পণ্ডিত এ কানন-এর জন্ম-শতবার্ষিকী উদযাপিত হল মহা সমারোহে

পণ্ডিত এ কানন আর গুরুমা মালবিকা কাননের সুযোগ্যা ছাত্রী চন্দ্রা চক্রবর্তী। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী চন্দ্রার সঙ্গীতশিক্ষা কলকাতার সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমিতে। গুরুর জন্ম-শতবার্ষিকী উদযাপনের আয়োজনেও তাই কোনো ত্রুটি ছিল না।

Entertainment news
Chandra Chakraborty

চন্দ্রার ডাকে সাড়া দিয়ে হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের মহা তারকারা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের গুরু পরম্পরার অভিজ্ঞতার কথা হাজার হাজার দর্শকের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানের গুণগত মান,পরিবেশনা ও পরিচালনার গুণে এতটাই মনোগ্রাহী হয়েছিল যে, এক একটা অনুষ্ঠানে দর্শক-সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। সেইসঙ্গে, ‘কলাকার আর্টস—ইউকে’র নাম পৌঁছে গেছে পৃথিবীর কোণায়-কোণায় সমস্ত সঙ্গীতপিপাসু মানুষের কাছে। পণ্ডিত এ কাননের জন্ম শতবর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল উস্তাদ রাশিদ খানের গান আর এ কানন বিজড়িত স্মৃতিকথা দিয়ে।

Entertainment news
Celebrated of A Kanan’s 100th birth anniversary by Kalakar Arts UK

৫০ পর্বের পর গুরু-শিষ্য পরম্পরা সিরিজের অনুষ্ঠানের শেষ হল গত ২৭শে ডিসেম্বর গুরুমা বিদুষী মালবিকা কাননের ৯০ তম জন্মদিবস উদযাপন দিয়ে। এই অনুষ্ঠানে ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী বিদুষী শাশ্বতী সেন ও তার ছাত্র-ছাত্রীরা। গত বছর এপ্রিল থেকে শুরু করে একটানা এতদিন ধরে তারকা সমাবেশে এমন উচ্চমার্গের অনলাইন অনুষ্ঠান সত্যিই নজর কেড়েছিল।

এই প্রসঙ্গে চন্দ্রা জানালেন, ‘প্রতিবার অনুষ্ঠান শুরু করার পর দেখতে-দেখতে কখন যে এক ঘন্টা,দু’ ঘন্টা কিংবা তিন ঘন্টা পার হয়ে গেছে, আমরা কেউই  টের পাইনি। এ যেন শুধু আমার বা কলাকারের অনুষ্ঠান নয়, এই অনুষ্ঠান গুলো হয়ে উঠেছে সমস্ত দর্শকের নিজের। তাই দর্শকরা নিজেরাই আরও কত জায়গায় তাঁদের নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়াতে এই অনুষ্ঠানের কথা অন্যদের জানিয়েছেন। আজ তাই সারা পৃথিবী জুড়ে ‘কলাকার আর্টস—ইউকে’ এক বিশাল পরিবার! গুরুজী তো এমনটাই চাইতেন, সবাই এক সঙ্গে থেকে ভালো কাজ করে যাবে, শুদ্ধ সংগীতের প্রচার করে যাবে।’

entertainment news
Celebrated of A Kanan’s 100th birth anniversary by Kalakar Arts UK

কোভিডের জন্য লন্ডনে যে লক ডাউন শুরু হয়েছিল গত বছর মার্চে, নতুন বছরের শুরুতেও সেই বদ্ধ অবস্থা থেকে বেরোনো যায়নি। কলকাতায় এখন দর্শক সমাবেশে সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরু হলেও, লন্ডনে তা কত দিনে সম্ভব হবে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এই অবস্থায়, চন্দ্রা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘যত দিন পর্যন্ত সবকিছু পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় না পৌঁছাচ্ছে, তত দিন অন্তত মাসে দু’-বার কলাকারের ফেসবুক অনলাইন অনুষ্ঠান চলতে থাকবে। সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে আনা হবে সম্ভাবনাময় নতুন শিল্পীদের। সঙ্গে থাকবেন এক সময়ের প্রবীণ শিল্পীরাও, যারা এক সময় সঙ্গীত জগতের সর্বোচ্চ স্থানে থাকলেও সময় আর বার্ধক্য তাঁদের লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেছে। যাদের নাম এখনও অনেকের কাছে পৌঁছায়নি, তেমন শিল্পীদের গান বাজনা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেবে কলাকার। এও এক গুরু দক্ষিণা। সিরিজের নাম দেওয়া হয়েছে— মেহফিল।’

entertainment news
Chandra Chakraborty

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম হিন্দি ছবির শুটিং শুরু কুমোরটুলিতে

একের পর এক ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার জয়ী পরিচালক এবং অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, এবার শুরু করলেন হিন্দি ছবি পরিচালনার কাজ।আঁজ্ঞে হ্যাঁ, টলিউড থেকে সোজা বলিউডে পা রাখলেন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়৷ শুরু হয়েছে সুরিন্দর ফিল্মসের প্রযোজনায় তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘মনোহর পাণ্ডে-এর শ্যুটিং।

এর আগে বাংলা দেশ ও ভারতের পটভূমিকায় তৈরি করেছেন ‘বিসর্জন’ ও তার সিকুয়েল বিজয়া,  তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে ‘নগরকীর্তন’ এবং একজন রূপান্তরকামী মানুষকে নিয়ে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’,   বামনদের নিয়ে ‘ছোটদের ছবি’  কিংবা ফোলি আর্টিস্টের জীবন নিয়ে ‘শব্দ’–একের পর এক ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়  তুলে ধরতেই পছন্দ করেন কৌশিক। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে করছেন দর্শকরা। তাঁর ফিল্মি কেরিয়ারের প্রথম হিন্দি ছবি ‘মনোহর পাণ্ডে’-এর জন্য বেছে নিয়েছেন খ্যাতনামা চিত্র ও মঞ্চাভিবস্তুত নেতা সৌরভ শুক্লাকে।এই ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন রঘুবীর যাদব এবং সুপ্রিয়া পাঠক কাপুরের মতো দক্ষ শিল্পীরা।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে  ‘মনোহর পাণ্ডে’ ছবির পোস্টারও। টুইট করে সেই ছবির ঘোষণা করেছেন বক্স-অফিস বিশেষজ্ঞ তরণ আদর্শ।কলকাতার কুমোরটুলিতে বলিউডের অভিনেতাদের নিয়ে শ্যুটিং করলেন কৌশিক।

কলকাতায় শুটিং করতে এসে দিব্যি খোশ মেজাজে রয়েছেন অভিনেতা সৌরভ শুক্লা। কখনও ভবানীপুরের টেবিল টেনিস ক্লাবে টেনিস খেলেছেন, তো কখনও আবার বাঙালি খাবার উপভোগ করেছেন। তাঁর অভিনীত একটি সিন দিয়েই শুটিং শুরু হল। ঠিক যেখানে প্রতিমা গড়া হয় সেখানেই শুট করা হয়েছে প্রথম দৃশ্যটা। এর আগে বলিউডের বহু ছবির শুটিং করতে কলকাতায় এসেছেন।থিয়েটারো করে গেছেন এ শহরে। কিন্তু এই প্রথমবার কলকাতার কোনও ইউনিট নিয়ে বলিউড ছবির জন্য শুটিং করলেন সৌরভ।

জানা গিয়েছে যে, এক সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হতে চলেছে এই ছবি৷ তবে, গল্প এবং চরিত্র নিয়ে এখন থেকেই মুখ খুলতে নারাজ ছবির টিম৷ কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের এই ছবির প্রেক্ষাপট মধ্যবিত্ত এক দম্পতি এবং করোনা আবহ৷ করোনা, লকডাউনের প্রভাবের মাঝখানে এক ছোট্ট ভালোবাসার গল্প বুনেছেন পরিচালক । ছবিটি মূলত শ্যুটিং হবে কলকাতা শহরের আনাচে-কানাচেই৷ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়৷ ক্যামেরায় রয়েছেন গোপী ভগৎ।

ফিটকিরি-র বহুবিধ ব্যবহার

ফিটকিরি চেনেন না এমন মানুষের সংখ্যা কম। কিন্তু ফিটকিরি-র বহুবিধ ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা হয়তো সবার নেই। অর্ধস্বচ্ছ বরফের মতো কঠিন এই খনিজ দ্রব্যটি, সস্তা এবং সহজলভ্য। কারণ, এটি এখন ল্যাবরেটরি-তে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়। এর স্বাদ নোনতা এবং কষা। এটির সঠিক ব্যবহারে কী কী উপকার পাওয়া যায়, তা জেনে নিন।

জল শোধনকারী : সেই প্রাচীনকাল থেকেই জল শোধনে ব্যবহৃৎ হয়ে আসছে ফিটকিরি। জলে কোনও ময়লা বা জীবাণু থাকলে, এক টুকরো ফিটকিরি ফেলে দিন, দেখবেন কিছুক্ষণ পরে ময়লা নীচে থিতিয়ে যাবে। এরপর আস্তে করে উপরের জলটুকু অন্য পাত্রে ঢেলে ব্যবহার করতে পারেন।

জীবাণুনাশক : অ্যান্টিসেপটিক হিসাবে খুব কার্যকরি ভূমিকা নেয় ফিটকিরি। তাই, দাড়ি কাটতে গিয়ে হঠাৎ গাল কেটে গেলে ফিটিকিরি ঘষে দিন। এতে রক্তও বন্ধ হবে এবং জীবাণুর সংক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।

ঘামাচি দূর করে : গরমে অনেকের ঘামাচির সমস্যা দেখা দেয়। আর এই ঘামাচি দূর করার জন্য ফিটকিরির সাহায্য নিন। স্নানের জলে এক টুকরো ফিটকিরি ফেলে স্নান করুন, ঘামাচির সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

ব্রণ দূর করে : সাধারণত ত্বকে জীবাণুর আক্রমণ ঘটলে এবং পেট পরিষ্কার না-থাকলেই ব্রণ-র সমস্যা দেখা দেয়। তাই, পেট পরিষ্কার রাখার জন্য খান ফাইবার-যুক্ত খাবার। ফিটিকিরি জলে চুবিয়ে আস্তে আস্তে ব্রণর উপর ঘষতে থাকুন। এক মিনিট পর ঠান্ডা জলে মুখ ধুয়ে নিন, ব্রণ দূর হবে।

মুখের দুর্গন্ধ দূর করে : মুখের ভিতর ঠিক মতো পরিষ্কার না রাখার জন্য কিংবা বাজে টুথপেস্ট ব্যবহার করার কারণে মুখগহ্বরে জীবাণু বাসা বাঁধে এবং দুর্গন্ধ হয়। এক্ষেত্রে হালকা গরম জলে একটু নুন এবং ফিটকিরির সামান্য গুঁড়ো মিশিয়ে গার্গল করুন। মুখের দুর্গন্ধ দূর হবে এবং দাঁতে ব্যথা থাকলে তাও দূর হবে।

মাথার উকুন মারে : চায়ের লিকার ঠান্ডা করে, ওর মধ্যে ফিটকিরির সামান্য গুঁড়ো মিশিয়ে মাথায় মাখুন এবং তিরিশ মিনিট পর শ্যাম্পু করুন। টানা তিনদিন এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে উকুন উধাও হয়ে যাবে।

বিজন বনের গহিনে

উত্তরে ডুয়ার্স সফরে গেলে আমার প্রেসক্রিপশন– কাঞ্চনকন্যায় টিকিট কেটে জানলার পাশে দখল নিয়ে বসুন। পরদিন সকাল থেকেই যাত্রাপথের দু’ধারে ছবির গ্যালারি খুলে যাবে, যার সূচনা গুলমা স্টেশন থেকেই। গুলমা– নামটি যেমন কোমল, তেমন পেলব প্রকৃতি। অতঃপর মহানদী পেরিয়ে মহানন্দা অভয়ারণ্যে প্রবেশ। এই অরণ্য জড়িয়ে কত নদীর খোয়াবনামা। এ যেন নদী নয়, লাজুক লতা কবিতা। কারও নাম লিস, কেউ চপলা ঘিস, কেউ অপ্সরা ডিমা, কেউবা সুন্দরী ডায়না, আঁকাবাঁকা জলঢাকা রেলের জানলায় দেখা দিয়ে চলে গেল, ও চুপিচুপি কি বলে গেল! বন-ছুট নদীর সেই মন-ছুট ডাকের অবাধ্য হয় সাধ্য কার। তিন পাহাড়ের কাঁধে চড়ে করোনেশন সেতু, নীচে তার দুরন্ত তিস্তার বিস্তার।

ঘন বনের মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো হল্ট স্টেশনগুলি– নাগরাকাটা, বাগরাকোট, চালসা, মাল, মেটালি, মাদারি। প্রকৃতির উদার বিস্তারের মাঝে বড়ো নম্র সব নাম। স্টেশন কেরনকে প্রথম দেখা এক কুয়াশা ঢাকা শীত-ভোরে। শিশির ভেজা স্টেশন। কয়েক টুকরো কাঠের বেঞ্চ, গ্যাসের বাতি। অনেকটা নীচে একফালি প্ল্যাটফর্মের নির্জন বেঞ্চ-এ একাগ্রচিত্তে বসেছিলেন কৃশকায় শ্বেতকায় ব্রিটিশ বৃদ্ধ।

হ্যাট-টাই-কোট-বুট। হাতে স্টিক। হয়তো চা বাগানের অবসরপ্রাপ্ত সাহেবটি, কেরনকে ভালোবেসে এখানেই স্থায়ী হলেন। প্ল্যাটফর্মের অপর দিকে রেলবাবুদের লাল ইটের কোয়ার্টার। তাদের নিত্যকার ঘর গেরস্থালি। তাদের বুকের ওপরে রেল স্টেশন, পিছনে পাহাড়, বন, সরীসৃপ ঝরনা। নির্জনতা চেরাই করে মাঝে মাঝে বুনো বাইসন নামে রেল পাড়ায়।

এখন আলিপুরদুয়ার নতুন জেলা। কাঞ্চনকন্যা ভিড়ল এসে আলিপুরদুয়ার জংশনে। আমাদের প্রথম হল্ট পরিমলের ঠেক-এ, অর্থাৎ রাজাভাতখাওয়া ট্রেকার্স হাট-এ। কাঠের দেয়াল, কাঠের সিঁড়ি, ঘর, বারান্দা– তক্তা জুড়ে জুড়ে অনবদ্য অনাড়ম্বর এক এথনিক হাট। অনেকটা ধূলি-ধূসর এক বাতিল ক্যাসল। তারই মুখোমুখি ভাতখাত্তয়া রেল স্টেশন।

 

চারিদিকে বুনো গন্ধ নিয়ে প্রাচীনত্বের সিলমোহরে ভাতখাওয়া বনাঞ্চল। এখানে মার্চেন্ট পাড়ায় আলাপ হয়েছিল আশু ঘোষের সঙ্গে। ভদ্রলোকের আশি ঊধর্ব বয়স। ২৮ বছর বয়সে ওপারের (বাংলাদেশ) সাতক্ষীরা থেকে একগুচ্ছ যুবক ভাগ্য ফেরাতে এসে খুঁটি করলেন গহন বনের মাঝে এইখানে। তখনও বন কাটাই দণ্ডনীয় অপরাধ হয়নি। গগনস্পর্শী লালি, কাঞ্চন, শাল, বহড়া কেটে টিম্বার ব্যাবসার ইলাহি সুযোগ। সন্ধে হলে বাইরে বেরোবার সুযোগ কম। টের পেতাম পাকা লাটোর খেতে হরিণ ঢুকেছে বনে। ঘরের বেড়ার পাশে লাটোর ফল চিবোচ্ছে। হামেশাই ঘটত এমনটা।

গরমে পাল খাওয়া বাঘের ডাকও শুনেছি। সেই মদন চড়া ডাকে যেন গাছের পাতা ঝরে পড়ে। এখান থেকে ছোটো লাইন গেছে জয়ন্তী। পাহাড়ের কোলে অনবদ্য রেল স্টেশন । তখন বন যেমন ছিল, বন্যও তেমন। সন্ধে নামলে গারো বস্তির ভেতর দিয়ে হাতির পাল ঢুকত ফরেস্ট কলোনিতে। এ ছিল নিত্যকার পাঁচালি। তখন কয়লার রেল চলত এ পথে। খানিক গিয়ে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়েছে জঙ্গলের আঁধারে। হাতির দল নেমেছে। রেল ট্র্যাক অবরুদ্ধ ৷এখন আর জঙ্গল কোথায়? যা ছিল তার সিকি ভাগ উচ্ছেদ হয়ে গেছে। তখনকার দিনকাল হলে মার্চেন্ট পাড়া খুঁজে পেতে অত সহজে?

ভাতখাওয়ায় ছোট্ট একটা লাঞ্চ ব্রেক সেরে আমাদের এগিয়ে যাওয়া গদাধর রেঞ্জ অফিসে। সেখানে কটা দিনের আশ্রয় রেঞ্জার ভবেন বসুমাতার মেহমান হয়ে। এই ভবেন বসুমাতা আমার ভ্রমণ জীবনে এক আবিষ্কার। সেই আবিষ্কারের গল্পটা একটু খুলেই বলি।

২৪ নভেম্বর, ১৯৯৬, রায়ডাক বন নিবাস থেকে ভুটানঘাট বাংলোয় থাকার উদ্দেশে ময়নাবাড়ি বিট-এ এসে গাড়ি থামল! এখানেই ভুটানঘাটের এন্ট্রি পয়েন্ট। বিটবাবু গাড়ি রুখলেন– পারমিট ছাড়া তো নাকা উঠবে না। আমরাও না-ছোড়। বিনা পারমিটে ডুয়ার্স তল্লাট টহল মারছি। বাবুটি ঠান্ডা গলায় বলেন– ও সব গল্প শুনিয়ে টলাতে পারবেন না ভাই। এই কোর ফরেস্টে ঢুকতে উপযুক্ত কাগজ চাই। তার উপরে ভুটানঘাট বাংলো ভিআইপি মর্যাদার রেস্ট হাউস। তিনি বোঝাতে চেষ্টা করেন, ডুয়ার্সের ৭৬১ বর্গ কিমি বনাঞ্চল কঠিন আইনে বাঁধা। এর ভিতরে যেমন মূল্যবান বৃক্ষ সম্পদ, তেমনই বন্যপ্রাণী, আবার ভুটানের জিরো পয়েন্ট। আমরাই এই সম্পদের নিরাপত্তারক্ষী। এবারে আপনাদের বিবেক কি বলে?

আমার বিবেক বলছে ফিল্ড ডিরেক্টর সাহেবের সঙ্গে একবার যোগাযোগ করতে হয়। বিটবাবু বলেন, কার কথা বলছেন?

নাম বলি। তিনি ফোন লাগান। আমরা গাড়ি থেকে নেমে জায়গাটা জরিপ করি। সামনে তুরতুরি চা বাগান। বিট কোয়ার্টারের পিছন থেকে পাইকারি জঙ্গল। ঘন অন্ধকার। সরু সিঁথি চেরা পথ ৫ কিমি টেনে এনেছে ভুটানঘাট বাংলোর গেট ইস্তক। এ সবই আমাদের বাইরে থেকে জানা শোনা।

ওদিকে ফোনে ওপরওয়ালার কী উপদেশ, আদেশ, নির্দেশ এল জানি না। অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর বিট ভদ্রলোক বেশ রাশভারী গলায় আমাদের ডেকে নিয়ে বলেন, আপনাদের ছাড়া যাবে না। অর্থাৎ চা না খেয়ে আপনাদের ছাড় নেই। ততক্ষণে চায়ের জল বসেছে স্টোভে আর আমরা বসেছি গল্পে। এই ভদ্রলোকই ভবেন বসুমাতা, তখন ময়নাবাড়ি বিটের বিট অফিসার। এই অশান্ত বনের ঘেরাটোপে দু’জন বন গার্ড, একটি টহলদারি হাতি প্রমীলা– তার পাতাওয়ালা, আর তাঁকে ঘিরে এই কটি প্রাণী। সঙ্গে দু-নলা এক বন্দুক। ভবেন বলেন চিরস্থায়ী এক রেড অ্যালার্ট জোন এটা। বাইরে খেকে কিচ্ছু বুঝবেন না। আপনাদেরও বলে রাখছি, ভুটানঘাটে গিয়ে কোনও বাহাদুরির ভারী মাশুল গুনতে হতে পারে।

 

সেবারে ভুটানঘাট ছেড়ে আসার পর সেই যে সম্পর্ক-ছুট হয়ে গেলেন ভবেন, তাঁকে খুঁজে পেতে ২০ বছর কেটে গেল। অকস্মাৎ একদিন ফোনে যোগাযোগ। ভুটানঘাট এপিসোড মনে করাতে এক বারেই চিনে গেলেন এবং আন্তরিক আমন্ত্রণ জানালেন। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে  এই যাত্রা। অরণ্যপ্রিয় এই মানুষটাকে প্রথম দেখায় বুঝেছিলাম ইনিই আমার ডুয়ার্সের অভিধান হতে পারেন। সে বোঝায় যে কোনও খাদ ছিল না, ক্রমশ প্রকাশ পেয়েছে।

লাঞ্চের মাঝ পর্বেই ভবেন হাজির। চেহারা সেই একইরকম আছে– ছিপিছপে গড়ন, হালকা ট্যান করা গায়ের রং। মেদহীন পাঁচ ফুট ৭ ইঞ্চির কাঠামো। এসেই বলেন– লাঞ্চে মেনু কী রেখেছে পরিমল?

–এই তো ঢেঁকি শাক, দুধ কচু, চেপ্টি মাছের ঝাল।

–স্থানীয় আইটেম সব হিসেব করেই রেখেছে দেখছি।

–কেমন আছেন বলুন– শুধোই ভবেনকে।

–কেমন দেখছেন?

–বয়েস একেবারেই ছোবল বসায়নি শরীরে।

–সারাটা জীবন সবুজে থেকে এটুকু সজীব তো থাকব মশায়। ভবেন চেয়ার টেনে বসেন পাশে।

তাঁকে বলি, –২০ বছর হারিয়ে আসার গল্প শুনব আপনার মুখে। –বুনো মানুষদের গল্প একই। সেই ময়নাবাড়ি থেকে কাঠমবাড়ি। ৫ বছর দক্ষিণের জঙ্গলে কাটিয়ে আবার উত্তরের লাটাগুড়ি, নাথুয়া, কুমারগ্রাম করে এই বক্সা টাইগারে টানা ১৯ বছর।

Buxa -Jayanti Travel

লাঞ্চ শেষে উঠে বসি ভবেনের গাড়িতে। গন্তব্য গদাধর, রাজাভাতখাওয়ার একটি রেঞ্জ। ভবেনবাবুর বানপ্রস্থ জীবন এই রেঞ্জ কুঠিতে।

ভাতখাওয়া পেরিয়ে দমনপুরে এসে ডান দিকে পথের প্যাঁচ কাটিয়ে গাড়ি ওপরে উঠে ধরল ৩১ নং জাতীয় সড়ক। স্টিয়ারিং-এ খোদ ভবেন বসুমাতা। পথের দু’ধারে ছুটে চলেছে মাঝির ডাবরি চা-বাগান। মার্চের শেষ থেকে মে-র তৃতীয় সপ্তাহ জুড়ে চলবে এই ফার্স্ট ফ্ল্যাশের টি প্লাকিং। মে’র শেষ থেকে বাকি ৩ মাস সেকেন্ড ফ্ল্যাশের প্লাকিং শুরু হবে। সেই চায়ের কদর বিশ্ব জুড়ে। পথের পাশে গাড়ি থামিয়ে নেমে গিয়ে ভিড়ে যাই চা মেয়েদের সঙ্গে। এই মদেশীয় মেয়েরা কেউ জার্লিনা, মেরি, ডায়না, সুরিনা –সকলেই জিশুপন্থী।

আমাদের দেখে সহকারি ম্যানেজার সহাস্যে এগিয়ে এসে প্রস্তাব দেন– চলুন তবে ভবেনবাবু ওদের ফ্যাক্টরিটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিই। ভবেন হেসে বলেন– এই সবে চা দুনিয়ায় ওরা পা রাখলেন। আগে সবুজ পাতা চিনুন, তারপর তো ফিনিশ্ড চা। বড়ো বাগানের চা আইন বেশ কড়া ধাতের। ব্রিটিশরাই করে গেছেন। অধিকাংশ বাগানের মালিক তো তাঁরাই ছিলেন। সহ মানেজার বলেন– যেমন ধরুন সকাল ৭ টায় হুটার বাজিয়ে বাগানে হাজিরা শুরু। তখন কুলি লাইন ফাঁকা করে কামিনরা বেরিয়ে এসে বাগানে ঢুকবে। বাগানবাবু ওদের হাজিরা দেখবে। কাজের তদারকিতে বাগান সর্দার। জল পানের প্রয়োজনে পানিওয়ালা ঘুরছে। দিনে ৩ দফা পাতা কাঁটায় (ওজন) তোলা হবে। বিকেল ৩টেয় বইদার প্রতি প্লাকারের সেদিনের উৎপাদন লিপিবদ্ধ করবে। ফি দিন ন্যূনতম ২৪ কেজি পাতা তুলতেই হবে। বেশি হলে উপরি মজুরি।

হপ্তা মজুরির দিন বাগান গেটে হাট বসে। হাট মানে সারা সপ্তাহের কেনাকাটা, হাট মানে মদপানি, জুয়ার ঠেক। হাট মানে কাবুলি ব্যাংকে সুদ-আসলের বোঝাপড়া। ম্যানেজার সাহেবের হাটের বাগান শুনে মনে পড়ল এক চা বাগানের হাটের অভিজ্ঞতা। সে ছিল মথুরা চা বাগানে সোমবারের হাট। চিলাপাতা বাংলো থেকে রিক্সাযোগে চলেছি আমবা দু’জন। দূরত্ব ৩ কিমি। পথে অগণিত মানুষেব পা চলেছে হাটে। দু’ধারে মথুরা চা বাগান। মাঝে মসৃণ সড়ক। মার্চের নরম বিকেল। মাথার ওপর আদিগন্ত আকাশ।

মাঝির ডাবরি বাগান ছেড়ে এগোচ্ছে গাড়ি। উত্তরে কালকূট নদীটা দেখে নামিতা সাংমাকে মনে পড়ল। নদীর পারে সুপুরি ছায়ায় গারোদের গ্রাম। নমিতা, সূচনা, মারাক একবার আকুতি জানিয়েছিল,

–এখানে একটা হোমস্টের ব্যবস্থা দিন না করে! আমরা স্বর্গ ছেঁড়া স্বনির্ভর গোষ্ঠী চালাই। হোমস্টেতেও সফল হব দেখবেন।

–সুপুরি ছায়ায় গ্রাম, অবাধ এক মেছো নদী কালকূট, দূরে ভাতখাওয়া জঙ্গলকে পেঁচিয়ে ধরে এগিয়ে গেছে। পাশেই চেকো বিট। এখানে এক পর্যটন আবাস হলে গারো মেয়েদের যত্নবান হাতের পরিষেবায় ওদের স্বপ্ন সফল হতো। টুরিস্টরা পেতেন এক নতুন ঠিকানা। আজও হল না! সে আক্ষেপ রয়েই গেল!

কলকূটের পরে গেল গদাধর নদী।

–এ নদীও কি ফিশ ব্যাংক? ভবেন বলেন, –উত্তরের কোন নদীই বন্ধ্যা নয় জানবেন। এর বিশেষ কৃতিত্ব সরপুঁটিতে। গদাধরের সরপুঁটির নেশা সুযোগ পেলে ধরিয়ে দেব।

৩১ নং হাইওয়ে থেকে বাঁ-দিকে বাঁক নিয়ে মাইল ছয়েক গেলে রেঞ্জার কোয়ার্টার। পাশেই অফিস। কোয়ার্টারে একাই থাকেন ভবেন। আর একটি কাজের ছেলে কুমার রাভা। রান্না থেকে যাবতীয় ঘরকন্না তার হাতে। আর আছে একটি দিশি সারমেয়– বাঘা, তার গতিবিধি বেডরুম টু বাথরুম। গাড়ি থেকে নামতেই ছুটে এসে সে-ই আমাদের উদ্যম খানিক ড্যামেজ করে দিল। তারপর প্রভু-বন্ধু বুঝতে পেরে ল্যাজ গুটিয়ে ঘরে অদৃশ্য হল। পরে অবশ্য বেশ ক’বার এসে আন্দাজ নিয়ে গেছে আগন্তুকরা তার প্রভুর কতটা হিতাকাঙক্ষী!

ভবেন বলেন– বাঘা এই কোয়ার্টারের কেয়ার টেকার। ওর কাছে ছাড়পত্র না পেলে নো এন্ট্রি। একবার সকালের দিকে বারান্দায় শুনছি ওর বিকট চিৎকার। ভিতর ঘরে ছুটে এসে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। ওর সঙ্গে বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখি ৩ ফুটের এক দুধরাজ সাপ বারান্দা থেকে ঘরের দিকে আসতে চাইছে। আর প্রহরী তা রুখে দিয়ে তারস্বরে চিৎকার জুড়েছে।

অবশেষে ওটাকে বস্তায় ভরে জঙ্গলে পাঠালাম। টেবিলে চা পড়েছে, সঙ্গে গল্প।

ভবেন প্রস্তাব দেন,

– আজ বাকি দিনটা রেস্ট করে, কাল তাড়তাড়ি লাঞ্চ সেরে, ফরেস্ট ট্রিপ।

–তাঁর প্রস্তাব মঞ্জুর।

পরদিন তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে নিয়ে প্রস্তুত হলাম। গাড়ি বেরোল। পুরোধায় ভবেন, সঙ্গে বিটবাবু, গানম্যান, আর চালককে ধরে আমরা আরও চারজন। বুঝলাম বেশ আঁটোসাঁটো বন্দোবস্ত করে জঙ্গলে নামছেন ভবেন। আমরা আগেই জানিয়েছি বন্যপ্রাণী দেখা নিয়ে আমাদের কোনও হ্যাংলামি নেই। সামনে সাইট হলে ভালো, নইলে ভাতখাওয়া, পানবাড়ি, জয়ন্তীর জঙ্গল একাই একশো।

–বেশ, আগে গদাধর রেঞ্জ থেকে শুরু করি, চালক বলে।

জনপদ ছেড়ে নির্জনতায় প্রবেশ ঘটছে। তার সূচনায় কয়েকটি বিচ্ছিন্ন গাছ, নাগবেলা লতার ঝোপ, খোলা প্রাঙ্গণ ছেড়ে হুড়মুড়িয়ে জঙ্গল এসে পড়ল। এই গদাধর রেঞ্জ। আসল কোর ফরেস্ট শুরু হবে পানবাড়ি থেকে। পানবাড়ি শুনে মনে পড়ল একবার ভাতখাওয়া থেকে ২৩ মাইল টাওয়ারে এসে পানবাড়ি জঙ্গলের নমুনা দূর থেকে দেখে ভেবেছিলাম, একবার কোনও ফিকিরে ঢুকতে পারলে জঙ্গলের বিক্রম দেখা যেত। সেই পানবাড়ির পরদা ফাঁস হতে চলেছে।

গাড়ি চলছে শম্বুক গতিতে। স্টিয়ারিং-এ আছে টাইগার নার্জিনারি। ভবেন বলেন– আমাদের এই টাইগার কিন্তু রয়েল বেঙ্গল থেকে খুব পিছিয়ে নেই। ওর যেমন সাহস, তেমন ক্ষুরধার বুদ্ধি, তেমনই দৃষ্টি শক্তি। বাঁ দিকে ভয়ংকর জঙ্গল। ডান দিকে বনের আড়ালে ২০ মাইল বনবস্তি।

–গদাধরের জঙ্গলে সম্বরটা বেশি দেখা যায়, বিটবাবু বলেন। যদিও এই পুরো অঞ্চলটাতেই অ্যানিমেল সাইট হয়। তবে সকালে আর বিকেলে ওরা রোড ক্রস করে।

Bhutanghat

রেঞ্জকুঠি থেকে আমরা ৭ কিমি ভেতরে ঢুকে পড়েছি। এখানে একটি ওয়াচ টাওয়ার গড়ে উঠছে। নিশ্ছিদ্র বনভূমিতে দিনের বেলায় ঝিঁঝির ডাক শুনছি। বন্যপ্রাণী প্রতিহত করতে টাওয়ারের চারদিকে সোলার ফেন্সিংয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। পাশে হাতির খাদ্য হিসাবে বাঁশের চাষ হচ্ছে। ডানদিকে চোখ ফেরাতে দেখি কয়েক লক্ষ প্রজাপতি কাগজকুচির মতো উড়ছে। জঙ্গলের এতটা পথে কোথাও একটা কীট পতঙ্গ চোখে পড়েনি, অথচ ওই একটা জায়গায় সাদা ইউনিফর্মে ওদের ছন্দবদ্ধ ডান্স ড্রামার অর্থ কি? গানম্যানটি বলেন– প্রকৃতির মতলব ব্যাখ্যাতীত দাদা।

এই শিহরণ জাগানো জঙ্গলে ভবেনের আগ্রহে নামতে হল। তিনি বেঁটেখাটো পেটাই স্বাস্থ্যের এক জনকে ধরে এনে বলেন– ও হেন্সিং, খুব মজার চরিত্র, কথা বলে দেখুন।

–লোকটি অনুগত ভঙ্গিতে সামনে দাঁড়িয়ে বলে– না স্যার, এখন আর কোনও কুকাজ করি না। এই বাবুটা আমার জীবনের ডিজাইন পালটে দিয়েছেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে দুর্গম জঙ্গলে নির্মীয়মাণ এই টাওয়ারের বর্তমান চৌকিদার ও একাই। একটি টর্চ আর কুকরি সম্বল মানুষটি সারা রাত আগলে রাখে ইট, বালি, সিমেন্ট থেকে আধা নির্মিত টং ঘরটা।

গানম্যানটি বলেন– এই লোক একটা হাতিকে একাই ঘোল খাইয়ে ছাড়বে। বাইসন, হাতির হার্ডের মুখে পড়লে অক্ষত বেরিয়ে আসবে। অসম্ভব মনের জোর, শরীরের কষ আরও বেশি দাদা। বিশ মাইল বস্তির এই ছেলেটি দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়ে একটা বিয়ে করে বসল। আর তারপর ওর জীবনের ছক গেল বদলে। জঙ্গলের হরিণ মারে, চোরা পথে মাংস বিক্রী করে, আর চোরা বাজারে চামড়া চালান করে। ক্রমে এই টাইগার রিজার্ভে পয়লা নম্বরের পোচার হয়ে দাঁড়াল।

বন দপ্তর ফাঁদ পাতে, ও জাল কেটে বেরিয়ে যায়। ২০ মাইল বন বস্তিতে পুলিশ দিনে রাতে হানা দিয়েও ব্যর্থ। হরিণ নিধন চলতেই থাকে। এবারে হেন্সিং-এর নামে পরওয়ানা জারি হল। ধারিয়ে দিলে অথবা ওর সন্ধান দিলে পুরস্কার ঘোষণা হল। চতুর ব্যক্তিটি বুঝল এবারে বাঁচতে হলে জঙ্গল ছাড়তে হবে। হেন্সিং-এর বাবা ছিল বোড়ো, মা নাগা। সে নাগাল্যান্ডে আত্মগোপন করে রইল ১১ বছর। তারপর ফিরে এল অন্য স্লক হেন্সিং।

আজ অতীত কৃতকর্মের জন্য সত্যিই সে অনুতপ্ত! ভবেন ওর সাহসকে ভালো কাজে লাগাতে প্রয়াসী হলেন। সেই ভক্ষকই আজ সরকারি সম্পত্তির রক্ষক।

ওকে বলি– এখন তোমার বোধ বিবেচনা কি বলছে?

একটু ভেবে নিয়ে সে বলে– পাপ যা করেছি স্যার বাকি জীবনের সু-কর্মেও তা নিষ্পত্তি হওয়ার নয়। আরও একটা জীবন লাগবে।

–ওকে থামিয়ে দিয়ে বলি– অপরাধ বোধটাই তোমার প্রায়শ্চিত্তের প্রথম ধাপ, তুমি পেরিয়ে এসেছ। বাকিটা কর্মের মধ্যে দিয়ে খালাশ পেয়ে যাবে। কি বুঝল জানি না, হেসে ঘাড় কাত করল হেন্কসিং নার্জিনারি।

সামনে ২৩ মাইল টাওয়ারে যেতে দু-ধারের জঙ্গল পাঁচিল তৈরি করেছে। তার ভিতরে ব্ল্যাক হোলে কে লুকিয়ে আছে বোঝার বাইরে। টাইগার কিছু একটা আন্দাজ করে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে।

ভবেন নীচু গলায় বলেন– কিছু সাইট হল?

গানম্যান ভালো ভাবে নজর করে বলে– একটা হার্ড দেখছি ওদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। বাঁ দিকে এসে পড়েছে এক থেকে চার নম্বর পানবাড়ি ফরেস্ট কম্পার্টমেন্ট। ডান দিকে জয়ন্তি ৯ নম্বর কূপ। ওদিকেই গেল পিজি ফরেস্ট রোড। এ জঙ্গলে সাধারণের প্রবেশ কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তবে সঙ্গগুণে নিজেদের অ-সাধারণ ভাবতে ক্ষতি কি?

ত্রি-তল বিশিষ্ট, ২৩ মাইল টাওয়ার একটি চৗপথির মুখে। চারিদিকে হাই ফরেস্ট। সামনে জঙ্গল কেটে বেশ খানিক খোলা জায়গা বার করে আনায় চোখের রিলিফ হচ্ছে। এখানে দাঁড়ালে পূর্ব দিকে ফেলে এসেছি গদাধর এবং পানবাড়ি ফরেস্ট এলাকা, পশ্চিমে রাজাভাতখাওয়া কম্পার্টমেন্ট, উত্তরে গেলে জয়ন্তির জঙ্গল। দক্ষিণে সাংহাই রোড ধরে টানা গেলে চেকো বিট হয়ে পথ গিয়ে মিলল ৩১ নং সড়কে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখি চিকরাশি, তুং, কাওলা, লাটোর, পাকাসাজ, আঁখাতরু, লালি, কুম্ভি –কত যে গাছের নাম, তাদের শরীরী ভঙ্গিমা। লসুনি ফুলের মিঠে গন্ধ নাকে আসছে। সবুজ স্টিকের মতো ঝুলছে টোটোলা ফল।

টাওয়ারের টং-এ জলপাই উর্দিতে দুই নজরদার গোলাপ সাংমা এবং বিপাই ওঁরাও। সঙ্গে দু’খানা দো-নলা। রবিবার ওরা টং-এ চড়েছে, বৃহস্পতিবার বনবাসের মেয়াদ শেষ। প্রতি বৃহস্পতি থেকে পালা করে চারদিন ধরে জঙ্গল লুঠের ওপর নজরদারি। টাওয়ারে শোওয়া, রান্না করে খাওয়া। এ জীবন আমাদের কল্পনার বাইরে। টাওয়ারের চারিদিকে পরিখা কাটা, তার উপরে সোলার ফেন্সিং-এ নিরাপত্তা বলয়। মাচার ওপর বসেই অ্যানিমেল সাইট হয়। সামনে মাটি খানিক চৗরস করে লবণ আর বিট লবণ ঢালা হয়েছে। সেই লবণের টানে আসে হাতি, সম্বর, হরিণ, বাইসন।

টাওয়ারের নীচে বসে গল্প চলছে। ফোটোবাজ বন্ধুটির লেন্সে হঠাৎ এক পাল হাতি ধরা পড়তেই সে উত্তেজিত। ভবেনবাবু ওকে ডেকে নেন। বলেন তাড়াতাড়ি পিছিয়ে আসুন। ওরা টাটকা নুনের সন্ধান পেয়েছে। কথা শেষ হওয়ার আগেই পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণের জঙ্গল ধরে দলবদ্ধ হাতি আসছে লবণের সন্ধানে। আমরা যে যার মতো ক্যামেরা, মুভি, মোবাইল খুলে তুলে রাখি বন্য সুন্দরের টাটকা সাবুদ।

জঙ্গলে ডাকছে ক্রৌর-ক্রৌর বসন্ত বৌরি, ডাকছে ময়ূর, পাপিয়া। খুব কাছ থেকে ডেকে উঠেছে কোনও আজব জীব ট্যাঁকো-ট্যাঁকো শব্দে। বুঝতে পারি না প্রাণীটা আমার ঝোলার মধ্যে ঢুকে পড়েছে

কী-না! এক জন বনগার্ড বলে– ও ব্যাটা রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকেছে, তক্ষক। দেখবেন?

–চলো তো। ঘরের কপাটের পাশে দেখি শাল খুঁটি আঁকড়ে আড়াই ফুট গিরগিটির মতো প্রাণীটির শরীর কালো-হলুদ রং-এ চিত্রিত। বীভৎস জীবটির ওপর টর্চের আলো পড়তেই সে মুখটি আড়াল করার চেষ্টা করে। আমাদের দিশি মাতালের মতো, মনে করছে মুখটি আড়াল করলেই কেউ তাকে দেখতে পাবে না।

হাতির দল অদৃশ্য হল বটে, তবে চারটি পিলারের ওপর ভর দিয়ে একটা আড়াই তলা বাড়ি মাঠের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। লোন টাস্কার। না সরলে বেরোবার উপায় নেই। বিটবাবু রসিকতা করে বলেন– নারী আর করী (হাতি) ‘কোন পথে যেতে কোন পথে যায়’, ওদের মন বোঝা দায়। তাঁকে বালি– এ কি রিসেন্ট অভিজ্ঞতা? আমার হঠাৎ বিস্ফোরণে বাবুটি লজ্জায় খানিক গুটিয়ে যান।

গাড়ি ছুটছে। আরও বন্য এ অরণ্য। স্ল বনে দিবারাত্রির কোনও কাব্য নেই। শুধুই অন্ধকারের পাঁচালি। মনে পড়ছে ৭ বছর আগে, তখন বিকেল ৩-টে, ঠিক এই পথে যেতে ছোটন বর্মন তার গাড়ির দম বন্ধ করে নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তরল অন্ধকারে তলিয়ে আছে আমাদের যানটি। চারিদিকে লরং (ঝিঁঝি ) ডাকছে প্রবল বিক্রমে। জোনাকির হলুদ ফুল উড়ছে। বুকের মধ্যে নৈঃশব্দের চোরা চালান টের পাচ্ছি। মিনিট তিনেক কেটে গেছে।

ছোটনকে চাপা গলায় শুধোই– তোমার ঘোড়ার রোগটি কী হে?

সে গাড়ি চালু করে দিয়ে বলল– পরে বলব স্যার।

পরে সে বলেছিল– আপনি পড়াদার লোক, বে-নোটিসে গাড়ি থামিয়ে যে রগড়টি করলাম তাতে আপনি কতটা লাভ ‘লোকসান’ গুনলেন তা আপনিই জানবেন। ঠিক কি-না? সেদিন বুঝলাম ছোটন বেপরোয়া মদ্যপই নয়, রীতিমতো বুদ্ধিও ধরে। আমার অভিজ্ঞতার তোষাখানায় ওই ৩ মিনিট বড়ো দুর্লভ আমানত হয়ে আছে আজও!

৭ বছর আগের সেই পথেই এগিয়ে চলেছি জয়ন্তী। হেড লাইটের আলোয় পথ দেখা! পথের দু’ধারে ব্ল্যাক বোর্ড ঝুলছে। তার মধ্যেও আমাদের গানম্যানের অব্যর্থ দৃষ্টিশক্তি। সে শান্ত গলায় বলে গাড়ি রুখ টাইগার। ওই দ্যাখ। বাঁ দিকে টর্চ মারতেই দেখি একটা কালো মুষকো বাইসন। কপালে সাদা তিলক, পায়ে সাদা মোজা, দুদিকে বাঁকানো সিং। ছবির জন্য সে তৈরিই ছিল। কিন্তু আলো বৈরী হল।

ভবেন বলেন– আজ আপনাদের অ্যানিমেল লাক সুপ্রসন্ন বলতে হয়।

বিকেল যে ফুরিয়ে এসেছে জঙ্গলে তার কোনও হেরফের নেই। গাড়ির মধ্যে মূক কতগুলি মানুষ বসে দেখছে ডুয়ার্স বনের হিম্মত। অন্ধকারে ছুটে যাচ্ছে টিমুর, টাটারি, লামপাতি, জারুল, রানিচাপ। কত দুষ্প্রাপ্য অর্কিড গাছের শাখায় ঝুলে আছে। কোথাও ওদালের মাথায় ঝুলছে ৮ ফুটের মৌচাকে কয়েক কুইন্টাল বুনো ফুলের মধু। দক্ষিণবঙ্গে মার্চের জঙ্গল মানে পলাশের রঙে হোলি খেলা। চিংরি ফুল, ধাতকি, মহুয়া গন্ধ। উত্তরে বসন্তের বনে ফোটে লসুনি, চিলৌনি, ওদাল। বিভিন্ন ফুলের বিচিত্র গন্ধের ঝাপটা লাগে হঠাৎ করে। মাঝে মাঝে তৃণভোজীদের জন্য গড়া হয়েছে ফুড ব্যাংক– মালসা, পুরুন্ডি, চেপ্টি, ঢাঢ্ঢার চাষ। কখনও ছুটে যাচ্ছে বেতবন।

ভবেন বলেন– এ বনে বেত পাবেন চার ধরনের। মোটা গড়াল বেত, দুধে বেত, পুত্লি বেত, মাঝারি মোটা। এই বেত বেশি হয় এদিকে। সরু মুবগি বেত। বেত বনে সাপের আড্ডা বেশি, বিশেষ করে অজগর।

ফরেস্ট গার্ডটি বলে– ২৩ মাইলে গঁক-গঁক শব্দে ধনেশের ডাক শুনেছেন? বিলক্ষণ শুনেছি। নেপালিরা বলে হাংরায়। এছাড়াও হরিতাল, ভীমরাজ, ময়না, বাজপাখি, কীট-পতঙ্গ, সরীসৃপ সব মিলিয়ে জীব বৈচিত্র্যের আদর্শ ভাণ্ডার এই তামাম বনভূমি।

সন্ধের মুখে এসে ভিড়লাম জয়ন্তী জনপদে। থাকা নয়, শুধুমাত্র চায়ের টানে। মাথার ওপর ছাউনি, চারিদিকে খোলা বড়োসড়ো এক চা-ঠেক-এ৷ ৩০ জন বসতে পারে। অনেক টুরিস্ট তাদের চায়ের মজলিশ জমিয়ে তুলেছেন। চায়ের ফাঁকে নদীটা একবার দেখে আসি।

আমার প্রস্তাবে ভবেন বলেন– রাতে কী দেখবেন?

দেখব ৭ বছর আগে ফেলে যাওয়া আমার স্মৃতিকে।

নদীর বুকে হেঁটে সেবারে দেখতে গিয়েছিলাম মহাকাল। জটার মতো জয়ন্তীর জলের ধারা কখনও গোড়ালি ভেজা, কখনও হাঁটু ডোবা। তীব্র তার টান। এখন চাঁদের আলোয় তার নিদ্রাতুর রূপটি না দেখেই ফেরার মানে হয় না। ভবেন সঙ্গে গাড়িটাকে জুড়ে দেন। বলেন– এটাকে সঙ্গে নিলে সময় সংক্ষেপ হবে।

বিস্তীর্ণ নদীর ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে কয়েক ছড়া জলের ধারা। ভরা চাঁদের আলো পড়েছে জলে-স্থলে-পাহাড়ে। চাঁদের ছোঁয়ায় ছিপছিপে নদী ঝিকমিক করছে। ওপারে কালো জোববায় ঢাকা পাহাড় শ্রেণি। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে মার্চের সন্ধ্যায়। ওদিকে ফেরার সময়ও তাড়া দিচ্ছে। মনে পড়ছে নদীর কিনারে বাংলো, তার পাশে এক ময়না গাছে সারা রাত ফিসফিস সে ডেকেছিল– ভুতু-ভুতু-ভুতু! সেই হাড় হিম করা ডাক নাকি হুতুম পেঁচার! সেই সব স্মৃতি ফেলে রেখে হয়তো চিরকালীন এই ফিরে চলা! বিদায় হে জয়ন্তি!

চা-পকোড়া শেষ করে গাড়িতে ওঠার মুখে কিছু টুরিস্টের সামনে পড়ে গেলাম। তারা জয়ন্তীতে কটা দিন থিতু হতে এসেছেন। –আর আপনারা?

ভবেন বলেন– আমরা তো ভাতখাওয়ার পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলাম। এবারে গদাধরে ফেরা।

একজন জানতে চাইলেন– ভাতখাওয়ায় ঢুকতে কী করতে হবে দাদা?

মুখে গাম্ভীর্য বজায় রেখে ভবেন সপ্রতিভ হয়ে বলেন, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি নিতে হবে। –ভদ্রলোক খানিক ঝটকা খেয়ে বলেন– আপনি তা হলে…?

টাইগার ততক্ষণে গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে!

কর্ন দিয়ে নানা রকম

কর্ন-এর হরেক গুণ৷ ক্যালরির পরিমাণ কম থাকায় তা ডায়েটের কাজে সাহায্য করে। কর্ন-এ ফাইবারের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি হজমে সাহায্য করে। কর্ন পরিপাকতন্ত্র ঠিক রাখতে সাহায্য করে।এতে উচ্চ পরিমাণে পুষ্টি উপাদান ছাড়াও এতে রয়েছে ফাইবার ও প্রোটিন, যা শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করে।কর্ন-এ আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি  রক্তস্বল্পতা কমাতে সাহায্য করে।

কাঁচা অবস্থায় কর্ন সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। এছাড়াও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গেও পরিবেশন করা হয়। স্যুপ, নুডুলস, সালাদের সাথে পরিবেশন করা হয়। কর্ন প্রিজার্ভ করা অবস্থায় লবন, চিনি, ভিনিগার দ্রবণে  ডুবিয়ে, বায়ুরোধক ক্যানেও পাওয়া যায় যা মাসের পর মাস রেখে ব্যবহার করা যায়।

প্রতি ১০০ গ্রাম ভুট্টায় থাকে ১৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেইট, ২ গ্রাম ফাইবার, ৩ গ্রাম প্রোটিন, ১.৫ এর কম চর্বি এবং ৮৬ ক্যালরি। লেবুর রস কিংবা হালকা নুন-লঙ্কা দিয়ে ভুট্টাপোড়া খেতে বেশ লাগে।স্বাস্থ্যকর গুণের কারণে একে সুপারফুড বলেন বিশেষজ্ঞরা। আমরা দিচ্ছি কর্ন দিয়ে তৈরি দুটি মজাদার রেসিপি৷

কর্ন বিরিয়ানি

উপকরণ : ১/২ কাপ কর্ন, ৩ কাপ বাসমতি চাল, ২টি পেঁয়াজ লম্বা করে কুচি করা, ৩টি টম্যাটো কুচি করা, ২ চা চামচ আদা-রসুন পেস্ট, ৬টা কাচালংকা কুচি করা, ৪ টেবিল চামচ তেল, ৪ টেবিল চামচ ঘি, ২০০ গ্রাম দই, ৭৫০ মিলি জল, নুন স্বাদমতো, ২ চা-চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/৪ চা চামচ হলুদগুঁড়ো, ১/৪ কাপ ধনেপাতা কুচি করা, ১/৪ কাপ পুদিনাপাতা কুচি করা, ১টা তেজপাতা, ২টো দারচিনি, ৫টা লবঙ্গ, ৩টে ছোটো এলাচ।

প্রণালী : বাসমতি চাল আধঘন্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। জল ছেঁকে আলাদা রাখুন চালটা। এবার একটা গভীর তল-যুক্ত পাত্রে তেল ও ঘি একসঙ্গে গরম করে, গোটা গরমমশলা ভেজে নিন। পেঁয়াজ হালকা বাদামি করে ভেজে নিন। আদা-রসুন পেস্ট ও টম্যাটো দিয়ে সঁতে করুন। এতে লংকাকুচি, ধনেপাতাকুচি ও পুদিনাপাতাকুচি মেশান। কর্ন দিন, হলুদগুঁড়ো, লংকাগুঁড়ো, দই ও নুন দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। গ্রেভি গাঢ় হলে এতে চালটা দিয়ে নাড়তে থাকুন। তারপর ৩ কাপ জল ঢেলে ভালো ভাবে মিশিয়ে দিন। নুন, চিনি স্বাদমতো মিশিয়ে প্রেশার কুকার বন্ধ করুন। নামিয়ে ধনেপাতাকুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

Recipe of Corn Pakoda

রাইস কর্ন পকোড়া

উপকরণ : ২ কাপ সেদ্ধ করা চাল, ১টা আলু কাটা, ১ কাপ সুইট কর্ন, ১/২ ছোটো চামচ আদাকুচি, ১ ছোটো চামচ জিরে, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ভাজার জন্য তেল, নুন ও লংকাগুঁড়ো স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা বোল-এ সেদ্ধ করা ভাত, আলুকুচি, সুইট কর্ন, আদা, জিরে, ধনেপাতা ও অল্প জল মিশিয়ে একসঙ্গে চটকে মেখে নিন। এই মিশ্রণ থেকে পকোড়া তৈরি করে, কর্নফ্লাওয়ার-এর গুঁড়ো মাখিয়ে গরম তেলে ভেজে নিন। সসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

রহস্য ধারাবাহিকঃ মার্ডার ইন ভিক্টোরিয়া (শেষ অধ্যায়)

পর্ব – ১০

চা খেতে খেতে রণিদা বলল, একটু তাস খেললে কেমন হয় রঞ্জন?

আমি অবাক, কেসটা এমন এক পর্যায়ে এসে থমকে আছে, কোথায় রণিদা তাই নিয়ে ডিসকাস করবে, তা নয় হঠাৎ তাস খেলার প্রস্তাব?

একটু আমতা আমতা করে বললাম, হ্যাঁ, সে তো খেলাই যায়। কিন্তু আর একজন পার্টনার লাগবে যে?

কেন শুক্লা নেই?

বোন তো কলেজে গেছে, বললাম আমি।

ওঃ হো, ওর তো আবার ইভনিং কলেজ। ঠিক আছে তা হলে এক কাজ কর–দাবাটা নামা, এক হাত খেলা যাক।

অগত্যা দাবা নামানো হল, সাজানো হল ঘুঁটি।

রণিদা বলল, আসুন গোবিন্দদা, দেখি আজকে আপনি হারতে কতক্ষণ সময় নেন?

ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন, এমন একটি ভাব করছ যেন তুমি বিশ্বনাথন আনন্দ। নেহাত দাবাটা আমি তেমন ভালো জানি না তাই মাঝেমধ্যে হেরে যাই তোমার কাছে।

মাঝেমধ্যে?

ওই হল আর কী।

খেলা আপনি ভালোই জানেন দাদা, যেটা জানেন না সেটা হল সঠিক চাল। আর সেটা দিতে এটাতে কিছু থাকতে হয়, নিজের মাথায় টোকা মেরে রণিদা ঘিলুর ইঙ্গিত করে।

এটা কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে রণি, এত অহংকার ভালো নয়।

বেশ, তবে বাজি ধরা যাক, বলল রণিদা।

কী বাজি?

যদি আমি আপনাকে দশ মিনিটের মধ্যে হারাতে পারি তবে কাল আপনি আমাদের দু’জনকে রেস্টুরেন্টে খাওয়াবেন, আর যদি আপনি আমাকে হারাতে পারেন বা আমি হারতে দশ মিনিটের বেশি সময় নিই তা হলে কাল আমরা দু’জন আপনার খরচে রেস্টুরেন্টে খাব।

ঢোলগোবিন্দবাবু এক মনে ঘুঁটি সাজাচ্ছিলেন।

রণিদার কথাটা উনি প্রথমে ধরতে পারলেন না। কিন্তু সেটা বোধগম্য হওয়া মাত্র নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, এটা কেমন কথা হল ভায়া? খেলায় আমি হারি বা জিতি, যাই রেজাল্ট হোক না কেন আমাকেই খাওয়াতে হবে?

আমি হো-হো করে হেসে উঠলাম। বললাম সেই মহান শর্তটার কথা মনে আছে ঢোলগোবিন্দবাবু?

কোনটা ভাই?

ওই যে, হয় তুই মাছের লেজা খা, আমি মাছের মাথা খাই, না হয় আমি মাছের মাথা খাই, তুই মাছের লেজা খা।

দুজনেই হাসিতে যোগ দিল।

এমন সময় মা আমাদের জন্য চা আর ডালমুট নিয়ে এল। রণিদাকে দেখে বলল, ভালো আছ বাবা?

হ্যাঁ, আপনি ভালো তো মাসিমা?

আর বাবা ভালো, আমাদের এই বয়সে কি আর ভালো থাকা যায়? ওই আছি আর কী। আপনি কেমন আছেন দাদা?

খু-উ-ব ভালো, হেসে জবাব দিলেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

মা চায়ের কাপ-ডিশ আমাদের দিকে এগিয়ে দিল একে একে। তারপর বলল, তোমরা কথা বলো বাবা, আমি আসি।

মা অন্য ঘরে চলে গেল।

আমি বললাম, তোমরা দুজন বসে খেলবে। আর আমি বসে বসে বুঝি ভ্যারেন্ডা ভাজব?

ভাজ না, ভাজ। চায়ের সঙ্গে ভাজা-ভুজি ভালোই লাগে, আমাকে উত্তেজিত করতে বলল রণিদা।

ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন, না না রঞ্জন তুমি দর্শক। দর্শক ছাড়া কোনও খেলা জমে?

রণিদা বলল, হ্যাঁ, তুই দর্শক কাম হেল্পার। অবশ্য গোবিন্দদার সাইডে।

তা হলে ওকে কি আমরা ‘পরিদর্শক’ বলতে পারি?

তার মানে? আমি ঘাবড়ে যাই।

নির্লিপ্তভাবে ঢোলগোবিন্দবাবু জবাব দেন, দর্শনের পাশাপাশি যিনি পরিচালনাও করেন তিনি তো পরিদর্শকই, কি বলো রণি?

ওফ্, ঢোলগোবিন্দবাবু আপনি না।

রণিদা বলল, পরিদর্শক হিসাবে তোর দায়িত্বটা কিন্তু মোটেও কম বলে ভাবিস না রঞ্জন। মনে রাখিস, যখন কেউ দাবা খেলে সে তার সব চালই সঠিক বলে মনে করে, কিন্তু পাশে থাকা ব্যক্তিটি খুব সহজেই তার ভুল চাল ধরে ফেলে।

ঘড়ি দেখে শুরু হল খেলা।

রণিদা বলল, সময়টা নোট কর রঞ্জন, এখন কিন্তু পাক্বা ন’টা পঞ্চাশ।

দু’পক্ষেই চার-পাঁচটা চাল দিল দ্রুত। তারপর ক্রমশ উভয়েই ধীর গতি হল।

রণিদা বলল, এই কেসের একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয় সেটা কী বল তো রঞ্জন?

কী?

সব কটি মানুষই একই ব্র্যান্ডের সিগারেট খায়।

যেমন? আমি প্রশ্ন করি।

কেন প্রথম দিন কি আমরা দেখিনি যে ভিক্টিমের দুই ক্লোজ ফ্রেন্ড কমলেশ খাস্তগীর এবং সুবিমল সোম উভয়েই চারমিনার খান। আবার দেখ, ভিক্টিম নিজেও ওই সিগারেট খেতেন। শুধু তাই নয়, এ মুহূর্তে সন্দেহের জালে জড়িয়ে পড়া প্রধান সাসপেক্টও ভালোবাসে ওই একই ব্র্যান্ডের সিগারেট। এমন আশ্চর্যজনক কো-ইন্সিডেন্স আমি আগে কখনও দেখিনি।

এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণ সবই রাধেশ্যাম মণ্ডলের বিপক্ষে। বেচারা মারা পড়ল মনে হয়, বললাম আমি।

ধ্যুর, তুই একটি যা-তা, একটু লজিক্যালি ভাবনা-চিন্তা করার চেষ্টা কর।

এ কথা কেন বলছ?

দেখ রঞ্জন, রাধেশ্যাম মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলে একটি জিনিস নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়েছে যে, মানুষটির মধ্যে ক্রিমিনাল টেনডেন্সি কিছু থাকলেও প্রকৃতপক্ষে উনি একজন সুস্থ মস্তিষ্কেরই মানুষ। বাবার সম্পত্তির সত্তর ভাগের দাবি করলে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ যে উনি পাবেনই সেটা নিশ্চিত জানতেন। অন্তত আইন তাই বলে। মিছিমিছি দাদাকে খুন করতে যাবেন কেন? তাতে যে ওর দু-কুলই যাবে সেটা বোঝার মতন বুদ্ধি ওনার আছে বলেই আমার বিশ্বাস।

হুমকি চিঠিগুলির সঙ্গে লেখা মেলাবার জন্য ওর হাতের লেখা সংগ্রহ করে পুলিশ হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্টের কাছে পাঠিয়েছে শুনলাম, বললাম আমি।

আমি সেন্ট পার্সেন্ট সিওর যে রিপোর্ট আসবে নেগেটিভ অর্থাৎ ওগুলি রাধেশ্যাম মন্ডল লেখেননি।

আর সিগারেট বাটের ফরেনসিক রিপোর্ট? সেদিন ভিক্টোরিয়ায় ঘটনাস্থল থেকে সেলোফেন পেপারে তুমি যেগুলি সংগ্রহ করে রাতুল রায়কে দিলে? অফিসার নিশ্চয়ই তখন ওটার পজিটিভ রিপোর্টের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবেন?

সমস্যাটা কোথায় জানিস রঞ্জন? –পুলিশ সব সময় চেষ্টা করে আগে আসামীকে ফিক্স আপ করতে। তারপর ক্রিমিনাল টু ক্রাইমে মুভ করে। তাতে মিসলিড হবার চান্স বেশি থাকে। আর আমি করি ঠিক তার উলটোটা অর্থাৎ ক্রাইম টু ক্রিমিনাল এ মুভ করতে। আর একটি ব্যাপারও ইনভেস্টিগেশনের ক্ষেত্রে সব সময় মাথায় রাখা উচিত।

সেটা কী?

শার্লক হোমস পড়িসনি তুই? স্যার আর্থার কোনাল ডয়েল এক জায়গায় বলেছিলেন, যেখানে আপাত তথ্যগুলি বড়ো বেশি ভিভিডলি ছড়ানো থাকে, সেখানে মূল সত্য থাকে আর একটু গভীরে।

হুম, আমি বিজ্ঞের মতন মাথা নাড়ি।

পাড়ার ছেলেদের আক্রোশের ব্যাপারটা ভুলে গেলে চলবে না, ওসব অ্যান্টিসোশ্যালরা অনেক কিছু করতে পারে। মানুষ মারা ওদের কাছে জলভাত, বললেন ঢোলগোবিন্দবাবু। আর রাধেশ্যামের ওরকম বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিল না।

অকাট্য যুক্তি। ভেবে দেখার মতন, জবাব দিল রণিদা।

তবে কথাটি ও ব্যাঙ্গার্থে বলল না সিরিয়াসলি সেটা ওর কণ্ঠস্বরে পরিস্ফুট হল না।

তুমি যাই বলো না কেন রণি, আমি বলছি তুমি মিলিয়ে নিও, পুলিশ শেষ পর্যন্ত ওই রাধেশ্যাম মন্ডলকেই দোষী সাব্যস্ত করবে। গোবিন্দবাবুর কণ্ঠস্বরে যথেষ্ট জোর।

সে যাই হোক, আপনি এবার কিস্তি সামলান গোবিন্দদা। রণিদা শেষ চাল দিল। ফের বলল, আশা করি ঘড়িতে এখন কাঁটায় কাঁটায় দশটা।

এঃ হে, গেল মনে হয় দানটা, বললেন ভদ্রলোক।

ঠিক তারপরই বলে উঠলেন, এটা কিন্তু তোমার ঠিক পলিসি নয় রণি–বিপক্ষকে একটি জটিল আলোচনায় ডুবিয়ে রেখে গোপনে নিজের কাজ হাসিল করা।

গোপনে কোথায়? বোর্ডে ঘুঁটি তো সর্বসমক্ষে সাজানো, হেসে উত্তর দিল রণিদা, তাছাড়া স্বয়ং পরিদর্শকও রয়েছেন।

ওসব বললে চলবে না, তুমি আমাকে বোর্ডে কনসেনট্রেটই করতে দিলে না এটা-সেটা গল্প করে।

গল্পের উপসংহারটা সম্ভবত আগামীকালই লেখা হবে, জানা যাবে প্রকৃত অর্থে হু ওয়াজ দ্য অথর অফ দি ক্রাইম, বলল রণিদা।

কালই! আমি বিস্মিত ওর কনফিডেন্স দেখে।

হ্যাঁ, কাল বিকালের মধ্যেই কেসটার একটি গতি হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। আজ উঠিরে রঞ্জন, চলুন গোবিন্দদা।

ওরা দুজনে উঠে দাঁড়াল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে, উদ্দেশ্য দরজা অবধি এগিয়ে দেওয়া।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললাম, তুমি কি এখন বাড়ি যাবে রণিদা?

নাহ্, বেশ কিছু ইনফরমেশান কালেক্ট করতে হবে। তার আগে অবশ্য গোবিন্দদাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাব।

বেরোবার মুখে বোনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের।

কখন এলে রণিদা? জিজ্ঞাসা করল বোন।

এই খানিকক্ষণ হল। পড়াশোনা কেমন চলছে?

ভালো, মাথা নাড়ে বোন। তারপর বলে, গোবিন্দবাবু আপনি কেমন আছেন?

ভালো আছি রে মা, একদম ফার্স্ট ক্লাস, হেসে জবাব দিলেন ভদ্রলোক।

বিদায় নিয়ে রণিদা ও ঢোলগোবিন্দবাবু রওনা হল। তবে যাবার আগে রণিদা বলে, কালকের সন্ধেটা ফ্রি রাখিস রঞ্জন। আশা করছি কালই এর একটি হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে।

গাড়ি স্টার্ট দেয়। হাত নেড়ে শুভরাত্রি জানাই ওদের।

পর্ব – ১১

গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ঘুরে ফিরেই একটি প্রশ্ন মাথায় আসছিল। তা হল, ভিক্টোরিয়া মার্ডার কেসের পরিণতি কী? কে শেষ পর্যন্ত খুনি হিসাবে অভিযুক্ত হতে চলেছে? সত্যি বলতে কী আমার স্থূল বিচার-বুদ্ধিতে বার বার রাধেশ্যাম মন্ডলের কথাই মনে হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের ঢোলগোবিন্দবাবুর যুক্তি মন্দ লাগেনি আমার।

কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, ব্যাপারটা যদি অত সহজই হতো, রণিদা কেসটা নিয়ে এত মাথা ঘামাত না। ওর মতন তীক্ষ্নধী, সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি।

তাই ওর ওপর আমার পূর্ণ আস্থা। দুষ্কৃতকারী যত বুদ্ধিমানই হোক না কেন, ষড়যন্ত্রের জাল সে যত সুচিন্তিত ভাবেই বিছিয়ে থাকুক না কেন, রণিদার শাণিত মননের কাছে সেসব নস্যি। ওর যুক্তিশীল মন তদন্তের গভীরে ঢুকে সব ফালাফালা করে আপাতত অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভ্রান্তি থেকে আসল অপরাধীকে টেনে বার করে আনবেই, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

যাই হোক, সকাল থেকেই রণিদার ফোন এক্সপেক্ট করছিলাম। কিন্তু সে ফোন যখন এল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল।

বললাম, হ্যাঁ বলো রণিদা।

বলছি যে সন্ধে সাতটা নাগাদ ঘনশ্যাম মন্ডলের বাড়ি চলে যাস, মনে রাখিস, অন ডট সাতটা।

পৌনে পাঁচটা থেকে সাতটা–মধ্যবর্তী এই সময়টা আমার কীভাবে কাটল তা বলে বোঝাবার নয়। কারণ রণিদার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যা অভীষ্ট লাভের গাঢ় অনুভূতি। মনে হল, ছিপে মাছ অলরেডি গাঁথা হয়ে গেছে, কেবল একটু খেলিয়ে টেনে তোলারই যা অপেক্ষা।

সাতটা বাজবার মিনিট পাঁচেক আগেই গিয়ে উপস্থিত হলাম মন্ডলবাবুর বাড়ি।

এখানে পৌঁছে দেখলাম আমার মতন আরও অনেকেই আবেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছেন।

রণিদা তো আছেই, সঙ্গে ঢোলগোবিন্দবাবু।

সেই সঙ্গে সেই ঘরে উপস্থিত মিসেস মন্ডল, তার ছেলে, মেয়ে এবং জামাই। আছেন কমলেশ খাস্তগীর, জনমেজয় মিত্তির, এমনকী নীলাক্ষি দাশগুপ্তও।

ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সময় মিলিয়ে ঘরে ঢুকলেন এই কেসের সঙ্গে যুক্ত আর এক ব্যক্তি অর্থাৎ সুবিমল সোম।

এতক্ষণ যাবৎ টেবিলের ওপর মাথা নীচু করে একটি প্যাডে কী সব লিখছিল রণিদা ওর নিজস্ব কোডে।

সুবিমল সোম ঘরে প্রবেশ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল ও।

বেশ কনফিডেন্টলি রণিদা বলতে শুরু করল, দেখুন আমার মনে হয় এই মুহূর্তে এই কেসের সঙ্গে যুক্ত প্রায় প্রতিটি মানুষই এখানে উপস্থিত, কেবল একজন ছাড়া।

কেউ কেউ এ ওর দিকে চাইল কৌতূহলী দৃষ্টিতে।

অনুপস্থিত ব্যক্তিটি রাধেশ্যাম মন্ডল। আপনারা সকলেই জানেন উনি এখন পুলিশ হেফাজতে। আর আমি নিশ্চিত, আপনারা সকলে নিশ্চয়ই  এটাও এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে এ কেসে যদি প্রকৃতই উনি অপরাধী হতেন তা হলে আজ আপনাদের এখানে ডেকে আনা হতো না।

তার মানে ঘনশ্যামের হত্যাকারী রাধেশ্যাম নয়? সুবিমল সোমের কণ্ঠস্বরে বিস্ময়।

আপনি বলতে চান পুলিশের তদন্ত ভুল? নীলাক্ষি দাশগুপ্তর কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝরে পড়ল।

রণিদা ওদের বিস্ময় কিংবা বিরক্তির ব্যাপারে গেল না। বরং শুরু করল অপেক্ষাকৃত শান্ত ভঙ্গিতে।

ঘটনাটি ঘটেছিল গত তেরোই ফেব্রুয়ারির কোনও এক অশুভ সময়, বলতে লাগল রণিদা, ওই দিন মি. মন্ডল অফিস গেছিলেন। কি আমি ঠিক বলছি মি. মিত্তির?

হ্যাঁ স্যার, বাঁ দিকে বেশ খানিকটা ঘাড় বাঁকান ভদ্রলোক।

সেদিন যদি কারও সঙ্গে পূর্ব পরিকল্পিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকত তাহলে উনি সে কথা মিসেস মন্ডলকে বলে যেতেন কারণ সেটাই ওনার অভ্যাস, তাই না মিসেস মন্ডল?

এবার মিসেস মন্ডলও সম্মতিজ্ঞাপক মাথা নাড়েন।

রণিদা ফের বলতে শুরু করে, তা হলে আততায়ীর সঙ্গে ঘনশ্যামবাবুর মিটিংটা যদি একটি আন-প্ল্যানড মিটিং হয়ে থাকে ওনাকে ডেকে নেবার জন্য আততায়ী নিশ্চয়ই একটি ফোন কলের সাহায্য নেবে এবং বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। ওই দিন প্রায় পাঁচটা নাগাদ ঘনশ্যাম মন্ডল একটি ফোন রিসিভ করেন। ঠিক বলছি তো মিত্তিরবাবু?

হ্যাঁ স্যার, এবারও বাঁ দিকে ঘাড় বাঁকান ভদ্রলোক ইতিবাচক ভঙ্গিতে।

ঘনশ্যামবাবু সম্ভবত পৌনে ছ’টা নাগাদ ভিক্টোরিয়ার নির্ধারিত স্থানে পৌঁছোন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার আততায়ীর সঙ্গে দেখা হয়। অথবা এর উলটোটাও হতে পারে অর্থাৎ আততায়ী ওনার আগেই অকুস্থলে পৌঁছোয়। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, আততায়ী ঘনশ্যামবাবুর কোনও অতি পরিচিত ব্যক্তি যার ফলে তার দুরভিসন্ধির ব্যাপারে ভদ্রলোকের বিন্দুমাত্রও সন্দেহ জাগেনি।

ঘরের সকলে রুদ্ধ নিঃশ্বাসে রণিদার কথাগুলি গিলছিল। বেশ কয়েকজনের কপালে এই ঠান্ডাতেও ঘাম দেখা গেল। পিন পড়লেও বুঝি শোনা যাবে।

রণিদা ফের শুরু করল

আততায়ীর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলেছিল ঘনশ্যামবাবুর। সম্ভবত খুনি অপেক্ষা করছিল কখন স্থানটি আরও একটু নির্জন হয়।

ঘটনাচক্রে ওই দিন ভিক্টোরিয়ার যে গার্ড সান্ধ্যকালীন চেক আপের দায়িত্বে থাকার কথা তিনি অসুস্থ ছিলেন। ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিতভাবেই আততায়ীর অনুকূলে যায়।

এর পর কথাচ্ছলেই এক সময় আততায়ী উঠে দাঁড়ায় তার অভিপ্রায় বোঝা অসম্ভব ছিল ঘনশ্যামবাবুর কাছে। কারণ তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে সামান্য টাকার জন্য তার এত দিনের পরিচিত কোনও ব্যক্তি তাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে।

তারপর? প্রশ্ন করেন নীলাক্ষিবাবু।

তারপর আচমকাই আততায়ী কোনও শক্ত দড়ি জাতীয় কিছু দিয়ে পিছন থেকে মন্ডলবাবুর গলা পেঁচিয়ে ধরেন যতক্ষণ না তার প্রাণবায়ু পুরোপুরি বেরিয়ে যায়, এক সময় স্থির হয়ে যায় দেহটা নিঃশব্দে। সামান্য কিছু ছটফটানি জনিত শব্দ হয়ে থাকলেও তা কারও কানে পৌঁছোয় না। ঘটনা সুষ্ঠু ভাবে মিটলে আততায়ী তার মার্ডার উয়েপনটা নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে কারণ সে ওটা ওখানে ফেলে যাবার মতন বোকা নয়। যাবার আগে অবশ্য সে একটি কাজ করে যাতে প্রমাণ হয় আততায়ী একজন অত্যন্ত কুল ব্রেনের মার্ডারার।

সেটা কী? এবার প্রশ্ন করি আমি।

সেটা হল এই যে, যাবার আগে খুনি মৃতদেহটিকে বেঞ্চের এক কোণায় এমন ভাবে বসিয়ে রেখে যায় যাতে হঠাৎ দেখলে মনে হয় উনি জীবিত এবং বসে সামনের জলশোভা দেখতে মগ্ন। এতে তার লাভ কী? প্রশ্নটা জাগতেই পারে আপনাদের মনে। উত্তরে বলি, লাভ এটাই যে মৃতদেহ আবিষ্কারে যত দেরি হবে আততায়ী নিজেকে গুছিয়ে নেবার ততটাই বেশি সময় পাবে।

এ পর্যন্ত বলার পর রণিদা একটু থামে। তারপর আবার বলে, সংক্ষেপে মোটামুটি এটাই ছিল সেদিনকার ঘটনা। এবার আমি দ্বিতীয় পর্বে যাব।

ঘনশ্যামবাবু মারা গেলেন, কিন্তু কেন? কী সেই কারণ যার জন্য মানুষটিকে মরতে হল?

মানে তুমি বলতে চাইছ, মোটিভ? ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন।

ইয়েস, শুধু শুধু একটি মানুষ খুন হয় না। তার পিছনে কোনও না কোনও কারণ থাকবেই। তা হলে এবার প্রশ্ন জাগে, এই ঘনশ্যাম মন্ডল মারা যাবার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে? কে কোন দিক থেকে কতটা লাভবান হতে পারেন?

ক্রাইম হিস্ট্রি সম্বন্ধে যাদের পড়াশোনা আছে তারা নিশ্চয়ই জানেন কত সামান্য, কত তুচ্ছ কারণে পৃথিবীর বুকে কত অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তাই সন্দেহের তালিকায় আমি প্রথম পর্যায়ে রাধেশ্যাম মন্ডল থেকে শুরু করে সুবিমল সোম, কমলেশ খাস্তগীর, নীলাক্ষি দাশগুপ্ত, জনমেজয় মিত্তির, এমনকী তাঁর স্ত্রী মিসেস মন্ডলকেও বাদ দিইনি।

দেখলাম সকলের প্রতি রণিদার ধারালো অথচ শীতল দৃষ্টিপাত আছড়ে পড়ল নিঃশব্দে।

উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা ক্রমশ সহ্যসীমা অতিক্রম করছিল।

রণিদা ফের শুরু করে।

প্রাথমিক কথাবার্তা ও অনুসন্ধানে একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায়, মিসেস মন্ডল পতিপরায়ণা, সংসারের নিবেদিত প্রাণ, একজন অত্যন্ত সুশীলা মহিলা। স্বামীর মৃত্যুতে তার কোনও লাভের ব্যাপার নেই।

তা হলে এর পরই আসছে রাধেশ্যাম মণ্ডলের নাম। যার সামাজিক রেপুটেশন খুবই পুওর। সম্পত্তির ভাগ নিয়ে তার দাদার সঙ্গে বিবাদের খবর সর্বজনবিদিত। এমন কী তার বউদি পর্যন্ত নিশ্চিত নন যে এই খুনে তার হাত আছে কি না। ঘটনার আগে সে দাদাকে শাসিয়ে গেছে দেখে নেবে বলে। ঘটনার সময় সে ফেরার। এরপরও তাকে আসামী না ভাবার কোনও অবকাশই থাকতে পারে না। ফলস্বরূপ, এই মুহূর্তে মানুষটি পুলিশের লক আপে।

এর মধ্যে মিসেস মন্ডল আমাকে জানান যে মাত্র কিছুদিন আগে তার স্বামী ও পুত্রের সঙ্গে লোকাল কিছু রাউডির বচসা ও হাতাহাতি হয়। অতএব প্রতিহিংসাবশত খুনটা তারাও করতে পারে।

কিন্তু আমার সিক্সথ সেন্স বলে, খুনি ঘনশ্যামবাবুর পরিচিত। তা না হলে হাত কাটা জগা, বরফি প্রভৃতির মতন দুষ্কৃতকারীরা তাকে ফোনে ডাকলে তিনি একা একা কাউকে কিছু না জানিয়ে ভিক্টোরিয়ায় চলে আসবেন–এটা ভাবা বোধহয় আমাদের বড়ো বেশি বোকামি হয়ে যাবে। তা ছাড়া আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ঘটনাচক্রে ওই বচসার দিন দুয়েক পরই কালীঘাট থানার পুলিশ ওদের বেশ কয়েকজনকে একটি কেসে অ্যারেস্ট করেছে, ওরা এখন জেলে।

সন্দেহের তালিকায় এবার থাকছেন জনমেজয় মিত্তির এবং নীলাক্ষি দাশগুপ্ত, রণিদা বলতে থাকে, ঘনশ্যামবাবু কোটায় প্রোমোশন পেলে ওনারা ডিপ্রাইভড হবেন ঠিকই, কিন্তু ওঁরা সরকারি কর্মচারী এবং ঘোরতর সংসারী মানুষ। একজন সরকারি চাকুরে তার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এতটা রিক্স নেবার দুঃসাহস দেখালেও হয়তো দেখাতে পারেন, কিন্তু এক্ষেত্রে ওঁরা জড়িত নন। কারণ ওই দিন যখন ফোনটা আসে, ওঁরা দুজনই তখন অফিসে উপস্থিত।

মনে হল, বুঝি ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল জনমেজয় মিত্তির এবং নীলাক্ষি দাশগুপ্তর কারণ রণিদার কথা শেষ হওয়ামাত্র দুজনেরই প্রায় একসঙ্গে দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল।

এক গেলাস জল হবে? রণিদা বলল।

হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই, বললেন ঘনশ্যামবাবুর ছেলে।

মিনিট খানেকের মধ্যেই চলে এল জল। ঢকঢক করে এক নিশ্বাসে জলটা শেষ করল রণিদা।

তারপর ফের বলতে শুরু করল, এবার আসছি আমার সন্দেহের তালিকায় একদম নীচের দিকে থাকা দুটি নামে, অর্থাৎ সুবিমল সোম এবং কমলেশ খাস্তগীর যারা হলেন ঘনশ্যাম মন্ডলের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন দুই প্রিয় বন্ধু।

মজার কথা হল, এনারা দুজনই কিন্তু মন্ডলবাবু বেঁচে থাকাকালীন ওনার সঙ্গে আমার বাড়ি এসেছিলেন হুমকি চিঠি তদন্তের কিনারার উদ্দেশ্যে।

প্রথম দিকে অবশ্য আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি একটি বিষয়ে দুজনের প্রায় একই রকম বক্তব্যে। দুজনেই বলেন, তারা মন্ডলবাবুর সঙ্গে অপর বন্ধুর কথা কাটাকাটির কিছুটা আচমকা শুনে ফেলেছেন।

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই রকম যে এদের দুজনের একজন নিশ্চয়ই সুপরিকল্পিত ভাবে আমার তদন্তকে বিপথে চালিত করতে চাইছেন। প্রশ্ন হল, কে সেই মহান ব্যক্তি?

এরই মধ্যে হঠাৎ উপস্থিত হন ঘনশ্যাম মণ্ডলের ছোটো ভাই রাধেশ্যাম মন্ডল। গোটা ঘটনাটা একটি নাটকীয় মোড় নিল। সকলের চোখ তার ওপর গিয়ে পড়ল কারণ ঘনশ্যামবাবুর মৃত্যুতে আপাত দৃষ্টিতে তার লাভই সব থেকে বেশি। ওদিকে আসল অপরাধী তখন অনেক দূরে বসে মুচকি মুচকি হাসছে। কারণ তখনও পর্যন্ত ভাগ্য শুধু নয়, ঈশ্বরও তার সহায়।

ঘনশ্যামবাবুর মার্ডার কেসটা গোড়া থেকেই বেশ জটিল ছিল। কারণ ভদ্রলোক ছিলেন বড়োই ইনট্রোভার্ট প্রকৃতির মানুষ। কারও সঙ্গে তেমন মিশতেন না। এমন কী টাকা-পয়সার বিষয়গুলিতে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে পর্যন্ত কোনওরকম আলাপ-আলোচনা করতেন না।

এ পর্যন্ত একটানা বলার পর সম্ভবত সামান্য দম নেবার জন্য রণিদা একটু থামে। তারপর ফের পূর্ণ উদ্যমে শুরু করে–

আপনার ছেলের তো এবার লাস্ট ইয়ার, তাই না সুবিমলবাবু?

আচমকা আক্রমণে ভদ্রলোক একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।

আমার ছেলের?… হ্যাঁ মানে, কিন্তু তাতে কী? কোনও মতে ঢোঁক গিলে বললেন ভদ্রলোক।

না, মানে বলছিলাম, ছেলের পড়াশোনার খরচ তো বেশ বেড়ে গেছে, ঠিক কি না? রণিদা প্রশ্ন করে।

আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন মি, চক্রবর্তী।

আপনার ক’টি জেরক্স মেশিন সুবিমলবাবু?

দুটি, সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন ভদ্রলোক।

শুনেছি তার একটিতে মি. মন্ডল কিছু টাকা ইনভেস্ট করেছিলেন, কথাটা কি সত্যি?

চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ।

আপনি ওনাকে মাসে মাসে একটি নির্দিষ্ট অ্যামাউন্টের টাকা দেবেন এই প্রতিশ্রুতিতে, কি ঠিক বলছি?

একবার ঢোঁক গিলে ভদ্রলোক বলেন, হ্যাঁ, মানে সেইরকমই কথা হয়েছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু সে তো খুবই সামান্য টাকার ব্যাপার। আপনি কি বলতে চাইছেন ওই সামান্য টাকার জন্য আমি আমার বাল্যবন্ধুকে খুন করেছি?

না, মি. সোম, আপনার বন্ধু মি. মন্ডল মারা গেছেন আরও অনেক অনেক বেশি টাকার জন্য। আমি কেবল সর্বসমক্ষে আমার বক্তব্যকে যথাসম্ভব পরিচ্ছন্নভাবে উপস্থাপনার চেষ্টা করছি।

এই খুনের ঘটনায় আপনি যে জড়িত নন তা আমি খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত–ঘটনার দিন আপনি বাড়িতেই ছিলেন তা আমি জেনেছি।

এরপর রণিদা আচমকাই বিশালদেহী কমলেশ খাস্তগীরের দিকে শাণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, এখন এক একটি ইনফোসিস শেয়ারের মূল্য কত মি. খাস্তগীর?

অসম্ভব ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পড়লেন বলে মনে হল ভদ্রলোককে। মানে, যতদূর জানি প্রায় কুড়ি হাজার টাকা।

আপনি ঠিক জানেন মি. খাস্তগীর। এই ঘরে শেয়ার মার্কেট সম্বন্ধে আপনার থেকে বেশি আর কেউ জানে না।

তারপর গলাটা আর একটু চড়িয়ে রণিদা ফের বলতে থাকে, আপনারা শুনে অবাক হবেন আজ থেকে মাত্র আট মাস আগে এক একটি ইনফোসিস শেয়ারের মূল্য ছিল মাত্র একশো থেকে দেড়শো টাকা, হ্যাঁ ঠিক তাই।

আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতন ঘনশ্যামবাবুরও পয়সার প্রতি আকর্ষণ ছিল, হয়তো একটু বেশি। কে না চায় বলুন, আর একটু ভালো ভাবে বাঁচতে। সম্ভবত সে জন্যই ফাটকা কিছু লাভের উদ্দেশ্যে ভদ্রলোক মাঝেমধ্যেই শেয়ারে টাকা বিনিয়োগ করতেন। ওনার চেক বুকের পিছনের পাতায় সঞ্জীব আগরওয়াল, মনীশ রূংটা, শিশুমার পোড়েল প্রভৃতি নামগুলি তার প্রমাণ।

আপনারা বলবেন, এরা কারা? এদের নামে চেক ইস্যু করা হচ্ছে অথচ মন্ডল পরিবারের কেউ এদের চেনা দূরে থাক, নামই শোনেনি।

উত্তরে বলি, এরা হলেন শেয়ার মার্কেটের এক একজন শেয়ার ব্রোকার। ঘনশ্যাম মন্ডল একজন সরকারি কর্মচারী। শেয়ারে টাকা বিনিয়োগ ও ফাটকা লাভের ব্যাপারটা উনি সম্ভবত ওনার ইনকামট্যাক্স ফাইলে ঢোকাতে চাননি অথবা বন্ধু কমলেশ খাস্তগীরকে উনি একটু বেশিই বিশ্বাস করেছিলেন। ওনার নিজস্ব কোনও ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট ছিল না, তাই উনি শেয়ারে বিনিয়োগ করতেন কমলেশবাবুর ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে। কি কমলেশবাবু, আমি ঠিক বলছি তো? দেখবেন, ভুল হলে শুধরে দেবেন।

উনি চুপ করে থাকেন খানিক, তারপর বলেন, বলে যান যা বলতে চান।

গত জুলাইতে ঘনশ্যামবাবু ওনার জিপিএফ. থেকে তিন লাখ টাকা তোলেন এবং কমলেশবাবুর মাধ্যমে সেই টাকা ইনফোসিস শেয়ারে লাগান যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ছ’কোটি টাকা।

ছ কোটি টাকা! বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে সবার।

ইয়েস, সিক্স ক্রোরস রুপিজ, কেটে কেটে বলে রণিদা এবং চুক্তি অনুসারে এর অর্ধেক ঘনশ্যামবাবুর প্রাপ্য ছিল, তাই না মি. খাস্তগীর?

কীসের চুক্তি?

আপনার সঙ্গে মি. মন্ডলের নিশ্চিত ভাবেই কোনও লিখিত বা মৌখিক বোঝাপড়া ছিল, আপনি এখন বিষয়টা অস্বীকার করতে পারেন। একদিন সেই নিয়ে আপনাদের দুজনার মধ্যে বাদানুবাদও হয়, নয় কি?

বাজে কথা।

গত জুলাইতে আপনি তিন লাখ টাকা দিয়ে তিন হাজার ইনফোসিস শেয়ার ধরেছিলেন কথাটা কি ঠিক নয়?

কথাটা ঠিকই, তবে টাকাটা আমাকে ঘনশ্যাম দেয়নি, বলেন খাস্তগীর।

আপনার নামে চেক ইস্যু করা হয়নি ঠিকই, চেকটা সঞ্জীব আগরওয়ালের নামে, অবভিয়াসলি সেই চেকের তলায় ঘনশ্যাম মন্ডলের সই ছিল। চেকটা আগরওয়ালের অ্যাকাউন্টে এনক্যাশ হয়েছে অপরদিকে আপনার ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে গত জুলাইতে জমা পড়েছে তিন হাজার ইনফোসিস শেয়ার। আপনার চেকবুক ভেরিফাই করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে যে ওই সময় আপনি আগরওয়ালকে তিন লাখ টাকা মূল্যের কোনও চেক ইস্যু করেননি। অন্তত রেকর্ড তাই বলছে।

এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন, আমার অন্য এক বন্ধু আমাকে টাকাটা দিয়েছিল, খাস্তগীর বললেন।

শুধু শুধু মিথ্যা বলছেন মি. খাস্তগীর। ব্যাপারটা এখন আপনার হাতের বাইরে চলে গেছে। মনে রাখবেন মানুষ মিথ্যা বলে কিন্তু ডকুমেন্ট মিথ্যা বলে না।

আপনি বলতে চাইছেন ঘনশ্যামকে আমিই হত্যা করেছি? ওই হুমকি চিঠিগুলি আমিই লিখেছি?

অত বোকা আপনি নন কমলেশবাবু। হুমকি চিঠির লেখাগুলি আপনার হাতের লেখার সঙ্গে মিলবে না তা আমি জানি, বলল রণিদা, চিঠিগুলি যে কাউকে দিয়ে অতি সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে লিখিয়ে নেওয়া আপনার পক্ষে মোটেও কঠিন নয়।

তা হলে কী প্রমাণ আছে আপনার হাতে যার জন্য আপনি আমার বিরুদ্ধে এ রকম সাংঘাতিক অভিযোগ আনছেন? প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখায় কমলেশ খাস্তগীরকে।

প্রমাণ আমার হাতে নয়, আপনার হাতে রয়েছে কমলেশবাবু।

অত্যন্ত শীতল কণ্ঠস্বর রণিদার।

তার মানে?

কেন, আপনার হাতের ওই দামি চমৎকার সেল ফোন? গত তেরোই ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটে বেজে ছাপান্ন মিনিটে আপনার ওই সুদৃশ্য সেলফোন থেকে একটি কল বাতাসের ডানায় ভেসে উড়ে যায় ঘনশ্যামবাবুর কয়লাঘাটা অফিসে, অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ অলসো রেকর্ডেড। বিষয়টা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে ভেরিফাই করে নেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ কি? আপনাকে সেলফোনের ব্যাপারে সেদিন এক নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে আপনার ফোনের সিরিয়াল নাম্বারটা বের করে নিলাম কি এমনি এমনি?

শ-য়-তা-ন, তোকে আমি, দাঁত কিড়মিড় করে তেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেন মি. খাস্তগীর, কিন্তু আচমকাই ধড়াম করে সশব্দে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন ভারী মানুষটা। হাত থেকে ছিটকে গেল মূল্যবান সেলফোন।

ব্যাপারটা ঠিক মতন বুঝে উঠতে সময় লাগল।

আসলে হয়েছিল কী, ভ্যাবলাকান্তের মতন চুপচাপ বসে থাকা ঢোলগোবিন্দবাবু পরিস্থিতি বিবেচনা করে অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় আক্রমণকারীর দিকে আচমকাই একটি পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন–আর তাতেই খাস্তগীরের অধঃপতন।

ঢোলগোবিন্দবাবু নির্লিপ্ত ভাবে কেবল বললেন, উঁহু, ক্রোধ জিনিসটি মোটেও ভালো নয়, কমলেশবাবু।

ঢোলগোবিন্দবাবুর তৎপরতায় সকলে বিস্মিত।

আঘাতটা বেশ জোর পেয়েছিলেন ভদ্রলোক, কোনও মতে মেঝেতে উঠে বসলেন। রণিদা ওনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, উঠুন, উঠে নিজের জায়গায় শান্ত হয়ে বসুন মি. খাস্তগীর।

বাধ্য ছেলের মতন রণিদার হাত ধরে উঠে ভদ্রলোক নিজের জায়গায় ফিরে বসে পড়লেন।

তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে উনি বললেন, এইসব হাবিজাবি প্রমাণ দিয়ে আপনি আমাকে ফাঁসাবেন ভেবেছেন?

রণিদার মুখে হাসি।

ও বলল, ঘটনার দিন ভিক্টোরিয়ায় সন্ধ্যাবেলা আপনি ও ঘনশ্যামবাবু যে চা-ওয়ালার কাছে চা খেয়েছিলেন খুব সহজেই সে আপনাকে টি-আই প্যারেডে আইডেন্টিফাই করে দেবে– সেটা ভুলে যাবেন না।

একটু থেমে রণিদা ফের বলে, সেখানেই শেষ নয়–ডিএনএ. ফিঙ্গারপ্রিন্ট টেস্ট বলে একটি শব্দ আছে, সেটা শুনেছেন কি? না শুনে থাকলে সেটা আপনার অজ্ঞতা। আপনি হয়তো জানেন না ইন্ডিয়ান এভিডেন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী ওটা একটি কনক্লুসিভ এভিডেন্স। আপনি একজন চেইন স্মোকার। ওই দিন অকুস্থলে কিছু ফিল্টারবিহীন সিগারেট বাট পাওয়া যায়, যেগুলি সযত্নে সংগ্রহ করে ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের হাতে আমি তুলে দিয়ে এসেছি। সেগুলি সুরক্ষিতই আছে।

আমি একাই চারমিনার খাই না, শেষ চেষ্টা করেন মি. খাস্তগীর।

আপনি এ ব্যাপারে একেবারেই মূর্খ কমলেশবাবু সেটা বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার। আপনার স্যালাইভা বা অন্য কোনও বডি ফ্লুয়িড সংগ্রহ করে ওই সিগারেট বাটগুলির সঙ্গে পরীক্ষা করলে তার যে-কোনওটির সঙ্গে পুরোপুরি ম্যাচ করে যাবে ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট টেস্টে–আয়াম ডেড শিওর। আর ব্যাপারটা কোর্টও গ্ল্যাডলি অ্যাকসেপ্ট করবে, কি বলুন?

কমলেশ খাস্তগীরের মুখ থেকে আর একটিও শব্দ বের হল না। উনি দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললেন।

রণিদা ঘড়ি দেখে। সিঁড়িতে ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া যায়। আমরা সচকিত হই।

রণিদা বলে, আমিই মি. রায়কে বলেছিলাম পাক্বা সাড়ে সাতটায় এখানে আসতে।

রাতুল রায় ঘরে ঢুকে বললেন, অ্যারেস্ট হিম।

তার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল দুজন তৈরি হয়েই এসেছিলেন। ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র কমলেশ খাস্তগীরের হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল কর্তব্যরত মানুষ দুটি।

অনেক ধন্যবাদ মি. চক্রবর্তী, বাকি ব্যাপারটা এবার আমিই দেখছি, বাই, বলে চলে যেতে উদ্যত হন মি. রায়।

এক মিনিট অফিসার, বলে সোফার তলা থেকে নীচু হয়ে খাস্তগীরের সেলফোনটি তুলে আনে রণিদা। তারপর সেটি ওনার হাতে দিয়ে বলে, এটি আপনার কেসের সম্পত্তি। এটিও সিজ করুন। কোর্টে কাজে লাগবে।

ডেফিনিটলি, থ্যাংক ইউ ওয়ান্স এগেইন, বাই, বলে চলে যায় অফিসার।

বিদায় অফিসার, বলে রণিদা, আপনারা তা হলে এবার আমাকে অনুমতি দিন।

রণিদার চোখেমুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে ওঠে।

কী যে বলেন মি. চক্রবর্তী, আজকের মতন দিনে আপনাকে আমরা এভাবে চলে যেতে দিতে পারি? বলে বাড়ির জামাই এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে প্রায় জড়িয়ে ধরে রণিদাকে।

ঢোলগোবিন্দবাবু বলে ওঠেন, এমন দিনে একটু চা জলখাবার না খেয়ে গেলে গৃহস্থের অকল্যাণ হবে।

সকলে হো হো করে হেসে ওঠেন।

মিসেস মন্ডল বলেন, তা যা বলেছেন। উনি দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান।

বুঝলি রঞ্জন, গোয়েন্দা হতে গেলে সর্বপ্রথম যেটা দরকার তা হল ইনটুইশন, যার দ্বারা একজন মানুষকে এক্সরে আই ফেলে মুহূর্তে পড়ে নেওয়া যায়। আমাদের বাড়িতে যেদিন কমলেশবাবু প্রথম আসেন সেদিনই আমার মনে হয়েছিল মানুষটি মোটেই সুবিধার নয়।

সেটা কীভাবে বুঝলে? প্রশ্ন করি আমি।

ওনার দৃষ্টিতে, কেমন একটি জরিপ করার অভিপ্রায় ছিল ওনার দুচোখে, আর…

আর শুরু থেকেই তাই ভদ্রলোককে তুমি চোখে চোখে রাখতে শুরু করলে ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন।

অবশ্য গোয়েন্দাদের এই ইনটুইশনের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ পার্সোনাল একটি বোধ। তবে রঞ্জন, তোর সহযোগিতা ছাড়া এ কেস সলভ করতে হয়তো আরও বেশি সময় লেগে যেত।

ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না, জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে রণিদার দিকে চাইলাম।

কমলেশ খাস্তগীরকে সেদিন আনায়োর শা-র মুখে তুই আবিষ্কার করেছিলি মনে আছে?

হ্যাঁ, উনি সাট্টার কোনও পেনসিলারের সঙ্গে কথা বলছিলেন, বললে তুমি।

মুন্না, মুন্নার সঙ্গে। ব্যাপারটা দেখামাত্র আমার মাথার একটি জটিল অঙ্কের সমাধান হয়ে গেল। তার মানে লোকটির মধ্যে ফাটকা খেলার একটি প্রবণতা আছে। সাট্টা ছাড়া দ্বিতীয় যে-পন্থাটা এক্ষেত্রে মনে আসে, তা হল শেয়ার।

প্রথম দিন যেদিন উনি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন তুই খেয়াল করিসনি কিন্তু ঢোলগোবিন্দবাবু দেখেছিলেন ওনার হাতে একটি খবরের কাগজ।

হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে।

কিন্তু গোবিন্দদা এটা বলতে পারেননি যে কাগজটা ছিল ইকনমিক টাইমস যা থেকে শেয়ার সম্পর্কিত সমূহ খবরাখবর পাওয়া যায়। আমার ধারণা পরিষ্কার হয় যে উনি শেয়ারে টাকা লাগান।

শেয়ার মার্কেটে আমার কিছু বন্ধুবান্ধব আছে। সঞ্জীব আগরওয়ালের নাম বলতেই চিনতে পারল। তার কাছ থেকে কমলেশ খাস্তগীরের খোঁজ পাওয়া গেল। ঘনশ্যামবাবুর তিন লাখ টাকা বিনিয়োগের রহস্যের জট খুলে গেল। আরও পরিষ্কার হল যখন মনে পড়ল ওনার চেকবুকে যেখানেই শেয়ার ব্রোকারদের নাম লেখা তার পাশেই ব্রাকেটে ‘কে কে’ লেখা অর্থাৎ কমলেশ খাস্তগীর। বাকি সব তথ্যগুলি যাচাই করতে আরও কিছুটা দৗড়ঝাঁপ করতে হল।

তুমি যাই বলো ভায়া, তোমার যাবতীয় তথ্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার তত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই উতরে গেল। থমথমে মুখে বললেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

আমি অবাক, রণিদাকেও সেরকমই মনে হল।

ওই যে বলেছিলাম মনে আছে, যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। শেষ পর্যন্ত সিগারেটের ছাইই তোমার কাজে লাগল, বলে উনি নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন হো হো করে।

অমিও যোগ দিলাম হাসিতে।

কিন্তু রণিদা চুপ করে রইল। তারপর বলল, এবার তা হলে কয়েকটা কথা বলি–প্রথমত, তত্ত্বটা আপনার নয়। দ্বিতীয়ত, সেদিন তত্ত্বটির আসল শব্দটাই প্রয়োগে ভুল করেছিলেন এবং তৃতীয়ত, ছাই নয়, এক্ষেত্রে আমাদের প্রয়োজনে লাগছে সিগারেটের বাটটুকু।

ওই একই হল, তত্ত্ব বলো, তথ্য বলো, সিগারেট, কিংবা তুমি আমি যা কিছুই হোক না কেন, সক্বলেরই শেষ পরিণতি কিন্তু ওটিই, নিজের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে ভদ্রলোক দার্শনিকতার মোচড় দেন।

এবার রণিদার চোখে হাসির ঝিলিক দেয়, আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কিছু বুঝলি রঞ্জন?

বলেই আচমকা গাড়িটি একটি বড়ো রেস্তোঁরার সামনে দাঁড় করাল ও।

কী ব্যাপার, এখানে থামলে কেন?

রণিদা বলল, মনে নেই কাল রাতে দাবা খেলার কথা? বাজিতে হেরো গোবিন্দদা আজ আমাদের ডিনার খাওয়াবেন।

রণিদার হাসিতে আমি যোগ দিই।

ঢোলগোবিন্দবাবু অস্ফুটে বলে ওঠেন, হা গোবিন্দ!

——-

সমাপ্ত 

রহস্য ধারাবাহিকঃ মার্ডার ইন ভিক্টোরিয়া (চতুর্থ অধ্যায়)

পর্ব – ৮

রেড রোডে বরাবরই গাড়ির গতি বেশি থাকে।

কার টেপে রবীন্দ্রসংগীত বাজছিল। জানি, রণিদা রবীন্দ্রসংগীতের একনিষ্ঠ ভক্ত হলেও এ সময় ও গান শুনছে না, জটিল অঙ্কের সমাধানে ব্যস্ত।

গানটা ওর মস্তিষ্কে অনুভূত হচ্ছে অন্যভাবে, এক অপার্থিব আবহ সৃষ্টিতে যা ওকে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য ভাবনাচিন্তা দূরে ঠেলে দিয়ে মনকে একাগ্র করতে সাহায্য করছে। ওর এইরকম আচরণ আমার সুপরিচিত।

আমি এখনও মূকাভিনয় করে যাচ্ছি।

আচমকা রণিদার মোবাইলটা যান্ত্রিক সুরে গেয়ে ওঠে– ‘আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে…’

নমস্কার, রাতুলবাবু, বলুন কী খবর?

ওর কণ্ঠস্বরে বুঝতে পারি চমকপ্রদ কিছু ঘটেছে।

বলেন কী? এরই মধ্যে আসামি অ্যারেস্টও হয়ে গেল? নাহ্, মনে হচ্ছে এ যাত্রা আমার পরিশ্রমটা বৃথাই গেল। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এক্ষুনি আসছি আমি। আপনার কাছাকাছিই আছি এখন। ওকে, ধন্যবাদ।

ফোন রেখে রণিদা ড্রাইভ করতে করতে আমাকে বলে, দারুণ খবর রঞ্জন, ঘনশ্যাম মণ্ডলের খুনি ধরা পড়েছে।

সে কী?

হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, হাসে রণিদা।

আমি অবাক, রণিদা এভাবে হেরে গেল। এ তো প্রায় অসম্ভব। কোনও মতে ঢোঁক গিলে বললাম, কে সেই খুনি?

কেন, রাধেশ্যাম মণ্ডল।

মানে ঘনশ্যাম মণ্ডলের ভাই।

এগ্জ্যাক্টলি, তবে এটা পুলিশের ধারণা।

ওকে কোথায় পেল পুলিশ?

গতকাল রাতে ও নাকি বাড়ি ফিরে আসে। ঘনশ্যামবাবুর স্ত্রী ব্যাপারটা ফোন করে থানায় জানান। পুলিশ ওকে রাতেই বাড়ি থেকে অ্যারেস্ট করে তুলে নিয়ে আসে।

তারপর?

তারপর আর কী, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওর জবাব না কি স্যাটিসফ্যাক্টরি ছিল না। আজ সকালে কোর্টে পেশ করে পুলিশ রিমান্ডের প্রেয়ার দেয়।

নিশ্চয়ই কোর্টও সেটা মঞ্জুর করেছে?

অবশ্যই।

তা হলে আমরা এখন ময়দান থানায় যাচ্ছি?

ঠিকই বলেছিস, জবাব দিল রণিদা।

বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম ক্রস করছিল তখন আমাদের গাড়ি। কিছু সময়ের মধ্যেই ময়দান থানায় পৌঁছোলাম।

থানায় প্রবেশ করে ইনভেস্টিগেটরস রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম রণিদা আর আমি। ঘরে ঢুকতেই আইও রাতুল রায় বলে উঠলেন, গুড আফটারনুন মি. চক্রবর্তী।

গুড আফটারনুন মি. রায়, রণিদা প্রত্যুত্তর দেয়, আমি হাসি।

বসুন, একটু চা চলবে কি?

হ্যাঁ, হলে মন্দ হয় না। কিন্তু আপনার আসামি কই মি. রায়?

এক্ষুনি আনাচ্ছি, বলে মি. রায় অপেক্ষাকৃত উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, সেন্ট্রি, সেন্ট্রি।

স্যার ডাকছেন? এক রাইফেলধারী স্মার্ট ইউনিফর্মে।

হ্যাঁ, লক আপ থেকে আমার আসামিটাকে বের করে আনুন তো একটু।

স্যার, বলে চলে গেলেন সেন্ট্রি কনস্টেবল।

একটু পর আমাদের সামনে যে-মানুষটিকে উপস্থাপিত করা হল, তাকে দেখা মাত্র যে কেউ একবাক্যে খুনি বলে ধরে নিতে দ্বিধা করবে না।

ময়লা রং, দোহারা চেহারায় বলিষ্ঠ গড়ন। উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট সাত-আট হবে। চোখে রক্তাভা। মুখে দাড়ি-গোঁফ অপরিচ্ছন্ন। দৃষ্টিতে বিষণ্ণতা ও রুক্ষতার এক অদ্ভুত মিশেল।

একটি বিশেষ জিনিস লক্ষ্য করলাম, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত অপরাধীরা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই লোকটির তেমন হাবভাব দেখা গেল না। কেমন একটি কৗতূহলী দৃষ্টি মেলে আমাদের দিকে তাকাল মানুষটি। মনে হল, আমাদের জরিপ করছে, মুখে কিছু বলল না।

রাতুলবাবু বললেন, এই হতভাগা, ওনারা যা যা জিজ্ঞাসা করেন ঠিক ঠিক উত্তর দিবি।

কেবল ঘাড় নাড়ল লোকটি, মুখে কিছু বলল না।

রণিদা প্রথম প্রশ্ন করল, আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন রাধেশ্যামবাবু?

রণিদার ব্যবহারে কেবল দারোগাবাবুই নয় আমিও বিস্মিত হলাম, কারণ ওর গলার সুর কেমন যেন ভ্রাতৃসুলভ মমতা মাখা। একবার রণিদার দিকে, একবার রাধেশ্যামের দিকে চাইলাম।

উত্তর কাশী, ছোট্ট জবাব এল।

নিশ্চয়ই বেড়াতে?

হ্যাঁ।

আপনি কি একাই গেছিলেন, না সঙ্গে কেউ ছিল? মানে বন্ধুবান্ধব আর কি।

কেউ না, আমি একাই গেছিলাম।

এরকম প্রায়ই যান?

হ্যাঁ, মাঝেমধ্যেই। পকেটে কিছু টাকা-পয়সা এলেই বেরিয়ে পড়ি এদিক সেদিক।

কীভাবে আসে ওগুলি?

মানে?

বলছি টাকা-পয়সা সাধারণত কীভাবে আপনার হাতে আসে, আই মিন, ঠিক কী করেন আপনি?

এবার মানুষটি চোখ নামায় নীচের দিকে, কোনও জবাব দেয় না।

উত্তর দেন রাতুলবাবু, কী আর করবে? মস্তানি, তোলাবাজি, লোককে ভয় দেখানো– এই সবই করে বেড়ায়। হয়তো ব্যাটা

ড্রাগস-ফাগসের ব্যাবসাও করে। খবর আমি পেয়ে যাব খুব শিগগির। তারপর দেখাচ্ছি ব্যাটাচ্ছেলেকে।

বাবার সম্পত্তির সত্তর ভাগ দাবি করেছিলেন আপনি?

রাধেশ্যাম নিরুত্তর।

আপনার মনে হয়নি এটা অন্যায্য?

দাদা তো সরকারি চাকরি করে, প্রচুর টাকা। সত্তর পারসেন্ট আমাকে দিতে আপত্তি কোথায়? কেউ না জানুক আমি তো জানি দাদার চাকরিটা বাবাই করে দিয়েছিলেন।

রণিদা আর ওই প্রসঙ্গে কথা বাড়াল না, অন্য দিকে এগোল। কাল ক’টার সময় ফিরেছেন?

হাওড়ায় পৌঁছেছি রাত নটা নাগাদ।

সোজা বাড়ি এলেন?

হ্যাঁ।

পথে, আই মিন, পাড়ায় কোনও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা হল না কাল?

না।

দাদার মৃত্যুর খবরটা জানতেন?

না, বাড়ি এসে শুনলাম।

কে বলল? বউদি?

না, কাজের লোক।

বউদি, ভাইপো-ভাইঝিদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কেমন?

একটু ভেবে জবাব দিল, মনে হয় ওরা কেউই আমাকে পছন্দ করে না। আমার অবশ্য ওদের কারও ওপর কোনও রাগ নেই।

বাড়ি এসে কী করলেন?

স্নান করে খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে অফিসার আমাকে তুলে নিয়ে এলেন। বোধহয় বউদি ফোন করেছিল।

এ ব্যাটারও সিগারেটের নেশা আছে, বুঝলেন মি. চক্রবর্তী? আবার ব্রান্ডটাও উল্লেখযোগ্য, বললেন রাতুল রায়।

রণিদা আর আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।

চারমিনার, চোখে হাসির ঝিলিক দিল ভদ্রলোকের।

তাই নাকি? প্রশ্নটা ছিল রাধেশ্যামের প্রতি।

রণিদার প্রশ্নের উত্তরে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল ও।

আচ্ছা, রাধেশ্যামবাবু… দাদার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি কোনও দিনই ভালো ছিল না?

নাহ্, কোনও দিনই না, তবে…

তবে কী?

তবে একটি কথা আমি আপনাকে দিব্যি করে বলতে পারি যে দাদাকে আমি খুন করিনি, বিশ্বাস করুন, দাদাকে খুন আমি করিনি।

মানুষটার চোখে-মুখে কেমন একটি অসহায়তা ফুটে উঠল।

হ্যাঁ, হ্যাঁ ধরা পড়ার পর সববাই একই কথা বলে, বলল পুলিশ অফিসার।

বিষয়টা রণিদার চোখও এড়াল না বোধ হয়। তবে একই সঙ্গে কোনও সিমপ্যাথেটিক ওয়ার্ডও বেরোল না ওর মুখ থেকে। কেবল ঝকঝকে ব্লেডের ধারালো দৃষ্টিতে রাধেশ্যামের চোখে চোখ রেখে তাকাল একবার।

তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে অফিসারকে প্রশ্ন করল, একে নিয়ে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী মি. রায়?

ওর কয়েক পাতা হাতের লেখা আগামীকাল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্পেসিমেন রাইটিংস হিসাবে নেব। তারপর সেগুলি পাঠাব এক্সপার্টের কাছে।

একবার যে পাঠালেন?

ওগুলি ওর বহুদিন আগের লেখা। কনটেমপোরানিয়াস রাইটিংস পেলে রিপোর্ট পজিটিভ হবার সম্ভাবনা বাড়ে।

তাহলে তো আবার ডিসির ফরোয়ার্ডিং লাগবে?

না, দ্বিতীয়বার একই কেসে ডকুমেন্ট অ্যাডিশন করলে সেক্ষেত্রে ডিসির ফরোয়ার্ডিং না হলেও চলে।

আচ্ছা, এগুলি এগজামিনেশনের জন্য কোথায় পাঠান আপনারা?

ভবানী ভবনে।

ওটা তো বেঙ্গল পুলিশের আন্ডারে, আই মিন, সিআইডি-র হেডকোয়ার্টার তাই না?

হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন।

কেন আপনাদের ক্যালকাটা পুলিশে ডকুমেন্ট এগজামিনেশনের কোনও ইউনিট নেই?

এখনও পর্যন্ত তো নেই, হেসে জবাব দিলেন অফিসার।

তা কত দিন লাগতে পারে রিপোর্ট পেতে?

আগে তো এক সময় এক দেড় বছর লাগত রিপোর্ট পেতে, এখন ওখানে এক ঝাঁক ইয়ং এক্সপার্ট আসায় রিপোর্ট আমরা মানে আইওরা এক-দেড় কি বড়ো জোর দুমাসের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছি।

গুড, কোনও ভাবে রিপোর্টটা তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় না?

হতে পারে, স্পেশাল কিছু কেসের ক্ষেত্রে। সেক্ষেত্রে ডিসির একটি প্রায়োরিটি লেটার দিতে হয় কেসের গুরুত্ব উল্লেখ করে, দ্রুত জবাব দেন অফিসার।

দেখুন কী করা যায়? আর সিগারেটের স্পেসিমেনটা নিয়ে কী করবেন ভাবছেন?

এক্ষুনি ওটা এগজামিন করাতে চাইছি না, কারণ টেস্টটাতে প্রচুর খরচ। তাই গভর্নমেন্টের পারমিশন পেতে একটু ঝামেলা হয়। আর একটু কনফার্ম হয়ে নিই, তারপর পাঠাবার কথা ভাবব।

ঠিক আছে মি. রায়, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, এভাবে সহযোগিতার জন্য। ইন ফ্যাক্ট, এই রাধেশ্যাম মণ্ডলকে জেরা করাটা আমার কাছে ভাইটাল ছিল। আজ আসি, ফোনে আপনার সঙ্গে টাইম টু টাইম যোগাযোগ রাখব।

বাই, হাত নাড়লেন মি. রায়।

থানা ছেড়ে আমরা রওনা হলাম বাড়ির পথে।

হঠাৎ রণিদা বলল, চল তোর বাড়ি যাই, একটু আড্ডা মারব জমিয়ে।

চলো, এতে আর বলার কী আছে?

গাড়ি চলছিল মাঝারি গতিতে। গান চালাল রণিদা।

আমি জানালা দিয়ে পথশোভা দেখছি। মাথার মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে ভাবনাচিন্তার ভোমরাগুলি। হঠাৎ বললাম, রণিদা এটা কি ঠিক হচ্ছে?

কোনটা?

এই যে তদন্তের মাঝে মাঝে তুমি ঢোলগোবিন্দবাবুকে বাদ দিয়ে দিচ্ছ, সঙ্গে নিচ্ছ না। হাজার হোক ভদ্রলোক তোমার কাছে গোয়েন্দা হবার ট্রেনিং নিতেই এসেছেন। শেষে হয়তো বলে বসবেন, আমরা কৃতিত্ব নেবার জন্য নিতান্ত স্বার্থপরের মতন কাজ করেছি ইত্যাদি, ইত্যাদি।

তুই তো সারাক্ষণ আমার সঙ্গেই আছিস, কী কী ঘটেছে তার একটি ডিটেলস রিপোর্ট দিয়ে দিবি গোবিন্দদাকে, রাস্তার দিকে চেয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলছিল কথাগুলি তবে মনে হল, কোনও গভীর ভাবনায় ডুবে আছে।

বাড়ির কাছাকাছি আসতেই রণিদা বলে উঠল, তুই নেবে যা রঞ্জন। আজ তোর বাড়ি ঢুকব না। বেশ কিছু খবর নেওয়া বাকি। পরে ফোন করিস।

অবাক হলাম না। ওর আচার-আচরণ আমার পরিচিত। জানি, এখন হাজার রিকোয়েস্ট করলেও বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এক কাপ চা ওকে খাওয়াতে পারব না। অগত্যা বাধ্য ছেলের মতন বললাম, ক’টা নাগাদ ফোন করব বলো।

এই সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ, আসছি।

গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায় রণিদা।

পর্ব – ৯

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ রণিদাকে ফোন করলে ও বলল, একবার চলে আয় এ বাড়ি।

নির্দেশ পাওয়ামাত্র আমি একটি ট্যাক্সি নিয়ে রওনা হলাম।

রণিদার বাড়ি পৗঁছে দেখলাম পরিবেশ বেশ গুরুগম্ভীর।

দোতলার ড্রয়িংরুমে রণিদার ঘরে ডিম লাইট জ্বলছে। নীচু স্কেলে বাজছে রবীন্দ্রসংগীত।

দরজার দিকে পিছন করে সোফায় ঘাড় এলিয়ে বসে আছে রণিদা, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।

পা টিপে টিপে যথাসম্ভব সতর্কতাসহ ঘরে ঢুকলাম।

রণিদা টের পেয়ে গেল তবুও, বলল রঞ্জন বস। হরিদা এক্ষুনি কফি নিয়ে আসবে। মিনিট দশেকের মধ্যেই বেরোব।

সোফায় দেহ রাখলাম আমি।

রণিদা আর কোনও কথা বাড়াল না। এক মনে সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে রিং বানাতে লাগল অভ্যাস মতন। বুঝলাম, ভাবনায় ডুবে আছে।

হরিদা তিন কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এলে আমি জিজ্ঞাসু চোখে রণিদার দিকে তাকালাম।

আসছে, হাত নেড়ে আমায় আশ্বস্ত করল রণিদা।

ঠিক সেই সময় লোহার গেটের ঠকাং করে আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম তৃতীয় কাপটি ঢোলগোবিন্দবাবুর জন্য।

মিনিট দুয়েকের মধ্যে ভদ্রলোকের মোলায়েম কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কী হে ভায়া, ঘর অন্ধকার করে বসে আছো সন্ধেবেলা?

হাত বাড়িয়ে সুইচ টেপে রণিদা, মুহূর্তে টিউবের আলোয় হেসে উঠল গোটা ঘর।

চোখ সইয়ে দেখলাম বেরোবার জন্য রণিদা একদম রেডি।

রণিদা বলল, কফি নিন গোবিন্দদা।

ভারী মানুষ, ধপাস করে বসে পড়লেন সোফায়। বললেন, দাঁড়াও একটু দম নিয়ে নিই। একদম তৈরি হয়েই আছো দেখছি।

উনি কফি তুলে নিলেন হাতে, একটি দীর্ঘ সিপ দিলেন।

রণিদা উঠে দাঁড়াল, বলল, আর পাঁচ মিনিট কিন্তু আমাদের হাতে টাইম আছে গোবিন্দদা।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ও।

কফি খেতে খেতে ঢোলগোবিন্দবাবুর সঙ্গে আমার কথাবার্তা হচ্ছিল। বেশিরভাগটা উনিই বলছিলেন, আমি কেবল শুনছিলাম। তদন্তের মাঝে উনি বাদ পড়ে যাওয়ায় অনুযোগের শেষ ছিল না। হঠাৎ খেয়াল হল, নীচ থেকে গাড়ির হর্নের আওয়াজ আসছে।

বুঝলাম ডাকছে রণিদা।

গাড়িতে উঠে ও বলল, বল দেখি রঞ্জন, কোন দিকে যাব আমরা এখন?

কোথায় আর, ঘনশ্যাম মণ্ডলের বাড়ি, বিজ্ঞের মতন জবাব দিলাম আমি একটুও না ভেবেই। আন্দাজে ঢিল মারলাম একটি।

গুড, হেসে বলল রণিদা।

ঢিলটা তা হলে লেগে গেল ঠিক জায়গায়, মনে মনে বললাম।

গাড়িতে যেতে যেতে ঢোলগোবিন্দবাবু আচমকা বলে উঠলেন, আমার মনে হয় মিথ্যেই আমরা দৌড়ঝাঁপ করে মরছি এখন।

তার মানে? আমি অবাক, খানিকটা বিরক্তও।

এটাই স্বভাব ভদ্রলোকের, মাঝে মাঝে এমন সব উৎপটাং কথা বলে বসেন যে আমরা তাজ্জব হয়ে যাই। অবশ্য এ জন্য ওনাকে ভালোও লাগে।

মানে, বলতে চাইছি কেসটা অলরেডি ডিটেকটেড, বেশ গম্ভীর দেখায় ওনাকে।

কী বলতে চাইছেন দয়া করে ঝেড়ে কাশবেন একটু?

ব্যাপারটা জলবৎতরলং অর্থাৎ কিনা জলের মতো তরল। ঘনশ্যামবাবুকে হত্যা করেছে তার ভাই রাধেশ্যাম মণ্ডল। কিন্তু সে এই কাজ একা করেনি।

আমি মুখে কোনও কথা বললাম না, বুঝতে পারলাম উনি সাসপেন্স বাড়াতে চাইছেন।

রণিদার কোনও ভাবান্তর হল কি না বুঝতে পারলাম না। পিছনের সিটের কথাবার্তা ওর কানে যাচ্ছে বলেও মনে হল না, গাড়ি চালানোতেই ব্যস্ত ও।

একটু থেমে দ্বিগুন উৎসাহে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, রাধেশ্যাম এই কাজ করেছে ওর বন্ধুদের সহযোগিতায়। নিশ্চয়ই তোমাদের মনে আছে সেদিন মিসেস মণ্ডলের কথাগুলি?

কোন কথার কথা বলছেন আপনি?

ওই যে ভদ্রমহিলা বললেন না, পাড়ার কিছু রাউডির সঙ্গে ঘনশ্যামবাবুর চাঁদা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল? ওরা যাবার আগে দেখে নেবে বলে শাসিয়েও ছিল?

তাতে হলটা কী?

এ তো সহজ সমীকরণ–রাধেশ্যাম মণ্ডল নিজেও একটি রাউডি। ওর নিজস্ব লোকজন আছে। খুবই দুর্নাম ওর। শাসিয়ে যাওয়া বদমায়েশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা ওর পক্ষে মোটেও কঠিন নয়। আমি বলছি, ও সেটাই করেছে–ওই দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের দাদাকে সরিয়ে দিয়েছে। এতে দু’পক্ষেরই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। আরে রামায়ণ পড়োনি নাকি?

ওনার এ যাবৎ ব্যাখ্যাটা মোটামুটি খারাপ লাগেনি, হলে হতেও পারে। কিন্তু এর সঙ্গে রামায়ণের মিল কোথায় বুঝলাম না। তাই প্রশ্ন করলাম, এতে রামায়ণ পেলেন কোথায় আপনি?

কেন কিষ্কিন্ধা কাণ্ড, সুন্দরা কাণ্ডের কথা একবার মনে কর–সুগ্রীব-বিভীষণ–নাহ্, কিছু পড়াশোনা নেই তোমার দেখছি। এই বিদ্যা নিয়ে তুমি রিপোর্টারগিরি করছ? ছ্যা, ছ্যা।

শুনতে পেলাম রণিদা বেশ শব্দ করে হেসে উঠল।

ভীষণ রাগ হল আমার। কিছু বললাম না তখনকার মতন, ভাবলাম একবার বাগে পাই, লেগপুল করা বার করছি।

সত্যি! কী দারুণ ব্রেন আপনার গোবিন্দদা, কত সহজে মামলাটার সমাধান করে ফেললেন, বলল রণিদা।

তুমি দেখে নিও ভায়া পুলিশও শেষ পর্যন্ত ব্যাটাচ্ছেলের কাছ থেকে এই কথাই বার করবে। ওকে পিসিতে টেনেছে কি আর এমনি এমনি? চার ডান্ডা লাগালেই দেখবে হুড়মুড় করে সব কথা বেরিয়ে আসছে, সহাস্য জবাব এল ঢোলগোবিন্দবাবুর কাছ থেকে।

পুলিশের আর সে সুদিন নেই দাদা, আসামী কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ডান্ডা লাগাতে গেলে পুলিশ নিজেই এখন ঠান্ডা হয়ে যাবে, হেসে বললাম আমি, হিউম্যান রাইটস্ বলে একটি কথা আছে শুনেছেন নিশ্চয়ই? আমাদের দেশ এখন সেই রাইটস্ মানুষের ওপর, বিশেষত আসামীদের ওপর বলবৎ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফলে থানায় পুলিশ, আসামীদের মারধোর করার পরিবর্তে গরম দুধ খাওয়ায়, দুবেলা ডাক্তার দিয়ে চেক আপ করায় শুধু নিজের চাকরি বাঁচাতে। জানেন কিছু? এবার পারলে নিজের চোখে দেখে আসুন গিয়ে।

এতক্ষণ পর একটু স্বস্তি লাগছে, বেশ করে ঝেড়ে দিয়েছি, বলে কিনা কিছু পড়াশোনা নেই।

সে যাই হোক, পুলিশের অনেক উপায় আছে কথা বার করার জন্য, ঢোলগোবিন্দবাবু সিদ্ধান্তে অবিচল।

দেখা যাক, তবে আমার কিন্তু কেসটা মোটেও সরল বলে মনে হচ্ছে না, কারণ রণিদাকে এর আগে এতটা সিরিয়াস হতে দেখিনি কখনও, আমি বললাম।

আমার কথায় রণিদা সামান্য হেসে বলল, আমাকে বুঝি খুবই সিরিয়াস দেখাচ্ছে?

ঘনশ্যাম মণ্ডলের বাড়ি পৗছে দরজায় বেল টিপলাম। দরজা খুলে দিলেন মিসেস মণ্ডল। ওনার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল রণিদা আমাদের আসার কথা আগেই ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল।

ঘরে গিয়ে বসতে মিসেস মণ্ডল ওনার ছেলে এবং মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে আমাদের সকলের আলাপ করিয়ে দিলেন।

আজ ভদ্রমহিলাকে অনেকটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। ব্যবহারে যথেষ্ট আন্তরিকতা লক্ষ্য করলাম।

কথাবার্তা শুরু করল রণিদা।।

মিসেস মণ্ডল, আপনি নিশ্চয়ই চান আপনার স্বামীর হত্যাকারী ধরা পড়ুক?

সে তো অবশ্যই চাই, বললেন ভদ্রমহিলা।

সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনাকে একটু ব্যক্তিগত কিছু প্রশ্ন করতে পারি? আপনার উত্তরের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

রণিদার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে মুহূর্তে পরিবেশটা একদম বরফঠান্ডা হয়ে পড়ল।

ভদ্রমহিলা সহজ ভাবেই বললেন, বলুন কী জানতে চান?

এখন থেকে মাস আটেক আগে অর্থাৎ জুলাই মাস নাগাদ বা তার কাছাকাছি সময়ে আপনি কি কোনও বড়ো-সড়ো অসুখে পড়েছিলেন।

আমি? অসুখে!

ভদ্রমহিলা বুঝি আকাশ থেকে পড়লেন। হয়তো বা তার অসুস্থতার সঙ্গে খুনি ধরা পড়বার যোগাযোগটা ঠিক কোথায়–এ কথা ভেবেই তার বিস্ময় বাড়ল।

একটু ভেবে নিয়ে উনি জবাব দিলেন, ছোটোখাটো কিছু হলে হতে পারে কিন্তু তেমন বড়ো কিছু তো মনে পড়ছে না।

এমন কোনও রোগ বা অপারেশন যার জন্য লাখ তিনেক টাকা লাগতে পারে? রণিদা আরও গভীরে যায়।

তিন লাখ! না, না অমন কোনও কিছু আমার কেন, আমার পরিবারের কারও কোনও দিন হয়নি যার চিকিৎসায় অত টাকা ব্যয় হতে পারে।

বাড়ি ঘরের রেনোভেশান কিছু হয়েছিল ওই সময়?

না, হয়নি তো। আচ্ছা, ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন আমাকে? মিসেস মণ্ডল বলেন।

আপনার স্বামী ঘনশ্যাম মণ্ডল গত জুলাইতে তিন লাখ টাকা পিএফ থেকে তোলেন আপনার চিকিৎসার জন্য। আই মিন ওই গ্রাউন্ডে।

তাই নাকি! উনি বেশ অবাক হলেন বলে বোধ হল।

অর্থাৎ ব্যাপারটা আপনার অজানা?

এ প্রশ্নের উত্তরে মিসেস মণ্ডলকে খানিকটা অপ্রস্তুত লাগল। উনি আমতা আমতা করে বললেন, আসলে কী জানেন, টাকা পয়সার ব্যাপারে যা কিছু সিদ্ধান্ত বরাবর ও একাই নিত। আমার সঙ্গে কোনও আলাপ-আলোচনা করত না। তা নিয়ে অবশ্য কোনওদিন আমার কোনও অভাব-অভিযোগ ছিল না।

একটু থেমে উনি আবার বলতে থাকেন, লোকাল ব্যাংকে ওর সঙ্গে আমার একটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট ছিল। তাতে কিছু টাকা-পয়সা থাকত ঠিকই তবে আমার মনে পড়ে না শেষ কবে আমি ব্যাংক থেকে নিজে সই করে টাকা তুলেছি।

অর্থাৎ আপনি বলতে চাইছেন, মণ্ডলবাবু যদি ওই পরিমাণ টাকা তুলেও থাকেন সেটা আপনি জানেন না, তাই তো?

সম্মতিজ্ঞাপক মাথা নাড়েন ভদ্রমহিলা।

সে ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে গেল, বলল রণিদা তবে ইন্ডিয়ান ল অনুযায়ী স্বামীর অবর্তমানে ওনার যাবতীয়

স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক এখন আপনি। তাই এখন নিশ্চয়ই ওগুলি নাড়াচাড়া করার অসুবিধা নেই আপনার?

দেখুন অসুবিধা আগেও ছিল না। কোনও দিন কোনও প্রয়োজনে টাকার দরকার হলে কোনও কারণ জিজ্ঞাসা করেনি ও। কেবল জানতে চাইত কত দিতে হবে? আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ছিল অটুট। আসলে আমি ঘর-সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতাম বরাবর। টাকা-পয়সা-সম্পত্তির ব্যাপারে কোনওদিন কিছু জানতে চাইনি, আগ্রহও হয়নি তেমন।

কথাটা ঠিক আমি ওভাবে বলতে চাইনি মিসেস মণ্ডল, রণিদা বলল, এই কেসের স্বার্থে ওই টাকাটার হদিশ আমাকে বের করতেই হবে কারণ ওটাই মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

সোফা ছেড়ে রণিদা উঠে পায়চারি করতে লাগল ঘরের মধ্যে। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, একজন সংসারি হিসেবি মানুষ আচমকাই তিন লাখ টাকা পিএফ থেকে তুললেন বিশেষ কোনও কারণ ছাড়াই? যত দূর জানা যায় মানুষটি সৎ, কোনও বদ নেশা তার ছিল না যে তাতে তিনি পয়সা উড়িয়ে দেবেন। বরং বলা যায় উনি যথেষ্ট সঞ্চয়ী। তা হলে ধরে নিতে হবে টাকাটা উনি এমন কোনও কিছুতে ইনভেস্ট করতে চেয়েছিলেন যাতে জিপিএফ-এর ধরা বাঁধা ইন্টারেস্টের থেকে লাভ বেশি পাওয়া যেতে পারে। সেটা কী?

পায়চারি করাকালীন বাম হাতের তালুতে মুষ্টিবদ্ধ ডানহাতখানা দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করছিল রণিদা। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, দেখুন মিসেস মণ্ডল, গত জুলাইতে ঘনশ্যামবাবু পিএফ থেকে তিন লাখ টাকা তুলে ছিলেন এটা ফ্যাক্ট। অফিস নিশ্চয়ই টাকাটা ওনাকে ক্যাশে দেয়নি, চেকে দিয়েছিল। তাহলে সেই চেক এনক্যাশও হয়েছিল, টাকাটা ওনার অ্যাকাউন্টে থাকার কথা। ব্যাপারটা হয়তো খুবই পার্সোনাল, তবু বাধ্য হয়েই বলছি, দয়া করে ওনার ব্যাংকের পাশবইটা যদি একটু নিয়ে আসেন… রণিদা ইতস্তত করে।

রণিদার কথা সম্পূর্ণ হতে না হতেই ভদ্রমহিলা বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, আমি নিয়ে আসছি।

ইতিমধ্যে চা ও জলখাবার নিয়ে এল কাজের লোক। মিসেস মণ্ডলের মেয়ে একে একে আমাদের হাতে তুলে দিলেন ওগুলি।

মিনিট তিনেকের মধ্যেই ভদ্রমহিলা তিনখানি ব্যাংকের পাশবই নিয়ে এসে রণিদার হাতে দিয়ে বললেন, দেখুন মি. চক্রবর্তী, আলমারির লকারে এই তিনটি পাশবই আমি পেলাম, সঙ্গে চেকবইগুলিও নিয়ে এসেছি।

দারুণ কাজ করেছেন, এগুলিও দরকার, কোনওমতে বলল রণিদা।

ওকে এত উত্তেজিত হতে আগে কখনও দেখিনি। প্রায় ছোঁ মেরেই ভদ্রমহিলার হাত থেকে পাশবইগুলি নিয়ে গভীর আগ্রহ ও উৎকণ্ঠা ভরে সেন্টার টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে রণিদা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ওগুলি।

দ্রুত দুটি পাশবই দেখেই সরিয়ে রাখল পাশে। তারপর তৃতীয় বইটি খুলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝি অভীষ্ট লাভ হল ওর।

বলল, এই তো তিন লাখ টাকা এনক্যাশ হয়েছে। কিন্তু একি! একদিন পরই ওই অ্যামাউন্টটা সাইফন হয়ে গেছে। কিন্তু গেল কোথায় টাকাটা? চেক বইটা একবার দেখি। কনসার্ন ব্যাংকের চেক বই-এর পাতা ওলটাতে লাগল দ্রুত… শেষ পাতায় সাধারণত সবাই লিখে রাখে কোন চেক কবে কাকে দেওয়া হল… এই তো গত আঠাশে জুলাই তিন লাখ টাকার একটি চেক ইস্যু করা হয় সঞ্জীব আগরওয়াল নামে এক ব্যক্তিকে। নামটার পাশে ব্র্যাকেটে আবার লেখা কে কে, সারপ্রাইজিং।

আচ্ছা মিসেস মণ্ডল, এই আগরওয়ালাকে আপনি চেনেন? সঞ্জীব আগরওয়াল?

আগরওয়াল। হতভম্ব দেখাল ভদ্রমহিলাকে। ওই নামের কোনও লোকের সঙ্গে ওর আলাপ ছিল বলেও কোনও দিন শুনিনি।

আপনারা কেউ? রণিদা ওনার ছেলে-মেয়ের দিকে তাকায়।

না। দুজনেই মাথা নাড়ে।

রণিদা তখন আবার চেকবইটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, আরে এখানে দেখছি সঞ্জীব আগরওয়াল, মনিশ রূংটা, শিশুমার পোড়েল এদের বেশ কয়েকবার চেক ইস্যু করা হয়েছে। অবশ্য সব ক্ষেত্রেই অ্যামাউন্টটা কম ছিল, বিশ-পঁচিশ হাজারের মধ্যে।

বলা বাহুল্য, আমিও হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম চেক বইয়ের ওপর।

ঢোলগোবিন্দবাবুকে অবশ্য খানিকটা নিস্পৃহ দেখাল এ ব্যাপারে। উনি এক মনে খাদ্যবস্তুগুলির সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত। ওই ব্যাপারটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হল ওর ক্ষেত্রে।

রণিদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপনারা তা হলে এই চেক বই মারফত মি. মণ্ডল কাকে কখন কী পরিমাণ টাকা দিচ্ছেন তার কোনও খবরাখবর জানেন না?

না, মা ও ছেলে-মেয়ে সকলেই মাথা নাড়েন। জামাইকে ঘরে দেখা গেল না।

রণিদা তখন পাশবই ও চেকবইগুলি মিসেস মণ্ডলের হাতে তুলে দিয়ে বলল, এগুলি যত্ন করে তুলে রাখুন।

হাত বাড়িয়ে ভদ্রমহিলা ওগুলি নিলেন।

রণিদা এগিয়ে এসে এবার চা-টা তুলে নিয়ে বেশ বড়ো একটি সিপ দিয়ে আবার টেবিলে নামিয়ে রাখল। একটু পায়চারি করে সোফায় এসে বসল। এক মনে চা খেল।

কেউ কোনও কথা বলছিল না।

চা শেষ হলে উঠে দাঁড়াল রণিদা। তারপর বলল, মিসেস মণ্ডল, অনেক কষ্ট দিলাম আপনাকে। এ বিষয়টা জানা আমার অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিষয়টা জানার পরও অনেকটাই অজানা রয়ে গেল। দেখি কী করা যায়। তবে আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন–কাল-পরশুর মধ্যেই প্রকৃত খুনিকে আমি ধরে ফেলব।

কিন্তু পুলিশ তো ঠাকুরপোকে ধরে নিয়ে গেছে, কী সব

প্রমাণ-ট্রমানও নাকি পেয়ে গেছে মিসেস মণ্ডল বললেন।

হ্যাঁ, ওদের ইনভেস্টিগেশন ওদের মতন চলুক, আমারটা আমার মতন, হাসল রণিদা।

আসলে রণিদাকে দারুণ কনফিডেন্ট দেখায়।

আজ আসি, বিদায়, বলল রণিদা।

আমি ও ঢোলগোবিন্দবাবুও উঠে দাঁড়িয়ে ওকে অনুসরণ করলাম। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে বসলাম। গাড়ি এগিয়ে চলল।

আশুতোষ মুখার্জী রোডের দিকে বেরোই, কী বল? রণিদা বলল, আচ্ছা, আজ তোর বাড়ি গেলে কেমন হয়?

কালকের মতন? হেসে জবাব দিলাম।

না, না আজ পাক্বা, হাসল রণিদাও।

গাড়ি চারুমার্কেট রেলব্রিজের তলা দিয়ে এগিয়ে চলল। আনায়োর শা মোড়টা টপকাতেই হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল এক বিশেষ দৃশ্যে–চিনতে মোটেও ভুল হবার নয়, কমলেশ খাস্তগীর।

পাশে বসে থাকায় রণিদাকে কনুই দিয়ে গুঁতো মারতে সুবিধা হল। গুঁতো মেরে বললাম, রণিদা, খাস্তগীর।

ইঙ্গিত মাত্রই রণিদার চোখ পড়ল ওই দিকে।

নিজের গাড়িতে হেলান দিয়ে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে ময়লা এক লুঙ্গিপরা মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন।

রণিদা খানিকটা স্লো করেই স্পিড বাড়াল গাড়ির।

বিড়-বিড় করে বলল, মুন্না। ওর সঙ্গে খাস্তগীরের কী কথা থাকতে পারে?

তুমি চেন ওই লোকটাকে?

হ্যাঁ, মুন্না এদিককার একটা সাট্টা ডনের পেনসিলার। কিন্তু ওর সঙ্গে কমলেশ খাস্তগীর… তা হলে কী… তাই যদি হয়… দুয়ে দুইয়ে চার হতে… চমৎকার রঞ্জু, মনে হচ্ছে মেঘ সরে যাচ্ছে বুঝলি… ক্রমশ ফরসা হচ্ছে আকাশ।

আমি হাঁ করে ভ্যালভ্যালে দৃষ্টি মেলে রণিদাকে দেখলাম। মেঘ কেটে কোথায় যাচ্ছে কে জানে?

রণিদার সামনে নিজেকে মাঝে মাঝে বড়ো আন-স্মার্ট লাগে।

সম্ভবত আমার চোখ-মুখ দেখেই ফিক করে হাসল রণিদা, বলল তোকে দারুণ দেখাচ্ছে জানিস?

নিজেকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হলাম।

বাড়ি এসে ঝপাঝপ গাড়ি থেকে আমি আর ঢোলগোবিন্দবাবু নামলাম।

রণিদা বলল, তোরা এগো, মাসিমাকে বল চা খাব। কড়া করে। গাড়িটা পার্ক করে সিগারেট নিয়ে এক্ষুনি আসছি। সিগারেট শেষ।

আমি দরজায় বেল বাজালাম।

ক্রমশ…

রহস্য ধারাবাহিকঃ মার্ডার ইন ভিক্টোরিয়া (তৃতীয় অধ্যায়)

 

পর্ব – ৫

দেখুন পুলিশের চাকরিটাই এ রকম, ইচ্ছা না থাকলেও নানা অপ্রীতিকর কাজ করতে হয় তাদের মাঝেমধ্যে। ওই ব্যাপারটা মনে রেখে কষ্ট পাবেন না। আর আমি আপনাকে সে রকম কিছু জিজ্ঞাসা করব না।

ঠিক আছে, বলুন কী জানতে চান?

রণিদা ডায়ারি ও পেন নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বলল আপনার স্বামীর সঙ্গে কমলেশ খাস্তগীর এবং সুবিমল সোমের সম্পর্ক কীরকম?

আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ছাবিবশ বছর। শুনেছি তারও আগে থাকতে বন্ধুত্ব ওদের।

ওরা ছাড়া আর কার কার সঙ্গে মিশতেন, মি. মণ্ডল?

কমবেশি সকলের সঙ্গেই কথা বলতেন তবে বন্ধু বলতে ওরা দুজনই ছিল যাদের ওপর ও খুব নির্ভর করত। আসলে ও একটু ইনট্রোভার্ট প্রকৃতির মানুষ ছিল– যেচে কারও সঙ্গে যেমন আলাপ করতে পারত না, তেমনি কারও সঙ্গে একটানা দীর্ঘক্ষণ কথা বলতেও দেখিনি ওকে কোনওদিন।

শুনেছিলাম, ভায়ের সঙ্গে ওনার একটু মনোমালিন্য হয়েছিল দিন কয়েক আগে?

ভদ্রমহিলা চুপ করে রইলেন। হয়তো মনে মনে ভাবলেন এ প্রসঙ্গে কীভাবে মুখ খোলা উচিত তার।

তারপর বললেন, ঠাকুরপো একটু অন্য প্রকৃতির মানুষ। তা নিয়ে বাবা-মায়ের দারুণ দুঃখ ছিল। মা আগেই মারা যান। বাবা মারা যাবার পর সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে দাদার সঙ্গে গণ্ডগোল হতো ওর। ওর অন্যায় দাবি দাদা মেনে নিতে পারেনি। তাতে খুব রেগে যান ঠাকুরপো। বলেন, এ সম্পত্তি তুমি কীভাবে ভোগ করো আমিও দেখে নেব।

উনি এখন কোথায়?

বলতে পারব না, মাঝে মাঝে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ওর পুরোনো অভ্যাস।

মিসেস মণ্ডল, রণিদা বলল, আপনি এই পরিবারের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। আপনি স্বামী ও ঠাকুরপোকে দীর্ঘদিন যাবৎ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একটি প্রশ্নের উত্তর দিন, আপনার কি মনে হয় মি. মণ্ডলকে তার ভাই খুন করতে পারে?

মাথা নীচু করে ভদ্রমহিলা মিনিটখানেক চুপ করে থেকে জবাব দিলেন, বলতে পারব না।

যাক গে ওসব কথা, আপনার ছেলে-মেয়েরা কোথায়?

ওপরের ঘরে।

ছেলে কি বড়ো?

না মেয়ে, বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক হল।

আপনার ছেলে কত বড়ো?

এ বছর কুড়িতে পড়ল। ডাকব?

না থাক, এখন দরকার নেই ওদের। বলল রণিদা, আচ্ছা মিসেস মণ্ডল, আপনার স্বামী তো রেলে চাকরি করতেন ওনার অফিসটা ঠিক কোথায় বলুন দেখি?

কয়লাঘাটা ব্রাঞ্চ।

উনি কি অফিস থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়েই বাড়ি ফিরতেন?

হ্যাঁ প্রতিদিনই। যেদিন কোথাও যাবার কথা থাকত বলে যেত আমায় যে, ফিরতে দেরি হবে।

সেদিন নিশ্চয়ই তেমন কিছু বলে যাননি উনি?

না। মাথা নাড়েন মিসেস মণ্ডল।

ধন্যবাদ, আর একটি কথা, আপনার স্বামীর এভাবে খুন হবার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

কারণ? ভদ্রমহিলাকে বিধবস্ত দেখায়। আপনার এই প্রশ্নটা পুলিশও আমাকে করেছিল।

কী উত্তর দিয়েছিলেন পুলিশকে?

তখন বলতে পারিনি। তবে পরে অনেক ভেবে মনে হয়েছে একটি ঘটনার কথা।

আমরা নড়েচড়ে বসলাম, আগ্রহ বাড়ল।

কী সেই ঘটনা? প্রশ্ন করে রণিদা।

দিন কুড়ি আগে পাড়ার বেশ কিছু ছেলে এসে ক্লাবের উন্নয়নের জন্য দশ হাজার টাকা চাঁদা চায় ওর কাছে।

সে কী। আমরা চমকে উঠি, তারপর?

ও জানায় অত টাকা দিতে পারবে না। বড়ো জোর শ’পাঁচেক দিতে পারে। এতে ছেলেগুলির সঙ্গে ওর কথা কাটাকাটি হয়। আমার ছেলে এগিয়ে যায়, প্রতিবাদ করে। শেষে অল্পবিস্তর হাতাহাতি হয়। স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যস্থতায় সেদিনকার মতন ঘটনাটা চাপা পড়লেও যাবার আগে ছেলেগুলি ভয়ংকর ভাবে আমাদের শাসিয়ে যায় দেখে নেবে বলে।

ঘটনাটা তখন থানায় জানাননি?

আমি ওকে বলেছিলাম জানাতে, কিন্তু ও রাজি হয়নি।

খুব ভুল করেছেন। তা ছাড়া গত দুদিনে পুলিশকে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা না দিয়ে আরও বড়ো ভুল হয়েছে, যাই হোক, ছেলেগুলিকে চেনেন আপনি?

আমার ছেলে চেনে–হাতকাটা জগা, বরফি, কীসব নাম যেন ওদের।

তা হলে শেষ পর্যন্ত চাঁদা ওরা নিল না?

এক দাদার মাধ্যমে দু-হাজার টাকা আমরা পাঠিয়েছিলাম ক্লাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই টাকাটা ওদের হাতে পৌঁছেছে কি না, ওরা ওই টাকা আদৌ নিয়েছে কি না বলতে পারব না।

রণিদা বলল, আশ্চর্য। এমন মারাত্মক একটি ঘটনা অথচ তিনজনের একজনও সেদিন ব্যাপারটার উল্লেখ করলেন না। যাক গে, যা হয়ে গেছে গেছে। ঘটনাটা সম্বন্ধে খবর নিচ্ছি আমি। আইও রাতুল রায়কেও জানাচ্ছি খবরটা। আজ আমরা উঠি মিসেস মণ্ডল, আপনাকে কষ্ট দেবার জন্য মার্জনা চাইছি।

না, না ঠিক আছে, ভদ্রমহিলাকে বেশ আশ্বস্ত দেখাল। সম্ভবত আমাদের সঙ্গে কথা বলে উনি কিছুটা নির্ভার বোধ করছেন।

আর একটি প্রশ্ন আছে আমার, রণিদা বলে।

হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন না।

আপনার ঠাকুরপো রাধেশ্যাম মণ্ডল কি কোনও নেশাটেশা করতেন?

আমি যতদূর জানি সবরকম নেশাই ওর ছিল, অনেকটা ফ্রি শোনাল ওনার কণ্ঠস্বর।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে মিসেস মণ্ডল, এটা আপনার কাছে রাখুন, বলে একটি কার্ড বের করে রণিদা এগিয়ে দেয় ভদ্রমহিলার দিকে, আমার ফোন নম্বর এতে দেওয়া আছে। যে-কোনও প্রয়োজনে রিং করবেন।

ধন্যবাদ, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে উনি দরজার দিকে হেঁটে এগিয়ে গেলেন।

গাড়িতে বসে দেখতে পেলাম গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রওনা অবধি ভদ্রমহিলা দরজার দুটি পাল্লায় হাত রেখে অবিচল দাঁড়িয়ে আছেন–বিষণ্ণতা সিল্যুটে হিমায়িত।

মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল।

গলির মুখে আমাদের গাড়িটা বাঁক নিতেই দৃষ্টির অক্ষমতার তুলি দৃশ্যটিকে অন্ধকারের শ্লেটে মুহূর্তে মুছে দিল।

পর্ব – ৬

পরদিন সকালে রণিদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল আমার। আসলে তখনও ঢোলগোবিন্দবাবু এসে পৌঁছোননি।

রণিদা বলল, তদন্তের এ পর্যন্ত এসে কী বুঝছিস রঞ্জন?

তুমি হয়তো মনে মনে অনেকদূর এগিয়ে গেছ রণিদা যেহেতু এ বিষয়ে বরাবরই তোমার ব্রেন আমার থেকে অনেক দ্রুত চলে। তবে আমার মনে হয়, গুছিয়ে বলার মতন জায়গায় কিন্তু আমরা এখনও এসে পৌঁছোইনি।

একটু ঝেড়ে কাশ।

মানে এখনও তদন্তের অর্ধেকটাই সারা হয়নি।

যেমন?

যেমন এ কেসে সন্দেহের আসল তির যার দিকে তাকে জেরা করবার কিংবা চাক্ষুস দেখবার সৌভাগ্য আমাদের এখনও হয়নি যেটা অত্যন্ত জরুরি।

অর্থাৎ ঘনশ্যাম মণ্ডলের ভাই রাধেশ্যাম মণ্ডল।

ঠিক তাই।

তোর কি মনে হয় রাধেশ্যাম মণ্ডল খুন করতে পারে?

অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছুই নেই, বললাম আমি। রাধেশ্যাম মণ্ডল তার দাদার হত্যাকারী হতে পারে, আবার নাও পারে। একথা তো ঠিক যে ঘনশ্যাম মণ্ডলের মৃত্যুতে যদি কারও ডাইরেক্ট ইম্মিডিয়েট গেইনের ব্যাপার থাকে তবে সেটা রাধেশ্যাম মণ্ডলের।

গুড, ভেরি গুড।

তা ছাড়া আমি ইতস্তত করি।

তা ছাড়া কী?

তা ছাড়া দেখলে না, মিসেস মণ্ডল পর্যন্ত নির্দ্বিধায় রাধেশ্যাম মণ্ডলকে নির্দোষ বলতে পারলেন না। আমি একটি জিনিস জানি রণিদা, মহিলাদের সিক্সথ সেন্সটা কিন্তু প্রখর। ওরা এমন কিছু জানতে, বুঝতে বা অনুভব করতে পারেন অতি সহজে, যা পুরুষদের পক্ষে চট করে পারা সম্ভব নয়।

উনি কিন্তু ডেফিনিটলি বলেননি যে রাধেশ্যাম মণ্ডল খুনি, রণিদা পালটা যুক্তি দেখায়।

সেটা বলা ওনার পক্ষে সম্ভব কি?

তা অবশ্য ঠিক, বলে রণিদা, তা হলে এবার আসা যাক পরবর্তী প্রসঙ্গে  অর্থাৎ অফিস কলিগ জনমেজয় মিত্তির ও নীলাক্ষি দাসগুপ্তের কথায়।

কিন্তু রণিদা, প্রফেশনাল জেলাসিবশত এত বড়ো একটি কাণ্ড ঘটানো কি সম্ভব?

সেটা ভাবার বিষয় অবশ্যই, বলল রণিদা, তবে তোর কথা টেনে বলতে হয়, নাথিং ইজ ইম্পসিবল আন্ডার দি সান। আমাদের ও ব্যাপারটা ঝালিয়ে দেখতে হবে শিগগির।

আচ্ছা রণিদা, সুবিমল সোম এবং কমলেশ খাস্তগীর এদের দু’জন সম্বন্ধে তুমি কী ভাবছ?

দেখ, তদন্ত এখনও পর্যন্ত যে-পর্যায়ে আছে তাতে ওদের দুজনের কাউকেই সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।

কিন্তু কাউকে খুনি ভেবে নিলেই তো হল না, যাকে খুনি ভাবছি–তাকে কেন খুনি ভাবছি তার একটি কোজেন্ট গ্রাউন্ড নিশ্চয়ই থাকা উচিত।

অর্থাৎ তুই বলতে চাইছিস মোটিভ। মার্ডারের মোটিভটা কী? বলে রণিদা সিগারেট ধরায়।

জাস্ট রাইট। ঘনশ্যাম মণ্ডলকে হত্যা করে সুবিমল সোম কিংবা কমলেশ খাস্তগীরের লাভটা কী সেটা আগে খুঁজে বার করতে হবে আমাদের। কারণ ভেবে দেখলেও এ পর্যন্ত আমাদের হাতে এমন কোনও স্ট্রং এভিডেন্স বা তথ্য আসেনি যার ওপর বেস করে আমরা এদের খুনি ভাবতে পারি।

সোফায় মাথা হেলিয়ে সিগারেটের রিং ছুড়তে ছুড়তে রণিদা বলে, খুনি ভাবতে না পারলেও সন্দেহ কিছু এসেই যাচ্ছে।

কী রকম? জানতে আগ্রহ হয় আমার।

ওদের কথার মধ্যে বেশ কিছু অ্যানোম্যালি আছে। কিছু তথ্য গোপন করতে চাইছে দুজনই।

যেমন?

যেমন সুবিমল সোমের সঙ্গে জেরক্স সংক্রান্ত কোনও ব্যবসায় ঘনশ্যামবাবু সম্ভবত জড়িয়েছিলেন যেটা উনি চেপে যান আমাদের কাছে–তথ্যটা জানা যায় কমলেশ খাস্তগীর মারফত। সেটা কেন?

হতে পারে উনি বন্ধুর মৃত্যুর পর ওই টাকা আর ওনার পরিবারকে দিতে চাইছেন না, বললাম আমি, কিন্তু তুমি কমলেশ খাস্তগীরের কথায় কী অসংগতি পাচ্ছ?

তোর মনে আছে আমি কমলেশবাবুকে প্রশ্ন করেছিলাম খুনের দিন সন্ধ্যাবেলা আপনি কী করছিলেন?

হ্যাঁ মনে আছে।

উত্তরে উনি কী বলেছিলেন বল দেখি?

উনি বলেছিলেন, সেদিন একটা বিয়েবাড়ি গেছিলেন।

রাইট, বলল রণিদা, তুই পাঁজি খুলে দেখ, ওই দিন কোনও বিয়ের ডেট নেই।

তাতে কি প্রমাণ হয় উনি খুন করেছেন?

না, তা হয় না ঠিকই, তবে আমাদের ভাবার একটি জায়গা এসে যায়–ওই দিন ভদ্রলোক তাহলে কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন, কেনই বা তিনি মিথ্যা বললেন আমাদের কাছে?

ঠিক আছে, মানলাম তোমার কথা, বললাম আমি, আর কী উল্লেখযোগ্য ব্যাপার আছে ওই ভদ্রলোক দুজনের?

কেন? খেয়াল করিসনি–ওরা দুজনেই বল দুজনার কোর্টে ঠেলে দিচ্ছেন?

কী রকম? কী রকম?

একবার সুবিমল সোম বলছেন, উনি শুনেছেন যে, ঘনশ্যাম মণ্ডল এবং কমলেশ খাস্তগীরের মধ্যে কোনও গোপন বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে,

আবার ওদিকে কমলেশ খাস্তগীরও বলছেন, উনি শুনেছেন সুবিমল সোমের নতুন জেরক্স মেশিন বসানো নিয়ে ওদের বচসার কথা কানে এসেছিল ওনার, রণিদার কথাটা সম্পূর্ণ করলাম আমি।

এগজ্যাক্টলি, বলল রণিদা, এদের যে-কোনও একজন তদন্তটাকে অযথা গুলিয়ে দিতে চাইছেন মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে। তাহলে সেক্ষেত্রে দুটো প্রশ্ন এসে যাচ্ছে, রণিদা থামে একটু।

আমি চুপচাপ ব্যগ্র দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে।

তারপর ও ফের বলতে শুরু করে, প্রথম প্রশ্ন, এদের দুজনের মধ্যে কে সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি? দ্বিতীয় প্রশ্ন, এভাবে তদন্ত ডিরেলড করায় তার ইন্টারেস্ট কী?

খুবই যুক্তিযুক্ত কথা, তবে রণিদা, আমার মনে হয় মার্ডারের দ্বিতীয় মোটিভটা সম্বন্ধে আমাদের একটু ভেরিফাই করে নেওয়া উচিত, নয় কি?

অর্থাৎ তুই বলতে চাইছিস, হোয়েদার ইট ইজ আ কেস অফ রিভেঞ্জ অর নট?

হ্যাঁ, লোকাল ছেলেদের সঙ্গে ভদ্রলোকের বিবাদের ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও হেলাফেলার নয়। বিষয়টা নিয়ে একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার। কারণ ওই এলাকায় বেশ কিছু ডেঞ্জারাস অ্যান্টিসোশ্যাল এলিমেন্ট আছে। ওরা করতে পারে না এমন কোনও কাজ নেই।

ঠিকই বলেছিস তুই, ও ব্যাপারটা দেখছি পরে, সিগারেটের অবশিষ্টাংশটি ছাইদানে গুঁজে নিভিয়ে দিতে দিতে বলল রণিদা, এখন একটু দেখা যাক আমাদের দারোগাবাবু তদন্তের কী অগ্রগতি ঘটালেন।

টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে ফোন করল ও।

হ্যালো রাতুল রায় বলছেন? আমি রণজয় চক্রবর্তী, প্রাইভেট ডিটেকটিভ বলছি।

ও-প্রান্ত থেকে কী উত্তর আসছে আন্দাজ করতে পারছিলাম।

শুনলাম রণিদা এদিক থেকে বলছে

কতটা প্রসিড করল কেসটা?… এসেছে? কী বলছে মেডিকেল রিপোর্ট?.. অ্যাঁ… ডেথ ডিউ টু অ্যাসফিক্সিয়া হুইচ ইজ অ্যান্টি-মর্টেম অ্যান্ড হোমিসাইডাল ইন নেচার… হ্যাঁ এটা তো মোটামুটি জানা ছিলই। আর চিঠিগুলি? ওগুলি এগজামিনেশনের জন্য পাঠাতে ডিসির ফরওয়ার্ডিং লাগবে?

হ্যাঁ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাঠান, কেননা রিপোর্ট আসতেও তো বেশ কিছুদিন লাগে… কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড রাইটিং কার নিলেন? আই সি… আই সি… আর, ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের কোনও খবর?… সে কী এখনও পাঠাননি?… পরে? আচ্ছা… না না নো প্রবলেম, রিপোর্ট পেতে কোনও অসুবিধা হলে বলবেন, ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমার বন্ধুভাগ্য ভালো… হ্যাঁ সিএফএসএল-এ আমার দুজন বন্ধু আছেন…. হ্যাঁ, ডা. কাশ্যপকে তেমন হলে ফোন করে দেব আমি… রিলেশন তো রাখতেই হয়, না হলে কাজের অসুবিধা… হ্যাঁ, বাই, ঠিক আছে, গুড… ছাড়ছি তা হলে, হ্যাঁ বাই।

ফোনে কথা বলা শেষ করে রণিদা আমার দিকে তাকাল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, কীরে যা শুনলি বুঝলি কিছু?

পাক্বা, তা না হলে তোমার সঙ্গে এতদিন রয়েছি? সমঝদার-কে লিয়ে ইশারাই কাফি হোতা হ্যায়, বললাম আমি। কিন্তু একটি জায়গায় খটকা থেকে গেল।

কোন জায়গায়?

পুলিশ অফিসার চিঠিগুলি কার সঙ্গে মেলাবার জন্য পাঠাচ্ছেন… মানে সাসপেক্ট কাকে করছেন?

কেন ঘনশ্যাম মণ্ডলের ভাই রাধেশ্যাম মণ্ডলকে।

উনি ফিরে এসেছেন?

এখনও না। তবে বাড়িতে ওর লেখা কিছু কাগজ পত্র ছিল, মিসেস মণ্ডল বের করে দিয়েছেন। ওগুলিকেই এর স্টান্ডার্ড রাইটিং হিসাবে পুলিশ সিজ করেছে।

তদন্ত জোর কদমে এগোচ্ছে তাহলে?

হ্যাঁ, এবার চল, একটু বেরোব, বলল, রণিদা।

কোথায় যাবে, বিবিডি বাগ?

রণিদার চোখে বিস্ময়। বলল, তুই কি আজকাল থট রিডিংও শিখছিস না কি?

পর্ব – ৭

ঘনশ্যামবাবুর অফিসে পৌঁছে রণিদা নিজের কার্ড দেখিয়ে ওনার ইমিডিয়েট বস মি. জে পূজারির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে মিনিট দুয়েকের মধ্যে ডাক এল।

শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কার্পেটে মোড়া ওয়েল ফার্নিশড চেম্বার মি. পূজারির। ঘরে ঢুকে সম্রম জাগল মানুষটিকে দেখে।

আসুন মি. চক্রবর্তী, প্লিজ টেক ইয়োর সিট।

থ্যাংক ইউ মি. পূজারি।

পূজারি বেল টিপলেন।

ঘরে উঁকি দিল বেয়ারা, সাব?

দো-কফি, সংক্ষিপ্ত আদেশ মি. পূজারির কণ্ঠে।

চলে গেল বেয়ারা।

হাঁ বোলিয়ে, মি. চক্রবর্তী, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ? কাল তো থানা থেকে এক অফিসার এসে অনেক কুছু জিজ্ঞাসাবাদ করে নিল।

রণিদা বলল, আমি আপনার বেশি সময় নেব না মি. পূজারি। দু’চারটে মাত্র প্রশ্ন।

হ্যাঁ, বোলিয়ে প্লিজ। কণ্ঠস্বরে ব্যস্ততা।

ঘনশ্যাম মণ্ডল কেমন মানুষ ছিলেন বলে মনে হয় আপনার?

উনি বেশ পুরোনো লোক। এই অফিসে আমি দশ-এগারো মাস হল ট্রান্সফার নিয়ে এসেছি। এ পর্যন্ত যা দেখেছি–কাজের ব্যাপারে উনি খুব কড়া ছিলেন, আ বিট পারফেকশনিস্ট ইউ ক্যান সে। যে-কোনও কাজ চোখ বন্ধ করে ওর ওপর ছেড়ে দেওয়া যেত। ইন ফ্যাক্ট, আয়াম ভেরি সরি টু নো দ্যাট উনি এভাবে খুন হলেন।

এ ব্যাপারে আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?

সন্দেহ? আমার? নো নো, একদম না।

ওনার কোনও রাইভাল ছিল এ অফিসে যে ওকে ঈর্ষা করত বলে মনে হয়?

একটু ভেবে মি. পূজারি বললেন, না, তেমন কিছু শুনিনি কোনও দিন।

এমন সময় দরজা ঠেলে বেয়ারা কফি নিয়ে ঢুকল।

খানিক নীরবতা।

পেয়ালা ও চামচের ছন্দিল টুংটাং। সেগুলি একে একে আমাদের দুজনের দিকে এগিয়ে দিল বেয়ারা।

মি. পূজারি বললেন, প্লিজ।

ধন্যবাদ দিয়ে কফিতে চুমুক দিলাম আমরা।

শুনলাম ওনার একটি প্রোমোশন ছিল সামনে? কোটার গ্রাউন্ডে উনি দুই সিনিয়ারকে সুপারসিড করে ওটা পাবার কথা ছিল। কথা বলা যাবে ওদের দুজনের সঙ্গে?

একটু ভাবলেন মি. পূজারি।

তারপর বললেন, আই সি, এ ব্যাপারটা মাথায় একদম ছিল না আমার। ঠিক আছে, এক্ষুনি ডেকে দিচ্ছি আমি ওদের।

ফের বেল টিপলেন ভদ্রলোক। বেয়ারা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল, উন্মুখ দৃষ্টি।

ওই মিত্তির আর দাশগুপ্তকে বলো, আমার ঘরে একবার আসতে, এক্ষুনি।

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, কিন্তু মি. চক্রবর্তী আমার মনে হয় না এর জন্য একজন মানুষ আর একজনকে খুন করতে পারে।

পারে মি. পূজারি, পারে। ক্ষেত্র বিশেষে সবই সম্ভব। কদিন আগে এই কলকাতার বুকেই মাত্র পাঁচশ টাকার বিনিময়ে একজন ভাড়াটে খুনি একটি নিরপরাধ মানুষকে খুন করেছে। ইয়েস, ওনলি ফর ফাইভ হানড্রেড রুপিজ, কেটে কেটে বলে রণিদা। ঘটনাটা কাগজে বেরিয়েছিল, খুব সম্ভব নিউজটা আপনি মিস করে গেছেন। মাই এক্সপিরিয়ন্স সেজ, এভরিথিং ইজ পসেবল।

রণিদার ধাতব কণ্ঠস্বরে আত্মপ্রত্যয়।

আই সি, একটু ঘাবড়ে গেলেন বলে মনে হল ভদ্রলোক।

গলায় এখন আর ব্যস্ততার সুর নেই। প্রথম দিকে রণিদাকে একটু আন্ডার এস্টিমেট করছিলেন বলে আমার মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন ওনার ধারণাটা সম্পূর্ণ উবে গেছে।

আ-স-ব স্যার?

দরজা ঠেলে মিনমিনে কণ্ঠস্বর যুক্ত একটি বছর পঞ্চাশেক বয়সের মুখ উঁকি মারল।

হ্যাঁ, প্লিজ কাম ইন। মি. পূজারির বোল্ড উত্তর।

ঘরে ঢুকলেন দুই ভদ্রলোক।

পূজারি বললেন, আসুন আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই–ইনি মি. রণজয় চক্রবর্তী, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ঘনশ্যাম মণ্ডলের মার্ডার কেসের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসেছেন। আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চান। আর মি. চক্রবর্তী, ইনি হলেন জনমেজয় মিত্তির, আওয়ার সিনিয়র অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আর ইনি নীলাক্ষি দাশগুপ্ত।

ওদের নমস্কারের উত্তরে প্রতি নমস্কার জানাল রণিদা।

জনমেজয় মিত্তির বললেন, কিন্তু দাদা, আমি মানে, ঘনশ্যামের খুনের ব্যাপারে…

আমতা আমতা করতে থাকেন ভদ্রলোক।

কিছুই জানেন না, তাই তো? রণিদা কথা সম্পূর্ণ করল।

ভদ্রলোক মাথা নাড়েন ইতিবাচক।

সেটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা একটি কথা বলুন মি. মিত্তির– ঘটনার দিন অর্থাৎ গত তেরোই ফেব্রুয়ারি ঘনশ্যামবাবু তো অফিসে এসেছিলেন, কি ঠিক বলছি?

হ্যাঁ, ঠিক বলছেন।

অর্থাৎ আপনিও এসেছিলেন?

ঠিক তাই।

কিন্তু ওই দিন সন্ধেবেলা অর্থাৎ অফিস ছুটির পর আপনি কোথায় গেছিলেন বলবেন কি?

আমি?… আমি… কেন বাড়ি চলে গেছিলাম সো-জা, উত্তর দেন জনমেজয়বাবু।

আপনার বাড়ি কোথায়?

আজ্ঞে শ্যামনগর, নর্থ চবিবশ পরগনা। হ্যাঁ মনে পড়েছে ওই দিন স্টেশনে নেমে যথারীতি স্টেশনের টি-স্টলে চা খেয়েছিলাম আমরা।

আমরা মানে?

আমি আর এক ডাক্তারবাবু, নীতিন পাকড়াশি। ট্রেন থেকে নামতেই দেখা হয়ে গিয়েছিল ওনার সঙ্গে। ডাক্তার মানুষ যখন তখন কাজে লাগে আমাদের। তাই চা খেতে আমন্ত্রণ জানাই ওনাকে।

ঠিক বলছেন?

প্রয়োজনে প্রমাণ দিতে পারি স্যার। ওনার ফোন নম্বর এখানেই আছে, মানে আমার অফিস ব্যাগে, দেব স্যার?

না থাক, ধন্যবাদ।

যা বোঝার দ্রুত বুঝে নেয় রণিদা। তারপর চোখ ফেরায় নীলাক্ষি দাশগুপ্তের দিকে।

হ্যাঁ, মি. দাশগুপ্ত, আপনাকে দু-একটি প্রশ্ন করতে পারি?

করুন, বেশ গম্ভীরস্বরে উত্তর দিলেন ভদ্রলোক।

মোটা চশমার কাচ, ভারী মুখ, মাঝারি উচ্চতার মানুষটি প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি মোটা। মাথার মাঝখানে বিস্তৃত টাক। চারিপাশ ঘিরে পাকা চুল অল্পবিস্তর।

দেখলেই মনে হয় বেশ ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক মানুষটি।

আপনার চাকরি কতদিন হল মি. দাশগুপ্ত?

সামনের জানুয়ারিতে রিটায়ার করব, খুব সংক্ষিপ্ত এবং মাপা জবাব এল।

আপনার তো সামনেই একটি প্রোমোশন আছে, তাই না?

হতো না, হয়তো এবার হয়ে যাবে।

কেন?

উত্তরটা আপনি জানেন, গলায় শীতল উষ্মা।

দাশগুপ্তর কাটা কাটা উত্তর আমার মোটেও ভালো লাগল না, অভদ্রজনক বলে মনে হল। দেখলাম, রণিদা স্থির দৃষ্টিতে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে।

মি. পূজারি বললেন, উঁহু, ডোন্ট বিট অ্যাবউট দ্য বুশ। প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিন দাশগুপ্ত।

ওকে, ওকে, রণিদা হাত তুলে মি. পূজারিকে আশ্বস্ত করে। তারপর বলে, দেখুন মি. দাশগুপ্ত, ভুল বুঝবেন না, একচুয়ালি উই নিড ইয়োর কোঅপারেশন।

আপনি যদি আমাদের সন্দেহই না করতেন তা হলে এই গোটা অফিসে এত লোক থাকতে কেবল আমাকে আর মিত্তিরকেই ডেকে পাঠাতেন না, গলায় ঝাঁজ স্পষ্ট হল।

এ ধরনের ঋজু ও কঠিন মনোভাবাপন্ন মানুষদের জেরা করবার অভিজ্ঞতা নতুন নয়, ওকে তো চিনি। এসব চরিত্রের মানুষকে কীভাবে ট্যাকল করতে হয় সেটা ও ভালো ভাবেই জানে। তবে এই ব্যক্তিটিকে একটু বেশি ট্যারা বলে মনে হচ্ছে।

ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। জল কোন দিকে গড়ায়।

রণিদা একটু থেমে সরাসরি ভদ্রলোকের চোখের দিকে চেয়ে বলল, তা হলে সেই কমন প্রশ্নটা করেই ফেলি, কী বলেন?

করুন।

ঘটনার দিন সন্ধেবেলাটা আপনি কীভাবে কাটিয়েছিলেন দয়া করে যদি একটু বলেন।

আউট্রাম ঘাটে হাওয়া খেয়ে, জবাব দিলেন মি. দাশগুপ্ত।

বুঝতে পারলাম, উনি বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করতে চান না।

নিশ্চয়ই একা?

অবশ্যই।

গুড, এটা কি আপনার রোজকার অভ্যাস?

না, সে দিন কী মনে হতে গেছিলাম একটু।

তারপর, হাওয়া খেয়ে ফিরলেন কটায়?

রাত সাড়ে আটটা-পৌনে ন’টা নাগাদ। দেখুন মি. চক্রবর্তী, ভদ্রলোক এবার উত্তেজনায় বুঝি ফেটেই পড়লেন, আপনি যদি ভেবে থাকেন, চাকরির শেষ প্রান্তে এসে একটি প্রামোশনের লোভে আমার সহকর্মীকে আমি খুন করব, তা হলে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি আমার সম্বন্ধে নিতান্তই ভুল ভাবছেন।

রণিদা সম্ভবত এই মুহূর্তটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিল যে কখন ভদ্রলোক ব্রেক করেন।

মিনিট খানেক নীরবতা।

রণিদার শাণিত দৃষ্টি ভদ্রলোকের চোখে।

আচমকা ও উঠে দাঁড়ায়, তারপর বলে, মি. দাশগুপ্ত, আপনার মতন মানুষদের মুখোমুখি আমি এর আগেও হয়েছি। আমি জানি আপনি একজন সৎ ও নির্দোষ মানুষ। আপনাদের মতন আবেগপ্রবণ মানুষেরা আর যাই করুক এতটা হীন কাজ করতে পারে না। আপনার ভুল কেবল এটাই হয়েছে যে প্রথম থেকেই আপনি ধরে নিয়েছেন আমি আপনাকে খুনি ভেবেছি।

একটু থেমে রণিদা ফের বলতে শুরু করে, যতদূর শুনেছি, আপনি ঘনশ্যামবাবুর একদম পাশের টেবিলেই বসতেন, ওই দিন ওনার মধ্যে বিশেষ কোনও আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন কি?

বিশেষ কোনও আচরণ? না, ঠিক সে রকম তো, কণ্ঠস্বর এবার বেশ নরম দাশগুপ্তবাবুর।

আমি একটি কথা বলব স্যার? মিনমিনে কণ্ঠস্বর।

সরু করে গোঁফ ছাঁটা, চাপা গাল, ময়লা রং, রোগাটে শরীরের জনমেজয় মিত্তিরকে দেখে কেন জানি না আমার যাত্রাদলের একস্ট্রার কথা মনে পড়ল।

আমরা উপস্থিত সকলেই আগ্রহ নিয়ে তাকালাম জনমেজয় মিত্তিরের দিকে।

হ্যাঁ, প্লিজ জবাব দিল রণিদা।

আমি মণ্ডলের ঠিক অপোজিট টেবিলে বসি, মানে বসতাম আর কী। একটি কমন ফোন আমার টেবিলে থাকে। যতদূর মনে পড়ছে ওই দিন বিকাল বিকাল নাগাদ একটি ফোন এসেছিল মণ্ডলের।

ফোন? সেটাই স্বাভাবিক, ওই প্রশ্নে আমি যেতাম শিগগিরই, যাই হোক বলুন, বলল রণিদা।

হ্যাঁ ফোনটা আমিই তুলেছিলাম। মণ্ডলকে চাইতে ওকে ডেকে ফোনটা দিলাম।

ঠিক ক’টা নাগাদ ফোনটা এসেছিল বলতে পারেন?

যদ্দূর মনে পড়ছে পাঁচটা নাগাদ।

আচ্ছা এক মিনিট, কণ্ঠস্বরটা কি আপনার চেনা? মানে ওই কণ্ঠস্বরযুক্ত ব্যক্তিটি আগে কখনও ফোন করেছিল কি না বলতে পারবেন?

ঠিক বলতে পারছি না।

কোনও কথোপকথন ওভারহিয়ার করেছিলেন?

না, ঠিক ওই সময়েই আমাকে টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে হয়েছিল। তবে যতদূর মনে হয় ওর কোনও পরিচিতজনই ফোনটা করেছিল। তা ছাড়া–

তা ছাড়া কী?

তা ছাড়া মণ্ডল বরাবরই একটু চাপা স্বভাবের। কথা বলত কম। টেলিফোনে কথাবার্তার সময় কেবল হ্যাঁ, হুঁ ইত্যাদির মধ্যেই বেশিরভাগ সীমাবদ্ধ থাকত ওর দিককার কথা।

ফোনটা রিসিভ করবার পর কী ঘটেছিল বলতে পারেন? প্রশ্ন করে রণিদা।

মিনিট দশেক পর আমি টেবিলে ফিরে এসেছিলাম। এসে শুনি কী একটি আর্জেন্ট কাজে ও একটু আগে আগেই বেরিয়ে গেছে অফিস থেকে।

সাংকেতিক ভাষায় রণিদা কীসব অনবরত নোট নিচ্ছিল, এটা ওর বরাবরের স্বভাব।

তারপর বলল, আচ্ছা মি. মণ্ডলের ফাইনানসিয়াল কনডিশন কেমন ছিল বলতে পারেন?

প্রশ্নটা ছিল মি. পূজারির উদ্দেশ্যে।

হামি যতদূর জানে ভালোই ছিল, কি মিত্তির? উনি সঠিক বলতে পারবেন, জবাব দিলেন ভদ্রলোক।

বরাবরই মণ্ডল ছিল একটু সঞ্চয়ী। কৃপণ বলে অফিসে বন্ধুবান্ধবেরা প্রায়ই টোন কাটত। ইনকাম ট্যাক্সের জন্য প্রয়োজনীয় জমার থেকে বেশি টাকাই জমাতো ও। আর্থিক অসুবিধা কিছু ছিল বলে তো…

হঠাৎ কী যেন মনে পড়ায় ভদ্রলোক থেমে গেলেন।

কী ব্যাপার? বিশেষ কিছু মনে পড়ছে কি? রণিদার দৃষ্টিতে আগ্রহ বাড়ে। বাকিরাও উৎসাহিত।

হ্যাঁ একটি ব্যাপার কিন্তু আমার খুব আশ্চর্যের বলে মনে হয়েছে স্যার, জনমেজয় মিত্তির বলেন।

কোন ব্যাপারটা?

মণ্ডলের মতন একজন সঞ্চয়ী মানুষ আচমকা প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে তিন লাখ টাকা একবারে তুলে নিল!

এতে আশ্চর্যের কী আছে? যার টাকা সে তুলবে তার প্রয়োজনে এটাই স্বাভাবিক, মি. পূজারি বললেন।

টাকাটা উনি কবে তুলেছিলেন বলতে পারেন? রণিদা প্রশ্ন করে উৎসাহ ভরে।

একটু ভেবে মিত্তির বললেন যতদূর মনে পড়ছে এই মাস আটেক আগে, হ্যাঁ, ওই রকমই হবে।

আট মাস, অর্থাৎ লাস্ট জুলাইতে, ঠিক বলছি?

রেজিস্টার দেখে এগজ্যাক্ট ডেট বলে দিতে পারব, তবে জুলাইতেই, এ আমি নিশ্চিত স্যার।

আচ্ছা, টাকাটা তোলার জন্য উনি কী গ্রাউন্ড উল্লেখ করেছিলেন বলতে পারেন?

ওয়াইফস মেডিকেল ট্রিটমেন্ট, একটুও না ভেবেই এবার উত্তর দিলেন ভদ্রলোক।

সকল প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দ্রুত নিজস্ব কোড ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা বোধহয় সম্পূর্ণ হল। কারণ এরপর আচমকাই রণিদা বলে উঠল, অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাদের সকলকে। থ্যাংক ইউ ফর ইয়োর কর্ডিয়াল কোঅপারেশন। আশা করছি খুব শিগগিরই এই রহস্যের জট খুলে যাবে। আপনাদের প্রিয় সহকর্মীর হত্যাকারীকে কয়েকদিনের মধ্যেই আমি ধরে ফেলতে পারব। আজ আমরা আসি, বাই।

আমরা উঠে পড়লাম।

বাই, বলে, হ্যান্ডশেক করলেন মি. পূজারি।

একে একে জনমেজয় মিত্তির এবং নীলাক্ষি দাশগুপ্তের সঙ্গেও হাসিমুখে করমর্দন করে অফিস ছেড়ে গাড়িতে এসে বসলাম আমরা।

রহস্য বাঁক নিচ্ছে রঞ্জন, কিছু আন্দাজ করছিস? কেসটা জটিল হচ্ছে ক্রমশ, রণিদা বলে।

চলন্ত গাড়িতে এক আকাট মূর্খের মতন চেয়ে রইলাম রণিদার দিকে, কিছু মাথায় এল না। দেখলাম ওর চোখে মুখে আর এক রহস্য খেলা করছে।

ক্রমশ…

রহস্য ধারাবাহিকঃ মার্ডার ইন ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় অধ্যায়)

পর্ব – ৩

ঘটনার তিন দিন পর রণিদা মোবাইলে জানাল, আজ বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমার বাড়ি চলে আসিস, তোকে নিয়ে বেরোব একটু।

কোথায় যাবে রণিদা?

কেন তদন্তে, ওদিকটা এই ক’দিনে কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে নিশ্চয়ই, জবাব দিল ও।

তা হলে কি আমরা মণ্ডলবাবুর বাড়িই যাচ্ছি প্রথমে?

উঁহু, হল না। ঠিক প্রথমেই নয়, ভাবছি যাব একটু ঘুর পথে। প্রথমে আমরা যাব সুবিমল সোমের বাড়ি। তুই আয়, তারপর কথা হবে।

এক মিনিট রণিদা, ঢোলগোবিন্দবাবুকেও নিচ্ছো নিশ্চয়ই? তা না হলে উনি আবার আগের মতন বলবেন, আরে ভায়া, তোমরা আমাকে অর্ধেক জায়গায় নিয়েই যাও না, আমি আর কী তোমাদের ইনভেস্টিগেশনে সাহায্য করব? মনে আছে তোমার, সেইবার কিরিবুরুর গুহাদানবের কেস-এ?

তা যা বলেছিস, রণিদার গলায় মজা টের পেলাম, তা হলে ওনাকেও আসতে বলছি বিকালে।

সোয়া পাঁচটা নাগাদ গাড়ি ছাড়ল আমাদের।

ঠাকুরপুকুর থেকে দুই নম্বর চেতলা হাট রোড পৌঁছোতে মিনিট পঁচিশেক লাগাল।

বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হল না। পাশেই একটা ক্লাব– চেতলা যুব সংঘ। ক্লাবের সামনে ছেলেদের জটলা। জিজ্ঞাসা করতেই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল সুবিমল সোমের বাড়িখানা।

ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন, কলকাতার এই একটা বিষয় লক্ষ্য করবার মতন। মানুষকে ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে ধৈর্য ধরে শুনবে, তারপর সঠিক জায়গা দেখিয়ে দেবে। প্রয়োজনে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করে হলেও তোমাকে সাহায্য করবে। রাস্তার ঘোরপ্যাঁচ থাকলে অনেককে দেখেছি নিজে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিয়ে আসে। কিন্তু দিল্লি বা মুম্বইতে কাউকে ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে দেখবে ওরা ধরাবাঁধা তিনটে কথাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে।

কী বলে ওরা? আগ্রহ বাড়ে আমার। দেখলাম রণিদার চোখে মুখেও জানবার ইচ্ছা।

ব্যাটারা হয় বলে, মুঝে মালুম নেহী, না হয় বলে, মুঝে পাতা নেহী, আর একটু বেশি চালাক হলে বলে, পুঁছকর বাতায়েঙ্গে। হতভাগারা কবে কাকে পুঁছবে, আর চলমান পথিককে কবে কীভাবে বাতাবে কে জানে?

গাড়ি থেকে নেমে এসে রাস্তার ওপর একটা দোতলা বাড়ির দরজার গায়ে লাগানো কলিং বেল টিপলাম আমি।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর স্লিপারের চটাস চটাস শব্দ সিঁড়ি ভেঙে নেমে এল নীচে। মনে হল দরজার আই-হোল দিয়ে কেউ চেনার চেষ্টা করছে আমাদের। একটা কণ্ঠস্বর জেগে উঠল, কে-এ-এ?

মি. সুবিমল সোম আছেন? আমরা ওনার পরিচিত।

দরজা খুলে গেল। আমাদের সামনে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন, আপনারা কোত্থেকে আসছেন?

ঠাকুরপুকুর থেকে, রণিদাই জবাব দিল, ওনাকে একটু বলুন, রণজয় চক্রবর্তী দেখা করতে এসেছেন।

ভদ্রলোক আমাদের তিনজনকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলেন, তারপর বললেন, একটু দাঁড়ান।

দরজা আধ-খোলা অবস্থায় রেখে উনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেলেন।

মিনিটখানেকের পর ওই পথে নেমে এলেন সুবিমল সোম। বললেন, কিছু মনে করবেন না। দাদা ঠিক আপনাদের চিনতে পারেননি। আসুন, আসুন আপনারা।

পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি হাতে জ্বলন্ত সিগারেট–সুবিমল সোমকে অনুসরণ করে দোতালায় একটি বেশ বড়োসড়ো ড্রয়িং-রুমে পৌঁছোলাম আমরা।

বসুন আপনারা, আমি এক্ষুনি আসছি, ভদ্রলোক ভেতরে গেলেন।

আমরা সোফায় বসলাম। টেবিল, চেয়ার, দেয়ালের গায়ে কাঠের আলমারি, টিভি ট্রলিতে টিভি– যেখানে যেমনটি দরকার একদম সাজানো। একদিকের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ও সুভাষচন্দ্র। ঠিক তার উল্টোদিকের দেয়ালের জানলার পাশে গত বছরের একটি বাংলা ক্যালেন্ডার।

একবার রণিদার দিকে তাকালাম, দেখলাম স্বভাববশত ওরও চোখ ঘুরছে। ঢোলগোবিন্দবাবুর ভাবটা এমন, যেন দারুণ কোনও রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন উনি।

মিনিট দুয়েক পর সুবিমল সোম ফিরে এলেন ঘরে। আর ঠিক তার পিছন পিছন ট্রেতে কাচের গেলাসে জল নিয়ে বেয়ারা।

আমরা প্রত্যেকে একটি করে গেলাস তুলে নিলাম। সেন্টার টেবিলে ট্রে নামিয়ে রেখে ফিরে গেল বেয়ারা।

সুবিমলবাবু ওকে বললেন, রামু চা-টা একটু দেখ।

রণিদা বলল, আপনি ও নিয়ে ব্যস্ত হবেন না প্লিজ।

কেসটা তা হলে আপনি নিলেন? হেসে বললেন ভদ্রলোক।

নিলাম। একরকম বাধ্য হয়েই বলতে পারেন, জবাব দিল রণিদা, কেমন একটি অপরাধবোধ জাগছে ভেতর থেকে।

কিন্তু এ রকম একটি অবস্থায় আপনাকে পেমেন্টটা কে করবে বুঝতে পারছি না, মানে ঘনশ্যাম তো আর বেঁচে নেই।

ও নিয়ে আপনি ভাববেন না সুবিমলবাবু। ঈশ্বরের আশীর্বাদে টাকা-পয়সার খুব একটি টানাটানি আমার নেই। তদন্তটা আমার নেশা, পেশা নয়। আপনি ঘনশ্যামবাবুর বন্ধু, খুব কাছেরই বন্ধু সম্ভবত। অনুগ্রহপূর্বক এই কেসে আমাকে যদি একটু সহযোগিতা করেন তো উপকার হয়।

অবশ্যই, অবশ্যই। আমি আমার সাধ্যমতন আপনাকে সব ব্যাপারে সহযোগিতা করব। বলুন কী জানতে চান?

ঘনশ্যামবাবুকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?

একচুয়ালি ঘনা, আমি আর কমলেশ স্কুল বয়সের বন্ধু, ওর এভাবে চলে যাওয়াটা বরদাস্ত করা কঠিন।

আপনি নিশ্চয়ই চান ঘনশ্যাম মণ্ডলের খুনি ধরা পড়ুক?

অতি অবশ্যই, বেশ জোর দিয়ে বলেন ভদ্রলোক।

তা হলে দয়া করে আমার প্রশ্নগুলির ঠিক ঠিক জবাব দিন। কোনও তথ্য তা যতই অপ্রিয় হোক, লুকোবার চেষ্টা করবেন না।

না, না লুকোব কেন? বলুন না কী জানতে চান?

কেমন মানুষ ছিলেন ঘনশ্যামবাবু?

মানুষ হিসাবে তো ভালোই, তা নাহলে এতকাল আর বন্ধুত্ব টিকে থাকবেই বা কেন? তবে…

তবে কী?

দেখুন ও আজ আমাদের মধ্যে নেই, এসব কথা বলা এখন ঠিক হবে?

সব রকম আবেগের ঊর্দ্ধে দাঁড়িয়ে বিচার-বিবেচনা করার সময় এখন, কণ্ঠস্বর দৃঢ় শোনায় রণিদার।।

টাকা-পয়সার প্রতি ওর আকর্ষণ একটু বেশি ছিল, মৃদুস্বরে বলেন ভদ্রলোক।

এ কথা কেন বলছেন?

এমন সময় বেয়ারা চা আর কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে ঘরে ঢুকল এবং সেন্টার টেবিলে রাখল।

নিন, চা নিন, বললেন সুবিমলবাবু।

আমরা প্রত্যেকেই কাপ প্লেট তুলে নিলাম হাতে। ঢোলগোবিন্দবাবুকে বেশ উৎফুল্ল দেখাল। উনি চায়ের পাশাপাশি

টা-য়ের দিকেও হাত বাড়ালেন।

চা খেতে খেতে সুবিমলবাবু জবাব দিলেন, বরাবরই এ কথাটা মনে হয়েছে আমার।

কিন্তু কেন? দেয়ার মাস্ট বি সাম রিজন?

সব সময়ই ও চাইত চাকরি ছাড়াও অন্য কোনওভাবে যদি ইনকাম আরও কিছুটা বাড়ানো যায়।

সৎ বা অসৎ– যে কোনও উপায়েই, তাই তো?

না, না অসৎ কোনও পথে ও কোনওদিন সে চেষ্টা করেছে বলে আমি শুনিনি, জবাব দিলেন সুবিমলবাবু।

দেখুন একজন মানুষ তার আর্থিক উন্নতির চেষ্টা করবেন, গুড থেকে বেটার পজিশনে যেতে চাইবেন–ব্যাপারটা কি খুব দোষের?

দোষের কথা বলছি না, বলছি যে টাকার প্রতি ওর আসক্তিটা একটু বেশি বলেই চিরদিন মনে হয়েছে আমার।

আপনি কী করেন? ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গ পালটায় রণিদা।

তেমন কিছু না। আপনাকে বলেছি বোধ হয়, ব্যাংকে চাকরি করতাম। শরীর পারমিট করল না। ভিআরএস. নিলাম। নীচে দুটো দোকান আছে। একটি ভাড়া দিয়েছি। অন্যটা নিজেই চালাই। একটি ছেলে আছে দেখভালের জন্য। সময় কেটে যায়–এই আর কী।

ছেলেমেয়ে ?

মেয়ে নেই, ছেলে একটিই। খড়্গপুর আইআইটি-তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

বড্ড সিগারেট খান আপনি।

ওই একটি জায়গায় আমাদের তিন বন্ধুতে ভীষণ মিল।

কিন্তু ঘনশ্যামবাবুকে তো সেদিন আমাদের বাড়ি সিগারেট খেতে দেখলাম না?

বোধহয় খুব ঘাবড়ে গেছিল। ওকে তো বছর দুয়েক আগে ডাক্তার স্মোকিং পুরোপুরি ছেড়ে দিতে বলেছিল। ডাক্তারের ধমকে কাজও হয়েছিল। হপ্তাখানেক বন্ধ ছিল কিন্তু তারপর আচমকাই ফের স্মোকিং ধরেছিল দ্বিগুন উৎসাহে। আমি আর কমলেশ অবশ্য মাঝে কোনও গ্যাপ দিইনি, হেসে বলে ভদ্রলোক।

সেদিন ঘনশ্যামবাবুর ভায়ের নামটা জানা হয়নি।

রাধেশ্যাম মণ্ডল।

উনি এখন কোথায় ?

বলতে পারব না। মাঝে মধ্যেই উধাও হয়ে যায়। ফিরে আসে আবার। এবার দুই ভাইয়ে সম্পত্তির ভাগ নিয়ে নাকি তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। যাবার আগে শাসিয়েছিল দাদাকে, দেখে নেবে বলে।

রোজগারপাতি?

সে ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানি না। ওদের বাবা বেঁচে থাকতে ওনার কাছ থেকেই টাকাপয়সা কিছু কিছু নিত। তা নিয়ে অশান্তির শেষ না ছিল বাড়িতে। নেশা-ভাঙ করত। পাড়ার রেপুটেশনও ভালো নয়।

গুন্ডা-মাস্তানি করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার মারধোর খেয়েছে বলে শুনেছি। পুলিশের খাতায় নাম আছে কিনা বলতে পারব না।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, বলল রণিদা, আপনার বন্ধু কমলেশ লোকটি কেমন?

কেন, ভালোই। ও খুব খেতে ভালোবাসে জানেন? আর লোকজনকে খাওয়াতেও ভালোবাসে। চেহারাখানা দেখেছেন তো!

কী করেন ভদ্রলোক?

ব্যবসা।

কীসের ব্যবসা?

জমির দালালি, গাড়ির দালালি, প্রমোটিং ইত্যাদি। তাছাড়া ওর একটি স্টেডি ইনকাম আছে বাড়ি ভাড়া থেকে।

বাঃ, তাহলে তো ভদ্রলোক বেশ সলভেন্ট বলতে হয়।

তা বলতে পারেন। তা ছাড়া ও খুব শৌখিন, বিশেষ করে গাড়ির ব্যাপারে।

তার মানে?

ওর একটি বদ খেয়াল হল কোনও গাড়িই ও বেশিদিন চড়ে না। বড়ো জোর ছমাস। তারপর ওটা বেচে আর একটি কেনে।

ইন্টারেস্টিং, এতক্ষণে মুখ খুললেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

আমারও সে রকমই মনে হচ্ছে, বলল রণিদা, ঠিক আছে আজকের মতন আমরা আসি। হয়তো তদন্তের স্বার্থে আপনার কাছে আবার আসতে হতে পরে।

স্বচ্ছন্দে, হেসে জবাব দিলেন সুবিমলবাবু।

উঠে আসতে আসতে রণিদা হঠাৎ ফিরে বলল, আর একটি কথা সুবিমলবাবু–

হ্যাঁ বলুন।

আপনাদের তিন বন্ধুতে কখনও কোনও মনোমালিন্য হয়নি? বিশেষ করে ঘনশ্যামবাবুর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে। ভেবে বলুন।

খানিকক্ষণ চুপচাপ থেকে উনি বললেন, এত দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি, মান-অভিমান, কিংবা কথা কাটাকাটি হয়ে থাকতেই পারে। তবে সে সবের ঊর্দ্ধে আমরা পরস্পরের বন্ধুই ছিলাম বরাবর। তবে…

কী একটি কথা মনে পড়ায় ভদ্রলোক একটু থেমে যান।

রণিদার দৃষ্টি তীক্ষ্ন হল, তবে কী সুবিমলবাবু?

হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়ছে–আপনাদের বাড়িতে যেদিন প্রথম–আমরা দেখা করতে যাই কেসটা নিয়ে তার ঠিক দিন দুই পর, কোনও বিশেষ কারণে ঘনশ্যামের সঙ্গে কমলেশের কী নিয়ে যেন একটু তর্কাতর্কি শুনেছিলাম। মনে পড়ছে। আমি এসে পড়ায় ওরা হঠাৎ থেমে গেছিল। মনে হয়েছিল, বিষয়টা এমন কিছু যা ওরা আমাকে জানতে দিতে চায় না। আমিও আর উৎসাহ দেখাইনি ও নিয়ে।

ওদের কথাবার্তার কোনও সংলাপ মনে করতে পারেন? বিষয়টা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রণিদার কথায় সুবিমলবাবু বেশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন বলে মনে হল।

খানিক চিন্তা করে বললেন, যতদূর মনে পড়ে, ঘনা সামান্য উত্তেজিত কণ্ঠে বলছিল, ‘চুক্তি অনুসারে ওর অর্ধেক আমার।’

‘অর্ধেক আমার!’ রণিদা বিড়বিড় করে বলে কথাগুলি। তারপর প্রশ্ন করে, আর কিছু?

নাহ্, আর কিছু আমি শুনিনি।

ওকে, থ্যাংক ইয়ু ফর ইয়োর কাইন্ড অ্যাসিসটেন্স। একটি অনুরোধ, আপনার সঙ্গে যা কথাবার্তা হল গোপন রাখবেন। অন্তত মৃত বন্ধুর মঙ্গলের কথা চিন্তা করে। বাই, আবার দেখা হবে।

আমরা উঠে পড়লাম।

বাই, চলুন আপনাদের এগিয়ে দিই, বলে সুবিমলবাবু আমাদের সঙ্গে উঠে এলেন।

সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম আমরা। দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানালেন ভদ্রলোক।

রাস্তা ক্রস করে ওপারে রাখা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।

রণিদা বলল, এবার কমলেশবাবুর বাড়ি যেতে হবে।

পর্ব – ৪

গাড়ি স্টার্ট দিতেই রণিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কমলেশ খাস্তগীরের বাড়িটা কোথায়?

ফিফটি সিক্স প্রতাপাদিত্য রোড।

তাহলে তো কাছেই।

হ্যাঁ, আর ভিক্টিম ঘনশ্যাম মণ্ডলের বাড়িটা কোথায় জানিস নিশ্চয়?

কী করে জানব? সেদিন কার্ডখানা একবার দেখে নিয়েই তো নিজের পকেটে ফেললে।

রণিদা একটু হেসে বলল, তাই বুঝি? কিন্তু গোয়েন্দার সঙ্গে তার সহকর্মীদেরও সিক্সথ সেন্স থাকে বলে কোথায় যেন পড়েছিলাম।

আমি বললাম, তা হলে সেই সিক্সথ সেন্স এর নির্দেশ মতন বলছি, ঘনশ্যাম মণ্ডলের বাড়ি এই…

কালিঘাট এলাকাতেই, কথাটা আমার মুখ থেকে কেড়ে সম্পূর্ণ করলেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

এই তো চাই, সোৎসাহে বলে উঠল রণিদা, কিন্তু এবার কথা থামানো যাক, কারণ মনে হচ্ছে আমরা প্রতাপাদিত্য রোডের ফিফটি সিক্স… ফি-ফ-টি… সিক্স–হ্যাঁ পেয়ে গেছি।।

গাড়ি থামিয়ে রাস্তার এক পাশে পার্ক করল রণিদা।

আমি আর ঢোলগোবিন্দবাবু গাড়ি থেকে নেমে ওকে অনুসরণ করলাম। এলাকাটা বেশ শান্ত মনে হল। কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হল না। রাস্তার ওপর বিশাল বাড়ি। বাড়ির গায়ে নম্বর লেখা।

আজ ঢোলগোবিন্দবাবুর মাথায় চমৎকার একটি সাহেবে গলফ হ্যাট। সেটা খানিকটা নীচু করে নিলেন উনি ডান হাতে। তারপর গটমট করে হেঁটে এগিয়ে গেলেন এবং বাড়ির নাম্বার মিলিয়ে সর্বাগ্রে উনিই কলিং বেল পুশ করলেন।

কক-কক-কক-কক-কক-কক, মুরগি ডেকে উঠল ঘরের ভিতরে। স্পষ্ট কানে এল আমাদের।

দরজা খুললেন স্বয়ং কমলেশ খাস্তগীর। পরনে সাদা

পাজামা-পাঞ্জাবি, হাতে মোবাইল।

আমাদের দেখে মুহূর্তে ক্ষণিকের জন্য ভ্রূজোড়া কুঞ্চিত হয়েই স্বাভাবিক হল ফের। আনন্দে ফেটে পড়লেন ভদ্রলোক, আরে আসুন, আসুন স্যার। কী সৗভাগ্য আমার। গরিবের কুটিরে পদধূলি দিন।

কমলেশবাবুকে নমস্কার জানিয়ে ওনার পিছু পিছু এগিয়ে গেলাম আমরা।

গ্রাউন্ড ফ্লোরেই বসার ঘরে উনি নিয়ে গেলেন আমাদের। তারপর হাতের ইঙ্গিতে বসতে বললেন।

আমরা ধন্যবাদ জানিয়ে বসতেই কণ্ঠস্বরে উচ্চতা বাড়ল ওনার, এই কে আছিস…

যেমন বপু তেমনই আওয়াজ। প্রায় দৌড়ে এল এক চাকর, বাবু ডাকছেন?

হ্যাঁ গিন্নিমাকে গিয়ে বল, বাবুর কয়েকজন বন্ধু এসেছেন।

কমলেশবাবুর চোখের ইঙ্গিতে অভিজ্ঞ চাকরের সম্ভবত বুঝে নিতে দেরি হল না, ক’জন এসেছে সেটা দেখে যেতে। চাকরটি দ্রুত ভেতরে চলে গেল।

ভদ্রলোক আমাদের সামনের সোফায় বসলেন। তারপর কী মনে হতে উঠে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার টেনে একটি ক্ল্যাসিকের প্যাকেট ম্যাচ সহ এগিয়ে দিলেন রণিদার দিকে। মুখে বললেন, প্লিজ।

থ্যাংকস জানিয়ে রণিদা ও দুটো হাতে তুলে নিল। সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, আপনার বুঝি এ ব্র্যান্ড চলে না?

নাহ্, চারমিনারের নেশা আমার ছোটোবেলার। ভদ্রলোকে নিজের প্যাকেট থেকে একটি জ্বালালেন।

রণিদা সিগারেট প্যাকেট আর ম্যাচটা আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে ওনাকে প্রশ্ন করল, ছোটোবেলার মানে?

মানে ওই স্কুলে পড়ার সময়, যে-বয়সে লুকিয়ে সিগারেট ফুঁকে নিজেকে খানিকটা বড়ো বড়ো লাগে আর কী। তখন হ্যাঁ, নাইন-টেন-এ পড়ি বোধহয়। পরে আর ছাড়তে পারলাম না। বলে না, প্রথম প্রেম, ভোলা কঠিন।

ভদ্রলোকের ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি দেখতে পেলাম। বেশ ভালো লাগল মানুষটিকে। রসিক লোক মনে হচ্ছে।

গোটা ঘরে চোখ বুলিয়ে সে ধারণা আরও দৃঢ় হল। ঘরের আসবাব থেকে শুরু করে, দেয়ালের পেইন্টিংস, মূর্তি, ফ্লাওয়ার ভাস, মেঝেয় পাতা গালিচা, জানলার পর্দা– সব কিছুতেই বৈভব এবং রুচির সুপরিকল্পিত, সুচিন্তিত ভাবনার প্রকাশ।

শুনতে পেলাম ভদ্রলোক বলছেন, বলুন মি. চক্রবর্তী এই অধম আপনার কী সেবা করতে পারে?

প্লিজ ওভাবে বলবেন না, রণিদা বলল, আমি এসেছিলাম আপনার বন্ধুর মৃত্যুর তদন্তে সামান্য সাহায্য প্রার্থী হয়ে।

আপনি নিঃসঙ্কোচে যে-কোনও প্রশ্ন করতে পারেন আমায়। ঘনশ্যামের কেসটা আপনি নিয়েছেন দেখে আমি কী বলব আপনাকে–দারুণ, দারুণ খুশি হয়েছি। আমি চাই আমার বাল্যবন্ধুর হত্যাকারী ধরা পড়ুক।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমার প্রথম প্রশ্ন আপনার বন্ধু ঘনশ্যাম মণ্ডল কেমন মানুষ ছিলেন? কোনও বদ নেশা-টেশা? কিছু মাইন্ড করবেন না প্লিজ।

না, না ওসব কোনও বদ গুণ ওর ছিল না। ছেলেবেলা থেকে দেখছি তো। চা-সিগারেট ছাড়া কোনও দিন অন্য কোনও নেশা ও করেনি। আমি তো মশাই ওকে এই নিয়ে কত ঠাট্টা-ইয়ার্কি করেছি। আমার আবার একটু, হাতের ভঙ্গিতে বিশেষ কিছু বোঝান ভদ্রলোক, ইয়ে-টিয়ে চলে আর কী, বুঝলেন কিনা?

রণিদা,ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, বলুন দেখি, ওর এমন কে শত্রু থাকতে পারে যে কোনও কিছুর জন্য ওকে খুন পর্যন্ত করতে পারে?

কমলেশ খাস্তগীর একটু চুপ করে কিছু ভাবলেন মনে হল। তারপর বললেন, দেখুন যে-কোনও মার্ডারের পিছনেই একটি মোটিভ থাকে। কারও কিছু গেইনের ব্যাপার-স্যাপার থাকে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে প্রাথমিক সন্দেহ আসে রাধেশ্যামের প্রতি, অর্থাৎ ঘনশ্যামের ভায়ের প্রতি। কারণ ঘনশ্যামের মৃত্যু হলে ওর পথের কাঁটা নির্মূল হল। শতকরা সত্তর ভাগ না হোক, পঞ্চাশ ভাগ পেতে অন্তত আর কোনও বাধা রইল না।

হু-ম্, রণিদাকে চিন্তিত দেখাল, তা ঠিকই, কিন্তু…

কিন্তু কী রণজয়বাবু?

বলছিলাম, একবার ওর সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারলে ভালো হতো।

ওকে আপনি কোথায় পাবেন এখন, ও তো নিরুদ্দেশ। মাঝে মাঝে ডুব মারা ওর চিরকেলে অভ্যাস, কম দিন দেখছি। ব্যাটা পাক্বা রাউডি একটি।

আপনার দেখছি ওর প্রতি বেশ রাগ আছে মনে হচ্ছে? সামান্য হেসে বলল রণিদা।

আর বলবেন না দাদা, এই সেদিন, পাড়ার কিছু ছেলে নিয়ে এসে ও কিনা আমাকে চমকাচ্ছে।

সে কী! কেন? ঢোলগোবিন্দবাবু দারুণ বিস্মিত। আমার ও রণিদারও অবাক লাগল ব্যাপারটা।

ওই একটি বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে আমার কাছে পার্সেন্টেজ খেতে চায়।

বলেন কী?

ভাবুন একবার, চোখ উঁচিয়ে বললেন কমলেশবাবু।

তারপর, তারপর? ঢোলগোবিন্দবাবুর আগ্রহ বাড়ে।

তারপর আর কী? কিছু কথা কাটাকাটি হল। ঘনশ্যামের মুখ চেয়ে ওকে ছেড়ে দিলাম। বেশ কিছু টাকা খসল, এই আরকী। তবে চাইলে ওকে আমি দেখে নিতাম। এ লাইনে কাজ করি দীর্ঘদিন।

পার্টি-থানা–সব লাইন ঠিক রেখে চলতে হয় আমাদের। তবে এর পর আসলে ওর কপালে দুঃখ আছে।

যাক গে, বাদ দিন ওসব। যা বলছিলাম–ঘটনাটা ঘটেছে সম্ভবত তেরোই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়। ওই দিন ওই সময় আপনি কোথায়, কার সঙ্গে ছিলেন?

রণিদার আচমকা এমন ক্ষুরধার প্রশ্নে কমলেশবাবুকে খানিকটা বিপর্যস্ত দেখাল। তিনি কোনও মতে বললেন, আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন না কি?

কিছু মনে করবেন না, এটা আমাদের একটি রুটিন মাফিক অত্যন্ত কমন প্রশ্ন, হ্যাঁ, বলুন ওই দিন ওই সময় কী করছিলেন আপনি?

আমি….আমি…যতদূর মনে পড়ছে এক বন্ধুর ছেলের বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলাম।

কোথায়?

অ্যাঁ?

বলছি জায়গাটা কোথায়?

বরানগর।

বিয়ে না বৌভাতের নেমন্তন্ন ছিল ওটা?

বিয়ের, আমি একাই নয়, আমার ফ্যামিলিও সেদিন গেছিল বিয়ে অ্যাটেন্ড করতে, জবাব দিলেন কমলেশবাবু।

আই সি, …রণিদার কথা সম্পূর্ণ হল না। কারণ এই সময় বেয়ারা সঙ্গে আর একজনকে নিয়ে ঘরে ঢুকল দুই বিশাল আকৃতির ট্রে-তে করে মিষ্টি, নোনতা ইত্যাদি নিয়ে। আমি আর রণিদা আঁতকে উঠলাম খাবারের বহর দেখে। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, করেছেন কী?

তবে ঢোলগোবিন্দবাবুকে বেশ খুশি খুশিই দেখাল। খাদ্যের পরিমাণ ও প্রকৃতি তার মনপসন্দ হয়েছে।

অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কমলেশবাবু বললেন, এই যৎসামান্য আয়োজন আর কী ?

তারপরই সুর পালটে ধমকে উঠলেন, হতভাগা, দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? চা-টা নিয়ে আয় এক্ষুনি।

চাকর দুটি বাবুর আদেশ তালিম করতে যাবে এমন সময় রণিদা বেশ একটু ভারী গলায় বলে উঠল, এই তোমরা দাঁড়াও, এদিকে এসো।

চাকর দুটি কঁচুমাচু হয়ে খানিক এগিয়ে এল।

কমলেশবাবু অবাক।

রণিদা বলল, আমি বলছি, এখানে মাত্র একটি প্লেট রেখে বাকিগুলি ভেতরে নিয়ে যাও।

না, না কী যে বলেন আপনি। এটুকু খেতেই হবে। চেঁচিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক।

রণিদা বলল, দেখুন কমলেশবাবু, আমি বা আমার এই ভাই–দুজনার কেউই মিষ্টির ভক্ত নই। মিষ্টি ভালোবাসেন আমাদের এই ভদ্রলোকটি–ঢোলগোবিন্দবাবু। আপনার আতিথেয়তাকে সম্মান জানাতে একটি প্লেট রাখছি, একটিই যথেষ্ট। আপনি বরং আমাদের একটু চা খাওয়ান।

চাকর দুটি হতবুদ্ধি। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

কমলেশবাবু আমতা আমতা করে বললেন, এটা কি ঠিক হল? প্রথম দিন আমার বাড়ি এলেন অথচ একটু মিষ্টি মুখে তুলতে চাইছেন না আপনারা।

আমি বললাম, প্লিজ, আপনি আদারওয়াইজ ভাববেন না। এই আমরা মিষ্টি খাচ্ছি, প্লেট থেকে একটি সন্দেশ তুলে মুখে পুরলাম আমি। তারপর রণিদার দিকে এগিয়ে দিলাম প্লেটটি।

দেখলাম রণিদা প্লেট থেকে একটি মিষ্টি তুলে মুখে দিল, তারপর প্লেটটি বাড়িয়ে দিল ঢোলগোবিন্দবাবুর দিকে।

আমি চাকর দুটিকে মৃদু ধমক দিলাম, দাঁড়িয়ে দেখছ কী? নিয়ে যাও এগুলি।

ওরা ওসব নিয়ে ভেতরে চলে যেতেই রণিদা আগের প্রশ্নে ফিরে গেল, হ্যাঁ, মি. খাস্তগীর, বন্ধুর বিয়ে তা হলে ভালোই জমল বলুন?

বন্ধুর নয়, বন্ধুর ছেলের বিয়ে ছিল।

আই সি, সুবিমল সোমের সঙ্গে ঘনশ্যামবাবুর সম্পর্ক কেমন ছিল বলতে পারেন?

ভালোই। তবে ইদানীং…

আবার বাধা পড়ল আমাদের কথায় কারণ ট্রেতে করে চা নিয়ে প্রবেশ করল এক ভৃত্য।

সাবধানে, দেখিস, গায়ে পড়ে না যেন, কমলেশবাবু চাকরকে সজাগ করে দেন।

রণিদা আর আমি এগিয়ে ধরা ট্রে থেকে চা তুলে নিলাম। ঢোলগোবিন্দবাবু ইঙ্গিতে বোঝালেন ওনার চা-টা আপাতত টেবিলেই থাক, কারণ উনি এখন ব্যস্ত।

কমলেশবাবুও প্লেট সমেত একটি কাপ তুলে নিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন।

চাকরটি চলে গেলে কথাবার্তা শুরু হল আমাদের।

কী একটি কথা বলতে যাচ্ছিলেন যেন আপনি? রণিদা ভদ্রলোককে মনে করিয়ে দেয়।

হ্যাঁ, বলছিলাম ইদানীং টাকাপয়সা নিয়ে কিছু একটি ঝামেলা চলছিল ওদের দুজনার মধ্যে। সুবিমলের ছেলেটা আইআইটি খড়গপুরে পড়ে, প্রচুর খরচ হয়। ওর দোকানে দ্বিতীয় জেরক্স মেশিনটা বসাবার সময় শুনেছি ঘনশ্যাম কী একটি শর্তে ওকে এক মোটা অঙ্কের টাকা ধার দেয়। ওই নিয়ে ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল একদিন। আমি আচমকাই শুনে ফেলি। আপনি আবার এসব কথা বলে দেবেন না যেন।

না না নিশ্চিন্ত থাকুন আপনি, কাউকে কিছু বলা হবে না, এ ব্যাপারে, আশ্বাস দেয় রণিদা।

হঠাৎ রণিদার দৃষ্টি কমলেশবাবুর ফোনের দিকে গেল। বলল, মডেলটা তো চমৎকার। একটু দেখতে পারি?

অবশ্যই, একটু গদগদ চিত্তে কমলেশবাবু ফোনটা তুলে দিলেন রণিদার হাতে।

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খানিকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে রণিদা দেখতে লাগল সেলফোনটা।

আমার আশ্চর্য লাগল, হঠাৎ করে ওর আবার সেলফোন প্রীতি জেগে উঠল কেন?

একসেলেন্ট, রণিদার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, জানেন কি এর একটি নিজস্ব নম্বর আছে?

আমার ফোন নম্বরের কথা বলছেন তো?

না, না, আমি বলছি আপনার এই সেলটার নিজস্ব একটি আইডেন্টিফাইং নম্বর আছে, সেটি জানেন কি?

আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না, কমলেশবাবু বেশ খানিকটা হতভম্বের মতন বললেন।

দেখুন, সিমকার্ড যে নাম্বার দেয় সেটা আপনার ফোন নম্বর, অর্থাৎ কেউ ফোন করলে আপনাকে ওই নম্বরেই পাওয়া যাবে–এটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার আপনার কাছে?

হ্যাঁ, মাথা নাড়েন ভদ্রলোক।

যে-কোনও সেলফোনের একটি মডেল নম্বর থাকে, এটাও জানেন নিশ্চয়ই?

জানি, এবারও সম্মতিজ্ঞাপক মাথা নাড়েন ভদ্রলোক।

এ ছাড়াও এই সেলটার একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব আইডেনটিফাইং নম্বর আছে যা প্রতিটি সেলের ক্ষেত্রেই ভিন্ন ভিন্ন–সেটা জানেন কি?

সেটা জেনে লাভ?

লাভ আছে, সেটাই বলছি– ধরুন অসাবধানতা বশত ফোনটা আপনার হারিয়ে গেল কিংবা চুরি হয়ে গেল। আপনি সেক্ষেত্রে কী করবেন?

কেন, থানায় যাব।

গুড, থানায় গিয়ে আপনি আপনার ফোন নম্বর আর মডেল নাম্বার ও কোম্পানির নাম ইত্যাদি দিয়ে একটি মিসিং ডায়রি করবেন, তাই তো?

মাথা নাড়েন ভদ্রলোকে, যার অর্থ হ্যাঁ-বাচক।

ধরুন তার দু’দিন পর পুলিশ এই কোম্পানিরই একই মডেলের পাঁচখানা ফোন উদ্ধার করে আপনাকে বলল, আপনারটা চিনে নিতে। কী করে চিনবেন আপনি? কারণ চোর নিশ্চিতভাবেই সেলফোনটা চুরি করে প্রথম যে-কাজটি করবে তা হল আপনার সিম-কার্ডটি খুলে ফেলে দেবে। ফলে গেল আপনার নিজস্ব ফোন নম্বর। এবার কী করবেন আপনি?

তাই তো? হতবাক কমলেশবাবুর মুখ থেকে কথা সরল না।

ঢোলগোবিন্দবাবু মিষ্টি শেষ করে চায়ের কাপ-প্লেট হাতে তুলে নিয়েছিলেন, চুমুক দিতে ভুলে গেলেন। তিনিও হাঁ করে চেয়ে রইলেন রণিদার দিকে।

দাদা, চা-টা খান, ঠান্ডা হয়ে গেল যে, বললাম আমি।

সে ক্ষেত্রে, আবার বলতে শুরু করে রণিদা, সে ক্ষেত্রে আপনার সেলের নিজস্ব আইডেন্টিফাইং নম্বরটাই কাজ দেবে নিজের ফোন চিনে নিতে। অবশ্য যদি ফোনের কাগজপত্র সব যত্ন করে রাখা থাকে তা হলে প্রবলেম হয় না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন পর আর ওসব মাথায় রাখেন না।

আপনি যে-নম্বরের কথা বলছিলেন ওটা কীভাবে জানা যেতে পারে, কমলেশবাবু আগ্রহ দেখান এবার।

আপনি অনুমতি দিলে সেটা আমি অপারেট করে বের করতে পারি, জবাব দিল রণিদা।

হ্যাঁ দেখান না।

রণিদা এবার ওর কেরামতি দেখিয়ে সেলফোনটার কীসব বাট্ন টেপাটেপি করল দ্রুত, তারপর ফোনটা তুলে ধরল কমলেশবাবুর চোখের সামনে।

দেখা গেল মনিটরে ভাসছে পনেরো ডিজিটের একটি নম্বর।

এটাই?

হ্যাঁ, এটাই সেই গুরুত্বপূর্ণ আইডেন্টিফাইং নম্বর যেটা আপনার নিজের ফোন চিনে নেবার জন্য অতীব দরকারি।

ভালো জিনিস শিখলাম তো, কমলেশবাবুকে উৎফুল্ল দেখাল।

শুধু তাই নয়, এটা যদি আপনার নোট করা থাকে তবে থানায় মিসিং ডায়ারি করার পর ওই ডায়ারি নম্বর উল্লেখ করে যদি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে আপনি জানান যে আপনার এই আইডেন্টিফাইং নম্বরযুক্ত ফোনটি হারিয়ে গেছে, এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে যা পাচার হয়ে গেলে আপনার সমূহ বিপদ হবে, তা হলে ওরা ওই মুহূর্তে ফোনটি এমনভাবে ব্লক করে দেবে ওদের ওখান থেকে যে, আপনার কোনও তথ্য কেউ আর পাবে না।

দারুণ তো! কীভাবে নম্বরটা বার করা যায় শেখাবেন একটু?

অবশ্যই, বলল রণিদা, তারপর ফোনটা ওনার হাতে দিয়ে বলল, প্রথমে স্টার টিপুন।

টিপলাম, বললেন ভদ্রলোক।

এবার হ্যাশ।

হ্যাশ।

এবার জিরো।

এবার সিক্স।

সিক্স।

টিপেছেন এবার ফের হ্যাশ মারুন।

মারলাম, আরে… চমৎকার। ভদ্রলোকের চোখে মুখে খুশির উচ্ছ্বাস, দারুণ জিনিস শিখলাম একখানা।

শিখলেন তো? এবার এই নম্বরটা কোনও ইম্পর্টেন্ট জায়গায় লিখে রাখবেন, প্রয়োজনে কাজে দেবে। আজ উঠি।

উঠবেন? ঠিক আছে, উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক।

আমরা দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

কমলেশবাবু বললেন, যে-কোনও প্রয়োজনে স্মরণ করবেন, উইদাউট এনি হেজিটেশন।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, বলল রণিদা।

ধন্যবাদ আপনাদেরও।

গাড়িতে এসে আমি বললাম, কী ব্যাপার বলো তো রণিদা? হঠাৎ মোবাইল নিয়ে পড়লে?

ভালো লাগল সেটটা, খুব নির্লিপ্ত শোনাল ওর কণ্ঠস্বর।

কিন্তু আমি জানি মাঝে মাঝে ওর এই বেড়াল তপস্বী ভাবটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। কিছু একটা ছক কষছে মনে মনে। উত্তর দেবে না জানি, তাই আর ঘাঁটালাম না।

***

পর্ব – ৫

কমলেশ খাস্তগীরের বাড়ি থেকে বেরোতেই আমি বললাম, এরপর আমাদের গন্তব্যস্থল নিশ্চয়ই ঘনশ্যাম মণ্ডলের বাড়ি?

হ্যাঁ, বত্রিশের বি, কালীদাস পতিতুণ্ডি লেন, জবাব দিয়ে গাড়িতে উঠে বসল রণিদা।

মেন রাস্তা ধরে গলি বরাবর সামান্য এগোলেই বত্রিশের বি।

কড়া নাড়া দিতেই দরজা খুলে দাঁড়ালেন এক বিধবা মহিলা, বললেন, কাকে চান আপনারা?

ভদ্রমহিলাকে দেখে কষ্ট লাগল। চোখ দুটি করুণ।

বছর পঁয়তাল্লিশের সদ্য স্বামী হারা শোকনম্রা ঘনশ্যাম মণ্ডলের স্ত্রী অত্যন্ত সাদামাটা পোশাকে।

ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন, আমরা মানে ক’দিন আগে ঘনশ্যামবাবু…

হ্যাঁ, উনি আমার স্বামী, ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বরে কোনওরকম ভাব প্রকাশিত হল না।

দরজা ধরে দাঁড়িয়ে উনি।

ওনার মৃত্যুর তদন্তের ব্যাপারে আমরা এসেছিলাম, এবারও ঢোলগোবিন্দবাবুই উত্তর দিলেন।

ও পুলিশের লোক আপনারা? ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বরে কাঠিন্য।

রণিদা নিজের পকেট থেকে আইডেন্টিটি কার্ড বের করে ওনার দিকে এগিয়ে দিল। মুখে বলল, রণজয় চক্রবর্তী–দুর্ঘটনার কয়েকদিন আগে আপনার স্বামী দুই বন্ধুকে নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন।

ভদ্রমহিলা কার্ডে চোখ বোলাচ্ছিলেন।

তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বললেন, বুঝতে পেরেছি। দয়া করে ভেতরে আসুন আপনারা।

ওনাকে অনুসরণ করলাম।

মাঝারি মাপের এক ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে সোফায় বসলাম আমরা।

একটু স্থির হতে ভদ্রমহিলা বললেন, কিন্তু শুনেছিলাম, আপনি কেসটার তদন্তে আগ্রহী নন।

দেখুন ম্যাডাম, রণিদা বলতে লাগল, হুমকি চিঠির ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। তবে ওনাকে লোকাল পিএস-এ সব কিছু জানিয়ে একটি জেনারেল ডায়ারি করে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলাম।

হ্যাঁ, সেটা উনি করেছিলেন। গতকাল পুলিশ এসে কালীঘাট থানার ওই জিডি নম্বরটা নিয়ে গেছে। আপনি যদি চান তা হলে…

না, তার দরকার নেই। সেদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে কেসটা না নিলেও আপনার স্বামীকে চিঠির এনভেলাপগুলি আমাকে দিয়ে আসতে বলেছিলাম এবং উনি তা দিয়েও এসেছিলেন। ফলে দয়া করে এটা ভাববেন না যে ঘনশ্যামবাবুকে আমি যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি। আসলে বিষয়টা তখন এত সামান্য ছিল যে তার জন্য অ্যাডভান্স নিতে আমার বিবেকে বাধছিল সেদিন। যাইহোক, আপনি ভাববেন না, এখন এই কেসটার তদন্তে আমি হাত দিয়েছি, অপরাধীকে খুঁজে বার করবই।

রণিদার কথায় ভদ্রমহিলাকে বেশ খানিকটা আশ্বস্ত বলে মনে হল। উনি বললেন, দেখুন ভাই, ওর মতন মানুষের যে কোনও শত্রু থাকতে পারে…

কান্নায় কণ্ঠ বুজে এল ভদ্রমহিলার, উনি আঁচলে মুখ চাপলেন।

আপনি ভেঙে পড়বেন না, প্লিজ, আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি আমরা। বলতে পারেন সে জন্যই দিন দুই পর আপনার বাড়ি এলাম।

ধন্যবাদ, একটু স্বাভাবিক হলেন মিসেস মণ্ডল।

কেসের তদন্তে আপনার সহযোগিতা আমার দরকার, রণিদা বলল।

বলুন, আমি কীভাবে আপনাদের সহযোগিতা করতে পারি? দয়া করে কোনও অপ্রীতিকর প্রশ্ন করবেন না।

হঠাৎ এ কথা বলছেন কেন? রণিদার সঙ্গে আমরাও বেশ অবাক হলাম।

গত দু’দিন ধরে পুলিশের জেরায় জেরায় আমি কাহিল। ও এভাবে চলে গেল। এত মানসিক চাপের মধ্যে আমি আছি যে বলে বোঝানো কঠিন। তার ওপর পুলিশের অসংখ্য প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে উত্তর দেবার সময় আমার মনে হয়েছে, যেন ওর মৃত্যুর জন্য পুলিশ আমাকেই সন্দেহ করছে।

ক্রমশ…

ক্যালেন্ডার লঞ্চ-এ তারকা সমাবেশ

কলকাতার পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে অবস্থিত, অভিজাত এক রেস্তোরাঁয় সম্প্রতি লঞ্চ করা হল এক বিশেষ টেবিল ক্যালেন্ডার। আর এই ফ্যাশন ক্যালেন্ডারটি লঞ্চ করতে উপস্থিত ছিলেন একঝাঁক তারকা। দেবশ্রী রায়, বিক্রম চট্টোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, রিচা শর্মা, রণজয় এবং আরও অনেকে। ছিলেন উদীয়মানরাও।

entertainment news
‘me & mooi’ calendar launched by Tollywood celebrities

ক্যালেন্ডারটির বিশষত্ব হল—এর প্রতিটি পাতায় তুলে ধরা হয়েছে কলকাতার কিছু মডেল এবং অভিনেত্রীদের। এতে যেমন রয়েছে চেনা-মুখ, তেমনই রয়েছে নতুন মুখ। অর্থাৎ, চেনা-অচেনার মেলবন্ধন। আসলে, অভিজ্ঞদের পাশাপাশি নতুনদের রেখে, ওদেরও প্রচারের আলোয় আনতেই এই উদ্যোগ বলে ‘Me & MOOI’-এর পক্ষ থেকে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা প্রেম মুখোপাধ্যায় এবং অর্পিতা গঙ্গোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত তাঁরা আরও জানিয়েছেন, শুধু ক্যালেন্ডার নয়, সিনেমা ও  সাংস্কৃতিক জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে চলেছেন অনেকের এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম লঞ্চ করার ইচ্ছেপ্রকাশও করেছেন তাঁরা।

entertainment news
Prem Mukhopadhyay & Arpita Gangopadhyay — Founder of ‘ME & MOOI’

——–

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব