতে একদিনও আসেনি। চাকর গোছের একটা লোককে পাঠিয়ে দেয় যে,

দু-তিনদিন অন্তর এসে হাসপাতালের টাকা আর যা-যা দরকার দিয়ে যায়। ফলে আমার চিকিৎসা ঠিকঠাকই চলছে। আমার ভালোবাসার বদলে এই উপকারটা ও আমার করে যাচ্ছে।’

অনুভা সেদিন তাড়াতাড়িই নিভা আর ভারতীকে বিদায় জানিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে আসে কারণ অফিস থেকে ছুটি নিয়েই ও ভারতীকে দেখতে গিয়েছিল সুতরাং অফিসে ফেরার দরকার ছিল। অফিসে কিছু কাজে মন বসাতে পারল না। খালি নিভার মুখটা মনে পড়ছিল আর কলেজের দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

একই বিষয় ছিল কলেজে ওদের দুজনের। দুজনেই শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে। অনুভার বাবা ছিলেন আইএএস অফিসার আর নিভার বাবা আর্মিতে উচ্চপদস্থ পদে ছিলেন। দুজনেই বন্ধু ছিলেন এবং কলেজে অনুভা এবং নিভার বন্ধুত্ব বেশ গাঢ় হয়। অনুভা ছিল ঘরোয়া এবং পারিবারিক সংস্কার মেনে চলার মতো মানসিকতা ছিল অনুভার। অথচ নিভা ছিল ঠিক বিপরীত। সমস্ত নিয়মবিরুদ্ধ কাজ করাই ছিল নিভার চরিত্রের বিশেষত্ব। সম্ভবত আর্মি লাইফস্টাইলের স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বাধীনতায় পরিবেশে বড়ো হওয়ার জন্য নিভার স্বভাব এইভাবেই গড়ে উঠেছিল।

নিভার স্বপ্ন ছিল বড়ো অফিসার হওয়ার। অনুভার জানা ছিল না নিভা বাস্তবে কতটা সাফল্য পেয়েছে। তবে নিভা বরাবরই বিয়ে করার বিরুদ্ধে ছিল কেননা ওর মনে হতো বিয়ে মানেই অপরের দাসত্ব করা। তখন মাঝেমধ্যে লিভ ইন রিলেশনশিপ নিয়ে কলেজের আড্ডাগুলোয় ঝড় উঠত। নিভা-কে সেখানে ব্যাপারটাকে সাপোর্ট করতেই দেখেছে অনুভা। এছাড়াও অনুভা জানত কলেজের দুই তিনজন ছেলের সঙ্গে নিভার ঘনিষ্ঠতার কথা।

অনুভা নিভাকে বহুবার বুঝিয়েছে লাইফ-টা এইভাবে নয়ছয় না করার জন্য কিন্তু নিভা এতে অনুভাকে উপহাসই করেছে। শেষে অনুভাই হেরে গিয়ে সরে গিয়েছে। কলেজ শেষ করে দু’জনে আলদা হয়ে নিজেদের পথ বেছে নিয়েছে। অনুভা সরকারি পরীক্ষায় পাস করে আজ কেন্দ্রীয় সরকারে অফিসার পদে বহাল। ভালো পরিবারে বিয়ের পর এখন অনুভা দশ বছর বয়সি মেয়ের মা। অথচ এই পনেরো বছরে নিভার কোনও খবরই অনুভার কাছে ছিল না। সুতরাং ওর-ও মনে প্রবল আগ্রহ ছিল জানার এতগুলো বছর নিভা কীভাবে কাটিয়েছে যে আজ ওর এই দুর্দশা।

পরের দিন অফিস করে অনুভা হাসপাতাল যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ল। স্বামী আর মেয়েকে আগেই বলে রেখেছিল দেরি করে বাড়ি ফিরবে। অনুভা-কে দেখেই নিভার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, হয়তো ও ভেবেই বসেছিল অনুভা আসবে না। ফল নিয়ে গিয়েছিল অনুভা। মাথার কাছে রাখা টেবিলটায় নামিয়ে রেখে টুল-টা টেনে বসল নিভার সামনে। ওর হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আজ কেমন শরীর তোমার?’

হাসি ফুটে উঠল নিভার মুখে। আনন্দের হাসি। উত্তর দিল, ‘মনে হচ্ছে এবারের মতো বেঁচে যাব।’

রাতে হিমাংশু বাড়ি ফিরলে, অনুভা নিভার কথা সব খুলে বলল স্বামীকে। পরের দিন ওরা দু’জনেই হাসপাতালে গেল নিভাকে দেখতে। হিমাংশু নিভার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে ওর শরীর সম্পর্কে খোঁজখবর করতে জানতে পারল, নিভার শুধুমাত্র ফুসফুস নয়, অত্যধিক মদ্যপান এবং স্মোকিং-এর জন্য ওর কিডনি এবং লিভারও ক্ষতিগ্রস্ত। অনুভাও নিভা সম্পর্কে অতশত জানত না, হিমাংশুর মুখ থেকে সব জানতে পেরে ও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল।

এরপর থেকে অনুভা নিয়মিত নিভার দেখাশোনা আরম্ভ করে দিল। বাড়ি থেকে খাবার বানিয়ে অফিস বেরোবার আগে নিভাকে দিয়ে আসত। অফিস ফেরত-ও হাসপাতাল হয়ে বাড়ি ফিরত। ওর জন্য আলাদা করে আয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল অনুভা। এছাড়াও ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হিমাংশু বজায় রেখে দিয়েছিল, ফলে চিকিৎসাটাও সঠিক দিশায় মোড় নিল।

প্রায় একমাস লেগে গেল নিভার মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠতে। ডাক্তার জানাল ওকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে তবে ওষুধপত্র এখন চলবে।

বাড়ি যাওয়ার দিন অনুভা আর হিমাংশু দুজনেই এল হাসপাতালে নিভার সঙ্গে দেখা করতে। হঠাৎই অনুভার মনে হল নিভা এখনও যথেষ্ট সুন্দরী যদিও অসুস্থ অবস্থায় থাকাকালীন নিভার চেহারা এতটা মনোযোগ দিয়ে দেখেনি অনুভা। তবে উদাস মনে হল নিভাকে। অনুভা জিজ্ঞেস করল, ‘বাড়ি যাচ্ছ… এত মনমরা হয়ে বসে আছো কেন? তোমার তো খুশি হওয়া উচিত।’

উদাস দৃষ্টি মেলে ধরল নিভা, ‘বাড়ি… কার বাড়ি? আমার কোনও বাড়ি নেই।’

‘কেন? তোমার সেই বন্ধু যে তোমার চিকিৎসা করাচ্ছিল…’

ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল নিভার ঠোঁটে, ‘যে মানুষ আমাকে দেখতে একটিবারও হাসপাতালে এল না, যে জানে আমার শরীরটা তার আর কোনও কাজে আসবে না, সেই লোকটা আমাকে তার বাড়িতে রাখবে?’

‘তাহলে ও কেন তোমার চিকিৎসা করাচ্ছিল?’

‘এই একটাই উপকার ও করেছে। হয়তো আমার ভালোবাসার ঋণটা ও এইভাবে মিটিয়ে ফেলতে চেয়েছে। লোকটা খুব ধনী। একটা অসুস্থ রোগীকে বাড়িতে রেখে ওর কী লাভ যেখানে টাকা ছড়ালেই এমন শয়ে শয়ে সুন্দরী মেয়েরা ওর কাছে এসে ভিড় করবে। আমি নিজেও ওর কাছে ফিরে যেতে চাই না কারণ পুরুষ সমাজ-টাকে আমি ভালো করে চিনে নিয়েছি। যদি কোনও মেয়েদের আশ্রম থাকে, আমি সেখানেই যেতে চাই’, আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে কথাগুলো বলে নিভা হাঁপাতে থাকে।

অনুভাও একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়। কী করবে বুঝতে না পেরে হিমাংশুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। পরক্ষণেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বলে, ‘ঠিক আছে তোমাকে কোথাও যেতে হবে না, তুমি আমার বাড়িতে থাকবে।’

‘তোমার বাড়িতে?’ বিশ্বাস করতে পারে না নিভা নিজের কানকে।

‘হ্যাঁ, আমার বাড়িতে। ব্যস আর কোনও প্রশ্ন নয়, চলো এবার।’

অনুভাদের চার বেডরুমের যথেষ্ট বড়ো ফ্ল্যাট। একটা রুমে ওরা নিভার থাকার ব্যবস্থা করে দিল। অনুভা আর হিমাংশুর ব্যবহারে নিভা এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে ধন্যবাদের একটা শব্দও ওর মুখ থেকে বেরোল না।

আর্মির পরিবেশে নিভা বড়ো হয়েছিল। বাড়িতে মদ, পার্টি এসবের কোনও কমতি ছিল না। বাড়িতে পার্টি না হলেও, রোজই নিভার বাবা ক্লাব থেকে ড্রিংক করেই ফিরতেন। মা-ও পার্টিগুলোতে ড্রিংক করতেন। সুতরাং এই পরিবেশেই নিভা শৈশব পার করে যৌবনে পড়েছিল। এটাই ওর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। যৌবনে পড়তে পড়তেই নিভার মদ এবং সিগারেটে একটা আসক্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

সরকারি চাকরির জন্য তৈরি হতে কোচিং ক্লাসে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছে ছিল নিভার। সেইমতো মা-বাবাকেও জানিয়েছিল নিভা।

‘মা, আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে চাই। কোচিং ক্লাসের খোঁজ নিয়েছি। যাদবপুর ইউনিভার্সিটির কাছে।’

ব্যারাকপুর থেকে ‘অত দূরে যাবি রোজ কী করে? কাছে কিছু নেই?’ নিভার মা-কে চিন্তিত শোনাল।

‘ভাবছি ক্লাসের আশেপাশে পিজি-তে থেকে যাব’, নিভা উত্তর দেয়।

‘বাড়ি থাকতে পিজি-তে থাকবি?’

এতক্ষণ নিভার বাবা চুপচাপ সবকিছু শুনছিলেন। এবার স্ত্রী-কে থামিয়ে বলে ওঠেন, ‘বোকার মতো কথা বলছ কেন? রোজ যাতায়াতেই যদি সময় চলে যায় তাহলে পড়বে কখন? এছাড়া ও যথেষ্ট স্মার্ট। ইচ্ছে হলেই বাড়ি চলে আসবে। আমরাও দেখা করতে চাইলে চলে যাব। অসুবিধাটা কোথায়?’

নিভার মা চুপ করে যান। বাপ, বেটি রাজি মানে মেয়েকে কেউ আটকাতে পারবে না, সেটা উনি ভালো ভাবেই জানেন। সুতরাং কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। এক বছরের কোর্সে নিভা ভর্তি হয়ে গেল এবং বাড়ি ছেড়ে পিজিতে থাকতে শুরু করল। নিভা সুন্দরী, স্মার্ট সুতরাং কোচিং-এও ও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েরাই ওখানে পয়সাওয়ালা পরিবার থেকে। সুতরাং প্রায় দিন পার্টি মজলিস লেগেই থাকত। আর নিভাও ধীরে ধীরে প্রতিটা পার্টির মক্ষীরানি হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে পছন্দের ছেলেদের সঙ্গে রাত কাটাতেও শুরু করল নিভা।

নিভার খবর ওর মা-বাবার কাছেও বেশিদিন চাপা থাকল না। তারা মেয়েকে পিজি ছাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করলেন কিন্তু মেয়ের এক গোঁ, ‘কোচিং শেষ হলে তারপর বাড়ি ফিরব।’

নিভার মা কঠোর হলেন, ‘নিভা তুমি যা যা করে বেড়াচ্ছ তাতে কি মনে হয় তুমি কোচিং-এর পড়া শেষ করতে পারবে? পড়া শেষ হলেও কম্পিটিশনের জন্য তৈরি হওয়া দরকার। আর তার জন্য পড়াশোনা করতে হবে, ছেলেদের হাত ধরে সারাদিন ঘুরে বেড়ালে কিছুই হবে না।’

‘মা, প্লিজ। বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলো। আর তো কটা মাস’, মায়ের কথা না শোনার ভান করে নিভা।

‘না, তা হবে না নিভা। তোমার কথা শুনে তোমার বাবা খুব দুঃখ পেয়েছেন। আমি ওনাকে কিছু বলতে পারব না। তুমি যদি নিজের ইচ্ছে মতো চলতে চাও তাহলে আমরা টাকাপয়সা দেওয়া সব বন্ধ করে দেব। তারপর যা ইচ্ছে হয় তাই কোরো।’

অতএব নিভাকে নিজের বাড়ি ফিরে আসতে হয়। কিন্তু বাড়িতে হাজার প্রতিবন্ধকতা থাকাতে মনে মনে ও অধৈর্য হয়ে পড়তে থাকে। বুঝতে পারত, মা ওর উপর সারাক্ষণ নজর রাখছে।

যারা এতদিন মক্ষীরানিকে ঘিরে ছিল তারাই ওকে প্রলোভন দিতে শুরু করল। বাড়ি ছেড়ে চলে আসলে ওর প্রয়োজনীয় সব কিছু ভার এমনকী থাকা-খাওয়া-অর্থ সব তারাই বহন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিল নিভাকে।

নিভা বুদ্ধি দিয়ে কোনওকিছুই বিবেচনা কোনওদিন করেনি, আজও তার অন্যথা হল না। একবারও মা-বাবা বা নিজের ভবিষ্যৎ ভাবল না। বন্ধুদের দেখানো প্রলোভনটাই ওর কাছে বড়ো হয়ে দাঁড়াল। একদিন মা-বাবার অনুপস্থিতিতে নিভা নিজের জামাকাপড় এবং সামান্য টাকাপয়সা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে উঠল। বন্ধুরা আগেই ওর জন্য ফ্ল্যাট দেখে রেখেছিল সুতরাং নতুন ফ্ল্যাটে শিফ্ট করতে দেরি লাগল না।

নিভার মা-বাবা নিজেরা যতটা পারলেন খোঁজাখুঁজি চালালেন কিন্তু আর্মি মহলে বদনাম হয়ে যাওয়ার ভয়ে পুলিশে রিপোর্ট লেখালেন না তাহলে হয়তো নিভার খোঁজ পাওয়া অসুবিধা হতো না। আবার এমনও হতে পারে তাঁরা উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত মেয়ের জীবন থেকে সরে যাওয়াই সব দিক থেকে শ্রেয় বুঝতে পেরেছিলেন তাই মেয়েকে ফিরে পাওয়ার এবং সঠিক পথে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার আশা পুরোপুরি ত্যাগ করেছিলেন।

 

নিভাও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পার্টি, নতুন নতুন বন্ধু নিয়ে ফ্ল্যাটে রাত কাটানো, এই ধরনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলল। তার শরীরের দুর্নিবার আকর্ষণে ধনী পরিবারের ছেলেরা ওর শরীরের বিনিময়ে ওর সব খরচ নিজেরাই বহন করে দিত। কিন্তু কতদিন চলত এইভাবে? ফুলের মধুও ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করল। একটা দুটো করে মৌমাছি অন্য ফুলে আকৃষ্ট হতে আরম্ভ করল। তাছাড়া কোচিং ক্লাস শেষ হতেই অনেকে পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়ার বাহানায় আসা কমিয়ে দিল বা বন্ধ করে দিল। রসদে টান পড়তেই নিভার চেতনা ফিরল। বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর পেত, ‘ব্যস্ততা বাড়ছে, সময় এভাবে আর কত নষ্ট করা যায়? তুই এবার নিজেও কিছু একটা কর কারণ বেঁচে থাকতে টাকার দরকার।’ অনেকেই পরামর্শ দিত, মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে যেটা নিভার কাছে অসম্ভব ছিল।

 

কৃষ্ণেন্দুকে নিভা সবথেকে ভালো বন্ধু বলে মনে করত। ওকে একদিন নিভা বলল, ‘কৃষ্ণেন্দু, আচ্ছা বলতো তোদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখার জন্য আমি আমার বাড়ি, মা-বাবা সব ছেড়ে চলে এলাম। আর তোরা এক এক জন করে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিস। এখন তাহলে আমার কী হবে?’

 

‘নিভা, আমি যেটা বলব তোর সেটা শুনতে ভালো লাগবে না। কিন্তু আসল সত্যিটা হল, তুই আমাদের বন্ধুত্বের জন্য নয়, নিজের সুখ এবং স্বার্থের জন্য বাড়ি ছেড়ে এখানে চলে এসেছিস। বিনা স্বার্থে এখানে কেউ কারও জন্য কিছু করে না। স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে সবাই সরে যায় যেটা তোর ক্ষেত্রে এখন হচ্ছে।’

কৃষ্ণেন্দুর কথা শুনে নিভার কাঁদতে ইচ্ছে করে কিন্তু কারও সামনে চোখের জল ফেলা নিভার পক্ষে সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অবসাদ ঘিরে ধরে নিভাকে। বুঝতে পারে না ও এখন কী করবে?

‘আমি এখন কী করব কৃষ্ণেন্দু?’ কান্নাভেজা স্বরে নিভা প্রশ্ন করে, ‘এ আমি কী করে বসলাম?’

‘যৗবনে বহু মেয়েই এভাবে ভেসে যায় যার জন্য পরে তাদের অনুতাপ, অনুশোচনার অন্ত থাকে না।’

‘কৃষ্ণেন্দু, তুইও তো কোনওদিন আমাকে বোঝাসনি, অথচ তোকেই অমি আমার সবথেকে ভালো বন্ধু বলে মনে করতাম।’

কৃষ্ণেন্দু হাসে, ‘কী বোকার মতো কথা বলছিস নিভা? তুই কোনওদিন কোনও একটা ছেলেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছিস? মদের অভ্যাস এবং সেক্স-এর ক্ষিদে তোর ভেতরকার মানুষটাকে কবেই মেরে দিয়েছে। এক সঙ্গে এতগুলো ছেলের সঙ্গে তোর প্রেমের সম্পর্ক, তো কোন ছেলেটা তোর সঙ্গে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রেম করবে বলতে পারিস? সবাই আসলে তোর শরীরটাকে ভোগ করতে চেয়েছে। ভোগ করেছে, ছেড়ে চলে গেছে। সবার সঙ্গেই শুয়েছিস সুতরাং শুধু একটা ছেলের কাছ থেকে সত্যিকারের অটুট সম্পর্কের দাবি তুই কি করে করতে পারিস?’

কৃষ্ণেন্দুর কথাগুলো তিক্ত হলেও কঠোর বাস্তব সেটা নিভা বুঝতে পারছিল। হঠাৎ কৃষ্ণেন্দুর হাত দুটো চেপে ধরে নিভা, ‘কৃষ্ণেন্দু আমি ভুল করেছি। সব বন্ধুরা ছেড়ে চলে গেছে। তুই প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না।’

কৃষ্ণেন্দু হাত ছাড়িয়ে নেয়। ‘না-রে নিভা আমার পক্ষে তোর সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। এক বছর আমার নষ্ট হয়েছে। পরীক্ষায় পাস করতে পারিনি, বাড়িতেও সকলে খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছে। এই বছর পাস করতেই হবে, কেরিয়ারের প্রশ্ন। সরি নিভা।’

নিভা এসে আবার কৃষ্ণেন্দুর হাত ধরে, ‘কৃষ্ণেন্দু প্লিজ। আমি সত্যিই তোকে ভালোবাসি। আমি জানি আমার জীবনে বহু ছেলে এসেছে কিন্তু বিশ্বাস কর যখনই মন খারাপ হয়েছে তখনই তোরই কথা মনে হয়েছে। আমাকে এভাবে ছেড়ে যাস না।’

‘বোঝার চেষ্টা কর নিভা। তোকে ছেড়ে না গেলে আমার ভবিষ্যৎ পুরো ডুবে যাবে। আগে আমাকে জীবনে দাঁড়াতে দে।’

‘কৃষ্ণেন্দু, ভালোবাসার ভিক্ষে আমি চাইছি না। চুটিয়ে প্রেম করেছি, সেক্সলাইফ-ও এনজয় করেছি কিন্তু পেটের খিদের কাছে হার মানতেই হয়। আমার অর্থ উপার্জন করার কোনও পথ নেই। আমার ভালোবাসার বদলে এইটুকু উপকার অন্তত করে দে, থাকার জন্য একটা ঘর আর পেট চালাবার জন্য একটা যে-কোনও কাজ। বেশ্যাবৃত্তি আমি করতে পারব না।’ নিভার স্বরে কাকুতি ঝরে পড়ে।

মেয়েটাকে দেখে মায়া হয় কৃষ্ণেন্দুর। আর সকলের মতো মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে না। একটু ভেবে জিজ্ঞস করল, ‘প্রাইভেট চাকরি করতে পারবি?’

‘হ্যাঁ, এছাড়া উপায়ই বা কী আছে?’

‘তাহলে ঠিক আছে। তুই এই ফ্ল্যাটেই থাক। যতদিন না চাকরি হয় আমি ভাড়া দিয়ে দেব। বাবাকে বলে কোথাও একটা তোর চাকরির ব্যবস্থা করছি।’

‘আমি তোর উপকার কোনওদিনও ভুলব না।’ কৃষ্ণেন্দু কিছু একটা ভাবল তারপর বলল, ‘তুই কেন বাড়িতে চলে যাচ্ছিস না কাকু, কাকিমা-র কাছে?’

নিভা, কৃষ্ণেন্দুর কাছ থেকে এই প্রশ্ন আশা করেনি। আশ্চর্য হল, পালটা বলল, ‘কী মুখ নিয়ে যাব? কী বলব ওদেরকে যে এতদিন আমি কী করেছি। না কৃষ্ণেন্দু, আমি ওখানে যেতে পারব না। ওখানে গিয়ে ওদেরকে নতুন কোনও সমস্যায় আমি ফেলতে পারব না।’

কৃষ্ণেন্দু, বাবাকে বলে নিভাকে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ব্যবস্থা করে দিল চাকরির। তবে যে ধরনের লাইফস্টাইলে নিভা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, সেটা মেনটেন করার জন্য চাকরির টাকা যথেষ্ট ছিল না। উদ্দাম সেক্সলাইফ থেকে সরে এলেও নিভা মদ আর সিগারেটে আসক্তি ছাড়তে পারল না। একাকিত্ব ওকে কুরে কুরে খেতে লাগল। মা-বাবার কথা, পুরোনো সব কথা মনে পড়লেই ও মদের বোতল খুলে বসত, সবকিছু ভুলতে চাইত।

কৃষ্ণেন্দু যখনই আসত, নিভার অবস্থা দেখে ওকে সাবধান করার চেষ্টা করত, ‘এত খাস না নিভা, অসুস্থ হয়ে পড়বি।’

‘ভীষণ ভয় করে কৃষ্ণেন্দু, একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করতে আসে’, নিভার চোখ ছলছল করে।

‘ভালো কথা বলছি নিভা, এভাবে একা একা থাকিস না। বাড়ি ফিরে যা। দেখবি কাকু-কাকিমা তোকে ঠিক ক্ষমা করে দেবেন’, কৃষেন্দু বোঝানোর চেষ্টা করে।

নিভার সেই একই উত্তর, ‘কোন মুখে ফিরব ওদের কাছে? ওরা আমাকে নিয়ে কী কী ভেবেছিল আর আমি কি হয়েছি… ক্ষমা হয়তো করে দেবে ঠিকই কিন্তু সমাজে তারা মুখ দেখাবে কী করে?’

‘কেন, এখনও তো তারা সমাজে মেলামেশা করছেন, তখনও করবেন’, প্রত্যুত্তরে বলে কৃষ্ণেন্দু।

‘হয়তো তারা আমাকে মৃত ভেবে নিয়েছেন। তুই ওদের চিনিস না। ওরা যদি আমাকে ক্ষমাই করে দিত তাহলে এতদিনে আমাকে ঠিক খুঁজে বার করত। এটা এমন কিছু মুশকিলের ছিল না। বরং আমার মনে হয় ওরা পুলিশে রিপোর্ট পর্যন্ত লেখাননি।’ কৃষ্ণেন্দুর এত বোঝানোর পরেও নিভার সেই একই গোঁ।

এরপর ধীরে ধীরে কৃষ্ণেন্দুর আসাও কমতে লাগল যত পরীক্ষা কাছাকাছি আসতে আরম্ভ করল। কৃষ্ণেন্দুর পরীক্ষাও দেওয়া হয়ে গেল এবং যথারীতি সিভিল সার্ভিস-এর পরীক্ষায় পাস করে গেল।

লখনউ-তে ট্রেনিং সুতরাং কৃষ্ণেন্দু নিভার সঙ্গে দেখা করে বিদায় জানাতে এল।

নিভা ভিতরে ভিতরে পুরোপুরি ভেঙে পড়ল এবার, ‘তুই এবার পুরোপুরি আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছিল। আর কোনওদিন কি আমাদের দেখা হবে কৃষ্ণেন্দু?’

‘নিভা, এক বছরে মানুষের মধ্যে অনেক পরিবর্তন আসে। ট্রেনিং চলাকালীন আমি আর আসতে পারব না। এভাবে জীবনটা নষ্ট করিস না। যতটা নীচে নামার নেমেছিস, এবার উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা কর। অফিসে ভালো স্যালারি পাচ্ছিস, কাউকে বিয়ে করে সংসারে মন দে। আমি যতটা পারব সাহায্য করব।’

নিভা উত্তর দিল না। কৃষ্ণেন্দু লখনউ চলে গেল। চিন্তা করাও ছেড়ে দিল নিভা, সময় এবং ভবিতব্যের হাতে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল। যারা নিভাকে চিনত তারা বেশ বুঝতে পারল নিভা নিজেকে শোধরাবার কোনও চেষ্টাই করছে না, বাঁচার ইচ্ছেটাই যেন ও ছেড়ে দিয়েছে।

এই ভাবেই কয়েক বছর কেটে গেল। কৃষ্ণেন্দু ভালো ভাবে সেটেল করে গেল। মাঝেমধ্যে শহরে এলেও ইচ্ছে করেই হয়তো নিভার সঙ্গে দেখা করত না কিন্তু প্রত্যেক মাসে নিভার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দশ হাজার করে টাকা জমা করে দিত যাতে নিভার কোনওরকম অসুবিধা না হয়।

নিভা বিয়ে করবে না ঠিকই করে নিয়েছিল। ও ভালো করেই জানত কৃষ্ণেন্দুকে ও কোনওদিনও পাবে না কিন্তু মনে একটা আশা টিমটিম করে জ্বালিয়ে রেখেছিল। অপেক্ষা যত লম্বা হচ্ছিল নিভার মদের মাত্রা ততই বাড়তে থাকছিল। একদিন কানে এল, কৃষ্ণেন্দু বিয়ে করে নিয়েছে। সামান্য আশাটুকুও ভেঙে গেল নিভার। মদ আর সিগারেটে নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিল ও। ওর এমন অবস্থা হল, রোজ অফিস যাওয়াটাও ওর পক্ষে সম্ভবপর হতো না।

সরাসরি কৃষ্ণেন্দুর সঙ্গে ওর আর কোনওরকম সম্পর্ক ছিল না। কৃষ্ণেন্দুর বাবার ঠিক করে দেওয়া একটা চাকর গোছের লোক নিভার খোঁজখবর নিতে আসত। ওর কাছ থেকেই নিভা কৃষ্ণেন্দুর কথা জানতে পারত আর সম্ভবত ওই, কৃষ্ণেন্দুকে নিভার সব খবর জানাত।

অতিরিক্ত মদ এবং সিগারেট খাওয়ার ফলে নিভা অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল। কৃষ্ণেন্দুর বাবার চাকর প্রায় রোজই আসত ওকে দেখতে। ওরই সামনে একদিন নিভার রক্তবমি হল। ওই নিভাকে সঙ্গে নিয়ে এসে সরকারি হাসপাতাল ভর্তি করে দিল।

মেডিকেল রিপোর্টে ধরা পড়ল অত্যধিক মদ এবং সিগারেট খাওয়ার জন্য নিভার কিডনি, লিভার, ফুসফুস সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষ্ণেন্দু ওই লোকটির মাধ্যমে হাসপাতালের সব খরচ বহন করতে লাগল কিন্তু একটিবারও নিভাকে দেখতে নিজে হাসপাতালে এল না।

চিকিৎসায় কোনও ঘাটতি রাখতে দেয়নি কৃষ্ণেন্দু ঠিকই কিন্তু ভালো ভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলেও নিভার উপকার খুব একটা হচ্ছিল না ডাক্তাররা বেশ বুঝতে পারছিলেন। ওর মনের বোঝাটাই শরীরের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শরীরের জন্য নয়, মনের কষ্টটাই ওকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছিল ধীরে ধীরে। নিভার যখন এই অবস্থা, ঠিক তখনই আশীর্বাদের মতোই নিভার জীবনে অনুভার প্রবেশ। নিভার নতুন জীবনের সূত্রপাত অনুভার হাত ধরেই সুস্থ হয়ে নিভা অনুভার বাড়িতে এসে গেল ঠিকই কিন্তু একটাই অস্বস্তি ওর মনের মধ্যে খচখচ করে বিঁধতে লাগল, কতদিন এভাবে আশ্রিত জীবনযাপন করবে?

মহাভারতে যক্ষের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় যুধিষ্ঠিরের কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের একে একে মৃত্যু বরণ করে নিতে হয়েছিল। ঠিক সেরকমই নিভার জীবনেও একটাই প্রশ্নের কোনও উত্তর ছিল না। এরপর কী হবে নিভার জীবনে? পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে অসুখে ভুগে নিভার সৗন্দর্যের ধার অনেকটাই কমে এসেছিল, চাকরিও চলে গিয়েছিল আর কৃষ্ণেন্দুর সঙ্গেও সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

অনুভার স্বামী হিমাংশু সরকারি দফতরে উঁচু পদে ছিলেন। তিনি চেষ্টা করে নিভাকে একটি সংস্থার কাজ জুটিয়ে দিলেন। সংস্থাটি অনাথ বাচ্চাদের দেখাশোনা এবং শিক্ষাদানের কাজ করত। আরও কিছুদিন অনুভার কাছে থেকে অনুভার চেষ্টাতেই নিভা একটা ছোটো ফ্ল্যাট খুঁজে নিল। ঘরদোর মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিয়ে নিয়ে অনুভাকে সঙ্গে করে নতুন ফ্ল্যাটে চলে এল নিভা। দু’দিন নিভার কাছে কাটিয়ে অনুভা নিজের বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হয়ে নিল।

‘আমি আবার একা হয়ে যাব, অনুভা।’

‘না, তুমি একলা নও। আমরা সবাই তোমার সঙ্গে আছি। আগে স্বার্থসিদ্ধির জন্য তেমার সো-কলড বন্ধুরা তোমাকে ঘিরে থাকত, তাই তোমার পতনটাও তাড়াতাড়ি হয়েছিল। এখন তোমার জীবনের একটা লক্ষ্য রয়েছে, বাচ্চাদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করা। লক্ষ্য স্থির রেখে যদি অতীতের কথা চিন্তা করো তাহলে দেখবে একা রাস্তা চললেও কখনও ভুল রাস্তায় পা ফেলবে না’, অনুভা আশ্বাস দেয়।

লজ্জা পেয়ে নিভা মুখ নামিয়ে নেয়। অনুভা ওর মুখটা তুলে ধরে। নিভার চোখে জল। বহু বছর পর নিভার চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব