টানাপোড়েন (শেষ পর্ব)

রান্নার দিদি চলে যেতেই ভিডিওটাতে ক্লিক করে মনে হয়েছিল, মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। আগের দিনের নগ্ন হয়ে চলা মেয়েটির ভিডিও। তফাৎ একটাই সে ভিডিও-র কোণায় তুহিনের স্পষ্ট ঝুলে থাকা মুখ।

বুঝতে পারছিল সর্বনাশের মাথায় উঠল নিজের জীবন। আর তার জন্য অন্য কেউ নয়, ও নিজেই দায়ী। এতদিনের সাজানো গোছানো সংসার মনে হচ্ছিল, খড়কুটোর মতো ভেসে যাওয়ার মুখে।

গুম হয়ে বসেছিল বেশ কিছুক্ষণ। তারপরই বিদ্যুৎঝলকের মতো একটাই নাম ভেসে এসেছিল- প্রশান্ত। একমাত্র যাকে বিশ্বাস করে সবটা বলা যায়।

প্রশান্ত তুহিনের থেকে বছর তিনেকের ছোটো। দুটো পাড়া পেরিয়ে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকে। অফিস যাওয়ার সময় একই ট্রেন ধরে, যদিও প্রশান্তর কর্মস্থল কলকাতার অন্য পাড়ায়। বরাবর বেশ চটপটে, বুদ্ধিমান আর বিশ্বাসী। কখনওই এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে করার অভ্যাস নেই। ফোন কেনার আগে যে দু’একজনের পরামর্শ নিয়েছিল তুহিন, প্রশান্ত অন্যতম। ফোনে ব্যাপারটা শুনে রবিবার বিকেলেই তুহিনের ফ্ল্যাটে হাজির হয়েছিল প্রশান্ত। দু’জনে দু’কাপ চা নীরবে শেষ করার পর প্রথম মুখ খুলেছিল তুহিনই, আমার কিন্তু বেশ টেনশন হচ্ছে।

—টেনশনের কিছু নেই। ব্যাপারটা এখন খুব কমন, ফোনে যে আশ্বাসের গলা শুনেছিল, সেভাবেই বলল প্রশান্ত।

—কমন?

—ভীষণই। আর এ কেস এখন সবধরনের মানুষের সঙ্গেই ঘটছে। মেয়েদেরকে পর্যন্ত জড়িয়ে দিচ্ছে এইসব র‍্যাকেট। বুকের দপদপানিটা আরও বেড়েছিল। উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘উপায়?’

—সময়টা একটু বেশিক্ষণ নিয়ে ফেলেছ। যখনই দেখলে ন্যাকেড কেস, বেরিয়ে চলে আসা উচিত ছিল।

—আসলে এত হকচকিয়ে গেছি, গলায় লজ্জাভাব এলেও তা ঢাকার চেষ্টা করেছিল তুহিন, এত জানি না। পুরো ব্যাপারটাই গুবলেট হয়ে গেছিল। যতক্ষণে বুঝেছি, লেট হয়ে গেছে। এখন কী করব, সেটা বল।

নিজের গোঁফের দুপ্রান্তে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করে প্রশান্ত বলেছিল, ‘করার আর কী আছে! সব বলে সাইবার সেলে রিপোর্ট করাটাই ঠিক রাস্তা।’

সাইবার মানেই পুলিশ। সারাজীবনে কোনওদিন পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়নি তুহিনকে। বুঝতেই পারছে, দুর্ভোগের একশেষ। নেভা গলায় বলেছে, ‘আমাকে যেতে হবে?’

আশ্বাস দিয়ে প্রশান্ত বলেছিল, ‘তোমাকে কেন শুধু! আমিও যাব সঙ্গে। ’

প্রশান্ত যাবে শুনে নেভা আগুন কিছুটা জ্বলে উঠেছিল। বলেছিল, ‘আমি যে মেসেজটা রিসিভ করেছি, মানে দেখেছি, সে নিয়ে কিছু চেস করবে নাকি!’

—মনে হয় না। করলে দেখা যাবে।

—তাহলে কবে যাচ্ছি আমরা?

—আমার মনে হয়, আরও চব্বিশ ঘণ্টা দেখে নেওয়া ভালো।

—চব্বিশ ঘণ্টা মানে কিন্তু মঙ্গলবার হয়ে যাচ্ছে প্রায়। এর মধ্যে কোনও কল বা মেসেজ এলে ?

—ধরার দরকারই নেই। ইগনোর করো। শুধু রেকর্ডটা ঠিকঠাক রাখা দরকার।

রবিবার রাতেই শাশ্বতী পর্ণাকে নিয়ে ফিরে এসেছে। দুরুদুরু বুক নিয়ে কেটে গেছে কাল মানে সোমবারও। কাল দুপুরে অফিসে পরপর দুবার ফোন এসেছে ওই একই নম্বর থেকে। না তুললেও মনে হচ্ছিল সবাই যেন সব জেনে ফেলল। এরই মধ্যে শাশ্বতীর গরম মেজাজ যেন তুহিনের ব্লাড প্রেসার দ্বিগুন করে দিচ্ছে।

আজ সকালেই হোয়াটসঅ্যাপে প্রশান্তর সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। চন্দননগর স্টেশনে সাইকেল গ্যারাজে সাইকেল জমা দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। প্রশান্ত এসে বাইকে তুলে নেবে তুহিনকে। নিজে অফিস ছুটি নিয়ে নিয়েছে। ওর জন্য আর একজনকেও অফিস কামাই করতে হচ্ছে, ভেবে খারাপ লাগছে। নিজের জীবনের টানাপোড়েন যে কতজনকে ছুঁয়ে ফেলছে!

আড়চোখে বউ-এর দিকে তাকাল তুহিন। ঝড়ের গতিতে পর্ণার টিফিন গুছিয়ে দিচ্ছে। পর্ণার স্কুলের বাস আসার সময় হয়ে আসছে। ফোন বাজছে শাশ্বতীর। টিফিন বক্স পর্ণার স্কুলব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতেই ফোন ধরল। ফোন বাজলেই বুক কেঁপে উঠছে তুহিনের।

—হ্যাঁ, শাড়ি দুটো গিয়ে তোকে আজকেই ফেরত দিয়ে দেব, শাশ্বতীর গলায় বিরক্তিটা থেকেই যাচ্ছে।

শাড়ির ব্যাপার মানে, ইলা। বউয়ের ক্লোজ বন্ধু অনেককালের। বর চাকরি করলেও শাড়ির ব্যাবসাটা ভালোই চালায় ইলা। শাশ্বতী মাঝেমধ্যে শাড়ি নেয় ওর থেকেই।

ঘড়ি দেখল তুহিন। তৈরি হতে শুরু করা দরকার। ব্যাপারটা ঠিক অফিস যাওয়ার মতোই লাগা দরকার। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছে প্রশান্ত প্রতিটা স্টেপ।

স্টেশনের গ্যারাজে সাইকেল জমা দিয়ে মেন রোডে উঠতেই বাইক নিয়ে প্রশান্তকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তুহিন। মাথার চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল।

নিজের শহরে পুলিশ থানারও যে এতগুলো বিভাগ আছে, অজানা ছিল। শেষবার থানায় এসেছিল কলেজে পড়ার সময়। এক বন্ধুর সাইকেল চুরির রিপোর্ট করতে। থানা-পুলিশ ব্যাপারটাই সাংঘাতিক রকম অপছন্দ তুহিনের। ঠিক উলটো চরিত্র দেখছে প্রশান্তকে। রীতিমতো সব জানা। দু’-তিনজন তো হেসে হেসে কথা বলল। আত্মবিশ্বাস বাড়লেও ভেতরের ভয় ভয় ভাবটা ছোটো ছোটো বুড়বুড়ি কেটেই চলেছে।

সাইবার বিভাগটা সাজানো গোছানো। ঠিক যেন সরকারি অফিস নয়, কর্পোরেট-সুলভ। বারান্দার মতো যে অংশটায় ওরা সোফায় বসে আছে, তার আশেপাশে ইনডোর প্ল্যান্ট। ঘষা কাচের দরজা ফাঁক করে কয়েকজনের যাতায়াতের মধ্যে ভেতরটা দেখে নিয়েছে তুহিন। অনেকগুলো কম্পিউটার বসানো। সেখানে কেউ কেউ পুলিশের ড্রেসে, কেউ কেউ সাধারণ ড্রেসে কাজ করছে, কথা বলছে। প্রশান্ত সঙ্গে না থাকলে তো আসতেই পারত না তুহিন।

—আপনাদের ভেতরে ডাকছেন ডিউটি অফিসার। একজন কনস্টেবল অফিসের দরজা খুলে তুহিনদের উদ্দেশে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে আবার ভেতরে অদৃশ্য হল।

ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল দু’জন। আড়চোখে লক্ষ করল তুহিন, প্রশান্ত অনেক বেশি সাবলীল। সামনের জিন্স, সাদা গেঞ্জি পরা তিরিশের আশেপাশের ছেলেটিই নিশ্চই ডিউটি অফিসার।

কম্পিউটার, পর্দা আর এসি-র ঠান্ডায় ভেতরটা বাইরের থেকেও আরও বেশি কর্পোরেট-সুলভ। হাত তুলে দু’জনে নমস্কার করতেই অফিসার সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। থানার অফিসারদের যেরকম কর্কশ বলে শোনা যায়, মোটেও ছেলেটির ব্যবহার সেরকম নয়। বরং একটা মোলায়েম ভাব আছে।

—বলুন, সামনের কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে মাউসে হাত রাখা অবস্থাতেই বললেন অফিসার।

ঠিকই ছিল, যা বলার বলবে প্রশান্তই। ভণিতা না করে ও বলল, ‘দেখুন, ইনি আমার বন্ধু। কম্পিউটার, স্মার্টফোন সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নয়। ফোনটা কেনাও রিসেন্টলি। অযথা একটা ব্ল্যাকমেলিং-এর শিকার হচ্ছে।’

—কোনও আসা লিংক ক্লিক করে ফেলেছেন, এই তো? রেকর্ডেড পার্ট পরে ক্লিপ করে সেন্ড করেছে। খুবই নিস্পৃহ গলার আওয়াজ অফিসারের।

তুহিন জোরে ঘাড় নাড়ল। প্রশান্ত বলল, ‘একটা থ্রেটও…।’

—কোনও পাত্তা দেবেন না। আর টাকা-পয়সা তো একদম নয়। কিছু ভয় পাবার নেই। এরা করে কী, সাধারণত একটা ব্লু-সাইটের সামনে আপনার মুখের রেকর্ড করে নেয়। আর তারপর চলতে থাকে টাকা নেবার জন্য কায়দা করে কল। কিছু দিয়েছেন নাকি? শান্ত, কাউন্সেলিং-এর ভঙ্গিমায় বলতে থাকেন অফিসার।

এবারও জোরে না-বাচকে ঘাড় নাড়ে তুহিন।

—ব্যস। তাহলে চিন্তার কোনও কারণ নেই। ফোন তুলবেনই না এসব ক্ষেত্রে। খুব বেশি ডিস্টার্ব করলে ব্লক করুন। তবে এক নম্বর তো এরা বেশিদিন রাখে না, পাত্তা না পেলে এরাও হাল ছেড়ে দেয়। ভয় পাবার কিছু নেই। কাউকে এরা জানাতে টানাতে যায় না।

খুব হালকা লাগছিল তুহিনের। প্রশান্ত হাসিমুখে বলল, ‘যাক। তুমি রিলিভড তো?”

হাসি ফিরিয়ে দিয়ে তুহিন বলল, “ওঠা যাক।’

দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। ইলাকে নিয়ে বাইরের সোফায় বসে আছে শাশ্বতী। বোঝাই যাচ্ছে, শাশ্বতীও ওকে দেখে একইভাবে শক খেয়েছে। না হলে ওভাবে উঠে দাঁড়াত না। প্রশান্ত একবার তুহিনের আর একবার শাশ্বতী-ইলার দিকে তাকাচ্ছে।

এগিয়ে আসে ইলাই, ‘আর বোলো না তুহিনদা। একটা বিচ্ছিরি ব্যাপারে এমন ফেঁসে গেছে না শাশ্বতীদি। হোয়াটসঅ্যাপে একটা কোথা থেকে লিংক এসেছিল। ক্লিক করে ফেলেছে… এখন ফোন করে থ্রেট মারছে।’

টানাপোড়েনটা এতদিন মনে হচ্ছিল শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কতদূর ছড়িয়েছে এবার বুঝতে পারছে তুহিন। চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে শাশ্বতী।

ইলার কথার জবাব না দিয়ে বউ-এর কাছে এবার এগিয়ে যায় তুহিন…

(সমাপ্ত)

২০২৫-এ ওয়ার্ডরোব মেকওভার

বয়স অল্প হলে যে-কোনও পোশাক পরলে যেমন মানিয়ে যায়, কখনও আবার তাদের সেই নতুন পোশাকই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু বয়স ৩০-৩৫-এ পৌঁছালেই বুড়িয়ে যাচ্ছেন, নিজেকে আর ফ্যাশনেবল রাখা সম্ভব নয়— এমন ধারণা করে নেওয়াটা ঠিক নয়।

ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিলারা যদি সঠিক পোশাক নির্বাচন করেন, তাহলে তারাও সৌন্দর্যে নতুন প্রজন্মকে ভালোমতো টেক্কা দিতে পারবেন।

অল্প বয়সে ম্যাচিওর লুক পাওয়ার জন্য কখনও মায়ের শাড়ি কিংবা সালোয়ার নিয়ে কিশোরীরা পরেই থাকে। কিন্তু শরীর, মন যত ম্যাচিওর করবে, ততই খুব কম প্রয়াসে নিজের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা সহজ হয়ে যাবে। দরকার শুধু ওয়ার্ডরোব মেকওভার।

বাহারি সব ডিজাইনের কুর্তি, কামিজ শুধু ক্যাজুয়াল পোশাক হিসেবেই নয়, সান্ধ্য পার্টিতেও প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যাপক ভাবে। পরিধেয় পোশাকের ধরনে নতুনত্ব আনলে যেমনটি ভালো লাগবে নিজের, তেমনই অন্যদের চোখেও হয়ে ওঠা যায় আকর্ষণীয়। ভদ্র-নম্র পোশাক হিসাবে গোটা উত্তর ভারতে লম্বা ঝুলের কামিজ ও সালোয়ার বা পালাজো স্যুটের জয়জয়কার। কাপড়ের ধরন ও প্যাটার্নভেদে বিভিন্ন দাম পড়ে এইসব পোশাকের। ডিজাইনাররা নিজস্ব পছন্দ এবং তরুণীদের কথা মাথায় রেখে, নিয়ে এসেছেন বিভিন্ন মনমাতানো ডিজাইনের কুর্তি আর কামিজ।

সালোয়ার স্যুটের সুন্দর মার্জিত শৈলী চিরকালই ফ্যাশনেবল। নরম আরামদায়ক ফ্যাব্রিক, সুন্দর কাট দ্বারা আকর্ষণীয় করা হয়েছে এইসব পোশাককে। কখনও মাল্টিকালার ফ্লাওয়ার মোটিফ, কখনও প্রিন্টেড বা ফাইন এমব্রয়ডারি করা ইয়োক বা হেমলাইন। স্টোন ফিটিং-সহ থ্রি-কোয়ার্টার হাতা। যেন হাজারো রঙের সংযোজন ঘটেছে এইসব পোশাকে।

বিয়েবাড়িতেও সালোয়ার স্যুট খুবই মানানসই। এই পোশাক পরতে চাইলে, সবচেয়ে ভালো মানাবে সিল্কের কুর্তা আর বেনারসি দুপাট্টার কম্বিনেশন। সিল্ক কুর্তার সঙ্গে মানিয়ে যায় যে-কোনও উজ্জ্বল রঙের দুর্দান্ত একটি বেনারসি দুপাট্টা। সুবিধে হচ্ছে, বাঙালিদের বাড়িতে বেনারসি এক-আধটা পাওয়া যাবেই। অনেক সময় মা-দিদিমাদের পুরোনো বেনারসিও অযত্নে পড়ে থাকে আলমারির এক কোণে। সেই শাড়িগুলিকে কাজে লাগানোর একটা চেষ্টা করে দেখাই যায়।

এমন অনেক ডিজাইনার আছেন, যাঁরা পুরোনো বেনারসির পাড় বা আঁচলটুকু দারুণ ভাবে কাজে লাগিয়ে আপনার জন্য তাক লাগানো পোশাক বানিয়ে দিতে পারেন। বেনারসি শাড়ির ভালো অংশটুকু কেটে নিয়ে খুব ভালো মানের লাইনিং লাগিয়ে আস্ত কুর্তা তৈরি করে নেওয়া সম্ভব। কারুকাজ করা আঁচল দিয়ে বানানো যায় স্কার্ফ। স্রেফ পাড়টুকু খুলে নিয়ে অন্য কোনও সলিড কালারের শাড়িতে লাগিয়ে নিন, চমৎকার দেখাবে!

যেহেতু আজকাল কামিজের কারিগরি তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতোই সুন্দর, তাই এর সঙ্গে একগাদা গয়না পরে পোশাকের সৌন্দর্যটা নষ্ট করার মানেই হয় না! যে-কোনও একটি তাক লাগানো গয়না বেছে নিন। তা ঢোকার হতে পারে, হতে পারে কানের ভারী দুল বা হাতের ব্রেসলেট। মেক-আপ করুন পোশাকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। লিপস্টিক, আইশ্যাডো বা ব্লাশ অন-এ অতি উচ্চকিত রঙের ব্যবহার কিংবা দারুণ হেয়ারস্টাইল ছাড়াও আপনি ঝলমলিয়ে উঠবেন অনুষ্ঠানবাড়িতে!

সঠিক মাপ ও শেপ-এর পোশাক

সব বয়সেই ফিগার মেনটেইন করতে পারবেন অর্থাৎ ৩৪-২২-৩৬ ফিগার হবে- এটা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর নাও হয়ে উঠতে পারে। তার মানে এই নয় যে, সঠিক শেপ- এর ফিটিংস ড্রেস পরা ছেড়ে দিতে হবে। ফিগার যদি সুন্দর হয়, যে-কোনও বয়সেই মাপ অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করতে পারেন, ফলে নিজের পারফেক্ট বডিশেপ অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই এবং নিজের পছন্দের পোশাকেই হয়ে উঠতে পারবেন অনন্যা।

বয়স বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে পেটে যদি সামান্য মেদ-ও জমা হয়, , চিন্তার কিছু নেই। বডি হাগিং ড্রেস যেমন টামি হাইড করবে, ঠিক তেমনই পাবেন পারফেক্ট লুক।

যদি ব্রেস্ট লাইন সামান্য ঝুঁকে গেছে বলে মনে হয়, তাহলে সাপোর্টিভ ব্রা পরে সঠিক লুক আনতে পারেন। বডি শেপার শেপওয়্যার, সাপোর্টিভ ব্রা-এর নানা ভ্যারাইটি এখন মার্কেট এবং অনলাইনেও সহজে অ্যাভেলেবল।

ব্ল্যাক শেডস পোশাক

ওয়ার্ডরোব-এ ব্ল্যাক শেডস-এর কালেকশন অবশ্যই রাখুন। যেমন ব্ল্যাক ড্রেস, টপ, কুর্তি, শাড়ি, জিন্‌স ইত্যাদি। এভারগ্রিন ব্ল্যাক শেড কখনওই আউট অফ ফ্যাশন হবে না। যে-কোনও সিজন-এ, নিজের খুশিমতো পার্টিতে, ফর্মাল মিটিং-এ অথবা অনুষ্ঠান বা ফেস্টিভ্যালে ব্ল্যাক ড্রেস, শাড়ি— সবকিছুই পরা যেতে পারে। কালো রঙের পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং হ্যান্ডব্যাগ, হাতঘড়ি, ফুটওয়্যার সবকিছুই আজও ফ্যাশনে ইন।

নি-লেংথ ড্রেস

আগে পার্টিতে ড্রেস পরে অনায়াসেই যখন নিজেকে ক্যারি করতে পেরেছেন, তাহলে এখন করতে কীসের লজ্জা? ৩০ বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়া মানে আপনি ড্রেস পরে আর পার্টি এনজয় করতে পারবেন না— এমন নয়। ফ্যাশন এবং কমফর্ট দুটোরই খেয়াল রেখে শর্ট ড্রেস-এর বদলে হাঁটু পর্যন্ত ড্রেস পরুন, আপনার সৌন্দর্য বা ফ্যাশনে এতটুকু ঘাটতি হবে না।

স্ট্র্যাপি টপস

কলেজে থাকাকালীন স্ট্র্যাপি টপস পরতে যখন দ্বিধা করেননি, তখন একটু বেশি বয়সে এসে কেন এটা অ্যাভয়েড করবেন? এখনও নিজের ওয়ার্ডরোব-এ স্ট্র্যাপি টপস রাখতেই পারেন। কিন্তু যখন কিনবেন, তখন একটু চওড়া স্ট্র্যাপ-এর ড্রেস বা টপ হলেই ভালো হয়। এতে আপনার কমফর্ট লেভেল-ও বজায় থাকবে আর দেখতেও স্টাইলিশ লাগবে।

ওয়ান পিস ড্রেস

ওয়ান পিস, গাউন, ম্যাক্সি, বিচ ড্রেস ইত্যাদি ৩০ বছর বয়সের পরেও অনায়াসে পরতে পারেন। এই ধরনের আউটফিট-এ যথেষ্ট ফ্যাশনেবল হয়ে উঠতে পারবেন। পার্টি, অনুষ্ঠানে ওয়ানপিস বা গাউন পরতে পারেন, আবার হলিডে সেলিব্রেশনের সময় বিচ ড্রেস আপনার পার্সোনালিটির সঙ্গে মানানসই হতে পারে। রেগুলার ওয়্যার-এর জন্য ম্যাক্সি ড্রেসও ট্রাই করতে পারেন।

জিন্‌স

টিনএজারস থেকে শুরু করে, সব বয়সের মহিলারাই জিন্স পরতে পছন্দ করেন। তবে একটু বেশি বয়সে জিন্স-এর  সঙ্গে টাইট ফিট স্কিনি টি-শার্ট একটু বিসদৃশ লাগতে পারে। ফর্মাল শার্ট, লুজ কুর্তার সঙ্গে স্মার্ট দেখতে লাগবে। লং ওয়েট-এর বদলে হাই ওয়েট জিন্‌স আপনাকে বেশি মানাবে।

শাড়ি

রেগুলার ড্রেস বা প্যান্টস, টপ, জিন্স ইত্যাদির লুকে যদি বোর ফিল করতে আরম্ভ করেন, তাহলে শাড়ি ট্রাই করে দেখতে পারেন। চেহারায় ভালো একটা পরিবর্তন আসবে। শরীরের খামতিগুলো শাড়ির সাহায্যে অনায়াসেই লুকিয়ে ফেলা সম্ভব আকষর্ণীয় লুক বজায় রেখেই। শাড়ির সঙ্গে স্লিভলেস, ব্যাকলেস, হল্টার অথবা টি-নেক ব্লাউজ পরুন, আপনার স্টাইল স্টেটমেন্ট অনেকেরই ঈর্ষার কারণ হতে পারে। বিশেষ কোনও জায়গায় রয়্যাল লুক ক্যারি করতে হলে বেছে নিন ডিজাইনার শাড়ি।

মিডিয়াম-সাইজ স্কার্ট

শর্ট স্কার্ট বা খুব লম্বা স্কার্ট নয়, হাঁটু অবধি বা হাঁটুর একটু নীচে অবধি স্কার্ট পরতেই পারেন। টি-শার্ট বা টপ-এর পরিবর্তে শর্ট, কুর্তির সঙ্গে পেয়ার করুন। এটি যথেষ্ট স্মার্ট ড্রেস। ডার্ক বা ব্রাইট শেড লং স্কার্টের সঙ্গে ম্যাট কালার এবং লাইট কালারের কুর্তি আপনাকে দেবে ব্যালেন্সড লুক।

জ্যাকেট অথবা কোট

জিন্স অথবা স্কার্টের সঙ্গে টাইট ফিটিং টপ, টি-শার্ট যদি পরেন, উপরে পরে নিন জ্যাকেট বা কোট, যাতে নিজেকে সফেস্টিকেটেড লুক দেওয়া যায়। যদি আপনার পোশাক ফুলস্লিভস হয়, তাহলে স্লিভলেস জ্যাকেট বা কোট আপনার সাজকে পারফেক্ট করে তুলবে।

পার্কিং ফি বাড়লে সমস্যায় পড়বেন সাধারণ মানুষ

দিল্লির মতো শহরগুলিকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে, রাজ্য সরকার এবং পৌরসভাগুলি উদ্ভট সমাধান খুঁজে বের করে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজেল চালিত সমস্ত যানবাহনগুলিকে বাইলেন-এ চলার অনুমতি দেওয়া, পার্কিং স্পেসগুলিতে ভারী চার্জ আরোপ করা এবং শহরে প্রবেশকারী যানবাহনের উপর ট্যাক্স নেওয়া।

শহরগুলিতে দূষণ অনেক কারণে ঘটে এবং যানজট শুধুমাত্র সরকারী কর্মকর্তাদের উদ্ভট সিদ্ধান্তের কারণে হয়। প্রতিটি শহরে সরকারি কর্মকর্তারা শহরের ময়লা পরিষ্কারের জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করার হিসাব দেখালেও, সেই টাকার অর্ধেক তাদের পকেটে যায়।

প্রতিটি শহরে আসলে কিছু মানুষের মন-মানসিকতায় পচন ধরেছে। যার প্রতিফলন ঘটছে পরিবেশে, দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে বায়ুও।

এটি একটি বিভ্রম যে, শহরগুলিতে পার্কিং ফি বাড়ানো হলে গাড়ির সংখ্যা হ্রাস পাবে। আসলে যা হবে তা হল— লোকেরা তাদের গাড়ি আরও দূরে পার্ক করবে। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়বে। যেখানে ফি নেওয়া হয় না,  সেখানে লোকেরা তাদের গাড়ি পার্কিং শুরু করবে এবং এর ফলে বাড়ির মালিক, দোকানদার, বিভিন্ন সংস্থার নিরাপত্তারক্ষী এবং পুলিশের সঙ্গে প্রতিদিন ঝগড়া হবে।

যদি শহরগুলিতে ধোঁয়া দূষণ কমাতে হয়, তাহলে প্রথম প্রয়োজন সঠিক ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা কিন্তু কেউ এটি করতে প্রস্তুত নয়। কারণ, এতে কাজটি সরকারী কর্মকর্তা এবং পরিদর্শকদের করতে হবে, যারা বেশি উপার্জন করতে আগ্রহী কিন্তু শহর চালানোর ইচ্ছে নেই। ফুটপাথ-এ দোকানপাট না থাকলে, অর্ধেক যানজট স্বয়ংক্রিয় ভাবে ঠিক হয়ে যাবে। যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের সময় নষ্ট হয় এবং দৃশ্যদূষণও হয়, যা বিরক্তিকর।

সরকার কিংবা পুলিশ কোথাও পর্যাপ্ত সংখ্যায় ট্যাক্সি, অটো, ই-রিক্সা চালানোর অনুমতি দিতে চায় না যানজটের অজুহাত দেখিয়ে কিন্তু তা সত্ত্বেও যানজট এড়ানো সম্ভব হয়েছে কি? আসলে এসব করা হয় পারমিট দিয়ে মোটা অংকের টাকা নেওয়ার জন্য।

পার্কিং ফি বাড়ানোর আগে বিকল্প সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবতেও পারে না সরকার। আগে মুম্বইতে শেয়ার ক্যাবের সুন্দর ব্যবস্থা ছিল, যা এখন প্রায় নেই। অথচ শেয়ার ক্যাবের মতো সুবিধা পেলে সাধারণ মানুষের অনেকটাই আর্থিক সাশ্রয় হতে পারে। অবশ্য পৌরসভার কর্মকর্তারা কেন এ নিয়ে মাথা ঘামাবেন? তাঁরা তো টাকা তুলতে চান, সেবা দিতে চান না। পার্কিং ফি বাড়ানো মানে সাধারণ মানুষ আরও আর্থিক সমস্যায় পড়বেন। কারণ, ক্যাব পার্কিংয়ের ফিজও যাত্রীকেই বহন করতে হবে।

গণপরিবহন বাড়লে ভালো কিন্তু যে-সব মহিলারা ভিড় বাসে যাতায়াত করতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাদের জন্যও তো বিকল্প উপায় করে দেওয়া উচিত। যাইহোক, বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ রইল। কারণ, পার্কিং ফি বাড়ানোর অর্থ হল, কোনও বাড়তি সুবিধা না দিয়ে, অফিসে যাওয়া, কেনাকাটা করতে যাওয়া, স্কুল-কলেজে যাওয়া কিংবা রেস্তোরাঁয় যেতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া।

টানাপোড়েন (পর্ব-০১)

ব্রেকফাস্ট টেবিলে শাশ্বতীর মেজাজের বহর দেখে ভেতরের ভয়টা আতঙ্ক হয়ে দেখা দিল তুহিনের। বউ হিসাবে শাশ্বতী বেশ ধীর- স্থির এবং সহনশীল। কিন্তু শেষ এক সপ্তাহে শাশ্বতীর মেজাজ বেশ তুঙ্গে উঠে আছে। কারণটা নিঃসন্দেহে মেয়ে পর্ণার স্কুলের ফার্স্ট টার্মের রেজাল্টে সায়েন্স গ্রুপে নম্বর কমে যাওয়া। একটা টার্মে নিয়মিত আশি শতাংশ পাওয়া মেয়ে যদি হঠাৎ করে সত্তর শতাংশে নেমে আসে, তার জন্য মেজাজ এতটা উদগ্র হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস তুহিন দেখাতে পারেনি।

কাল রাতে বেডরুমে শাশ্বতী ঢোকার পর নিরীহ গলাতেই বলেছিল, ‘এসিটা একটু চালিয়ে দেবে?’

উত্তর এসেছিল বাজখাঁই গলাতে, ‘ইচ্ছে হলে নিজে চালিয়ে নাও। আমার দরকার নেই।’

এতগুলো বছরের বিবাহিত জীবনের সম্পর্কে সে অর্থে কোনও টানাপোড়েন নেই। গলা তবুও মিনমিনে করে বলেছিল, ‘ক্লাস নাইনে পড়া একটা মেয়ের স্কুল পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে আমার মনে হয়, তুমি অতিরিক্ত রিয়্যাক্ট করছ।’

বেশ রূঢ়ভাবে শাশ্বতী বলেছিল, ‘নিজে কেরিয়ার তৈরি করার পর যদি দিনরাত অফিস নিয়ে ব্যস্ত থেকে, টিউশনের টাকা দিয়ে নিজেকে খালাস ভাবো, তাহলে এ নিয়ে মন্তব্য করা তোমার সাজে না। বিশেষত যেখানে এক বছরের মধ্যেই বোর্ডের পরীক্ষা মেয়ের।’

পরের বলা কথা বা যুক্তি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে ভেবে চুপ করে গিয়েছিল তুহিন। নিজের ফোন সুইচড অফ করে ঘুমোনোর চেষ্টা করেছিল। এমনিতে নিজের মনও তিনদিন ধরে ভয়ংকর অস্থির হয়ে আছে।

ঘটনার শুরু ঠিক দুদিন আগেই। ফার্স্ট টার্মের পরীক্ষার পর স্কুল হয়েছে একটানা। দিন-দুয়েকের ছুটি পেয়ে শাশ্বতী পর্ণাকে নিয়ে গিয়েছিল বাপেরবাড়ি। শনি-রবি দুদিনই অফিস ছুটি থাকে তুহিনের। রান্নার লোকের করে যাওয়া ডাল-পোস্ত খেয়ে শনিবার দুপুরে একটু তাড়াতাড়ি দিবানিদ্রা যাবার তোড়জোড় করেছিল। বিছানায় শুয়েও এপাশ-ওপাশ করছিল। এসেও যেন ঠিক ঘুম আসছিল না।

নিজের স্মার্টফোন তুলে নাড়াচাড়া করছিল তুহিন। দামি স্মার্টফোনটা কিনেছে মাস দুয়েক। আগে ছোটো টেপা কি-প্যাড ফোন ব্যবহার করত। টেকনোলজি ব্যাপারটায় খুব একটা কোনওদিনই রপ্ত নয়। বিভিন্ন বন্ধুদের অনবরত ব্যবহার করতে দেখে ভেতরে ব্যবহার করার একটা প্রবল ইচ্ছে পেয়ে বসেছিল। নিজের অফিসের ডিপার্টমেন্টে এখনও পর্যন্ত প্রযুক্তির বিশাল ব্যবহার না হওয়াটাও কোথাও গিয়ে তুহিনকে যেন এ ব্যাপারে পিছিয়ে দিয়েছে। ফোন কেনার পরপরই দুমদাম করে নানা অ্যাপ ইনস্টল করে, তাদের ঘিরে একটা প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে শুরু হয়েছিল নিয়মিত নাড়াচাড়া। এটা-ওটার ফাংশানের ভেতর ঢুকে একটা অদেখা পৃথিবীকে আবিষ্কারের নেশা।

বিশেষত হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক। বন্ধুরা এন্তার মিম, জোকস, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলো দেখে, উপভোগ করে, আবার কনট্যাক্টের নানাজনের সঙ্গে দেদার শেয়ার করে যাচ্ছিল।

শনিবার দুপুরেই অজানা এক নম্বর থেকে চলে আসে একটা লিংক। ট্যাপ করতেই একটা নিষিদ্ধ পৃথিবীর অদ্ভূত ছোঁয়া। সম্পূর্ণ নিরাভরণ একটা মেয়ে পোশাক খুলে ক্রমশ মোহময়ী হয়ে উঠছে পরিষ্কার একটা বিছানায়। তার দেহের সৌষ্ঠবে হঠাৎই এতটাই ঘোর লেগে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য, যাকে বলে একেবারে হারিয়ে যাওয়া। শাশ্বতী আর ওর দৈহিক মিলন এখন নাম কা ওয়াস্তে, কালেভদ্রে। বিয়ের পরও শাশ্বতী যে খুব আকর্ষণীয় কায়দায় কিছু করত এমনও নয়। তবে এসব নিয়ে তুহিনের কোনওদিন কোনও অভিযোগ বা হতাশা ছিল না। বরং সন্তান হবার পর শরীরী এই দূরত্বটুকুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল নিজের অফিস আর সংসারের কর্তব্য পালনে। বাইরের পৃথিবীর দিকেও কোনওদিন চোখ তুলে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।

অথচ এ মেয়েটা যেন ঘাড় ধরে একটা খোলা, নিষিদ্ধ জানলার ওপারে দাঁড়িয়ে তুহিনকে দেখিয়ে নিল নিজের মোহময়ী শরীরকে। এক্ষেত্রে সেতুটা অবশ্যই নতুন স্মার্টফোন।

একটু সময় গড়িয়ে শাশ্বতীর কথাটা মনে পড়তেই নিজের ভেতরের লজ্জা জেগে ওঠে তুহিনের। তড়িঘড়ি অচেনা ওই নম্বর থেকে বেরিয়ে আসে।

একবার ভেবেছিল, সোজা নম্বরটায় ফোন করে চেস করে। কোনও বন্ধুর মজা ভেবে নিজেই বোকা হয়ে যাবার চিন্তায় আর করেনি। রাতে ফোন খুলে ওই নম্বরটায় গিয়ে দেখেছিল, লিংক মুছে ফেলা হয়েছে।

এই পর্যন্তও সব ঠিক ছিল। আসল গণ্ডগোলটা ঘটল পরদিন। মানে রোববার সকালে। তুহিন খাবার টেবিলে বসে একমনে সেঁকা পাঁউরুটিগুলোতে মাখন মাখাচ্ছিল, মাঝে মাঝে চোখ রাখছিল সামনে টেলিভিশনের খবরের চ্যানেলটায়। রান্না করতে আসা রীনাদি তখন ডিমের পোচ তৈরিতে ব্যস্ত।

ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা ফোন বেজে উঠতে ঝুঁকে দেখেছিল তুহিন। অজানা নম্বর। প্রথমে ভেবেছিল হাত জোড়া, পরে রিং ব্যাক করে নেবে। কী ভেবে ফোন অন করতে হিন্দিতে হওয়া কথোপকথনটা কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল।

সরাসরি কোনও ছেলে ভারী গলায় বলে উঠেছিল, ‘দেখিয়ে এক ভিডিও আপলোড হুয়া হ্যায় এক ওয়েবসাইট মে। উঁহা আপ এক নাঙ্গা লেড়কি কা সাথ দিখ রহি হো। উসকো হটানা পড়েগা।’

বুকের মধ্যে যেন বোমা ফেটেছিল। প্রথমেই মনে হয়েছিল, ‘ভাইরাল’ শব্দটা ভীষণই ইন। শাশ্বতীও বছরখানেক হল স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। মেয়ের থেকে এটা-ওটা দেখে নিলেও বোঝা যায়, বেশ পোক্ত হয়ে উঠেছে। বোঝাই যাচ্ছে, গণ্ডগোল যা ঘটার ঘটেই গেছে। এখন কোনওভাবে যদি এইসব ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে বউয়ের কাছে পৌঁছে যায়, যাকে বলে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটবে।

উত্তেজনা বুকে চেপে, চোয়াল শক্ত করে তুহিন বলেছিল, ‘আপ কৌন?’

—ও জরুরি নেহি হ্যায়। ক্যায়সে ও ভিডিও ডিলিট করনা হ্যায় সোচিয়ে। নেহি তো আপ সাইবার কেস মে ফাঁস যাও গে। ফোন কেটে গিয়েছিল। থম মেরে বসেছিল চেয়ারে। টিভির দিকে চোখ যেতে মনে হয়েছিল, সেখানে শব্দ নেই। সঞ্চালকের যেন শুধু ঠোঁট নড়ছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ। রান্নার দিদির কথায় চমকে উঠে তাকিয়েছিল।

—কলা খাবেন পাঁউরুটির সঙ্গে?

—না তাকিয়ে না-বাচকে ঘাড় নেড়েছিল শুধু। মাথা কাজ করছিল না। পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেবে, সেটাই বুঝতে পারছিল না। টেবিলে খাবার পড়েই ছিল। শরীরের কোষের কোনও অংশে খিদে জমা হয়ে থাকলেও খাবার মুখে তোলার ইচ্ছা হারিয়ে গেছিল। কান গরম, অথচ পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

ফোন তুলে নেট অন করতেই আবার চমকে গিয়েছিল। ওই নম্বরটা থেকেই নোটিফিকেশন। কাঁপা কাঁপা অবস্থাতেই খুলে দেখেছিল একটা ভিডিও।

(ক্রমশ…)

‘স্বর্ণকুমারী’ গোল্ড কোস্ট (পর্ব-০১)

অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত, কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর— গোল্ড কোস্ট। কুইন্সল্যান্ডের রাজধানী ব্রিসবেন থেকে মাত্র ৬৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই শহর। এখানে বছরে প্রায় ৮ মাসেরও বেশি গ্রীষ্মকাল। শীতকালের তাপমাত্রাও খুবই আরামপ্রদ। তাই বছরের যে কোনও সময় গোল্ড কোস্ট বেড়াতে যাবার জন্য আদর্শ।

ব্রিটিশ এক্সপ্লোরার ক্যাপ্টেন জেমস কুক প্রথম গোল্ড কোস্টে এসেছিলেন ১৭৭০ সালে। তবে তার আগে হাজার হাজার বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা এখানে বসবাস করত। অ্যাবোরিজিনাল ভাষায় এই এলাকার নাম ছিল ‘কুরুঙ্গুল’। যার অর্থ হল- ‘অফুরন্ত কাঠের জোগান’। ১৮৪০ সালের আগে পর্যন্ত ইউরোপিয়ান অভিবাসীদের মধ্যে এই অঞ্চলটি একরকম উপেক্ষিতই ছিল বলা চলে। কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় লাল সিডার কাঠের ব্যাবসা। আর তার জন্যই দলে দলে ইউরোপিয়ান অভিবাসীরা এখানে আসতে শুরু করে। তবে আরও অনেক পরে গোল্ড কোস্ট ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

অস্ট্রেলিয়া একটি দ্বীপ বলে এর চারিদিকেই সমুদ্র। সমুদ্র সৈকত এখানকার লোকেদের জীবনসঙ্গী। তবুও বলব, গোল্ড কোস্টের সমুদ্র সৈকত, বিশেষত সার্ফারস প্যারাডাইস, সত্যিই অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অদ্বিতীয়। এর স্বর্গীয় সৌন্দর্যের তুলনা একমাত্র সার্ফারস প্যারাডাইস নিজেই হতে পারে।

টুরিস্ট হিসেবে আপনি সুইম, সার্ফ, প্যাডেল বোর্ড করতে চান বা সমুদ্রের বালুর উপর শুধু শুয়ে শুয়েই দিনটা কাটিয়ে দিতে চান, সেটা সম্পূর্ণই নির্ভর করছে আপনার উপর। গোল্ড কোস্টে আপনি সব কিছুই পাবেন। এবার আমরা এসেছি সপরিবারে পাঁচদিনের ছুটি কাটাতে। তাই আর দেরি না করে প্রথম দিনই বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে সুইমিং কসটিউম, বিচ টাওয়েল, সান গ্লাস, টুপি আর সানস্ক্রিন ক্রিম নিয়ে। অস্ট্রেলিয়াতে বেড়াতে এলে সবসময় সানস্ক্রিন ক্রিম লাগানো একরকম জরুরি বলা চলে। এটি শুধু সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করবে তাই নয়, ভবিষ্যতে স্কিন ক্যান্সারের সম্ভাবনা থেকেও রক্ষা করবে। তাই সাবধানতাই একমাত্র সমাধান।

সার্ফারস প্যারাডাইস বিচ আর তার আশেপাশের ভ্রমণকেন্দ্রগুলো যদিও গোল্ড কোস্টকে বিশ্ব পর্যটন শিল্পের মানচিত্রে স্থান করে দিয়েছে, তবুও এ কথা অনস্বীকার্য যে, গোল্ড কোস্টের আশেপাশে আরও অনেকগুলো সুন্দর বিচ রয়েছে। তাছাড়া ট্যুরিস্টের ভিড় থেকে রক্ষা পেতে হলে এবং প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে চাইলে সার্ফারস প্যারাডাইস থেকে একটু বাইরে বেরোলেই অনেক সুন্দর সুন্দর বিচ দেখা যাবে। মেইন বিচ, ব্রড বিচ, মায়ামি বিচ, মারমেইড বিচ, নবী বিচ, কারামবিন বিচ এবং কুলানগাটা বিচ ট্যুরিস্টদের নিরাশ করবে না।

সার্ফারস প্যারাডাইস বিচে সাঁতার কাটতে শুরু করার আগে ভাবলাম একবার আশপাশের বিচগুলো ঘুরে দেখলে কেমন হয়। তাই গাড়ি নিয়ে সঙ্গে মোবাইল ফোনের ম্যাপ খুলে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই গেলাম মেইন বিচ। মেইন বিচের সমুদ্র সৈকতের সাদা বালিয়াড়ি ওয়াকিং আর সাইক্লিং, দুটোর জন্যই আদর্শ। এখান থেকে সাউথ স্ট্র্যাডব্রোক দ্বীপ দেখতে পাওয়া যায়। চাইলে বোটে করে স্ট্র্যাডব্রোক দ্বীপ থেকে ঘুরেও আসা যায়। তবে যারা সার্ফিং শিখতে চান, মেইন বিচ তাদের জন্য আদর্শ জায়গা।

এরপর গেলাম ব্রড বিচে। অনেককেই দেখলাম সারা শরীরে সানস্ক্রিন ক্রিম মেখে বালুর উপর টাওয়েল বিছিয়ে শুয়ে আছে। কারও কারও চোখ বন্ধ, কেউ আবার গল্পের বই পড়ছে। আমরা বেশ কিছুক্ষণ সমুদ্রের ধারে হেঁটে আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কারামবিন বিচের উদ্দেশে। কারামবিন বিচ সার্ফিং-এর জন্য বিখ্যাত। এখানে একটা সার্ফ স্কুলও রয়েছে। যে-কেউ ইচ্ছে করলে এখান থেকে সার্ফিং শিখতে পারে। এই বিচে সার্ফ লাইফ সেভাররা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাহারা দেয়। এদের হাতে লাল আর হলুদ রঙের ফ্ল্যাগ থাকে। এদের কাছাকাছি কোথাও সুইমিং বা সার্ফিং করলে প্রয়োজনে এরা সাহায্য করতে পারে।

এরপর গেলাম আমাদের আজকের শেষ গন্তব্যস্থল কুলানগাটা বিচ-এ। এটি নিউ সাউথ ওয়েলস আর কুইন্সল্যান্ডের সীমারেখায় অবস্থিত। সার্ফারস প্যারাডাইস থেকে এর দূরত্ব প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার। সমুদ্রের ধার দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসার সময় বুঝতেই পারিনি এতটা পথ চলে এসেছি। এই বিচের শান্ত জল সুইমিং করার জন্য আদর্শ। কোনও এক অলস রবিবারে এই বিচের ধারে হাঁটতে হাঁটতে কার না ইচ্ছে করে ফেলে আসা অতীতের কোনও এক মিষ্টি মধুর প্রেমের কাহিনিতে ফিরে যেতে। এখানেই একটা রেস্তোরাঁতে খেয়ে আবার রওনা দিলাম সাফারস প্যারাডাইসের পথে।

সার্ফারস প্যারাডাইসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিনটে বাজল। একপাশে বিচ, আরেকদিকে সব হাই রাইজ বিল্ডিং। এখানের সমুদ্র সৈকতে তিন কিলোমিটার জুড়ে শুধুই সোনালি বালু। এটি শুধু অস্ট্রেলিয়ার নয়, সারা বিশ্বের সব থেকে সুন্দর বিচগুলোর মধ্যে একটি। সুইমিং, সার্ফিং, এমনকী জগিং করার জন্যও দূরদূরান্ত থেকে এখানে লোক আসে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই শহরের প্রাচীন নাম ছিল এলস্টোন। এক সময়ের একটা ছোট্ট কৃষিভিত্তিক শহর থেকে আজকের বিশ্ব বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত আর ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনে পরিণত হতে প্রায় এক শতাব্দী লেগে গেছে।

সার্ফারস প্যারাডাইসের বিচে সব থেকে বেশি ভিড় নজরে পড়ল। সমুদ্রের জলে স্নান করার লোভটা আর সামলাতে না পেরে এবার নেমে পড়লাম জলে। মুহূর্তেই মনটা ভালোলাগায় ভরে গেল। যতটুকু সাঁতার জানি, তাতে ঠিক প্রশান্ত মহাসাগরে সাঁতার কাটা যায় না। শুধু নিজেকে ডুবে যাওয়ার ভয় থেকে বাঁচানো যায়। আশপাশে লাইফ গার্ডদের দেখে মনে বেশ কিছুটা সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলাম। জানি বিপদে পড়লে পিছনে বাঁচানোর লোকেরা তৈরি আছেন। এখানকার জলে নামলে সময় যে কোথা দিয়ে চলে যায় সেদিকে কোনও খেয়ালই থাকে না। সমুদ্রতটের কাছাকাছি কেউ বা সুইমিং করছে, কেউ আবার বালুর শয্যায় শুয়ে সূর্য-স্নান করছে। তবে একটু দূরে যেখানে সমুদ্রের ঢেউ বেশি, সেখানে সব সার্ফারদের ভিড়। যদিও নিজে সার্ফিং করতে পারি না, তবুও এখানকার সার্ফারদের মুখ দেখে এই খেলার উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারলাম।

(ক্রমশ….)

প্রি-ম্যারেজ কাউন্সেলিং

বিয়ে মানেই একটা নতুন জীবনের শুরু, এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। যেখানে জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে যোগ হয় বিবিধ দায়িত্বের বোঝা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিয়ের দিনটার জন্যেই মাতামাতি বেশি থাকে। বিয়ের পরের সময়টার গুরুত্ব যে অনেক বেশি, তা নিয়ে মাথাব্যথা সকলেরই কম থাকে। আসলে বিয়ের দিনের অনুষ্ঠান পর্বকে চাকচিক্যে ভরিয়ে তোলাটাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। অথচ বিয়ের দিনের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত পাত্র এবং পাত্রী উভয়েরই আসন্ন বিয়ে নিয়ে থাকে চাপা উত্তেজনা। তাদের কাছে শুধু বিয়ের দিনটাই নয়, তার পরের জীবনটা নিয়েও থাকে বহু জল্পনাকল্পনা ও উদ্বেগ।

সমস্ত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে উঠবে কিনা, এমন জিজ্ঞাসা থেকেই জন্ম নেয় উত্তেজনা কিংবা উদ্বেগ। উভয়ের ক্ষেত্রেই নতুন পরিবার এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন থেকেই যায়। সুতরাং বিয়ের আগে থেকেই যদি নিজেকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে অতটা টেনশনে থাকার আশঙ্কা থাকে না।

কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট শ্রীতমা ঘোষ-এর মতে, জীবনের প্রতিটি মোড়েই থাকে বিস্ময় এবং চ্যালেঞ্জ। তবে বিবাহ সেই পর্যায়গুলির মধ্যে একটি, যা উত্তেজনাপূর্ণ এবং আশঙ্কারও হতে পারে। এটি এমন এক পর্যায়, যেখানে দু’জন ব্যক্তি একত্রিত হয়, তাদের দূরত্ব সরিয়ে রেখে নিজেদের থেকে বড়ো কিছু তৈরি করার জন্য কাজ করে, পরিবার গড়ে। এ এক অন্য স্বপ্নের জীবন। কিন্তু বিয়ে মানেই সুন্দর, মসৃণ এবং সুখস্বপ্নের মতো হবে, এমনটা হয় না সর্বদা।

আজকের দ্রুতগতির, চাহিদাপূর্ণ জীবনধারার সঙ্গে বিবাহিত জীবনের চাপগুলি আগের তুলনায় নাটকীয় ভাবে বদলে গেছে। সমস্যাও আসতে পারে কিংবা সমস্যা তৈরি হলেই মানসিক অস্থিরতাও শুরু হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই প্রি-ম্যারেজ কাউন্সেলিং-এর গুরুত্ব বাড়ছে।

প্রি-ম্যারেজ কাউন্সেলিং হবু দম্পতিদের আসন্ন সমস্যার আগাম সমাধান সূত্র দেয়। এখানে কাউন্সেলর একজন প্রশিক্ষিত পেশাদার। তাই তিনি হবু দম্পতির থেকে উদ্বেগ আশঙ্কার কথা শুনে সমস্যা সমাধানের ভরসা দেন এবং মানসিক চাপমুক্ত হওয়ার পথ দেখান। শুধু তাই নয়, কী ধরনের সমস্যা আসতে পারে, সেই বিষয়েও সচেতন করেন। এর ফলে হবু দম্পতির মনে আস্থা এবং বিশ্বাস তৈরি হয়।

আচ্ছা ভেবে দেখুন তো, বিয়ে করতে যাচ্ছেন অথচ আগের মতো আপনার মুখে কি আর হাসি নেই? কোনও বিষন্ন অতীতের জন্য কি আজও কষ্ট পাচ্ছেন? বাথরুমে কিংবা কাজের ফাঁকে যেমন গুনগুন করে গান গাইতেন, সে পার্ট-ও কি চুকেছে? তাহলে এবার আরও একবার নিজের প্রতি মনযোগ দিন। হাস্যময় মুখ আর স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের সেই মানুষটাকে নিজের ভিতর থেকে টেনে বের করে আনুন। যদি নিজে মুখে হাসি আনতে না পারেন, তাহলে কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট-এর সাহায্য নিন।

পাত্র-পাত্রী উভয়ের মধ্যে কী কী খামতি রয়েছে, দু’জনের ব্যক্তিত্বের তফাত কতটা, একে অপরের কাছে কী ধরনের প্রত্যাশা রাখেন, দু’জনে দু’জনের কাছে মনের কথা খুলে বলতে পারবেন কিনা— এইসব যাচাই করে নেন কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট। নিজেদের জীবন এবং কেরিয়ার সম্পর্কে হবু দম্পতিরা কী ভাবছেন, তাদের আর্থিক স্থিতি, সেক্স ও সন্তান নিয়ে তাদের কী ভাবনা এবং ভবিষ্যতে মতবিরোধ ঘটলে কে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম, এমন নানা বিষয়ে বিশেষকরে জোর দেওয়া হয় প্রি- ম্যারেজ কাউন্সেলিং-এর সময়। এই ধরনের বহু সমস্যা নিয়েই কাউন্সেলিং করা হয়ে থাকে। ফলত বিয়ের আগেই পাত্র-পাত্রী অনেকটা টেনশনমুক্ত হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারেন।

নিজেদের মানসিক ভাবে প্রস্তুত করার জন্যে যেমন রয়েছে প্রি-ম্যারেজ কাউন্সেলিং, তেমনই ঘরোয়া কিছু উপায়ও রয়েছে টেনশন কাটাবার জন্যে। তাই, বিয়ের আগে টেনশন মুক্ত হওয়ার কৌশল রপ্ত করুন। মনে রাখবেন, বিদেশের মতো ভারতেও এখন ডিভোর্সের হার এতটাই বেড়ে গেছে যে, এখানেও প্রি-ম্যারেজ কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেড়ে গেছে।

স্ট্রেস-এর কারণ

অতিরিক্ত চাপ বা প্রত্যাশার মুখে পড়লে, নিজেকে বেশ কিছুটা ধরাশায়ী লাগে। যখন কিছুতেই পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারছেন না, সেই মনের অবস্থাটাই হল স্ট্রেস। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শরীরে ও মনে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে বাসা বাঁধে ক্লান্তি, ভয়, ডিপ্রেশন, টেনশন, ক্ষোভ, রাগ প্রভৃতি। স্নায়ুর চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকে গুরুতর অসুস্থও হয়ে পড়েন। কেউ আবার চাপ সামলাতে ক্যাফিন কিংবা মদ-সিগারেটের মতো নেশার উপকরণকে আঁকড়ে ধরেন।

তবে স্ট্রেসের ভালোমন্দ দুটি দিক আছে। অনেক সময় কাজের চাপে মানুষের উদ্যম এবং এফিসিয়েন্সি দুই-ই বেড়ে যায়। বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করার এবং ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ হাতে এসে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এই পজিটিভ ভাবনাগুলোর উপর জাঁকিয়ে বসে নেগেটিভ স্ট্রেস। সেটাই কাটিয়ে উঠতে কী করতে হবে এবার সেটাই আলোচ্য বিষয়।

স্ট্রেস-ফ্রি থাকার উপায়

শারীরিক সুস্থতার চাবিকাঠি হল মানসিক প্রফুল্লতা। তাই তুমুল দুঃসময়ে মন ভালো রাখতে হবে। সময়ে শেষ করতে হবে আপনার উপর ন্যস্ত কাজকর্ম। অযথা এসব নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়াবেন না, বরং সংকল্প করুন, প্রতিটি দিন স্ট্রেস-ফ্রি থাকবেন। মুখে হাসি, পর্যাপ্ত ঘুম আর অযথা খারাপ চিন্তা না করা— এই তিনটিই আপনার স্ট্রেস ফ্রি থাকার মূল রসদ।

বাইরের পেশাগত সাহায্য ছাড়াও ঘরোয়া কয়েকটি উপায়ও রয়েছে বিয়ের আগের টেনশন কাটাবার জন্যে। বিয়ের দিনটির চাপ ছাড়াও সারা জীবনের সম্পর্ক যেখানে জুড়তে চলেছে, সেখানে প্রয়োজন হয় বাড়িতে থেকেও ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের তৈরি করা। বিভিন্ন হবিতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেও টেনশন অনেকটাই কমানো যায়। যেমন—

মিউজিক: মিউজিক ইজ দ্য বেস্ট মেডিসিন। যখন আপনি কমপ্লিটলি স্ট্রেসড অনুভব করবেন, ঠিক তখনই হালকা কোনও মিউজিক বা গান শুনুন আপনার প্লে লিস্ট থেকে। রাতে ঘুমানোর আগে কিংবা কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসার পথে গান-বাজনা শুনে মনটা রিফ্রেশ করে নিন। এক্ষেত্রে, ধীর মধুর স্মুদিং মিউজিক মনের চঞ্চলতা কমিয়ে তাকে শান্ত করতে সক্ষম। শরীরের মধ্যে জমে থাকা টেনশন কম করে জীবন এবং আত্মাকে সজীব করে তুলতে সাহায্য করবে লাইট মিউজিক।

ব্রিদিং এক্সারসাইজ: টেনশন কমাতে বাড়িতেই ব্রিদিং এক্সারসাইজ করলে খুব ভালো লাভ পাওয়া যায়। শরীরের পেশিগুলোকে উত্তেজনামুক্ত করতে, সারাদিনে যে-কোনও সময়েই এই ব্রিদিং এক্সারসাইজ করা যায়। খুব সহজে এবং তাড়াতাড়ি এটি কাজ করে। মেডিটেশন: মনের মধ্যে ক্রমাগত আসতে থাকা নেগেটিভ চিন্তাধারাকে মেডিটেশন কনট্রোল করে মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। ফলে মনে স্বচ্ছতা আসে। সারা দিনে ১৫ থেকে ২০ মিনিট মেডিটেশন করতে পারলেই যথেষ্ট।

শরীরের এক্সারসাইজ: শারীরিক শ্রম স্ট্রেস কমাতে অনেকটাই সাহায্য করে। শ্রমের কারণে শরীরে এনডরফিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যেটি শরীরকে রিল্যাক্স রাখতে সাহায্য করে।

জীবন উপভোগ করুন: নিয়মে আবদ্ধ থেকেই যে শুধু রিল্যাক্স করা যায়, এমনটা মনে করা ঠিক নয়। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সঙ্গে জীবনটাকে উপভোগ করা উচিত। বর্তমানকে উপভোগ করার নামই রিল্যাক্স করা। ভবিষ্যতে কী হবে এবং অতীতে কী হয়ে গেছে, সেইসব চিন্তা করে বর্তমানের মুহূর্তকে নষ্ট করা উচিত নয়। বরং, সময়-সুযোগ করে নিয়ে মাঝেমধ্যে দু’জনে মিলে বেড়াতে যান। সুন্দর প্রকৃতির মাঝে এবং নিরালায় দু’জনে শারীরিক ও মানসিক ভাবে কাছে থাকলে, উপভোগ্য হয়ে উঠবে জীবন।

পারিপার্শ্বিক আবহ: কী পরিবেশে, কোথায় সময় কাটাচ্ছেন এটা যে-কারওর জন্যেই একটা ভাইটাল পয়েন্ট। পারিপার্শ্বিক স্থিতি মানুষের মন, চিন্তাধারাকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। যে জায়গায় অথবা যাদের সঙ্গে থাকলে মন প্রফুল্ল থাকবে, বিয়ের আগে তেমন পরিবেশই বেছে নেওয়া উচিত পাত্র অথবা পাত্রীর।

নিজেদের রিল্যাক্স রাখতে গেলে আরও একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। অন্যের অযাচিত প্রশংসা অথবা কুৎসা কোনওটাই গায়ে মাখলে চলবে না। অন্যে কী বলবে অথবা ভাববে, এই নিয়ে বেশি কুণ্ঠাবোধ করা অনুচিত। এছাড়াও নাচ, অ্যারোবিক্স, গান করে, শপিং করে, বই পড়েও টেনশন দূর করা যায়।

নিজের জন্য সময়

পরিবারে কিংবা কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় দায়দায়িত্ব বাড়ে, চাপও বাড়ে। কিন্তু তাই বলে নিজের জন্য সময় বের করতে ভুললে চলবে না। কম বয়সে যদি লেখালেখির বা ছবি আঁকার অভ্যাস থাকে, সেটাকেই আবার ফিরিয়ে আনুন। প্রতিদিন যদি আপনার ব্যস্ত শেডিউল থেকে অন্তত এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করতে পারেন, তাহলে দেখবেন আপনি টেনশন ফ্রি হয়ে যাবেন।

মেলামেশা বাড়ান

অফিসে হোক বা অফিসের বাইরে কাজের ফাঁকে একটু আধটু আড্ডা দিন, গল্প করুন। এটা মুড বুস্টার হিসাবে দারুণ কার্যকরী। এর বাইরেও সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রটা বাড়ান। শুধুই কাজের প্রেশারে যখন প্রাণ হাঁসফাস করবে, চেষ্টা করুন ফোনে অন্তত কানেক্টেড থাকতে। চেষ্টা করুন ছুটির দিনটা পরিবারের সকলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করতে। কোনও সামাজিক কাজকর্মও করতে পারেন, মন ভালো হয়ে যাবে।

ইতিবাচক মনোভাব জরুরি

আপনার চিন্তাভাবনার মধ্যে নেতিবাচক মানসিকতাকে স্থান দেবেন না। ইতিবাচক মনোভাব রাখুন। চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করুন। কোনও সমস্যা এলে হেরে যাওয়ার কথা প্রথমেই ভাববেন না। হয়তো দেখা যাবে কাজটি আপনি অতি সফল ভাবে সম্পাদন করতে পেরেছেন। তাই সময় নিয়ে আগে পরিস্থিতি বিচার বিবেচনা করে, সেই মতো পদক্ষেপ করুন। শুরুতে নেতিবাচক ভাবনা এলেও, মনকে নিজের বশে নিয়ে আসুন। দেখবেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে-কোনও জিনিসের খারাপ দিকটি আর আপনার নজরে আসছে না।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান

ক্লান্তি কাটানোর জন্য ঘুমের মতো ভালো টোটকা আর হয় না। সারাদিনের কাজের চাপে ঘুম ছুটে যাওয়ার মতো অবস্থা যতই হোক না কেন, বাড়ি ফিরে রাতে ভালো ভাবে ঘুমান। এতে শরীর-মন দুটোই রিজুভিনেটেড হবে। অতএব, বেশি রাত অবধি জেগে সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যাটিং করা বা উত্তেজনাপূর্ণ ওয়েব সিরিজ দেখে, রাতের ঘুম পণ্ড করবেন না।

সুতরাং বিয়ের পরে জীবনসঙ্গীর সঙ্গে স্বপ্ন সফল করতে হলে, বিয়ের আগে পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে নিজেকে স্ট্রেস-ফ্রি রাখুন। মনে রাখবেন, জীবনটাকে নিয়ন্ত্রণ করা আপনারই হাতে। আপনি নিজেই পারেন জীবনকে স্ট্রেস-ফ্রি রাখতে।

বিবাহিত জীবনকে সফল করে তোলার উপায়

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ষাট শতাংশ সময় বয়ে বেড়াতে হয় দাম্পত্য সম্পর্ককে। ফলে বিয়ে হল জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই শুধু সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে, গুণাগুণ বিচার করা আবশ্যক। কারণ, বিয়ের পরে সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে একটা সরু সুতোর উপর। ভারসাম্য হারালে পতন অনিবার্য। তাই বিয়ের আগে পরস্পরকে চিনুন, জানুন ভালো ভাবে। মনে রাখবেন, দাম্পত্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় শারীরিক এবং মানসিক বিষয়।

তাই, যদি বিবাহিত জীবনকে সুখের, শান্তির করে তুলতে চান কিংবা সফল করে তুলতে চান, তাহলে বিয়ের আগে হবু জীবনসঙ্গীকে যাচাই করে নিন সঠিক ভাবে। অবশ্য শুধু যাচাই করে নেওয়াই নয়, নিজের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টিও হবু সঙ্গীকে জানিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া নিন।

যাচাই পর্ব এবং সিদ্ধান্ত

যদি সবকিছু উভয়ের মনের মতো হতে পারে মনে হয়, তবেই সেই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যান, নয়তো সম্পর্কে ইতি টানুন। কারণ, দাম্পত্যে যখন অপছন্দের কিছু আসে, তখনই সমস্যা দেখা দেয়। সম্পর্ক তখন ভেঙে যায়। তাই সম্পর্ক গড়ার আগে যেমন সতর্ক হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা উচিত, যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন। তাই, মানসিক এবং শারীরিক চাহিদার বিষয়ে দু’জনে খোলাখুলি আলোচনা করে তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত নিন।

এক্ষেত্রে আপনারা যদি দীর্ঘদিনের প্রেমিক-প্রেমিকাও হন, তাহলেও আবেগে ভেসে গিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবেন না। কারণ, শারীরিক এবং মাননিক চাহিদা পূরণ না হলে সম্পর্কে ফাটল ধরবেই। অবশ্য শুধু শারীরিক এবং মানসিক চাহিদা পূরণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিলেই চলবে না, গুরুত্ব দিতে হবে আর্থিক বিষয়টিকেও। কারণ, অন্তত মোটামুটি একটা আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে বিয়ে করা উচিত নয়।

মনে রাখবেন, সম্পর্কের শুরুতে আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি অতটা গুরুত্ব না পেলেও কিংবা মানিয়ে নিলেও, অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা আসবেই। অবশ্য আরও কয়েকটি বিষয়কে দাম্পত্যে গুরুত্ব দিতেই হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাসস্থান এবং খাদ্যাভ্যাস। যেখানে দু’জনে বসবাস করবেন, সেই বাসস্থানটিকে মানিয়ে নিতে পারবেন কিনা, তা দেখে নিয়ে তবেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিন।

এছাড়া, কে কীরকম খাবার খেতে পছন্দ করেন, তাও বিয়ের আগে আলোচনা করে নিন। যদি খাওয়ার বিষয়ে কারওর কোনও সমস্যা থাকে, তাহলে সমস্যা সমাধানের পথ বের করে রাখুন আগেভাগে। কারণ, ছোটো ছোটো অপছন্দের বিষয় নিয়েও সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি হতে পারে।

বিয়ের আগে পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গেও আলাপ-পরিচয় করে নিন দু’জনে। তাদের আচার-আচরণ অপছন্দ হলে কীভাবে মানিয়ে নেবেন, তাও দু’জনে মিলে আলোচনা করে রাখুন। প্রয়োজনে আপনারা দু’জনে শুরু থেকেই পরিবারের থেকে আলাদা থাকবেন, এমন সিদ্ধান্ত জানিয়ে সম্মতি আদায় করে রাখুন পরিবারের সদস্যদের থেকেও। অবশ্য শুধু এই বিষয়গুলিই নয়, দাম্পত্য সম্পর্ককে সফল করার জন্য আর কী কী উপায় এবং কৌশল অবলম্বন করবেন, তাও জেনে নেওয়া জরুরি।

বিশ্লেষণ

প্রেমের সম্পর্কের মধ্যেও সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বিশেষকরে আজকাল জীবনযাপন জটিলতর হচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবনেও সম্পর্কের উপর চাপ পড়ছে। কারণ, মানুষের জীবনের দুটি দিক রয়েছে। একটি দিকে রয়েছে তার কর্মজীবন, তো অন্যদিকে অবশ্যই ব্যক্তিগত জীবন। এই দুইয়ের সামঞ্জস্য জরুরি। তবে দুটো দিক সমানতালে সামলাতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক।

ভালোবাসার সম্পর্কের প্রথমের দিনগুলোতে মানুষ বেশ আনন্দেই থাকেন। তাদের জীবনে তখন চিন্তার কোনও জায়গা প্রায় থাকে না বললেই চলে। মনের সঙ্গে মন মিলে তখন মানুষ আগামী দিনগুলোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে। তবে কিছুদিন পেরোনোর পরই সমস্যা শুরু হয়ে যায়। তখনই সম্পর্কের ‘তার’ কিছুটা হলেও কেটে যায়। এবার এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝামেলা তাও না হয় সহ্য করে নেওয়া যায়, কিন্তু ঝামেলা নিয়মিত হলেই বিপদ।

কারণ, এমনটা হওয়ার অর্থ হল— আপনাদের সম্পর্কের কেমিস্ট্রিতে কোথাও একটা সমস্যা হয়ে গেছে ধরে নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমেই যদি এই সমস্যার সমাধান না করতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও বাড়বে বই কমবে না। তাই সতর্ক হয়ে যাওয়াটাই বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। অবশ্য দাম্পত্য সমস্যার সমাধান করতে হলে, কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতেই হবে।

পরিবর্তন কারও স্বভাব, চলন-বলন আপনার পছন্দ না-ও হতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাকে বোঝানোর পরিবর্তে সবসময় অপমান করাও শোভা পায় না। মনে রাখবেন, আপনি যেমন অন্যের কিছু বিষয় পছন্দ করেন না কিংবা মানতে পারেন না, ঠিক তেমনই আপনার কোনও বিষয় অন্যের কাছেও অপছন্দের হতে পারে। যেমন কেউ হয়তো জোরে জোরে কথা বললে আপনার অস্বস্তি হয়, ঠিক তেমনই আপনি হয়তো খাবার চিবানোর সময় অস্বাভাবিক আওয়াজ করেন— যা অন্যের কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে। অতএব, ক্ষমার মনোভাব রাখা জরুরি সংসারে সুখশান্তি বজায় রাখার জন্য।

আপনি ঠিক যেমনটা চান, আপনার সঙ্গীর প্রকৃতি হুবহু সেটা না-ও হতে পারে। তাই বলে তাকে আপনার মতো ধাঁচে গড়ে তুলতে চেষ্টা করবেন না। মনে রাখুন, প্রতিটি মানুষ প্রকৃতিগত ভাবে স্বতন্ত্র। কোনও কিছু আপনার চোখে খুব বেমানান লাগলে, তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন। বুঝিয়ে বললে তিনিও নিজেকে ঠিকই শুধরে নেবেন। এছাড়া, সঙ্গী যদি নিজেকে পালটাতে না চান, তাহলে জোর করতে যাবেন না। সেটা হতে পারে পোশাক কিংবা আচরণ। কারণ, এটির ফলাফল কখনওই শুভ হবে না আপনার সুন্দর সম্পর্কটির পক্ষে। প্রয়োজনে আপনি নিজেকে কিছুটা বদলে নিয়ে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন।

প্রশংসা

আপাতদৃষ্টিতে আপনার চোখে না পড়লেও, বাস্তবে আরও অনেকের মতোনই সম্পর্কের কিছু খুঁটিনাটি বিষয়কে হয়তো আপনিও এড়িয়ে যাচ্ছেন। ব্যাপারগুলো ঠিক চোখে পড়ার মতোন না হলেও, এই একেকটি ছোট্ট ছোট্ট ঘটনাই আপনার সম্পর্ককে করে তুলতে পারে সজীব আর প্রাণবন্ত। তাই, ছোটো ছোটো সাফল্যতেও পরস্পরকে প্রশংসা করুন, সমর্থন করুন।

বিশ্বাস

পৃথিবীর আর সবার চাইতে আপনি আপনার সঙ্গীর কাছে আলাদা কেন? কারণ এই যে, সে বিশ্বাস করে যে, সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে পৃথিবী অন্যদিকে চলে গেলেও আপনি তাকে ছেড়ে যাবেন না। তার পাশে থাকবেন। তাকে বোঝার চেষ্টা করবেন। আর এই বিশ্বাসটুকুই আপনাকে আপনার সঙ্গীর চোখে আলাদা করে তোলে। করে তোলে অনন্য। তাই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে সঙ্গীর পাশে থাকুন সবসময়।

মনে রাখবেন, বিবাহিত জীবনে সাফল্য আনার বিষয়টি খুব চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। তাই, একে অপরকে বোঝান— আপনারা একসঙ্গে থাকবেন বলেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অতএব, সমস্যা এলে দু’জনে মিলে সমস্যামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবেন।

স্বাধীনতা

শুধু ভালোবাসা দিয়ে কোনও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। নারী-পুরুষ উভয়েরই স্বাধীনতাবোধ রয়েছে। স্বাধীন চিন্তা ও নিজের একটি স্বতন্ত্র জগৎ রয়েছে প্রতিটি মানুষেরই। ভালোবাসার সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত, যা পরস্পরের স্বাধীনতা, মূল্যবোধ ও সম্মানের বিষয়টিকে অক্ষত ও সুরক্ষিত রাখবে।

হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না

প্রাচীন রীতিনীতি অনুযায়ী, মেয়ের বিয়ের পর মা-বাবার দায়িত্ব অনেকটাই কমে যেত। বলা যায়, তারা দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতেন। এছাড়া তাদের আর কোনও রাস্তাও ছিল না। কারণ, মেয়ের বিয়ের পর মা-বাবার অধিকারও খর্ব হতো। মেয়েকে মেনে চলতে হতো শ্বশুরবাড়ির রীতিনীতি এবং শাসন। তাই, মেয়ের বাবা-মা চাইলেও মেয়ের সংসারে নাক গলাতে পারতেন না। কিন্তু বর্তমানে অনেক কিছুর বদল ঘটেছে। বেশিরভাগ সংসারে এখন স্বামীর থেকে স্ত্রী-র কথা-ই বেশি চলে। আর এইজন্য, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সমস্ত ছোটোবড়ো ঘটনাতেও এখন হস্তক্ষেপ করেন মেয়ের মা।

এখন মেয়ে তার সংসারের সবকিছু শেয়ার করে নিজের মায়ের সঙ্গে। স্বামী কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে ছোটোখাটো ঝগড়া অথবা মনোমালিন্য হলেও সেই খবর চলে যায় মেয়ের মায়ের কানে। এর ফলে, যে ঝগড়া বা মনোমালিন্য খানিক পরেই হয়তো মিটে যেত, তা মেয়ের মায়ের ইন্ধনে জটিল রূপ নেয় অনেকসময়।

মেয়েকে বোঝানোর পরিবর্তে যখন মেয়ের মা তার শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে ঝগড়া-বিবাদের বিষয়ে কৈফিয়ত চান, তখন ঝগড়া-মনোমালিন্যের বিষয়টি আর সাধারণ স্তরে থাকে না। শুরু হয় বাগবিতণ্ডা এবং অবশেষে হার-জিতের অবধারিত লড়াই। আর ঠিক এই অবস্থায় সবথেকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় জামাই। সে তখন তার মা-বাবাকেও কিছু বোঝাতে পারে না, আবার স্ত্রী কিংবা শ্বশুর-শাশুড়িকেও কিছু বলার সাহস পায় না।

আর তখন থেকেই এই সাংসারিক কূটকচালির জেরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চিড় ধরা শুরু হয়। আর এসব জটিলতার অন্তরালে থাকে ইগো বা হার না মানার মতো এক ধরনের অহংবোধ। কেউ ভুল বললে কিংবা ভুল করলে অবশ্যই তার বিরোধিতা করা যায়। কিন্তু শুধু অহংকারের বশবর্তী হয়ে হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়াও এক ধরনের মূর্খতা, এটা মাথায় রাখেন না অনেকে।

জেদ করবেন না

বিয়ের পর প্রথমদিকে যতদিন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে আবেগ থাকে, ততদিন ঝগড়া মনোমালিন্য শুরু হলেও তা স্থায়িত্ব পায় না। কিন্তু আবেগ যখন কমতে থাকে, তখন শুরু হয় হার না মানার জেদ। কেউ সামান্য ভুল কিছু বলে ফেললে কিংবা ভুল করলে তখন আর মানিয়ে নেওয়া কিংবা ভুল শোধরানোর সময় কেউ কাউকে দেয় না। আসলে এ এক ধরনের অহংবোধ। যার ইগো যত প্রকট, সে তত বেশি জেদি। আর এই ধরনের জেদ ধীরে-ধীরে সংসারে ঘুণ ধরিয়ে দেয়।

হয়তো মেয়ের মা-বাবাও চান না মেয়ের সংসারে অশান্তি হোক। কিন্তু বারবার মেয়ের কাছ থেকে তার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিষয়ে অভিযোগ শুনতে শুনতে, মেয়ের মা-বাবাও অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে এবং আশঙ্কিত হয়ে ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন। আবার অনেকসময় অদূরদর্শিতার কারণেও ছোটোখাটো সমস্যায় আতঙ্কিত হয়ে অতি সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে নেন মেয়ের মা-বাবা এবং মেয়েটি নিজেও।

স্বেচ্ছাচারিতা নয়

এক ছাদের নীচে একসঙ্গে বসবাস করলেও, প্রত্যেকে নিজের সত্তা নিয়ে বাঁচেন। তাই, প্রথমে সবাইকে মানিয়ে নিয়ে চলার মন্ত্র শিখতে হবে। সম্মান পেতে গেলে, সম্মান দিতেও হবে অন্যকে। আপনার অধিকারের বিষয়ে সচেতনও থাকতে হবে। কোথাও বেশি অধিকার ফলানোও যেমন ক্ষতিকারক, ঠিক তেমনই আপনজন আপনাকে বিশ্বাস করে নানারকম স্বাধীনতা দিয়েছেন মানেই আপনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠবেন— এটাও ঠিক নয়। মনে রাখবেন, স্বাধীনতারও সীমা-পরিসীমা আছে। স্বাধীনতা লাগামছাড়া হলেই তা স্বেচ্ছাচারিতার রূপ নেয়। আর স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম হয় এক ধরনের অহংবোধ থেকে এবং এই ধরনের অহংবোধের জন্ম নেয় প্রকৃত শিক্ষার অভাব এবং অদূরদর্শিতার কারণে।

প্রথমে শুভাকাঙ্ক্ষীর বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে শিখুন। যেমন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন তা যেমন বাড়ির কাউকে জানিয়ে যাওয়া উচিত, ঠিক তেমনই কোথাও গিয়ে ফিরতে দেরি হলে ইনফর্ম করে দিন স্বামী কিংবা শ্বশুর-শাশুড়িকে। এতে আপনার প্রতি তাদের ভালোবাসা আরও বেড়ে যাবে এবং আপনি কোথাও গিয়ে বিপদে পড়লে আপনজনের সাহায্য পাবেন দ্রুত। কিন্তু যদি অহংকারের বশে আপনি ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাব নিয়ে চলেন, তাহলে সম্পর্কে ভালোবাসার বন্ধন আলগা হবে, তৈরি হবে দূরত্ব এবং সংসারে ঘুণপোকা বাসা বাঁধবে।

জীবনে সাধ অনেক থাকতে পারে কিন্তু সেইমতো সাধ্য থাকতে হবে। তা যদি না থাকে, তাহলে আপশোস না করে হাসিমুখে তা মেনে নিতে হবে। আবার আপনার যদি প্রচুর অর্থ-সম্পদ থাকে, তাহলে সেসবের অহংকারে অন্যকে ছোটো করা কিংবা অপমানজনক ইঙ্গিত করাও উচিত নয়। মনে রাখবেন, চিরদিন একই অবস্থা থাকে না সবার।

আজ আপনার ভালো অবস্থা আছে, কাল না-ও থাকতে পারে। আবার অন্যের আজ খারাপ অবস্থা আছে, কাল সে আপনার থেকেও বিত্তবান হতে পারে। অতএব, অর্থ-সম্পত্তির অহংকার বর্জন করুন। মানুষের সঙ্গে সবকিছু তছনছ হয়ে যেতে পারে। মুহূর্তের ভুল কিংবা আচমকা কোনও বড়ো দুর্ঘটনা অথবা বড়ো কোনও অসুখে মানুষ অনেকসময় সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে। তাই, ভেবেচিন্তে পা ফেলুন।

তুলনামূলক বিচার করবেন না

এমনকিছু বিষয় আছে, যে-সব ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচার করা ঠিক নয়। যেমন, শ্বশুরবাড়ির অবস্থা যদি আপনার বাপেরবাড়ির থেকে খারাপ হয়, তাহলে কথায় কথায় সেই প্রসঙ্গ তুলে স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেদের অপমান করবেন না। আবার, অন্যের যা আছে আপনাদের তা নেই বলে হীনমন্যতায় ভোগাও উচিত নয়। কারণ আপনি এই বিষয়ে আপশোস করলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন আপনার স্বামী। তিনিও তা অ্যাচিভ করতে চাইবেন আপনাকে খুশি করার জন্য এবং এই অ্যাচিভ করতে গিয়ে তিনি হয়তো এমন কিছু ভুল করে বসবেন কিংবা অনৈতিকতার আশ্রয় নেবেন— যা বিপদ ডেকে আনতে পারে। অতএব, ‘সাকসেস অ্যাট এনি কস্ট’ এই নীতি বর্জন করুন। আপনার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন।

গঠনমূলক চিন্তাভাবনা জরুরি

অহংকার আমাদের গঠনমূলক চিন্তাভাবনার মানসিকতা নষ্ট করে দেয়। তাই, যারা বেশি অহংকারী, তারা কনস্ট্রাকটিভ হতে পারেন না। আর কনস্ট্রাকটিভ হতে না পারলে, জীবনে সুখশান্তি অধরাই থেকে যাবে। আপনার সবকিছু অনেক আছে মানেই বিশ্বসেরা আর যার কম আছে সে নরাধম— এমন ভাবনা আসলে আপনার মূর্খতারই নামান্তর। এই ধরনের অহংকার আপনাকে একসময় অন্যদের থেকে আলাদা করে দেবে, আপনি ধীরে-ধীরে ভালোবাসা বর্জিত একা একটা মানুষে পরিণত হবেন। আর একাকিত্ব মানেই অবসাদ এবং অবসাদ মানেই সবকিছু থেকেও কিছুই নেই। এক্ষেত্রে অহংবোধ মন থেকে ঝেড়ে ফেলে, ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিতে হবে জীবনসঙ্গীকে।

কথা বলে সমস্যা মেটান

ঝামেলা হতেই পারে। এবার সেই ঝামেলার পর মুখ গোমড়া করে একে অপরের সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলে কিন্তু সমস্যা না মেটাই স্বাভাবিক৷ এক্ষেত্রে দ্রুত কথা বলে নেওয়াটাই হল বুদ্ধিমানের কাজ। যে-কোনও সমস্যা কিন্তু আলোচনা করে মেটানো যায়। সমস্যা এড়িয়ে গেলে ঝামেলা তো মিটবেই না, বরং আরও জটিল হবে। তাই শুরুতেই সতর্ক হয়ে যাওয়াটা খুবই জরুরি।

পরস্পরের মতামতকে সম্মান দিন

পরস্পরের মতামতকে সম্মান দেওয়াটা খুবই জরুরি। অপরের ইচ্ছে অনিচ্ছেকেও মাঝেমধ্যে গুরুত্ব দিতে শিখুন। এতে সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। সবসময় যদি আপনি নিজের মতটা সঙ্গীর উপর চাপাতে যান, তাহলে তার বিরক্তি আরও বাড়বে। তাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব।

ঝগড়ার মুহূর্তেও কুকথা নয়

অনেকেই এই ভুল করে থাকেন। আসলে তারা ভাবেন না যে, ঝগড়ার সময় কিছু খারাপ কথা বললে সমস্যা দেখা দেবে। তাই ঝগড়ার সময়ে এই ভুল করা চলবে না। আপনি যদি কথায় কথায় খারাপ কথা বলতে শুরু করে দেন, তবে অনেক সমস্যাই দেখা দিতে পারে। আপনার সঙ্গী কিন্তু আপনার ওই রাগের মুহূর্তে বলা কথাগুলোই মনে রাখতে পারেন সারাজীবন। এমনকী ঝগড়ার মুহূর্তে খারাপ কিছু কথা বললে তার প্রতিঘাত আরও বেশি। ডিভোর্স পর্যন্ত হতে পারে।

তাই সম্পর্কে মাধুর্য বজায় রাখতে পরস্পরকে সম্মান করুন। পরস্পরের প্রাইভেসিকে সম্মান করুন। দু’জনে, একে অপরকে স্পেস দিন। এতে সম্পর্কের দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হবে না। হৃদ্যতাও অটুট থাকবে।

প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়ে আরও সচেতনতা জরুরি

কেরিয়ার গড়ার জন্য অতি ব্যস্ততা এবং প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে পারিবারিক জীবন এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি ভাবতে ভুলে যাচ্ছেন অনেকে। আর যখন ভাবার অবসর পান কিংবা ভাবতে বাধ্য হন, তখন সময় অনেকটা পার হয়ে যায়— স্বপ্ন আর পূরণ হয় না স্বাভাবিক পন্থায়। কারণ যাই হোক না কেন, স্বাভাবিক ভাবে বাচ্চার জন্ম দিতে অক্ষম হচ্ছেন এখন অসংখ্য নারী। আর তাই ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ-এর চাহিদা বাড়ছে সারা পৃথিবীতে। সমীক্ষা অনুযায়ী, এখন ১২৫জন বাচ্চার মধ্যে ১জন বাচ্চা হয় আইভিএফ পদ্ধতিতে। তাই, আগামী দিনে আইভিএফ-এর সংখ্যা হয়তো আরও বাড়বে।

জানা যায়, ১৯৭৮ সালের আগে যত বাচ্চার জন্ম হয়েছে, তারা সবাই মাতৃগর্ভে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর স্বাভাবিক মিলনেই জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু তারপর থেকে আইভিএফ পদ্ধতি চলে আসার ফলে, পুরো ছবিটা বদলে গেছে। আর এখন প্রতি মিনিটে অন্তত একজন বাচ্চার ভ্রূণ তৈরি হচ্ছে টেস্টটিউব-এ পুরুষের স্পার্ম এবং নারীর এগ ফার্টিলাইজ করে। তাই বলা যায়, সারা পৃথিবীতে অসংখ্য ভ্রূণ মাতৃগর্ভে স্বাভাবিক ভাবে তৈরি না হয়ে, আইভিএফ অর্থাৎ ইনভিট্রো ফার্টিলাইজ পদ্ধতিতে হচ্ছে। তবে, যাইহোক না কেন, প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়ে এখনও অনেকে সচেতন নন বলে মনে করেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাই, মাতৃদিবসকে উপলক্ষ্য করে, সম্প্রতি ‘ফার্টিলিটি ফ্যাক্টস’ শীর্ষক এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল অম্বুজা নেওটিয়া হেলথকেয়ার ভেঞ্চার লিমিটেড-এর ফার্টিলিটি সেন্টার ‘জিনোম’। প্রজনন স্বাস্থ্যে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের  গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই ছিল ওই সম্মেলনের মূল বিষয়।

More awareness about reproductive health is necessary
Doctors

ওই সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন ‘জিনোম’-এর ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেসের পরিচালক ডা. সুজয় দাস গুপ্ত, প্রজনন মেডিসিন ও সার্জারির সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সুদীপ সামন্ত,  প্রজনন মেডিসিন ও সার্জারির সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শবনম পারভীন, প্রধান ভ্রূণ বিশেষজ্ঞ আত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অঞ্জনা ঘোষ। এঁরা প্রত্যেকে প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতিটি দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং সাংবাদিকদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেন।

এখন মেয়েরা যেহেতু ঘরে-বাইরে নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন বেশিরভাগ সময়, তাই তাদের কাছে বাচ্চার জন্ম দেওয়ার বিষয়টি এক বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। কীভাবে সবকিছু সামলে উঠে বাচ্চা নেবেন একজন কর্মরতা নারী, এটা ভাবতে ভাবতেই বয়স ৪০ বছর পার হয়ে যায়। আর বাচ্চা নেওয়ার সঠিক বয়স পার হয়ে যাওয়ার পর যদি স্বামীর স্পার্ম কাউন্ট কিংবা স্ত্রী-র এগ্ প্রোডাকশন কমে যায় কিংবা ইউটেরাস-এ কোনও সমস্যা দেখা দেয়— তাহলে তখন তারা নিরুপায় হয়ে আইভিএফ সেন্টারগুলির দ্বারস্থ হন। কিন্তু তখন অনেকটা দেরি হয়ে যায় এবং চিকিৎসায় সুফল পেতে অসুবিধা হয় বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

‘ফার্টিলিটি ফ্যাক্টস’ শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনে তুলে ধরা হয়, ক্লিনিকাল কেস হিস্ট্রির মাধ্যমে ইন্ট্রা সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (ICSI), প্রি-ইমপ্ল্যান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং (PGT) এবং ক্রায়োপ্রিজারভেশনের মতো সহায়ক প্রজনন চিকিৎসায় (ART) অত্যাধুনিক অগ্রগতির মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞান নতুন সীমানায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা অনুসন্ধান করেছেন যে, প্রজনন স্বাস্থ্যকে ঘিরে অবিরাম অস্পষ্টতা রোগীদের মধ্যে জ্ঞানের ব্যবধান তৈরি করছে কীভাবে। এই অনিশ্চয়তা প্রায়শই মানসিক যন্ত্রণা এবং ভয় বৃদ্ধি করে, যা চিকিৎসায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও জটিল করে তোলে।

এই অধিবেশনে প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির প্রাথমিক লক্ষণগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা সচেতনতার অভাবের কারণে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়, যা পুরুষ এবং মহিলা উভয়কেই প্রভাবিত করে। বিশেষজ্ঞরা ফার্টিলিটি-র চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক প্রভাব এবং শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি মোকাবেলার গুরুত্বও তুলে ধরেন। কীভাবে দম্পতিরা প্রায়শই গর্ভাবস্থায় উচ্চতর উদ্বেগ অনুভব করেন, বিশেষকরে যখন অতীতে গর্ভপাতের ইতিহাস থাকে।

পুরুষ বন্ধ্যাত্বের প্রতি ক্রমাগত অবহেলার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে এই আলোচনায়। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে জানিয়েছেন যে, ভারতীয় পুরুষদের মধ্যে প্রচলিত অ্যাজুস্পার্মিয়া (বীর্যে শুক্রাণু নেই), অলিগোস্পার্মিয়া (শুক্রাণুর সংখ্যা কম) এবং ভ্যারিকোসিল (পুরুষ প্রজনন ব্যবস্থায় প্রদাহিত অংশ), প্রায়শই পরবর্তী পর্যায়ে পর্যন্ত অচেনা থাকে, তাই চিকিৎসায় সুফল পেতে অসুবিধা তৈরি করে।  পুরুষের উর্বরতার সমস্যাগুলি মোকাবেলার জন্য উন্নত সচেতনতা এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়ার কথা জানান চিকিৎসকরা।

এই প্রসঙ্গে ডা. সুজয় দাস গুপ্ত জানিয়েছেন, ‘প্রজনন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী এবং প্রমাণ-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, অনেক ব্যক্তি তখনই প্রজনন সেবা গ্রহণ করেন, যখন বয়স-সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলি – যেমন স্ত্রী ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ হ্রাস কিংবা পুরুষের বীর্যের পরিমিতি হ্রাস – ইতিমধ্যেই তাদের প্রজনন পূর্বাভাসের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাই, ক্রায়োপ্রিজারভেশনের মতো ঐচ্ছিক প্রজনন সংরক্ষণ কৌশল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। পুরুষের প্রজনন বয়স বৃদ্ধি, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং জীবনধারা-সম্পর্কিত কারণগুলির জন্য সমানভাবে সংবেদনশীল, যা শুক্রাণু উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে এবং নিষেকের সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে।’

ডা. সুদীপ সামন্ত জানিয়েছেন, ‘এটি একটি ভুল ধারণা যে, প্রজনন চ্যালেঞ্জগুলি কেবল মহিলা সঙ্গীর উপর নির্ভর করে। আসলে পুরুষ বন্ধ্যাত্বের বিষয়টিও মূল্যায়ন করা উচিত। প্রায় ১৫-২০% বন্ধ্যাত্বের ঘটনা অব্যক্ত বন্ধ্যাত্বের শ্রেণীতে পড়ে, যা উভয় অংশীদারের ব্যাপক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। মাসিক স্বাস্থ্য মহিলাদের উর্বরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন– পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS) এর মতো অবস্থা, যখন প্রাথমিক ভাবে নির্ণয় করা হয়, তখন সমস্যা মোকাবিলায় সুফল দেয়। একইভাবে, গুরুতর ডিসমেনোরিয়ার মতো লক্ষণগুলি অন্তর্নিহিত এন্ডোমেট্রিওসিস নির্দেশ করতে পারে, যা অবিলম্বে সমাধান না করা হলে উর্বরতা হ্রাস করতে পারে। অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত যোনি স্রাবের মতো ক্লিনিকাল লক্ষণগুলি দ্রুত পরীক্ষা করা উচিত।’

ডা. শবনম পারভিন জানিয়েছেন, ‘আজকের দ্রুতগতির বিশ্বে, প্রজনন স্বাস্থ্য প্রায়শই পিছিয়ে পড়ে, যেখানে বেদনাদায়ক পিরিয়ড এবং অনিয়মিত চক্রের মতো লক্ষণগুলি উপেক্ষা করা হয়। চকোলেট সিস্ট, ফাইব্রয়েড এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার মতো অবস্থাগুলি নির্ণয় করা যায় না, যা শেষ পর্যন্ত উর্বরতার উপর প্রভাব ফেলে। জটিলতা প্রতিরোধ এবং ফলাফল উন্নত করার জন্য প্রাথমিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS), যদি প্রাথমিক ভাবে সনাক্ত করা হয় এবং চিকিৎসা করা হয়, তাহলে প্রজনন এবং বিপাকীয় ব্যাধি উভয়ই প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন ব্যবস্থাপনার মতো জীবনধারার বিষয়গুলি PCOS পরিচালনার মূল বিষয়। উপরন্তু, বয়স বেড়ে গেলে IVF সাফল্যের হার হ্রাস পায়, বিশেষ করে তিরিশ বছর বয়সের পর। অতএব, উর্বরতা এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য সক্রিয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাথমিক সচেতনতা অপরিহার্য।’

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অঞ্জনা ঘোষ জানিয়েছেন, ‘বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর গুণমানের বাইরে, মানসিক কারণগুলিও উর্বরতার উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। অনেক রোগী চাপকে একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা করে তোলেন, যা মানসিক বোঝাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অন্যান্য যে-কোনও চিকিৎসা অবস্থার মতোই বন্ধ্যাত্বের জন্যও সমন্বিত শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। চাপ হরমোনের ভারসাম্য ব্যাহত করতে পারে, ফলস্বরূপ প্রজনন ফলাফলকে প্রভাবিত করে। কাউন্সেলিং অপরিহার্য কিন্তু তা শুধু মানসিক চাপ,  উদ্বেগের জন্যই নয়, বরং দম্পতিদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দূর করার জন্যও অপরিহার্য।’

ভ্রূণ বিশেষজ্ঞ আত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘আইভিএফ একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার মধ্যে ক্লিনিকাল এবং ল্যাবরেটরি উভয় কাজই জড়িত, তবে ল্যাবে যা ঘটে, তার বেশিরভাগই রোগীদের অজানা। চিকিৎসার সময়, হরমোনাল ইনজেকশন ব্যবহার করে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করা হয় এবং একাধিক ডিম্বাণু তৈরি করা হয়, সাধারণত প্রায় ১০-১৫টি। এরপর ওই ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয় এবং শুক্রাণুর সঙ্গে মিলন ঘটানো হয়, যা সঙ্গীর কাছ থেকে আসে। ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুগুলিকে কালচার করা হয় এবং বিশেষ অবস্থায় ল্যাবে একটি ভ্রূণ তৈরি করা হয়। কিন্তু, আইভিএফ-এর প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে সচেতনতার অভাব প্রায়শই ভয় এবং অনিশ্চয়তার দিকে পরিচালিত করে।’

স্পেশাল স্ন্যাকস

নিজের হাতে খাবার বানিয়ে খাওয়ার মজা-ই আলাদা। আর সেই খাবার যদি হয় মুখরোচক, তাহলে তো জমে যাবে সকাল-সন্ধের আড্ডা। রইল রেসিপিজ।

পুর ভরা পেঁয়াজি

উপকরণ (উপরের অংশ): ২০০ গ্রাম ময়দা, ৫০ মিলিলিটার কাচ্চি ঘানি সরষের তেল, নুন স্বাদমতো।

উপকরণ (পুর বানানোর জন্য): ১ বড়ো কাপ পেঁয়াজ কাটা, ৪টে সেদ্ধ আলু, ১ ছোটো চামচ আদাকুচি, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকার কুচি, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতা কুচি, ১ বড়ো চামচ কাজু বাদামের গুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ কিশমিশ, হাফ চামচ আমচুর গুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর গরমমশলা, হাফ ছোটো চামচ লাল লংকার গুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ গোটা ধনে, পুর তৈরির জন্য সরষের তেল এবং স্বাদ অনুসারে নুন।

প্রণালী: উপরের অংশের জন্য ময়দায় নুন মিশিয়ে, জল দিয়ে ভালো ভাবে ফেটিয়ে রাখুন। এই মিশ্রণ অবশ্যই গাঢ় হবে। এরপর সেদ্ধ করে রাখা আলুর খোসা ছাড়িয়ে চটকে নিন। এবার চটকানো আলুর সঙ্গে কেটে রাখা পেঁয়াজের টুকরো, আদাকুচি, গোলমরিচের গুঁড়ো, কাঁচালংকার কুচি, ধনেপাতার কুচি, কাজু, কিশমিশ, আমচুর, লাল লংকার গুঁড়ো, গোটা ধনে, গরমমশলা এবং স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে অল্প একটু তেল গরম করে ভেজে নিন। ভাজা বাদামি বর্ণ ধারণ করলে, নামিয়ে নিয়ে ঠান্ডা করুন। ঠান্ডা হয়ে গেলে, ছোটো কচুরির আকারে লেচি তৈরি করে রাখুন। সবশেষে, কড়াইতে তেল গরম করুন এবং আলুর পুরের লেচি ময়দার লেইতে চুবিয়ে নিয়ে গরম তেলে ছেড়ে দিন। বাদামি বর্ণ ধারণ করলে ছেঁকে নিয়ে তেঁতুলের চাটনি দিয়ে পরিবেশন করুন।

বাদাম পকোড়া

উপকরণ: ১ কাপ ভেজানো মুগডাল এবং খোসা ছাড়ানো বাদাম, ১ বড়ো চামচ বেসন, ১ ছোটো চামচ আদাকুচি, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকার কুচি, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতার কুচি, হাফ চামচ হলুদগুঁড়ো, হাফ চামচ লাল লংকার গুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ আমচুর, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ভেজানো মুগডাল মিক্সিতে পেস্ট তৈরি করে বাদামের সঙ্গে মিশিয়ে রাখুন। তেল ছাড়া, বাকি বেসন এবং সমস্ত উপকরণ ভালো ভাবে মিলিয়ে নিন। এবার সামান্য জল দিয়ে বেসন ও সমস্ত মশলা ফেটিয়ে নিয়ে লেই তৈরি করুন। এরপর কড়াইতে তেল গরম করুন। মুগডালের সঙ্গে মেশানো বাদাম অল্প অল্প করে নিয়ে, বেসনে চুবিয়ে ভাজুন হালকা আঁচে। পকোড়া বাদামি বর্ণ নিলে ছেঁকে তুলুন কড়াই থেকে এবং ধনেপাতার চাটনি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

জাতপাতের বিভাজন বিপজ্জনক

‘ভাগ করলেই ভুগতে হবে’ স্লোগান আজকাল বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু কে বিভক্ত করছে, আর কাকে ভুগতে হবে, তা স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না। যদিও কোনও জাতির নাম নেওয়া হচ্ছে না, তবে সবাই জানে যে, দাঙ্গার ভয়ে সবাই কিছুটা সাবধান হয়ে কথা বলছে। তবে প্রচ্ছন্নে কেউ কেউ এই বলে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, যদি জাতপাতের নিরিখে চিহ্নিত করা হয় এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়, তবে সমস্ত দেশবাসী একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, বহিরাগতরাও সুযোগ নেবে। এখন প্রশ্ন হল— কে জাতপাতের ভেদাভেদ করেছিল এবং কবে থেকে শুরু করেছিল?

জন্মের পরেই যদি জাতপাতের নিরিখে শিশুকে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে গোটা দেশেরই বিপদ ঘনিয়ে আসবে। আসলে, এর জন্য দায়ী ব্রাহ্মণদের তৈরি পরিকল্পনা। সভ্যতার শুরু থেকেই ব্রাহ্মণদের সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যেককে তাদের জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। অনেক গ্রামে তো জাতপাত নিয়ে এখনও ১৮ শতকের আগের আচার-আচরণ জারি রয়েছে।

জওহরলাল নেহরুর আমলে গৃহীত সংবিধানে সকলের সমান অধিকার থাকলেও, এখনও জাতপাতের ভেদাভেদ চলছেই। নামের পরে পদবি দিয়েই ভালো-খারাপ চিহ্নিত করা হয় এখনও। জাতপাতের ভিত্তিতে বিভাজন এমন যে, যারা বিভাজন করতে জানে, তারা মুখ দেখেই নাকি বলে দিতে পারে কে কোন বর্ণের। আসলে, যারা জাতপাতের নামে বিভাজন করে, তারা শান্তিতে থাকে না। সন্তানের চলাফেরা, লেখাপড়া, মেলামেশার বিষয়টিও জাতপাতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে দেন ওই কুসংস্কারাচ্ছন্ন অভিভাবকরাই। তাই যারা ‘নিম্নবর্ণের’, তারা বাবার নাম, কাজ, বংশ পরিচয়, এমনকী কোন অঞ্চলে থাকেন, তা বলতে চান না কিংবা বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন আজও।

এই বিভাজনকারীরা সর্বত্র বিরাজমান এবং তারা দিনে ১০ বার তাদের জাতপাত নিয়ে চর্চা করে। ‘আর্টিকেল ফিফটিন’ ছবিটিও তাই হয়তো সাফল্য পেয়েছে। জাতের কৌলিন্য নিয়ে এখনও বড়াই করে বিভাজনকারীরা এবং সামনে থাকা লোকেদের জাতের নিরিখে ‘উচ্চ-নীচ’ তকমা দেয়। অবশ্য, ‘ছোটোজাতের’ নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে কোনও অসুবিধা হয় না জাতপাতের এই বিভাজনকারীদের। কিন্তু সেই জাতপাতের বিভাজনকারীদের বড়ো কষ্ট হয় যখন ‘ছোটোজাতের’ কেউ ঘরের কোনও কিছু স্পর্শ করেন।

মজার বিষয় হল এই যে, সব দল বর্ণের ভিত্তিতেই টিকিট দেয় ভোট প্রার্থীদের। এই বিভাজন কে করেছে? স্বামী দয়ানন্দ, বাল গঙ্গাধর তিলক, বালকৃষ্ণ গোখলে, রাজেন্দ্র প্রসাদ সরদার, বল্লভভাই পটেল এবং সি রাজাগোপালাচার্যের মতো কংগ্রেস নেতারাই কি তাহলে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের জন্য দায়ী ছিলেন? আসলে, কিছু মানুষকে ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করতে গিয়ে, সমগ্র ভারতের এক তৃতীয়াংশ নাগরিকের মনে আঘাত করা হয়েছে।

আজ ভয় দেখানো হচ্ছে কাদের? সেইসব দুর্বল মানুষ, যারা আজ সবদিক থেকে কোণঠাসা, তাদের? আজ যার হাতে বন্দুক আছে, নেতা আছে, প্রশিক্ষিত গুণ্ডাবাহিনী আছে— তারাই আসলে ভয় দেখাচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। মূল বিষয় হল— কোথাও স্বস্তি নেই, শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই সাধারণ মানুষের। যে দেশে হাজার হাজার সমস্যায় জর্জরিত মানুষ, সেখানে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা না ভেবে, আজও চলছে জাতপাতের বিভাজনের ক্ষুদ্র রাজনীতি। এই বিভাজন আসলে বিপজ্জনক। আর এই বিপদ থেকে সাধারণ মানুষ কবে মুক্তি পাবে তা জানা নেই কারওরই।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব