রহস্য ধারাবাহিকঃ মার্ডার ইন ভিক্টোরিয়া (১-ম অধ্যায়)

পর্ব – ১

ঘড়িতে এখন সময় পৌনে দশটা। শীতের সকাল। রণিদার বাড়ির ঘাসের সবুজ গালিচা মোড়া সুবিশাল লনে নরম মিঠে রোদে গা সেঁকতে-সেঁকতে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলাম। একটু আগে হরিদা এসে টেবিল-চেয়ার পেতে চায়ের যাবতীয় সরঞ্জাম রেখে গেছে। প্লেটে পরিমাণমতন কুচো নিমকি দিয়ে যেতে ভোলেনি। রোববার করে এই সময়টায় এ বাড়িতে আসা এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খবরের কাগজে ডুবে ছিলাম। আচমকা খানিক দূরের গাছে বসে থাকা পাখির ডাকে চোখ তুলে দেখি একটা ফিঙে, চিড়িক চিড়িক করে লেজ নাড়াচ্ছে– যেন বলছে, আমাকে দ্যাখো। উড়ে আসছে ভেজা বাতাস, বেশ লাগছে।

খুশি খুশি মুডে চায়ে চুমুক দিলাম।

এমন সময় লোহার গেটটা শব্দ করে সরে গেল।

দেখলাম, গেট ঠেলে রণিদা ঢুকছে। দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এল, আমার দিকে মৃদু হেসে বলল, একটু বস, এখুনি ফ্রেশ হয়ে আসছি। রণিদা প্রতিদিন ভোরবেলা কোনও না কোনও ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কখনও জিমে যায়, কখনও ক্যারাটে ক্লাবে, কখনও স্রেফ জগিং। যেদিন কোথাও যায় না নিজের ছাদে তৈরি একটা মিনি জিম আছে, সেখানেই গা ঘামিয়ে নেয়। এটা ওর রোজকার অভ্যাস। আমাকে বহুবার বলেছে, আরে রঞ্জন, একটু জিম-টিম কর, শরীর ফিট থাকবে, দেখবি কাজে কত এনার্জি পাবি।

চিরকালের হদ্দ কুঁড়ে আমি। ওসব আমার ধাতে নেই। তাই ভোরের সূর্য দেখা আমার কপালে কোনওদিন হয়ে ওঠে না।

কী হে রিপোর্টার, কতক্ষণ? প্রশ্ন শুনে চমকে তাকিয়ে দেখি ঢোলগোবিন্দবাবু–আমাদের রোববারের আড্ডার এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

হেসে জবাব দিলাম, মিনিট কুড়ি হল। বসুন।

বছর বাহান্নর ভারিক্বি চেহারার ঢোলগোবিন্দবাবু একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, রণি ফিরেছে?

হ্যাঁ, এই ফিরল। বোধহয় স্নানে গেছে। কিন্তু ব্যাপারখানা কী? আজ একদম ফিটফাট বাবুটি সেজে?

ঢোলগোবিন্দবাবুর পরনে ছিল হালকা ক্রিম রঙা ফুলস্লিভ শার্ট, ডিপ খয়েরি প্যান্ট, পায়ে চকচকে ব্রাউন স্যু। আর মাথায় গলফ ক্যাপ ও ঠোঁটে পাইপ। চমৎকার লাগছিল ভদ্রলোককে।

উনি হেসে জবাব দিলেন, কারণ আছে।

ওনার চোখে-মুখে এক রহস্যময়তা খেলা করছিল। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, আজ দেখছি বেশ একটু আগে আগেই চলে এলেন। অন্য দিন তো সাড়ে দশটা-পৌনে এগারোটার আগে এ মুখো হন না।

সে কী, খবর কিছু শোনোনি? মানে, রণি বলেনি তোমায় কিছু?

না, কই কিছু বলল না তো। কাগজটা নামিয়ে টেবিলে রেখে একটু নড়েচড়ে বসি।

আজ এক মক্বেল আসার কথা, নতুন কেস, এক বিশেষ ভঙ্গিতে চোখ নাচিয়ে বললেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

তাই! মুহূর্তে আমি যেন চাঙ্গা হয়ে উঠি। একজন ক্রাইম রিপোর্টার হিসাবে আমার প্রফেশনাল নার্ভটা টানটান হয়ে ওঠে। উৎসাহ ভরে বলি, নিন নিন, চা খান।

টি-পট থেকে একটা কাপে খানিকটা লিকার ঢেলে, দুধ ও সুগার কিউব দিয়ে চামচ সমেত কাপ-প্লেট এগিয়ে দিই ঢোলগোবিন্দবাবুর দিকে।

থ্যাংক ইউ মি. রিপোর্টার, কাপ-প্লেট হাতে তুলে নিয়ে সহাস্যে বললেন ভদ্রলোক।

ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম স্যার, কিন্তু কী কেস কিছু বলল কি রণিদা?

নাহ্ শুধু বলল, এই রোববার একটু তাড়াতাড়ি আসবেন, খবর আছে। এর বেশি কিছু ভাঙল না।

তাই বুঝি গন্ধে গন্ধে সাত তাড়াতাড়ি হাজিরা দিয়েছেন? আরে এই তো রণিদা আসছে।

নীল জিন্স-এর উপর একটা স্কাই রঙের টি-শার্ট চাপিয়েছে রণিদা। জিন্স-এ ওকে বেশি স্মার্ট লাগে।

পায়ে কোলাপুরি চপ্পল।

গুড মর্নিং গোবিন্দদা, হেসে বলল রণিদা।

মর্নিং ভায়া, মর্নিং। তারপর, শরীর ভালো তো?

একদম ফার্স্ট ক্লাস, আপনার? চেয়ারে বসে রণিদা।

মা তারার আশীর্বাদে কেটে যাচ্ছে এক রকম। কিন্তু তুমি যে বললে খবর আছে, তা খবরটা কী, শোনাও একটু আমাদের।

চা বানাতে বানাতে রণিদা জবাব দেয়, এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটার বিন্দুবিসর্গ জানি না আমি। তবে জেনে যাব খুব শিগগির।

কাপ-প্লেট হাতে তুলে দুটো পর পর সিপ দিয়ে রণিদা ফের বলল, গত পরশু এক ভদ্রলোক ফোনে জানালেন যে তাঁর খুব বিপদ, আমার সাহায্য চান।

আমি জানতে চাইলাম কী রকম বিপদ? উত্তরে ভদ্রলোক বললেন সাক্ষাতে সব কথা জানাবেন। তারপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইলেন। ওনাকে আজ দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে আসতে বললাম।

আমি ঘড়ির দিকে একবার চেয়ে বললাম, এখন তো প্রায় সাড়ে দশটা বাজে, এখনও কই…।

প্যাঁ-প্যাঁ-প্যাঁ, গেটের বাইরে একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর চিৎকার করে জানান দিল যে সে তার মালিককে নিয়ে এসে গেছে।

হরিদা, একটু দ্যাখো তো, বলে উঠল রণিদা।

বয়স্ক ছিপছিপে হরিদা অপেক্ষাকৃত একটু বেশি ক্ষিপ্রতায় ছুটে গিয়ে গেটটা খুলে দিল। তারপর আঙুল তুলে ইঙ্গিতে গাড়ি পার্কিং-এর জায়গাটা নির্দেশ করে গেট বন্ধ করে দিল।

লনে বসে দেখলাম অ্যাম্বাসাডার থেকে নামলেন তিনজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। ওনারা হরিদাকে অনুসরণ করে পায়ে পায়ে লনে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন স্বাভাবিক পদক্ষেপে।

আমরা তিনজনে উঠে দাঁড়ালাম। পারস্পরিক নমস্কার বিনিময় হল।

ঢোলগোবিন্দবাবু ভদ্রলোক তিনজনকে চেয়ারগুলি দেখিয়ে বললেন, প্লিজ, বি সিটেড।

ধন্যবাদ জানিয়ে তিনজন বসলেন।

হরিদা এগিয়ে এসে চা কাপে ঢেলে চিনি-দুধ প্রভৃতি মেশাতে লাগল চুপচাপ।

ওদের একজন ঢোলগোবিন্দবাবুর দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, আমার নাম ঘনশ্যাম মণ্ডল। ফোনটা আমিই করেছিলাম।

ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন, আমি না, রণজয় চক্রবর্তী হলেন উনি। আপনি ওনাকেই ফোন করেছিলেন। অনুগ্রহ করে চা নিন।

ভদ্রলোক ছাড়া বাকি দু’জন চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলেন।

আমাদের মধ্যে ঢোলগোবিন্দবাবু অপেক্ষাকৃত বেশি বয়স্ক বলে অনেকে তাকেই গোয়েন্দা ভেবে ভুল করেন। এক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। যাই হোক, গোবিন্দবাবুর কথায় ভদ্রলোক রণিদার দিকে খানিকটা বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে চাইলেন। সম্ভবত বছর বত্রিশের একটি ছেলেকে গোয়েন্দা বলে মেনে নিতে মন চাইছিল না তার।

একটু থেমে উনি বললেন, ও আচ্ছা।

আমার মতন রণিদাও এতক্ষণ তিনজনকেই খুব তীক্ষ দৃষ্টিতে অবজার্ভ করছিল। এবার বেশ কনফিডেন্টলি সরাসরিই বুঝি নেমে এল রণক্ষেত্রে, হ্যাঁ, আমিই রণজয় চক্রবর্তী। বলুন আপনার সমস্যাটা কী?

চা খেতে খেতে ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করলেন বলতে, আমার ইয়ে, মানে ব্যাপারটা একটু পার্সোনাল।

ভদ্রলোকের কথায় গোবিন্দবাবু ও আমি অপ্রস্তুত হয়ে রণিদার দিকে অসহায় ভাবে তাকালাম। স্পষ্ট বুঝতে পারছি ভদ্রলোক আমাদের দুজনকে চাইছেন না।

কিন্তু রণিদা ব্যাপারটাকে দ্রুত সহজ করে দিল। বলল, এরা দুজনই আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আমার যে কোনও তদন্তে ওরা সক্রিয় ভাবেই অংশ নেয়। আমি বলছি ওদেরকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন।

তারপর একটু থেমে আবার বলল, আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই, ও হল রঞ্জন, সুরঞ্জন দে। একজন ক্রাইম রিপোর্টার। সামান্য লেখালিখির শখ আছে। নামটা হয়তো শুনে থাকবেন।

আমি হাতজোড় করে ফের নমস্কার করি।

আর উনি হলেন ঢোলগোবিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার দাদার বন্ধু ছিলেন, এখন আমার। ভালো তবলা বাজান। ওনার মতন নিরীহ ভদ্র মানুষ ভূ-ভারতে কমই আছে। এবার যদি অনুগ্রহ পূর্বক আপনাদের পরিচয়টা একটু দেন।

রণিদার স্মার্ট কথাবার্তায় মনে হল ঘনশ্যামবাবুর দুশ্চিন্তা দূর হল।

উনি বললেন, মাফ করবেন, আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। যাই হোক, পরিচয় করিয়ে দিই–এরা দু’জনই আমার বাল্যবন্ধু বলতে পারেন। ইনি সুবিমল সোম আর ইনি কমলেশ খাস্তগীর।

আস্ত বীর! বিস্মিত ঢোলগোবিন্দবাবু দুচোখ কপালে তুললেন এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে।।

ওনার বেমক্বা কথায় আমি অবাক, রণিদার চোখেমুখে রীতিমতন বিরক্তি।

ঢোলগোবিন্দবাবুর সব ভালো, দোষ কেবল মাঝেমধ্যে দু-একটা দুমদাম উলটোপালটা কথা বলে ফেলেন কিংবা বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে কোনও কিছুর ভুল ব্যাখ্যা করে বসেন অত্যন্ত নির্বিকার চিত্তে।

খেয়াল করলাম কানে খাটো ঢোলগোবিন্দবাবু হিয়ারিং এইডটা লাগাতে ভুলে গেছেন। আমি ইশারায় ওটি ওনার বুকপকেট থেকে খুলে কানে লাগাতে বললাম।

উপস্থিত সকলেই একটু অপ্রস্তুত। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কমলেশবাবু একটু টেনে টেনে উচ্চারণ করলেন, খা-স্ত-গী-র।

মাথায় টাক। প্রায় ছ’ফুট উচ্চতার ফর্সা, ভারী মেদবহুল চেহারার মানুষটির কণ্ঠে একটু উষ্মা।

ওঃ, সরি সরি, বলে উঠলেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

রণিদা বলল, কিছু মনে করবেন না, উনি একটু কানে কম শোনেন। হ্যাঁ যা বলছিলাম, আপনার সমস্যাটা কী নিয়ে?

খানিক থেমে ঘনশ্যামবাবু বললেন, ইয়ে, মানে গত কয়েকদিন যাবৎ আমি বেশ কয়েকটা হুমকি দেওয়া চিঠি পাচ্ছি।

কত দিন ধরে?

তা প্রায়, দিন পনেরো হবে।

চিঠিগুলো সঙ্গে এনেছেন আপনি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ এই তো। ভদ্রলোক শশব্যস্ত হয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোড়ানো কিছু কাগজ বের করে রণিদার হাতে দিলেন।

দেখলাম সংখ্যায় চারটি। রণিদা সকলের সামনেই কাচের টেবিলটার ওপর ওগুলি রাখল।

বেশ মনযোগ দিয়ে মিনিট পাঁচেক ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে  চিঠিগুলি দেখে প্রশ্ন করল, এগুলি কি ডাকে এসেছিল?

হ্যাঁ।

খামগুলি কই?

একটা ফেলে দিয়েছি। বাকি তিনটে বাড়িতে কোথাও আছে। ওগুলি কি দরকার?

সম্ভবত শেষের তিনটি? হ্যাঁ, ওগুলি আমাকে দেবেন মনে করে। আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, চিঠিগুলি কি একই অফিস থেকে পোস্ট করা হয়েছিল?

এ প্রশ্নটার উত্তর এল সুবিমল সোমের কাছ থেকে। উনি বললেন, আমিও ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলাম। চিঠিগুলি কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে পোস্ট করা হয়েছিল।

ভদ্রলোকের দিকে রণিদার দৃষ্টি তীক্ষ্ন হল।

তিনজনের মধ্যে ওনাকেই বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে হল আমার।

মাথায় সেভেন্টি পার্সেন্ট চুল পাকা, সরু কাঁচা-পাকা গোঁফ। ডানদিক পেতে চুল অাঁচড়ান ভদ্রলোক। মাঝারি দোহারা চেহারার মানুষটির চোখ দু’টিতে বুদ্ধির প্রখরতা ঠিকরে বেরোচ্ছে মনে হল, ব্যাপারটা রণিদারও চোখ এড়ায়নি।

রণিদা দ্রুত উত্তর দিল, গুড। আপনি কি করেন মি. সোম?

এক সময় ব্যাংকে চাকরি করতাম। ভিআরএস নিয়েছি। বর্তমানে বাড়িতেই একটা এসটিডি বুথ বসিয়েছি। জেরক্স মেশিনও আছে। একটা ছেলে রেখেছি দেখাশোনার জন্য।

যাকগে ওসব, হ্যাঁ ঘনশামবাবু, যে কথা বলছিলাম আপনাকে, রণিদা বলতে শুরু করল। এই সংক্ষিপ্ত চিঠিগুলির মূল বক্তব্য যেটা বোঝা যাচ্ছে তা হল, কেউ আপনাকে থ্রেট করছে–বাড়ি-ঘর

বিক্রি-বাট্টা করে দূরে কোথাও চলে যেতে বলছে। তাই তো?

ভদ্রলোক সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।

আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়? তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকায় রণিদা।

সন্দেহ?

হ্যাঁ, এই শত্রুতার পিছনে কার হাত আছে বলে মনে হয় আপনার?

ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি জানেন? কিন্তু আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে কার কী লাভ হতে পারে বুঝতে পারছি না।

রোগা-পাতলা চেহারার শ্যামবর্ণ ঘনশ্যামবাবু লোকটির কণ্ঠস্বর বেশ অসহায়, নিরীহ শোনায়।

এমন সময় তৃতীয়জন অর্থাৎ কমলেশ খাস্তগীর তার বিশাল বপু নাড়িয়ে বলে উঠলেন, তোমার কিছু হলে কারও কি কিছু লাভ হতে পারে?

কথা বলেই উনি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার বের করেন। তারপর প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দ্রুত হাতে ঠোঁটে চেপে ধরে বলেন, এক্সকিউজ মি, সিগারেট না খেয়ে আমি আবার একদম থাকতে পারি না। ফস করে ম্যাচ জ্বালান ভদ্রলোক। সিগারেট ধরিয়ে বলেন, এই একটাই বদ অভ্যাস আমার।

দেখাদেখি সিগারেট ধরালেন সুবিমলবাবুও।

খেয়াল করলাম ব্র্যান্ডটা চারমিনার। রণিদার সঙ্গে থাকার ফলে আমারও মানুষের খুঁটিনাটি লক্ষ্য করার অভ্যস গড়ে উঠেছে।

রণিদা হাত নেড়ে ওদের আশ্বস্ত করে বলে, অল রাইট। হ্যাঁ আপনার কিছু হলে সব থেকে বেশি লাভবান কে হতে পারে ঘনশ্যামবাবু?

কিছুক্ষণ ভাবলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, বাবা গত বছর হঠাৎই স্ট্রোকে মারা যান। ফলে আমাদের দুই ভায়ের মধ্যে সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা করে যেতে পারেননি।

ভাই কি বড়ো?

না, ভাই আমার থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো।

কেমন মানুষ তিনি?

সে কথাই বলছি। ওর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে বাবার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। কিছুদিন আগেই আমার সঙ্গে এক প্রস্থ ঝগড়াঝাঁটি হয়ে গেল। ওর দাবি, যেহেতু আমি একটা সরকারি চাকরি করি বাবার সম্পত্তির সত্তর ভাগ ওকে দিতে হবে। বলুন তো, এটা মেনে নেওয়া যায়?

উনি, মানে আপনার ভাই এখন কোথায়?

কে জানে কোথায়। চিরকাল বাউণ্ডুলে স্বভাবের। মাঝেমধ্যেই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। কোথায় যায় কেউ বলতে পারে না। ওকে জিজ্ঞাসা করেও কোনওদিন উত্তর পাওয়া যায়নি। এক মাস, দুমাস, কখনও কখনও ছ’মাস পর্যন্ত বাড়ির বাইরে কাটিয়ে আসে।

লাস্ট কবে বাড়ি ছেড়েছে?

ওই যেদিন আমার সঙ্গে ঝগড়া হল। তা প্রায় প্রায় মাস খানেক হবে।

ঠিক আছে। উনি ছাড়া আর কাউকে সন্দেহ হয় আপনার? রণিদা ফের জিজ্ঞাসা করে, আপনি কিসে কাজ করেন?

রেলে। অফিসে অবশ্য…

অবশ্য কী?

বছর খানেকের মধ্যে আমার অফিস সুপারিনটেন্ডেন্টের পদে প্রোমোশন হবার কথা, যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে।

সব কিছু ঠিকঠাক নাও থাকতে পারে বলে মনে হচ্ছে কেন আপনার? রণিদার প্রশ্নের ধার বাড়ে।

ওই পোস্টের জন্য আরও দুজন প্রতিযোগী আছে। আসলে প্রামোশনটা আমি এসসি কোটায় পেতে চলেছি যে ব্যাপারটা ওরা দুজন কেউই মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। কারণ ওরা আমার থেকে বেশ সিনিয়র।

কি নাম ওনাদের?

একজন জনমেজয় মিত্তির, অপরজন নীলাক্ষি দাশগুপ্ত।

এসব ক্ষেত্রে কথার ফাঁকে ফাঁকে ডাইরিতে নোট নেওয়া রণিদার অভ্যাস। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না দেখলাম। লেখা শেষ করে ও প্রশ্ন করল, এদের ছাড়া আর কাউকে কি কোনও কারণে সন্দেহ হয় আপনার?

খানিক চুপ করে থাকলেন ভদ্রলোক।

তারপর বললেন, এদের ছাড়া তো আর কারও কথা মনে আসছে না এই মুহূর্তে।।

শুনুন ঘনশ্যামবাবু, আপনাকে আপাতত আমি কয়েকটি কথা বলি, একটু থামে রণিদা।

ও তিনজনের দিকে তাকায়, দেখা যায় প্রত্যেকেই বেশ উদগ্রীব ওর কথা শোনার জন্য।

পরিবেশ তৈরি করে নিয়ে ও ফের বলতে শুরু করে, প্রথমত, আপনি একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। দ্বিতীয়ত, চিঠিগুলি এখনকার মতো আমার কাছে রেখে যান। আর হ্যাঁ, খামগুলি দিয়ে যেতে ভুলবেন না। তৃতীয়ত, দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে মনে আত্মবিশ্বাস আনার চেষ্টা করুন। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে হুমকি চিঠি আদপে কার্যকরী হয় না। আর সব শেষে বলি, পুরো ঘটনাটা জানিয়ে লোকাল থানায় একটা জিডি করে রাখুন।

থানায়। মানে পুলিশে?

হ্যাঁ, থানায় জানাতে আপত্তি কীসের?

না, মানে আমরা ঠিক থানা-পুলিশ করতে চাই না, আর সে জন্যই আপনার কাছে আসা, বললেন কমলেশবাবু।

ঘনশ্যামবাবু বললেন, শুনেছি বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে…

বাহাত্তর ঘা, ওনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে সম্পূর্ণ করলেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

সকলে ওর দিকে তাকালেন, খানিকটা বিস্ময় সবার চোখে।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছি, আগে ছত্রিশ ছিল এখন ওটা বাহাত্তর হয়ে গেছে। বিশ্বাস না হয় মিলিয়ে দেখবেন। নির্বিকার চিত্তে বেশ জোর দিয়ে বললেন ঢোলগোবিন্দবাবু।

কেউ ওর কথায় হাসলেন না। কিন্তু তাতে ভদ্রলোকের ভ্রূক্ষেপ নেই।

ওসব কথা ছাড়ুন, যা বলছি আপনাদের মঙ্গলের জন্যই বলছি, বলল রণিদা, শুনুন চার লাইনের ছোট্ট একটা জিডি করে রাখুন থানায়! জিডি নম্বরটা নিতে ভুলবেন না।

তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল আমাদের কেসটা আপনি নিচ্ছেন না, তাই তো? এতক্ষণে কথা বললেন সুবিমলবাবু।

দেখুন এখনও পর্যন্ত আপনাদের কেসের যা পরিস্থিতি তাতে সেটা নেওয়ার কথা ওঠে না। তবে ব্যাপারটা আমি মাথায় রাখলাম।

না মানে, তাহলে আপনার ফিজের অ্যাডভান্সটা আমরা দিয়ে যেতাম আজ, বললেন কমলেশ খাস্তগীর।

ধন্যবাদ মি. খাস্তগীর, ঠিক সময়ে আমি আপনাদের জানাব বিষয়টা। আপাতত ওটা ভুলে যান। আপনাদের ঠিকানাটা জানা হল না।

উত্তরে সুবিমলবাবু ও কমলেশবাবু নিজেদের কার্ড বার করে রণিদার  দিকে এগিয়ে দিলেন।

ঘনশ্যামবাবু বললেন, আমার তো কার্ড নেই, আমি বরং কমলেশের কার্ডের পিছন দিকে আমার ঠিকানাটা লিখে দিই।

ফোন নম্বর দিতে ভুলবেন না, অফিসেরটাও।

হ্যাঁ হ্যাঁ লিখে দিচ্ছি সব।

লেখা শেষ করে ঘনশ্যামবাবু কার্ডখানা রণিদাকে ফিরিয়ে দিলেন যত্ন সহকারে।

রণিদা লেখাটায় একবার চোখ বুলিয়ে বলল, এটা তো মনে হচ্ছে কালীঘাট এরিয়া, তাই না?

ঠিক তাই, সম্মতিজ্ঞাপক মাথা নাড়েন ঘনশ্যামবাবু।

আচ্ছা আর একটা কথা–এই চিঠির লেখা দেখে আপনার কি পরিচিত কারও লেখা বলে মনে হচ্ছে?

একটু ভেবে উনি মাথা নাড়লেন, নাহ্।

ঠিক আছে আজ তাহলে এই পর্যন্ত। উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটলেই ফোনে তৎক্ষণাৎ জানাবেন আমাকে। আর হ্যাঁ, আবারও বলছি, সাবধানে চলাফেরা করবেন। সকলে উঠে দাঁড়াল। এরপর রণিদা উঠে দাঁড়িয়ে সকলের সঙ্গে করমর্দন করল। আমি আর ঢোলগোবিন্দবাবু ওকে অনুসরণ করলাম হাসিমুখে।

কিছু সময়ের মধ্যেই তিনজনকে নিয়ে ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। হু-স্ করে বেরিয়ে গেল গাড়ি।

এতক্ষণ আমরা সবাই চুপচাপ ছিলাম। হঠাৎ ঢোলগোবিন্দবাবু বলে উঠলেন, ধু-স-স, এ আবার একটা কেস। মনে হচ্ছে রোববারের সকালটাই মাটি হল।

রণিদা বলল, এবার বল দেখি রঞ্জন, কী কী জিনিস চোখে পড়ল তোর ?

আমিও পাক্বা গোয়েন্দার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলাম, এদের মধ্যে সবথেকে বেশি বুদ্ধি রাখেন সুবিমল সোম। ঘনশ্যামবাবু তেমন একটা ঘোর-প্যাঁচের মানুষ নন।

ক্যারি অন, চেয়ারে বসে সিগারেটে টান মেরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পিছে হেলে অর্ধশায়িত অবস্থায় চোখ দুটি বন্ধ রেখে জবাব দিল রণিদা।

সুবিমলবাবু, কমলেশবাবু–দুজনেই চারমিনার খান। তবে মনে হয়…

কী মনে হয়?

মনে হয়, কমলেশবাবুই বেশি ধুমপান করেন, কারণ ওনার গা থেকে পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে ভুর ভুর করে তামাকের গন্ধ বেরোচ্ছিল।

গুড, আর কী দেখলি বল?

তিনজনেরই বয়স পঞ্চাশের ওপারে। আর ওদের দু’জন মানে ঘনশ্যামবাবু ও সুবিমলবাবু ভিতরে ভিতরে উদ্বিগ্ন মনে হল। কিন্তু কমলেশবাবুর ব্যাপারটা বিশেষ বোঝা গেল না।

ঠিক আছে, মোটামুটি সব ঠিকই বলেছিস। তোকে গোয়েন্দার সহকারী হিসাবে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু গোবিন্দদা, আপনি যে দিবারাত্রি গাদা গাদা দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা গল্প পড়েন, আপনি কী কী অবজার্ভ করলেন বলুন দেখি। উল্লেখযোগ্য কিছু বলতে পারলে আগামী দিনে আপনাকে আমাদের সঙ্গে নেব, না হলে নয়।

রণিদার ঠোঁটে মুচকি হাসির ঝিলিক।

এতক্ষণ তর্জনি ও মধ্যমার মাঝে একটা ট্রিপল ফাইভ রেখে মুষ্ঠিবদ্ধ অবস্থায় সুখী সুখী ভঙ্গিমায় থেমে থেমে টান দিচ্ছিলেন ভদ্রলোক, চক্ষু অর্ধনিমীলিত ছিল। এবার চোখ এবং মুখ উভয়ই খুললেন তিনি, তারপর যেন দারুণ কোনও তথ্য সংযোজন করছেন এমন ভাবে বললেন, কমলেশবাবুর হাতে খুব দামি একটা সেলফোন, একটা খবরের কাগজ ছিল, আর,

আর? আমি আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করি।

আর ওই অ্যাম্বাসাডরটা ওনার।

চমৎকার। রণিদা সোল্লাসে বলে ওঠে, আপনি দেখছি দিন দিন শার্লক হোমস হয়ে উঠছেন গোবিন্দদা।

উঁহু, হল না। ওয়াটসন, ওয়াটসন বলো ভায়া। শার্লক হোমস তো হতেই হবে, তবে তার আগে ওয়াটসনের ভূমিকায় কিছু দিন কাজ করে নিই, কিছুটা বুদ্ধি পাকুক, বেশ গদগদ কণ্ঠস্বরে বললেন ভদ্রলোক।

আমি প্রশ্ন করলাম, কিন্তু হঠাৎ তুমি খামগুলির ওপর অত জোর দিতে গেলে কেন? এসব ক্ষেত্রে চারটে চিঠি চার জায়গা থেকে ছাড়া হবে সেটাই স্বাভাবিক।

তুই ঠিকই বলেছিস রঞ্জন, পোস্ট করার স্থান ভিন্ন হতে পারে, চিঠিগুলি ভিন্ন ভিন্ন হাতে লেখা হতে পারে কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় দুষ্কৃতকারী অসাবধানতা বশত এনভেলাপের ওপর ঠিকানাটা নিজের হাতে লিখে ফেলে। সেক্ষেত্রে মূল চিঠি থেকে এনভেলাপের লেখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। যদি সেই রকম কিছু মিলে যায়, একটা চান্স নিলাম বলতে পারিস। চল, এবার ওঠা যাক। তুই টিফিন করবি তো? গোবিন্দদার তো রবিবার করে হাফ-ডে ফাস্টিং চলে। হরিদা, এই হরিদা বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের দিকে

গেল ও।

অন্যমনস্ক ভাবে খবরের কাগজটা কখন যেন তুলে নিয়েছি আমি হাতে। ঢোলগোবিন্দবাবু নিবিষ্টমনে কী ভাবছেন, আর পাইপের ধোঁয়া ছাড়ছেন মাঝে মাঝে।

একটু পর হরিদার কথায় চমকে উঠলাম, এঃ হে, এইটুকু সময়ের মধ্যে জায়গাটা একদম নোংরা করে দিলে লোকগুলি। ছ্যাঃ ছ্যাঃ।

চেয়ে দেখলাম, সবুজ পরিচ্ছন্ন ঘাসের লনে বেশ কিছু

সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। হরিদা খুব খুঁতখুঁতে মানুষ।

হঠাৎ ঢোলগোবিন্দবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, ধু-স-স্ সব বোগাস।

কিন্তু সব যে বোগাস নয় সেটা বোঝা গেল কয়েকদিন পরই।

***

পর্ব – ২

ঘনশ্যামবাবুরা এ বাড়ি ঘুরে যাবার ঠিক ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ শনিবার। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ রণিদার একটা ফোন পেলাম।

রঞ্জন, এখনই একবার আসতে পারবি?

তোমার বাড়ি?

হ্যাঁ।

কী ব্যাপার, ভালো কিছু রান্না হচ্ছে না কি?

মজা রাখ, বেরোতে হবে একটু, ঘনশ্যামবাবু খুন হয়েছেন।

খুন! ঘনশ্যামবাবু!

বিস্ময়ের ঘোর কাটবার আগেই ও প্রান্ত থেকে শোনা গেল, আধ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে চলে আয়।

হ্যাঁ হ্যাঁ, এখনই চলে আসছি, কোনওমতে জবাব দিলাম।

ট্যাক্সিতে টালিগঞ্জ থেকে ঠাকুরপুকুর পৌঁছোতে সকালবেলা বেশি সময় লাগার কথা নয়। একবার ভাবলাম গোবিন্দবাবুকে খবর দিই। আবার পরক্ষণেই মনে হল, রণিদা যদি ওনাকে এই মুহূর্তে ঠিক পছন্দ না করে। থাকগে, যা করবার রণিদাই করুক। বেচারি ঘনশ্যামবাবু যে হুমকি চিঠিগুলি পাচ্ছিলেন তা শেষপর্যন্ত কার্যকরী হয়ে গেল। আহা রে! ভদ্রলোকের দুটি সন্তান আছে শুনেছি। উলটোপালটা ভাবনা-চিন্তায় নিজের আপাত প্রয়োজনীয় কাজগুলি দ্রুত সেরে নিচ্ছিলাম।

শেভ করে স্নান সেরে ফ্রেশ হলাম। ডিম-টোস্ট খেয়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। ব্যাগটা রেডি করাই থাকে, একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলাম সব কিছু ঠিকঠাক ভরা আছে কি না? নিশ্চিন্ত হয়ে ওটা কাঁধে ঝুলিয়ে রওনা হলাম। ট্যাক্সি পেতে অসুবিধা হল না।

এর মধ্যে ঘনশ্যামবাবু একদিন এসে রণিদাকে হুমকি চিঠির এনভেলপগুলি দিয়ে গেছিলেন।

রণিদা বলছিল, সেদিন ভদ্রলোককে বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। মনে হয়েছিল, ভদ্রলোক বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

রণিদা আর আমি দুজন মিলে আমাদের সীমিত বিদ্যাবুদ্ধিতে এনভেলপের লেখাগুলির সঙ্গে চিঠির লেখা মেলাতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোনও মিল পাইনি। এনভেলপের লেখাগুলিতেও একটির সঙ্গে অপরটির কোনও সামঞ্জস্য ছিল না। ঘনশ্যামবাবু নিজেও তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য তথ্য আমাদের দিতে পারেননি। ভদ্রলোক আমাদের কাছে এসেছিলেন সাহায্য লাভের আশায়। বেচারিকে এভাবে বেঘোরে প্রাণ দিতে হল।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে এক সময় রণিদার বাড়ি পৌঁছে গেলাম।

ঘরে ঢুকে দেখলাম রণিদা তৈরি হয়েই আছে প্রায়। ইনভেস্টিগেটিং টুল্স বক্সটার মধ্যে উঁকি মেরে কিছু দেখছিল ও। তারপর দ্রুত ওটা বন্ধ করে বলল, চল, বেরিয়ে পড়ি।

মিনিট তিনেকের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। ড্রাইভিং-এ রণিদার হাত দারুণ।

বললাম, আমরা যাচ্ছি কোথায়?

ভিক্টোরিয়া, রণিদার কপালে ভাঁজ, দৃষ্টি সামনে। বুঝলাম গভীর চিন্তা করছে কিছু।

পিও কি ভিক্টোরিয়ায়?

হ্যাঁ।

তুমি কখন খবর পেলে?

সকাল সাতটা নাগাদ সুবিমল সোম ফোনে জানালেন ঘনশ্যামবাবুর মৃত্যুর খবরটা। বললেন, আজ ভোরে ঝাড়ুদারের প্রথম চোখে পড়ে ডেডবডিটা বেঞ্চিতে হেলান দেওয়া অবস্থায়। দেখলে হঠাৎ মনে হবে ভদ্রলোক জীবিত, বসে আছেন। উনি যে মৃত এটা বুঝতেই নাকি বেশ সময় লেগেছিল ওর।

তারপর?

তারপর চ্যাঁচামিচি করে ও গার্ডকে ডাকে। ময়দান থানায় খবর যায়। পুলিশ এসে ডেডবডির দায়িত্ব নেয়, ওনার পকেটের কাগজপত্র থেকে পরিচয়, ফোন-নম্বর ইত্যাদি জানতে পারে পুলিশ, তারপর বাড়িতে ফোন করে জানায়। আইডেন্টিটি কার্ড থেকে প্রাথমিক সনাক্তকরণ পর্ব মিটলেও বাড়ির লোককে এসব ক্ষেত্রে তো অবশ্যই দরকার তথ্য কনফার্ম করা এবং বডি ডিসপোজাল করার জন্য।

থানার ফোন পেয়ে মণ্ডলবাবুর স্ত্রী ভীষণ ভেঙ্গে পড়েন। তারপর উনি সুবিমলবাবুকে ফোন করেন সাহায্যের জন্য।

গাড়িটা রেসকোর্সের গা ঘেঁষে এগিয়ে যায়। এক সময় ভিক্টোরিয়ার গেটের কাছাকাছি পার্কিং প্লেসে এসে দাঁড়ায়।

আয় নাম, শুনেছিলাম ডেডবডিটা এদিকেই কোথাও পড়ে ছিল, বলে গাড়ি থেকে নেমে দরজা লক করে রণিদা।

পায়ে পায়ে আমরা ভিক্টোরিয়ার গেটের দিকে এগোতেই দেখি বেশ গুরুগম্ভীর মুখে এগিয়ে আসছেন আমাদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অপর ব্যক্তিটি-স্বয়ং ঢোলগোবিন্দবাবু।

দেখলাম ভদ্রলোকের পরিধানে একটি হাফ প্যান্ট, সেটির দুই পকেটে হাতদুটি ঢোকানো।

পায়ে কেডস, গায়ে পুলওভার, মাথায় মাংকিক্যাপ চাপানো। মোবাইলটা সম্ভবত পকেটে।

ওনার পোশাক দেখে আমার ভ্রু কুঁচকে উঠল।

ব্যাপার বুঝতে পেরে উনি বললেন, ঢাকুরিয়া লেকে জগিং করছিলাম, এমন সময় গোয়েন্দার ফোন। ব্যস, সো–ও–জা চলে এলাম।

কথা না বাড়িয়ে রণিদার পিছু পিছু এগিয়ে গেলাম আমি।

বাঁ-দিক বরাবর কিছুটা এগিয়ে আমরা পিও অর্থাৎ প্লেস অফ অকারেন্স-এ পৌঁছোলাম।

ডেডবডি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল আগেই। তবে স্থানটি ঘিরে রাখা হয়েছিল ফিতে দিয়ে। অদূরে দু-জন কনস্টেবল পাহারায়।

রণিদা এগিয়ে গিয়ে ওদের একজনকে নিজের আই-কার্ডটা পকেট থেকে বের করে দেখাল। তারপর সামান্য কিছু কথাবার্তা বলল। মনে হল, ওরা আমাদের পরিচয় পেয়ে সন্তুষ্ট, কাজে বাধা দেবে না আর। ওদের একজনকে কথা বলতে বলতে নিয়ে এল আমাদের কাছাকাছি।

সঙ্গের কনস্টেবলটিকে রণিদা জিজ্ঞাসা করল, ডেডবডিটা কোথায় কী অবস্থায় পাওয়া গেছিল?

উত্তরে সে বলল, বলতে পারব না। এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য একমাত্র ঝাড়ুদারই দিতে পারবে।

ওকে ডেকে আনা যাবে?

অবশ্যই। তারপর চেঁচিয়ে অপর কনস্টেবলের উদ্দেশ্যে বলল, জগদীশ, ঝাড়ুদারকে ডেকে আনো তো।

লোকটি চলে গেল ঝাড়ুদারকে ডাকতে।

আমরা ফিতে ঘেরা জায়গাটা ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলাম। যদিও দেখার তেমন কিছুই ছিল না সেখানে। একটা বেঞ্চির চারপাশ খানিকটা স্পেস দিয়ে কর্ডন করে রাখা। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না।

মিনিট দুতিনের মধ্যেই জগদীশ নামের কনস্টেবলটি ঝাড়ুদারকে নিয়ে এল আমাদের কাছে।

নমস্তে সাব, বলে হাত জোড় করে নমস্কার করল মানুষটা।

রণিদা পালটা নমস্কার জানিয়ে বলল, তোমার নাম কী ভাই?

মাধব, হুজুর।

আচ্ছা ভাই মাধব, একটু আমাকে বলো তো আজ সকালে তুমি ডেডবডিটা কী অবস্থায় দেখতে পেলে?

আজ সকালে রোজকার মতন ঝাঁট দিতে দিতে এদিকে যখন এলাম, দেখলাম একটা লোক এই বেঞ্চিতে বসে আছে জলের দিকে মুখ করে।

কোন দিকে বসে ছিল? ডান দিকে না বামদিকে?

বামদিকে হুজুর।

তারপর তুমি কী করলে?

অনেকক্ষণ এদিক ওদিক ঝাঁট দিতে দিতে আমার মনে কেমন সন্দেহ হল হুজুর। এ কেমন লোক, একদম নড়ছে-টড়ছে না। মনে হল লোকটা হেলে আছে খানিকটা।

তারপর?

ঝাড়ু দিতে দিতে কাছে এগিয়ে এলাম ভালো করে দেখবার জন্য। দেখলাম, লোকটার চোখ বন্ধ। ঘুমিয়ে পড়ল নাকি? সাহস করে ডেকেই ফেললাম, বাবু, ও বাবু?

দেখলাম কোনও সাড়া শব্দ নাই। আমার মনে কু গাইল হুজুর। কী মনে করে এগিয়ে এসে ওনার গায়ে একটু ধাক্বা দিতেই উনি বেঞ্চিতে হেলে পড়ে গেলেন। নিশ্চয়ই মরে গেছে মানুষটা। চিৎকার করে লোক ডাকলাম। একে একে সবাই এল। থানা-পুলিশ হল।

আচ্ছা মাধব, গত কাল সন্ধ্যায় তোমাদের গার্ড ব্যাপারটা লক্ষ্য করেনি? মানে লোকজন বেরিয়ে যাবার পর চেক আপের দায়িত্ব নিশ্চয়ই কারও ওপর দেওয়া থাকে?

থাকে হুজুর।

কে সে, কী নাম? শিউশরণ হুজুর, ওই এসব দেখে।

ওর চোখে ব্যাপারটা পড়েনি?

ওর দুদিন যাবৎ বুখার চলছে হুজুর, তাই মনে হয় ঠিক মতন ডিউটি করতে পারছে না।

আর কেউ নেই এই কাজে?

আছে হুজুর, ও দেশে গেছে।

আচ্ছা, বলল রণিদা। তারপর জায়গাটার চারপাশ ঘুরে ঘুরে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ফেলে দেখতে লাগল।

ঢোলগোবিন্দবাবু আর আমিও চুপচাপ বসে ছিলাম না। জায়গাটার কাছাকাছি যতটা সম্ভব মনোযোগ দিয়ে খুঁজে দেখলাম কিছু পাওয়া যায় কি না। কিছু শুকনো পাতা, পরিত্যক্ত ঠোঙা, চায়ের প্লাস্টিক কাপ, শালপাতা, ইত্যাদি ছাড়া আর বিশেষ কিছুই চোখে পড়ল না। বোধহয় খুনের ঘটনায় আচমকাই ঝাঁট দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল আজ সকালে।

জিজ্ঞাসায় জানা গেল, সম্ভবত মানুষটিকে গলায় কিছুর ফাঁস দিয়েই হত্যা করা হয়েছিল। অফিসারদের কথাবার্তা অনুযায়ী সেটাই শুনেছে মাধব।

এরপর রণিদা ইনভেস্টিগেটিং টুল্স বক্স থেকে বেশ বড়ো সাইজের একটি ম্যাগনিফাইং লেন্স বার করল, সঙ্গে একটি ফরসেপস ও ছোটো একটি সেলোফেন ব্যাগ।

ওর অভিপ্রায় বুঝতে আমার দেরি হল না।

প্রায় আধঘণ্টা ধরে অসীম ধৈর্য সহকারে বেশ কিছু টুকরো-টাকরা ফরসেপসের সাহায্যে সংগ্রহ করে সেলোফেন ব্যাগে ভরল। কনস্টেবল দুজন সন্দিগ্ধ চিত্তে রণিদার কার্যকলাপ দেখছিল মন দিয়ে। এক সময় রণিদা উঠে দাঁড়াল।

কেসটা কে দেখছেন? জিজ্ঞাসা করল রণিদা।

সামনের কনস্টেবলটি অত্যন্ত নিস্পৃহ কণ্ঠস্বরে জবাব দিল, বলতে পারব না।

এরা দেখছি কিছুই বলতে পারে না, ওয়ার্থলেস সব, বিড়বিড় করে বলল রণিদা। কথাগুলি কানে এল আমার। তারপর বলল, চল রঞ্জন, একবার ময়দান থানায় যেতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রণিদা ঢোলগোবিন্দবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, কেমন বুঝছেন গোবিন্দদা?

হু-ম্-ম রহস্য এখন গাঢ় হচ্ছে। বেশ সিরিয়াসলি ভারিক্বি কণ্ঠে জবাব দিলেন ভদ্রলোক।

তারপর একটু থেমে বলতে লাগলেন, কথায় আছে না, ‘যেখানে দেখিবে যাই, উড়াইয়া দ্যাখো তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন।’ যে কোনও তদন্তের ক্ষেত্রে এই কথাটা আমি সব থেকে বেশি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করি, বুঝলে ভায়া? কিন্তু এখানে তো ওড়াবার মতন তেমন কিছু…

আমার হাসি পেয়ে গেল, কোনও মতে চাপলাম।

গাড়ির দরজা খুলে বসতে বসতে রণিদা বলল, এমন কনফিডেন্টলি ভুলভাল কথাগুলি বলেন কী করে বুঝি না।

গাড়ি স্টার্ট নিল।

মিনিট কয়েকের মধ্যেই রবীন্দ্রসদন, তথ্যকেন্দ্র প্রভৃতি বাঁয়ে ফেলে ময়দান থানায় উপস্থিত হলাম আমরা।

থানার বড়োবাবু ইন্সপেক্টর রমেন সরকার রণিদাকে চেনেন মনে হল। কারণ ঘরে ঢুকতেই ভদ্রলোক বললেন, ব্যাপার কী চক্রবর্তী, এত সকাল সকাল।

আসতে হল একটু। হেসে জবাব দিল রণিদা, ওই ভিক্টোরিয়ার মার্ডার কেসটার ব্যাপারে। কে দেখছেন ওটা?

কেসটা রাতুলকে দিয়েছি। রাতুল রায়, ইয়ং, ভেরি ডায়নামিক অফিসার। দাঁড়ান, ডেকে দিচ্ছি। টেবিলে লাগানো বেলের সুইচটায় চাপ দিলেন ভদ্রলোক। তারপর আমাদের দিকে চেয়ে আবার বললেন, আরে আপনারা দাঁড়িয়ে কেন এখনও, বসুন।

ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা তিনজন বসলাম চেয়ারে।

সেন্ট্রি কনস্টেবল বড়োবাবুর ঘরের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে বলল, স্যার ডাকছেন?

হ্যাঁ, রাতুলকে একটু ডেকে দাও তো।

স্যার, বলে পর্দা ছেড়ে চলে গেল সেন্ট্রি।

তারপর, কেমন আছেন? অনেকদিন দেখা-সাক্ষাৎ নেই, হেসে বললেন রমেনবাবু।

হ্যাঁ, সেই লাস্ট দেখা হয়েছিল ডিজি রণধাওর ছেলের বিয়েতে। উফ, ভদ্রলোক খরচও করেছিলেন বটে। উনি তো তখন ডিজি হোমগার্ড ছিলেন, তাই না?

ডিজি হুগলি ব্রিজ।

তাই হবে, বলল রণিদা, আসলে আপনাদের পুলিশ বিভাগে এতজন ডিজি মনে রাখাই কঠিন। সাধারণ পাবলিক ডিজি বলতে তো কেবল ডিজি ওয়েস্ট বেঙ্গলকেই বোঝে। এত রকম…

গুড মর্নিং স্যার, স্যালুট করে এক চাবুক চেহারার বছর ছাব্বিশের সাব-ইন্সপেক্টর দাঁড়ালেন আমাদের সামনে।

মর্নিং রাতুল, এসো তোমার সঙ্গে এনার পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি রণজয় চক্রবর্তী, প্রাইভেট ডিটেকটিভ, আ গুড পুলিশ ফ্রেন্ড বলতে পারো। এরা ওর বন্ধু। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।

ওকে স্যার, আসুন আপনারা আমার সঙ্গে, বললেন রাতুল রায়।

সৌজন্যমূলক হাসি হেসে রণিদা ওসিকে বলল, তাহলে…

হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। আপনারা যান ওর সঙ্গে। রাতুল এদের চা খাওয়াতে ভুলো না।

আপনি ভাববেন না স্যার, দরজার বাইরে থেকে উচ্চকণ্ঠে রাতুল রায় জবাব দিলেন।

ওনার পিছু পিছু আমরা আইও’জ রুম-এ গিয়ে বসলাম। প্রাথমিক আলাপ পর্ব মিটতে মিটতে চা-বিস্কুট এসে গেল।

রণিদা বলল, জানেন রাতুলবাবু, ভদ্রলোক যখন ওর দুই বন্ধুকে নিয়ে হুমকি চিঠিগুলি সমেত আমার বাড়ি গেছিলেন, তখন ব্যাপারটা এত সিরিয়াস ছিল না। কিন্তু তার দিন তিনেক পর আমার কথা মতন উনি যখন তিনটে এনভেলপ আমাকে দিতে এসেছিলেন দারুণ বিধবস্ত দেখাচ্ছিল। কোনও কারণে ভীষণ টেনশনে আছেন বলে মনে হল।

তাই নাকি।

হ্যাঁ, কিন্তু ব্যাপারটা আমাকে গোপন করে গেলেন, কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না। বললে হয়তো মানুষটাকে এভাবে বেঘোরে মরতে হতো না।

একটু থেমে রণিদা প্রশ্ন করল, আচ্ছা, কীভাবে মারা হল ওনাকে সেটা একটু বলবেন?

আ কেস অব স্ট্র্যাংগুলেশন–দড়ি বা ওই জাতীয় কিছুর দ্বারা গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ভিক্টিমকে।

মার্ডার ওয়েপনটা পাওয়া গেল?

নাহ, আততায়ী ও ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ, ওটা ফেলে যাবার মতন বোকা সে নয়, জবাব দিল অফিসার।

এরপর রণিদা ওর ব্যাগ থেকে সেই চিঠি আর এনভেলপগুলি বের করল এবং সেগুলি এগিয়ে দিল অফিসারের দিকে। বলল, মি রায়, এই সেই চিঠি ও এনভেলপগুলি।

অফিসার ওগুলি হাতে নিয়ে খুলে দেখতে লাগলেন।

রণিদা বলল, মি. রায় আপনি কাউকে দিয়ে এগুলি জেরক্স করাবার ব্যবস্থা করুন। অরিজিনাল ডকুমেন্টসগুলি আপনার সম্পত্তি এখন থেকে। ওগুলি আপনি আমার থেকে সিজ করছেন বলে সিডিতে দেখাতে পারেন, আমার কোনও আপত্তি নেই। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিতে আমার ভালোই লাগে, বিশেষত যদি তা কোনও সত্য উন্মোচনের ব্যাপারে হয়। আপনার কেসে হয়তো ভাইটাল এভিডেন্স হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে ওগুলি। আমার জেরক্স কপি পেলেই চলবে। আর এই সেলোফেন প্যাকেটটিও রাখুন। এগুলি আপনার কালেকশন হিসাবে কোর্টে পেশ করাই যুক্তিযুক্ত হবে।

থ্যাংক ইউ মি. চক্রবর্তী, বললেন অফিসার।

এরপর ভদ্রলোক একটি সিজার লিস্ট করে চিঠি আর এনভেলপগুলি অফিসিয়ালি সিজ করলেন। প্রয়োজনীয় সইসাবুদ হল। উনি একজন হোমগার্ডকে ডেকে ওগুলি জেরক্স করিয়ে আনলেন। তারপর কপিগুলি রণিদাকে দিলে রণিদা দ্রুত ওগুলি ব্যাগে ভরল।

অফিসারকে রণিদা বলল, খুব শিগগির নিশ্চয়ই আপনার তদন্ত শুরু হয়ে যাবে। উইশ ইউ গুড লাক। মাঝেমধ্যে একটু ডিসটার্ব করব, আশা করি…

না না, ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।

থ্যাংক ইউ অফিসার।

ময়দান থানা থেকে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। রণিদা গাড়ি স্টার্ট দিল।

এতক্ষণ যাবৎ ঢোলগোবিন্দবাবু একটি কথাও বলেননি। প্রতি মুহূর্তেই ভাবছিলাম, এই বুঝি কিছু একটা মন্তব্য করবেন উনি। কিন্তু ভদ্রলোক একদম স্পিকটি নট। বাধ্য হয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, কী মনে হচ্ছে ঢোলগোবিন্দবাবু?

পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অত্যন্ত বিজ্ঞের মতন উনি বললেন, ভাবছি, মার্ডারের মোটিভটা কী?

ড্রাইভ করতে করতে রণিদা ওনার দিকে একটিবার অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

ক্রমশ…

ধনী বাড়ির পাত্র কিন্তু সে টেন পাস

গতবছর আমি বিএ পাস করেছি। পাস করার পরেই বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য খুব জোর দিচ্ছে। কিছুদিন হল আমার বাড়ির সকলে আমার বিয়ের জন্য সম্বন্ধ ঠিক করেছে এবং ছেলেটির বাবা একটি পলিটিক্যাল পার্টির বড়োসড়ো নেতা। আমাদের বাড়ির থেকে ছেলেদের বাড়ির দূরত্ব খুব বেশিও নয়। ওরা আমাকে রাস্তায় দেখে পছন্দ করেছে এবং বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ছেলেটি দেখতে শুনতে বেশ ভালো কারণ আমি আমাদের পাড়াতেই ছেলেটিকে বহুবার দেখেছি। ছেলের বাড়ির প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে কিন্তু ছেলেটি মাত্র ক্লাস টেন অবধি পড়াশোনা করেছে। কাজকর্মও কিছু করে না। অথচ আমি পড়াশোনা জানা ছেলে বিয়ে করতে চাই। আমি ওই ছেলেটিকে বিয়ে করতে অনিচ্ছুক কিন্তু বাবার ইচ্ছের বিরোধিতাও করতে পারছি না। আমি এখন কী করব?

আরও পড়ুন – বাবার মৃত্যুর পর মা আমাকে মানুষ করেছেন। বাবার এক বন্ধু নিয়িমিত আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করেন যিনি কিনা আমার মাকে সব ব্যাপারে সাহায্য করে থাকেন। তাঁর প্রতি মায়ের কী মনোভাব জানি না, কিন্তু আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। এই ক্ষেত্রে কী সমাধান জানতে চোখ রাখুন –

এখনকার দিনে পড়াশোনা জানাটা সত্যি খুব দরকার, এবং আপনার ভাবনা চিন্তাটা কিছু ভুল নয়। আপনি আধুনিকা, সুতরাং ভয় না পেয়ে আপনি আপনার ইচ্ছের কথা মা-কে জানান। উনি যদি শুনতে রাজি না হন, তাহলে বাবাকে খোলাখুলি জানাতে ঘাবড়াবেন না, কারণ এটা আপনার সারা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে যে-ছেলেটির সঙ্গে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই ছেলেটি যদি যথেষ্ট বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন হয় এবং তার ব্যবহারও ভালো হয়, তাহলে আপনি ভেবে দেখতে পারেন ওকে বিয়ে করবেন কিনা। কারণ স্কুলের শিক্ষাই সবসময় সবকিছু নয়। কেউ প্রকৃত শিক্ষিত হলে স্কুলের শিক্ষাটা গৌণ হয়ে যায়। এছাড়া সে কোনও চাকরি বা ব্যাবসা না করলেও, বড়ো নেতার ছেলে ভবিষ্যতে বড়ো নেতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকতেই পারে। এই বিষয়গুলি বিচার করেই ডিসিশন নিন।

 

 

 

 

 

 

মহিলাদের রোগ অসুখ

শহরের দূষিত পরিবেশ এবং অতিরিক্ত চাপযুক্ত জীবন আমাদের শরীরে কোষের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করে দিচ্ছে৷ বিপত্তি বাড়ছে তাতেই৷কঠিন শারীরিক রোগ আপনার জীবনের সব দিকে প্রভাব ফেলতে পারে। আপনার সম্পর্ক,কাজকর্ম, শখ আহ্লাদ এবং আপনার সামাজিক মেলামেশা সবই প্রভাবিত হতে পারে। কঠিন অসুখ আপনাকে বিষণ্ন, চিন্তিত, ভীত বা ক্রুদ্ধ করে তুলতে পারে। আসুন একবার দেখে নেওয়া যাক, কোন দুটি অসুখে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছেন৷

হৃদ রোগ বাড়ছে মেয়েদের

বর্তমান সময়ে নারী-পুরুষ উভয়েরই জীবনশৈলী একই খাতে বইছে। সুতরাং হৃদরোগও আর শুধুমাত্র পুরুষদের একচেটিয়া নয়। আগের তুলনায় ক্রমশ বাড়ছে মহিলাদের মধ্যে হৃদরোগের সমস্যা।

টোব্যাকো স্মোকিং বা ধূমপানর মাত্রা বেড়ে যাওযার ফলে, আশঙ্কা করা হচ্ছে

মহিলাদের ক্রমবর্ধমান হৃদরোগের এটা অন্যতম কারণ। ধূমপানের জন্যই মহিলাদের

শরীরে নিঃসৃত ইস্ট্রোজেন ও হাই ডেনসিটি লাইপো প্রোটিনের মাত্রা হ্রাস পায়। এগুলিই বস্তুত হৃদযন্ত্রের রক্ষাকবচ। নিঃসরণের মাত্রা কমার ফলে, হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়ে।

অ্যাক্টিভ স্মোকারদের ক্ষেত্রে তো ঝুঁকি আছেই, সেই সঙ্গে অন্য কারও সিগারেটের

ধোঁযার কারণেও মহিলারা পরোক্ষ ভাবে এই ক্ষতির শিকার হন।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

গ্যাসের ব্যথার মতো কষ্ট শুরু হবে

বমি হতে পারে

কাঁধের মাঝখানে চিনচিনে ব্যথা

বুক ধড়ফড় করা

শরীরে অবশভাব।

Maintain healthy food habit

ইস্ট্রোজেন-এর ঘাটতি ডেকে আনছে বিপত্তি

জানেন কী, মেয়েদের শরীরে কেন ইস্ট্রোজেন জরুরি?

বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, মেয়েদের শরীরে নানা পরিবর্তন ঘটে। এর বেশির ভাগটাই ঘটে
বয়:সন্ধি সময়ে এই পর্যায়ে হয় ঋতুচক্রের সূত্রপাত।বয়:সন্ধির সময় থেকে

মধ্যবয়স পর্যন্ত ওভারি থেকে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নামের দুটি হরমোন নিঃসৃত হয়। মধ্যবযসে পৌঁছে ঋতুচক্র, ক্রমশ অনিয়মিত হতে হতে, পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

মেনোপজের সময়টিতে মেয়েদের ওভারিতে থাকা ডিম্বাণু শেষ হয়ে যায়। এটা প্রাকৃতিক কারণ। কিন্তু যাদের ইস্ট্রোজেন কম থাকার জন্য ঋতুচক্র প্রভাবিত হতে শুরু করে সময়ের আগেই, তাদের গাইনিকোলজিস্ট কনসাল্ট করা প্রয়োজন।

আসলে ঋতুচক্র স্বাভাবিক রাখতে, ভ্যাজাইনা এবং ইউটেরাসের কার্যক্ষমতা

অক্ষুণ্ণ রাখতে, ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হরমোনগুলিকে সেক্স হরমোনও বলা হয়। ইস্ট্রোজেনের অভাবে অনেকেরই বয়স হওয়ার আগেই, ভুলে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। হাড় ভাঙাও ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

ইস্ট্রোজেন বোন ডেনসিটি বজায় রাখে। খাবারের মাধ্যমে যে-ক্যালসিয়াম আমাদের

শরীরে প্রবেশ করে, তার অনেকটাই ইউরিন ও স্টুলের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক সময় আবার হাড়ের মধ্যে জমা হওয়া ক্যালসিয়াম, রক্তে মিশে যায়।বিভিন্ন হরমোন হাড়ের মধ্যে এই ক্যালসিয়াম ধরে রাখতে সাহায্য করে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই ইস্ট্রোজেন।

এছাড়াও লিভারে কোলেস্ট্রেরল উত্পন্ন হওয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখে ইস্ট্রোজেন। ফলে

ধমনীতে অতিরিক্ত ফ্যাট জমতে পারে না। হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও তাই কম থাকে।মোনোপজের পর বা আগে, শরীরের ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি মেটানো সম্ভব হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির দ্বারা।

ঘরোয়া উপায়ে কোষ্ঠকাঠিন্য-র প্রতিকার

অনেকে কোষ্ঠকাঠিন্য-র বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। কিন্তু যখন সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে, তখন গুরুত্ব না দেওয়ার মাশুল গুনতে হয়।  আসলে, এই কোষ্ঠকাঠিন্য হয় দুটি কারণে। একটি কারণ বংশগত। আর অন্যটি অনিয়ম এবং ভুল খাদ্যাভাসের জন্য।

শাকসবজি, ফলমূল প্রভৃতি ফাইবার-যুক্ত খাবার কম খাওযা, পর্যাপ্ত জলপান না-করা, কম পরিশ্রম করা ইত্যাদি নানারকম কারণ থাকে এই কোষ্ঠকাঠিন্য-র মূলে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে বিছানায় একটানা শুয়ে থাকা, সহজে হজম হয় না এমন খাবার বেশি খাওয়া, মানসিক চাপ, এমনকী মস্তিষ্কে টিউমার থাকলেও কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা হতে পারে।

আর শরীর থেকে মল ঠিক মতো বের না হওয়া, অর্থাৎ কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা যদি থাকে, তাহলে পাকস্থলীতে পাথর, অশ্ব, কোলন ক্যানসার প্রভৃতি নানারকম রোগভোগেরও সম্ভাবনা থাকে। অতএব, কোষ্ঠকাঠিন্যর চিকিৎসা জরুরি। কতগুলি ঘরোয়া পদ্ধতি এবং সহজলভ্য উপাদানকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করবেন, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিশদে।

প্রতিকার

  • সকালে উঠে একটু শরীরচর্চা করুন এবং তারপর এক গেলাস হালকা গরম জলে এক চা-চামচ পাতিলেবুর রস মিশিয়ে পান করুন
  • হালকা গরম দুধে একটা এলাচ ভেঙে মিশিয়ে রাখুন পাঁচ মিনিট। রাতে শুতে যাওয়ার তিরিশ মিনিট আগে পান করুন ওই দুধ
  • দুপুরে ভারি খাবার খাওয়ার একঘন্টা বাদে একটা আপেল কিংবা পেয়ারা খান, উপকার পাবেন
  • পাকা বেলের শরবত বানিয়ে খান মাঝেমধ্যে। দিনের যে-কোনও সময় পান করতে পারেন এই শরবত
  • লেবুর রস দিয়ে ছোলার ছাতুর শরবত পান করুন খালি পেটে, উপকার পাবেন
  • কুমড়ো, বেগুন, মুলো, গাজর প্রভৃতি ফাইবার-যুক্ত খাদ্যউপাদান পেটে গেলেও দূর হবে কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা

সতর্কতা : কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা দূরীকরণে ঘরোয়া পদ্ধতি প্রযোগের সুফল পেতে গেলে, পরিত্যাগ করতে হবে ধূমপান এবং মদ্যপান।

মগজধোলাই করার চক্রান্ত

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ক্যাচ দেম ইয়ং, অর্থাৎ, ওদের ছোটো থেকেই প্রভাবিত করো। ধর্মের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই করা হয়। বোধবুদ্ধি ঠিক মতো বিকশিত হওয়ার আগেই, শিশুদের মস্তিষ্কে নিজের ধর্মবিশ্বাস গেঁথে দেন অভিভাবকরা। যে-সময় শিশুরা তাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে প্রকাশ করতে পারে না, যে-সময় কোনও আপত্তি তুলতে পারে না, তখনই তাদের মগজ ধোলাই করতে সুবিধে হয় এবং এই সুযোগটাই নেওয়া হয় সিংহভাগ ক্ষেত্রে।

একটা সময় ছিল যখন শিক্ষায় সমানাধিকারও ছিল না, যা শোনা যেত, সেটাই বিশ্বাস করতে হতো। কিন্তু, ৫০০ বছরের পুরোনো ভ্রান্ত শিক্ষানীতি যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখনই বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটে। স্বেচ্ছাচারিতা যে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, তাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সত্য-মিথ্যার ভেদাভেদ এবং ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা নিয়ে আসছে প্রকাশনা মাধ্যম। তাই, মানুষের বিচারবুদ্ধি, বিশ্লেষণ ইত্যাদির ক্ষমতা বেড়েছে এবং বিবেক জাগ্রত হয়ে শুভবুদ্ধির জন্ম নিয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই ধর্মের কচকচানি যেমন সবাই মেনে নেন না এখন, ঠিক তেমনই স্বেচ্ছাচারিতাও এখন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এখন যেমন গণতন্ত্রের গুরুত্ব বেড়েছে, ঠিক তেমনই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বও বেড়েছে।

এত সত্ত্বেও, ধর্মের খেলা বন্ধ হয়নি। চলছে, চলবে এমনই অবস্থা এখন। নীতি এবং ভালোমন্দের তোয়াক্কা না করে, স্বার্থান্বেষী কিছু লোক নিজেদের মতো করে ধর্মপ্রচার করে চলেছে আজও। জারি রয়েছে লুঠপাট এবং হিংসামূলক কার্যকলাপও।

ভারতীয় জনতা পার্টির রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতি, ২০২০ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে, উঁচু ক্লাসের শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রচলিত মূল্যায়নকে বন্ধ করে, তাদের ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ তো ২০০ বছর পিছিয়ে দেওয়ার মতোই ঘটনা ঘটল।

কত বছর, কত টাকার বিনিময়ে কত কষ্ট করে সন্তানকে শিক্ষাদান করতে হয় অবিভাবকদের, সেই বিষয়টি আর তেমন গুরুত্ব পাবে না এখন। বরং গুরুত্ব পাবে, কে পড়াবে আর কী পড়বে। তাহলে কি এই শিক্ষানীতিতে এটা স্পষ্ট যে, শিক্ষার্থীরা আবার পুরাকালের শিক্ষানীতিকে আপন করে নেবে? এখন শব্দজাল বিস্তার করে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, প্রকৃত জ্ঞান পাওয়া যেত বেদ, শাস্ত্র প্রভৃতির মাধ্যমে। তাহলে জীববিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞান কিংবা সাহিত্য, কলা ইত্যাদির সামগ্রিক জ্ঞানলাভের গুরুত্ব আর রইল কি?

আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষানীতি বলবৎ হলে, আখেরে লাভ হবে প্রতিযোগী দেশগুলির। কারণ, যে-সব শিক্ষার্থীদের এই দেশীয় শিক্ষানীতি পছন্দ হবে না, তার অবশ্যই পছন্দের শিক্ষাগ্রহণের জন্য ছুটবে অন্যান্য দেশে। এর ফলে যেমন আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মেধা ব্যবহার করার সুযোগ নেবে প্রতিযোগী দেশগুলি ঠিক তেমনই, শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অর্থপ্রাপ্তি হবে আমাদের শিক্ষার্থীদের অর্থে।

আর আমাদের দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন বেশি সংখ্যায় অন্য দেশে আশ্রয় নেবে, তখন আমাদের দেশ আরও অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং অবিবেচক লোকেই ভরে থাকবে। এর ফলে, আমাদের শত্রুদেশ চিন খুশি হবে। কারণ, ওদেশের কমিউনিজম আর স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমরা আর আঙুল তুলতে পারব না।

আফ্রিকা, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা প্রভতি দেশের তো লাভ হবেই। কারণ, যাদের ইসলামি কট্টরপন্থী বলা হতো, তারাও ভারতবর্ষকে দেখে হাসবে। ১৩৮ কোটির দেশ ভারতবর্ষের যে সুনাম ছিল অসম্প্রদায়িক দেশ বলে, তা জলাঞ্জলি যাবে৷ এদেশের গরিমা হয়তো কেবল উঁচু মন্দির আর উঁচু মূর্তি নির্মাণের অহংকারের মধ্যেই এখন থেকে সীমাবদ্ধ থাকবে।

বাবার বন্ধুর প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করি

খুব ছোটোবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছি। আমি ওনাদের একমাত্র মেয়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর, বাবার অফিসেই মা চাকরি পান। তিনিই আমায় বড়ো করেছেন। কোনও অভাব অভিযোগ রাখেননি। এখন আমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত। বড় একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরতা। এখন মায়ের কষ্টটা বুঝতে পারি। আমাকে মানুষ করতে, নিজেকে অনেক আনন্দ থেকে বঞ্চিত রেখেছেন, কিন্তু আমার সাধ আহল্হাদ অপূর্ণ রাখেননি কোনোদিনও।

বাবার এক বন্ধু বরাবরই আমাদের পরিবারের খুব ক্লোজ। তিনি মায়েরও খুব ঘনিষ্ঠ। আত্মীয় মহলে কানাঘুষো শুনি, কাকু মা-কে ভালোবাসেন বলে সারাজীবন বিয়েই করলেন না। নানা বিপদে ওনাকে মায়ের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। এই বয়সেও কাকু এতো হ্যান্ডসাম যে বহু মেয়ের মাথা এখনও ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আমিও ওনার প্রতি প্রচন্ড আকর্ষণ অনুভব করি। আমার সমবয়সী ছেলে বন্ধুদের কাউকেই আমার ভালো লাগে না। তারা প্রেমের প্রস্তাব দিলেই মনে মনে একটা তুলনা চলে আসে কাকুর সঙ্গে। ওঁর মতো নির্ভরযোগ্য কাউকেই মনে হয় না । আমি কাকুকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু মায়ের মনোভাবটা পরিষ্কার স্পষ্ট করে বুঝতে পারি না। কী করব বলে দিন।

 

আপনার কথা থেকে আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে আপনার মা-ও ওই ভদ্রলোক পরস্পরকে ভালোবাসেন, সম্মান করেন ও নির্ভর করেন একে অন্যের উপর। হয়তো সামাজিক সম্মান রক্ষার্থে ওঁরা সম্পর্কের সীমা পার করেননি। আপনাকে মানুষ করার জন্য হয়তো আপনার মা আত্মত্যাগ করেছেন। নিজের ভালো করতে গিয়ে আপনাকে প্রাপ্য আদর থেকে বঞ্চিত করেননি।আপনারও উচিত এর প্রতিদান দেওয়া। আপনি বরং কাকুর সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলে তাঁর আপনার মায়ের ব্যাপারে কী মনোভাব, তা জানতে চান। ওঁরা যদি পরস্পরকে ভালোবেসে থাকেন তাহলে আপনি ওদের সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়ে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। আপনার যোগ্য কোনও মানুষ ভবিষ্যতে আপনার জীবনে আসবে। তাকে নিয়ে অবশ্যই সুখী হবেন। আপনিও মায়ের জন্য কিছু করুন। ওদের পাশে দাঁড়ান।

উড়ান

জুনি মোবাইলে সময়টা দেখে নিল। এখনও সময় আছে পার্লার পৌঁছোনোর। আগে থেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা, সুতরাং সময়মতো ওকে পৌঁছোতে হবে। নতুন নতুন বিয়ের পর ওর এইসব সাজগোজ, পার্লারে বসে রূপচর্চা খুব ভালো লাগত। এখন পানিশমেন্ট মনে হয়! আগে এইসব করার জন্য একটা মন ছিল ওর, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীর, মনে কেমন একটা শিথিলতা চলে এসেছে জুনির।

ওর বয়স এখন মাত্র সাতাশ। বড়ো বড়ো চোখ, পাতলা ঠোঁট, টিকালো নাক, কালো ঘন চুল যা কিনা স্টেপ করে কাটা, গায়ের রং একটু মাজা, যেটাকে আমরা শ্যামবর্ণ বলে থাকি। সব মিলিয়ে বেশ চোখে পড়ার মতো ব্যক্তিত্ব।

জুনি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তিন বোন, জুনি মেজো। বড়ো আর ছোটো বোন অপরূপ সুন্দরী, গায়ের রং দুধে আলতা বলতে যা বোঝায়, সেখানে জুনির গায়ের রংটাই একটু চাপা। এর জন্য মনে মনে জুনি একটু বিব্রত হতো। অথচ ওর চোখের মধ্যে এমন একটা আকর্ষণ ছিল যে, সৌমেন একবার দেখেই জুনিকে বিয়ে করতে মনস্থ করে ফেলে।

বিয়ের পাঁচ বছর পরেও জুনি আজও বুঝতে পারেনি, ওদের বিয়েতে সৌমেনের মা-বাবা আদৌ খুশি হয়েছিলেন কিনা। ওর এই একই প্রশ্ন সৌমেনকে নিয়ে। জুনি কি আদৌ সৌমেনকে খুশি করতে পেরেছে?

পার্লারে মেয়েটির দক্ষ হাত জুনির সারা মুখে মাসাজ করছে। ছোট্ট গদিপাতা বেঞ্চটায় শুয়ে আরামে চোখ বুজল জুনি, অতীতের ঘটনাগুলো চোখের সামনে এসে ভিড় করছে। সৌমেনের সঙ্গে ওর বিয়ে আজও স্বপ্ন মনে হয় জুনির। বিয়ের দিন নিজের শাড়ি, গয়না দেখে জুনি বেশ বুঝতে পারছিল ওর বোনেদের, এমনকী বান্ধবীদেরও ওকে দেখে ঈর্ষাবোধ হচ্ছে। সৌমেনদের বাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছিল বিয়ের পুরো সরঞ্জাম। লাল বেনারসিতে ঠাসা জরির বুনন, সোনার তারের কাজ। ওড়নাতেও শাড়ির সঙ্গে মানানসই কাজ করা।

গা ভর্তি গয়না, যার বেশিরভাগটাই শ্বশুরবাড়ি থেকেই আসা। বিয়ের দিন হিরের সেট দিয়ে শ্বশুরমশাই আশীর্বাদ করে গেলেন। সত্যি, কনেকে দেখে রাজকুমারীই মনে হচ্ছিল।

নতুন বউ হয়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করার সময় বুকের ভিতরটা কেমন যেন ভয়ে কাঁপছিল। এই বিশাল বাড়িতে সৌমেন থাকে। এ তো পুরো রাজপ্রাসাদ। জুনি ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল। বউভাতের দিন রাতে বউভাতের ধড়াচুড়া ছাড়ার পর, এক ফাঁকে শাশুড়ি এসে ঘরে ঢুকেছিলেন। সৌমেন অতিথিদের ছাড়তে নীচে গিয়েছিল। একটা প্যাকেট ধরিয়ে শাশুড়ি বলেছিলেন, শাড়ি ছেড়ে এটা পরে নিও। আশা করি, আজ রাত্রে কী করতে হয় সেটা তুমি জানো? প্যাকেটের ভিতর সাদা ফাইন কাগজে মোড়া সুন্দর একটা নাইটি, যেটা বিদেশ থেকে কেনা বলেই মনে হয়েছিল জুনির। শাশুড়ির কথা শুনে জুনির গাল, কান সব লাল হয়ে উঠেছিল।

অবশ্য সৌমেন ভালোবাসার পাকদণ্ডি বেয়ে খুব যত্ন করে ধৈর্য্য সহকারে জুনিকে চলতে শিখিয়েছিল। সৌমেনের বাড়ির আদবকায়দা, রীতি-রেওয়াজ, পোশাক পরার ঢং একেবারেই জুনির বাপের বাড়ি থেকে আলাদা ছিল। ধীরে ধীরে জুনি নিজেকে শ্বশুরবাড়ির আদলেই ঢেলে সাজিয়ে তোলে।

একমাস পরে যখন ও বাপের বাড়ি কয়েকদিনের জন্য থাকতে এল, সকলে ওকে দেখে অবাক হয়ে গেল। নিজেদের বাড়ির মেয়েকেই যেন চেনা যাচ্ছে না। অতি সাধারণ থেকে রাজেন্দ্রানী। শুঁয়োপোকার খোলস ত্যাগ করে যেমন পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতির আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু এই নতুন ডানা নিয়ে কতদিন সে উড়তে পারবে, সেটা তখনও সকলের অজানাই ছিল।

শ্বশুরবাড়ি ফিরে আসতেই টিকিট কাটাই ছিল, সৌমেনের সঙ্গে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবার জন্য বেরিয়ে পড়ল জুনি। মোট দুই মাসের টুর। দেখতে দেখতে দিনগুলো যেন পার হয়ে গেল। জুনির কাছে এটা রূপকথার সফর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ও আর সৌমেন। প্রথম মদ্যপান বিদেশেই। তখন ও বুঝতেও পারেনি এই আসক্তি ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে একদিন অভ্যাসে পরিণত হবে।

বাড়িতে ফিরে প্রথমেই খেয়াল করল, ওর বাড়ি থেকে আনা পুরোনো জামাকাপড় আর একটাও নেই। সবই আধুনিক পোশাকে বদলে ফেলা হয়েছে। শাশুড়ি একটা ফর্দ তৈরি করে জুনির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এ বাড়ির বউ, মেয়েের এগুলো শিখে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। আমি ব্যবস্থা করে দিয়েছি, কাল থেকেই শুরু করো।

অগত্যা দুই-তিন মাস ধরে চলল ড্রাইভিং, সুইমিং, ঘোড়ায় চড়া সবকিছু শেখার পালা। জন্মদিনে উপহার হিসেবে গাড়ি কিনে দিল সৌমেন। নিজে ড্রাইভ করে বাপের বাড়ি পেঁছোলে, জুনির মা-বাবা মেয়ের ভাগ্য দেখে, আনন্দে কেঁদেই ফেললেন।

স্বাভাবিক ভাবেই ভগবানের আশীর্বাদ বলেই মেনে নিলেন জুনির কপালকে। এত ভালো শ্বশুরবাড়ি আজকালকার দিনে ক’টা মেয়ের ভাগ্যে জোটে? বাড়ির বউকে এতটা স্বাধীনতা কে দেয়? সৌমেনের মা-বাবা মেয়েবউয়ের মধ্যে তফাত করতেন না। কিন্তু জুনির মনে হতো স্বাধীনতার উপর সকলের মৌলিক অধিকার রয়েছে। স্বাধীনতা দেওয়ার কী আছে? এটা আবার কেউ কাউকে দেয় নাকি? আধুনিক জীবন কাটাবার জন্য জুনির সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল ঠিকই কিন্তু কিছু শর্ত এবং নিয়মের গণ্ডিও মেনে চলতে হতো। মনে মনে নিজেকে পুরো স্বাধীন বলে ভাবতে পারত না জুনি। বিয়ের পাঁচ বছর পরে আজও পারে না। পার্লারে বেঞ্চটাতে শুয়ে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে ওঠে জুনির ঠোঁটের কোণায়।

পার্লার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় রোল কিনে খেতে ইচ্ছে করল। কিন্তু মনে পড়ল ডায়েটিশিয়ান এইসব ফাস্টফুড খেতে একেবারে বারণ করে দিয়েছেন।

বাড়ি ফিরে বিস্বাদ সেদ্ধ খাবার কোনও মতে গলা দিয়ে নামিয়ে নিজের ঘরে চলে এল জুনি একটু আরাম করতে।

সন্ধেবেলায় একটা সোশ্যাল ফাংশনে যাওয়ার কথা শাশুড়ির সঙ্গে। শাশুড়ির জন্য একটা বক্তৃতাও তৈরি করার কথা। সেটা করতে করতেই পাঁচটা বেজে গেল। ইচ্ছে করছিল একটু কফি খাবার। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই রান্নার ঠাকুর এসে এক গেলাস কিছু পানীয় ধরিয়ে দিল জুনির হাতে, এটা খেযে নাও দিদি। মা বলেছেন রাঙাআলু আর গাজরের রসটা বিকেলে চায়ের বদলে তোমাকে দিতে।

বাধ্য হয়ে ওষুধের মতো খেয়ে নিয়ে জুনি তৈরি হতে ঘরে চলে এল।

পেস্তা রঙের একটা জামদানি শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে পান্নার একটা হালকা সেট বেছে নিল। কপালে বড়ো একটা টিপ পরে, আয়নায় নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট হল।

গাড়িতে বসে রাস্তায় যেতে যেতে বক্তৃতা পুরো পড়ে শাশুড়িকে বুঝিয়ে দিল।

ফাংশনে কিছু ভালো লাগছিল না জুনির। সে কলমের জোরে বক্তৃতাটা তৈরি করেছিল ঠিকই কিন্তু মনে মনে জানত মনের কথা কলম দিয়ে শুধু নয়, হৃদয় দিয়ে লিখতে হয়। বক্তৃতার বিষয়টা ছিল, আমার অধিকারের প্রাধান্য বেশি, নাকি পরিবারের প্রতি দায়িত্বের…

হনিমুন থেকে ফেরার পর জুনির শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছিল না। সৌমেনের, প্রেমে তখনও হাবুডাবু খাবার অবস্থা। জুনিকে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হতে দেয় না। এক প্রকার জোর করেই সৌমেন জুনিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ফ্যামিলি ডাক্তার, জুনিকে পরীক্ষা করেই বললেন, সৌমেন মিষ্টির ব্যবস্থা করো, নতুন সদস্য আসতে চলেছে।

লজ্জায় জুনির গাল লাল হয়ে উঠল কিন্তু সৌমেন খুব খুশি হয়েে বলে মনে হল না। গাড়িতে বসতেই বলল, ওষুধ যেটা দিয়েিলাম ঠিকমতো খাওনি নাকি?

জুনি ভেবে উত্তর দিল, মনে হয় যে রাতে তোমার সঙ্গে বসে হুইস্কি খেয়েছিলাম… একটু জোরেই বলে ওঠে সৌমেন, হাউ ক্যান ইউ বি সো ইরেসপন্সিবল?

জুনি চুপ হয়ে গিয়েছিল। পুরো রাস্তা আসতে আসতে ভাবছিল হয়তো সৌমেন নতুন দায়িত্ব নিতে ঘাবড়াচ্ছে। জুনিও মাতত্বের স্বাদ পেতে পাগল হয়ে উঠেছিল এমনটাও নয়। কিন্তু যে আসতে চলেছে তাকে অস্বীকার করার ইচ্ছে জুনির ছিল না।

বাড়ি ফিরে চায়ে চুমুক দিতে দিতে সৌমেন মা-কে সব কিছু খুলে বলতেই, জুনির মনে হল শাশুড়ির মুখে বিদ্রুপের ভাব ফুটে উঠল। তিনি ব্যঙ্গ করেই বললেন, মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েদের নিয়ে এই এক মুশকিল। অবশ্য এদের কাছ থেকে কী-ই বা আশা করা যায়। বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই ছেলেপুলের মা হয়ে বসা।

জুনির চোখে জল চলে এল। সৌমেন সেটা উপেক্ষা করেই বলল, বাচ্চা নেব কি নেব না, সেটা আমাদের দুজনেরই সম্মতিতে হওয়া উচিত। আমার অজান্তেই এতসব ঘটেছে এটা সত্যিই দুঃখের। কিন্তু এই দায়িত্ব নিতে আমি এখন তৈরি নই। এখন তো সবে জীবন শুরু করেছি।

অ্যাবর্শন-এর ঘটনাই প্রথম জুনির চোখ খুলে দিল। ও বুঝতে পারল ডানা তাকে দেওয়া হয়েে ঠিকই কিন্তু কতটা সে উড়বে সেটার রিমোট কন্ট্রোল তার শ্বশুরবাড়ির হাতে রয়েছে।

নার্সিংহোমে সবকিছুই ঠিক ভাবে হয়ে গেল। শরীরে কোনও ব্যথাই বোধ করল না জুনি। কিন্তু মনের ভিতরের ক্ষতটা দগদগে হয়ে উঠল। কেউ জানল না জুনির যন্ত্রণার কথা। ও কাকেই বা বলবে? এই ভাবে প্রথম ঘটনা, দ্বিতীয় ঘটনা, ঘটনাগুলো ভিড় করতে শুরু করল জুনির মনে। রোজই নতুন নতুন রং ঢেলে সাজানো হতো জুনির পাখা দুটোতে কিন্তু কেউই একবারের জন্যও জুনিকে জিজ্ঞেস করত না, রংগুলো আদৌ তার পছন্দ কিনা।

অথচ সবার চোখে জুনির মতো ভাগ্যবতী অন্য কোনও মেয়ে নজরে আসত না। সবার শ্বশুরবাড়িতেই নানা রকমের নিষেধ মানামানির ব্যাপার থাকে। অথচ জুনির কাছে আধুনিক পোশাক থেকে শুরু করে দেশবিদেশ ঘোরা, নিজের পছন্দ মতন কাজ করা, দামি পার্লারে গিয়ে রূপচর্চা করানো এত স্বাধীনতা কোন শ্বশুরবাড়ি থেকে দেয়? জুনির এই সুখ সকলের মনে ঈর্ষাই জাগাত।

বাপের বড়ি যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল জুনি। হালকা নীল রঙের চিকন কাজের সুতির সালোয়ার কামিজ পরেছিল সে। গলায় পাতলা একটা সোনার চেন আর হাতে দুটো করে সোনার চুড়ি। তৈরি হয়ে ঘরের বাইরে আসতেই মুখোমুখি হতে হল সৌমেন আর শ্বশুরমশাইযে।

একী জুনি! এই পোশাকে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছ? ভালো শাড়ি কি নেই? হতভম্ব হয়ে জুনিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন শ্বশুরমশাই।

সৌমেনও বাবার সঙ্গে গলা মেলাল, বাবা ঠিকই বলেছে। ভদ্র পোশাকে যাও, এটা পরার মতো পোশাক হল? বম্বের কলানিকেতন থেকে যে-শাড়িটা কিনে দিয়েিলাম সেই সিল্কটা পরে যাও। যাও চেঞ্জ করে এসো।

কলের পুতুলের মতো জুনি আবার নিজের ঘরে চলে এল। সৌমেনের দেওয়া প্রত্যেকটা শাড়ি যেমন দামি তেমনি সুন্দর। কিন্তু জুনি কাউকে এটা বোঝাতে পারে না, এত দামি শাড়ি আর দামি দামি গয়না ওর আর বাপের বাড়ির সকলের মধ্যে একটা দেয়াল তুলে দেয়। ওর এই দামি শাড়ি, গয়না দেখে তাদের মনে একটা হীনম্মন্যতা জন্ম নেয়। প্রাণখুলে কেউই তেমন আর কোনও কথা বলতে পারে না।

গলির মুখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে জুনি পা টিপে টিপে বাড়ির ভেতর ঢোকে। জুনির মা ঠিকই টের পান মেয়ে আসা, কী রে জুনি, তুই এলি?

জুনি আবার সেই পুরোনো জুনি হয়ে ওঠে, উফ মা তুমি কী করে বুঝতে পারো বলো তো?

রান্নাঘরে এসে ঢোকে জুনি। মা রান্নায় ব্যস্ত। হাত ধুযে একটা প্লেট নিযে রান্না করে রাখা ছানার কোফতা তুলে খেতে শুরু করে দেয়।

জুনি, সাবধানে খা। এত দামি শাড়ি, একটু ঝোল পড়লেই শাড়িটা খারাপ হয়ে যাবে, মা সাবধান করলেন জুনিকে।

মা আর জুনির গলার আওয়াজ পেযে আরও দুই বোন এসে রান্নাঘরে ঢুকল। দিদি ফোড়ন কাটল, সেই ভালো জুনি, তুই ডাইনিং টেবিলে বসে কাঁটা-চামচ দিয়ে বরং খা। মা আমরা তো আছি বাসন ধুযে রান্নাঘর পরিষ্কার করার জন্য।

ছোটোবোন বলল, দি, তোকে কী দিই বলতো পা রাখার জন্য? তোর মাটিতে পা একেবারে মানায় না।

জুনি ওদের বক্রোক্তি গায়ে মাখল না। প্লেট-টা ধুযে বলল, চল, বাচ্চাগুলোর জন্য খেলনা নিযে এসেছি, দিয়ে দিই।

বিদেশ থেকে আনা খেলনাগুলো দুই বোনের ছেলেমেয়েের মধ্যে ভাগ করে দিল জুনি। ছোটো বোন হেসে বলল, দি, এত দামি দামি খেলনা প্লিজ আনিস না। খারাপ হয়ে গেলে আমরা ঠিকও তো করতে পারব না।

জুনি কী করে বলবে, সৌমেনের পছন্দ করা এসব খেলনা। জুনির কথা ওখানে কে শুনবে?

খেতে বসে মায়ের হাতের কচু শাক, লাউয়ে ঘন্ট, ছানার কোফতার ডালনা আর মাংস গোগ্রাসে জুনিকে খেতে দেখে মা হেসে ফেললেন। বললেন, কী রে শ্বশুরবাড়িতে খেতে দেয় না বুঝি? দেশবিদেশের কত রকমের খাবার খেযে বেড়াস। ওগুলো খেয়ে তোর মন ভরে না বুঝতে পারছি।

রাতটা মায়ের কাছে কাটাবারই কথা বলে এসেছিল জুনি। কিন্তু ঠিক সন্ধেবেলায় সৌমেনের ফোন এল, বড়ো পিসিমা হঠাত্ এসেছেন, তোমাকে বাড়ি চলে আসতে হবে। আমি ড্রাইভার পাঠিয়ে দিচ্ছি। ফোন রেখে দিল সৌমেন।

ড্রাইভার এসে বেল দিতেই জুনি দরজা খুলে দিল। ড্রাইভারের হাত দিয়ে শাশুড়ি সবার জন্য জামাকাপড় আর প্রচুর মিষ্টি পাঠিয়েছেন দেখল জুনি। বোনেদের হাতে উপহারগুলো তুলে দিতে দিতে জুনি স্পষ্ট বুঝতে পারল আনন্দে, লোভে ওদের চোখ চকচক করছে। জুনির ঠোঁটের মলিন একটুকরো হাসিটা সকলের চোখ এড়িয়ে গেল। মা কিছুটা ধরতে পারলেন ঠিকই, ইচ্ছে হল মেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেন, হ্যাঁ রে তুই ভালো আছিস তো জুনি? কিন্তু পরক্ষণেই দামি শাড়ি, জামাকাপড়, মিষ্টির মোহ তাঁরও চোখকে পর্দার আস্তরণে ঢেকে দিল।

জুনি ভালো মতোই জানত সৌমেন আর ওর মা-বাবা কিছুতেই ওকে বাপের বাড়িতে রাত্রিবাস করতে দেবে না।

বাড়ি ঢুকতেই শাশুড়ি জড়িয়ে ধরলেন জুনিকে, সৌমেনের পিসিমা তোমাকে দেখবেন বলে একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছেন। তাড়াতাড়ি শাড়ি বদলে বসবার ঘরে এসো।

জুনি আবার শাড়ি বদলে বসবার ঘরে ঢুকে পিসিমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। জুনির মাথা থেকে পা অবধি পর‌্যবেক্ষণ করলেন পিসিমা, ভালো খবরটা কবে দিচ্ছ? খাওয়াদাওয়া করো ঠিকমতন?

সোফায় এসে বসল জুনি। এবার পিসিমা এসে পাশে বসে হাত দিয়ে জুনির মুখটা তুলে ধরলেন, বললেন, বাঃ শ্বশুরবাড়ির রং তো দেখছি ভালোই লেগেছে তোমার গায়ে এখানকার সুখসুবিধে পেয়ে কেমন লাগছে তোমার?

চুপচাপ বসে রইল। কী উত্তর দেবে বুঝে ঠিক করতে পারল না জুনি।

রাতে মদ্যপান করতে করতে সময়ে খেয়াল ছিল না জুনির। চোখ বুজে আসছিল। গেলাস ভর্তি এই পানীয়টাই একমাত্র ওকে শান্তি দিতে পারে। আলাদা জগতে বিচরণ করতে পারে, যেখানে সে ছাড়া আর কেউ থাকে না। নিজের ইচ্ছেমতন যা খুশি করতে পারে।

সকালে যখন ঘুম ভাঙল জুনির তখন বাইরে রোদ ঝলমল করছে। সৌমেন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল। জুনিকে দেখে বলল, এত কেন খাও যখন ওটা তোমার সহ্য হয় না?

মৃদু হাসল জুনি, তাহলে পান করার কী অর্থ নেশাই যদি না হল তো…

একাকিত্ব আর শূন্যতা ধীরে ধীরে জুনিকে গ্রাস করতে আরম্ভ করল। কিন্তু বাইরে থেকে কেউই সেটা বুঝতে পারল না। সে নিজের মতো করে জীবনটাকে বোঝার চেষ্টা করছিল কিন্তু সেটা কারওরই বোধগম্য হচ্ছিল না।

একদিন জুনি সৌমেনকে বলল, আমিও তোমার সঙ্গে অফিস যেতে চাই। সৌমেন খুশিই হল। ও রাজি হয়ে গেল। জুনি রোজ সৌমেনের সঙ্গে অফিস যেতে আরম্ভ করল। কিন্তু ওখানেও তার বিশেষ কিছুই করার ছিল না। দাবার ঘুঁটির মতো জুনির অবস্থা। এক কথায় বলতে গেলে সবকিছুই তার কিন্তু কোনও কিছুই যেন তার নিয়ন্ত্রণে নয়।

মরুভমির মতো হয়ে উঠল জুনির জীবনটা। জায়গায় জায়গায় মরীচিকা দেখা গেলেও জল কোথাও নেই সুতরাং তেষ্টা মিটবে কী করে? কয়েক মাস পরে নিজেই অফিস যাওয়া ছেড়ে দিল। অফিসে ওর পরিচিতি বলতে একটাই ছিল, সৌমেনের ওয়াইফ।

সৌমেনের কাকার ছেলের বিয়েতে বাড়িশুদ্ধু সবাই উপস্থিত ছিল। ককটেল পার্টি চলছিল। লাল রঙের অফ শোল্ডার গাউন আর রুবির গয়নার সেট-টায় অপরূপা হয়ে উঠেছিল জুনি। হালকা মিউজিকের সঙ্গে সকলেই ডান্স করছিল। কারও কারও হাতে গেলাস। দুটো পেগ আগেই খাওয়া হয়ে গিয়েিল জুনির। সৌমেনকে জড়িয়ে ধরল সে। কানের কাছে মুখ নিযে এসে বলল, সৌমেন আমি উড়তে চাই, আমাকে খাঁচায় বন্ধ করতে চেও না। আমি একটা সাধারণ মেয়ে আমাকে অসাধারণ করে তোলার জেদ ছেড়ে দাও।

কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সৌমেন খেয়াল করল ডান্স ফ্লোরে প্রায় সকলেরই চোখ ওদের উপর। জুনি কথাগুলো আস্তে বলতে চাইলেও আশেপাশে সকলের কানেই পেঁছেছে কথাগুলো। আরও কিছু না বলে বসে, এই ভয়ে সৌমেন ওর হাত ধরে একটু জোর করেই বাইরে এনে গাড়িতে তুলে দেয়। তারপর সোজা ড্রাইভ করে বাড়ি চলে আসে। সারারাত সৌমেনের ঘুম আসে না। কেন জুনি এরকম বলল? কী অভাব রেখেছে সৌমেন? কোথায় ভুল করে বসল সে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে লাগল বারবার সৌমেন।

সকালে জুনি ঘুম থেকে উঠতেই সৌমেন জিজ্ঞাসা করল, তুমি সত্যি করে কী চাও জুনি? সবাই তোমার মতো জীবন পেতে চায় অথচ তোমার কাছে এরকম জীবনের কোনও কদরই নেই।

কী উত্তর দেবে জুনি? শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জানলার বাইরে। মনের মধ্যে তোলপাড় হতে থাকল, সত্যিই কি বাস্তবে জুনি এমনটাই চেয়েছিল?

সোশ্যাল ফাংশন অ্যাটেন্ড করা, এলিট ক্লাবের মেম্বার হয়ে সৌমেনের সঙ্গে পার্টি অ্যাটেন্ড করতে যাওয়া, কোনও অনুষ্ঠানে অতিথির আসন অলংকৃত করতে শাশুড়ির সঙ্গে সেখানে গিয়ে বসে থাকা, পার্লার যাওয়া নয়তো শপিং আর নয়তো বাড়িতে চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা। এটাই জীবন হয়ে উঠেছিল জুনির। জীবনের সব রং হারিয়ে গিয়েছিল তার জীবন থেকে।

তখনই একদিন খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ে। স্থানীয় কলেজে লেকচারারের পোস্ট। ইতিহাসের লেকচারার চাইছে। যে-বিষয়ে ও নিজে পড়াশোনা করেছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই আবেদন পাঠাল। সাক্ষাত্কারও চুপচাপ দিয়ে এল। জয়েনিং লেটার হাতে পেয়ে সৌমেনকে জানাল। সৌমেন বাড়ির সবাইকে।

রাতদিন হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো জুনিকে।

কী দরকার ছিল এরকম চাকরি নেওয়ার। পদে পদে, যেখানে ধাক্কা খেতে হবে?

যা রোজগার হবে তার থেকে বেশি টাকা পেট্রোলেই চলে যাবে?

রোদে বৃষ্টিতে সেই দৌড়ঝাঁপ করতে হবে, তখনই বুঝতে পারবে কত ধানে কত চাল। চাকরি করার যখন এতই শখ নিজেই যাওয়া আসা করবে আর নিজের খরচ নিজেই চালাবে।

এরকম হাজারো শব্দবাণ রোজ জুনির উপর বর্ষাতে আরম্ভ করল বাড়িতে। আর চুপচাপ মুখ বুঝে সব সহ্য করতে থাকল জুনি। ভুল তো করেছিল প্রথম থেকেই। ওড়বার জন্য দুটো ডানার রিমোট কন্ট্রোলটা স্বামী আর শ্বশুর-শাশুড়িকে দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আর নয়। নিজের উড়ান এবার সে নিজেই ঠিক করবে। মুখ থুবড়ে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়াবে। জীবনের রামধনু রং-কে নিজের চোখে পরখ করতে উতলা হয়ে উঠেছিল জুনি।

পার্লার থেকে বেরোতে বেরোতে জুনি ভাবছিল, রাস্তা যখন আমার তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও আমার। আমার ছোটো ছোটো স্বপ্নপূরণ করাটাই আমার মনের একান্ত ইচ্ছা। এটাই আজ থেকে সত্যি আমার জীবনে। নিজের মনের ভেঙে পড়া ডানা দুটোকে আবার জোড়া লাগাতে তত্পর হয়ে উঠল জুনি। এখনও অনেকটা পথ যাওয়া বাকি!

জলে রোগ নিরাময়

জল ছাড়া কোনও প্রাণী বাঁচতে পারে না। অথচ নানা হেলাফেলায় আমরা জল বিভিন্ন ভাবে নষ্ট করি। অথচ আর কিছু বছরের মধ্যে আশঙ্কা করা হচ্ছে এই জল নিয়েই সারা পৃথিবীতে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হবে, কারণ তখন জল নিয়ে হাহাকার পড়ে যাবে। জলের অভাবে একে অপরের ক্ষতি করতে মানুষ মুহূর্ত চিন্তা করবে না। সুতরাং জল সংরক্ষণ করার সময় এসে গেছে। শরীরের নানা সমস্যায় জলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এখানে আলোচিত হল।

  • সকালে ১ গেলাস ঈষদুষ্ণ জল যদি রোজ খাওয়ার অভ্যাস করা যায় তাহলে শারীরিক নানা সমস্যা থেকে শরীরকে মুক্ত রাখা যাবে
  • গরম জল শরীরের মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে
  • নাক বন্ধ হয়ে গেলে গরম জল নাসাল মিউকাস ভেলোসিটি বুস্ট করতে সাহায্য করে। ব্লাড সার্কুলেশন বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে ব্লাড প্রেশার ইমপ্রুভ করবে এবং হার্টের অসুখ হওয়ার প্রবণতা কম হবে
  • দাঁতের জন্যেও হালকা গরম জল খাওয়া খুব উপকারি। ডাক্তাররাও হালকা গরম জল দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে বলেন
  • খাবার হজম করতেও সাহায্য করে গরম জল। সকালে খালি পেটে ১ গেলাস গরম জল খেয়ে নিলে সারাদিন ডাইজেস্টিভ সিস্টেম সক্রিয় থাকে
  • দিনের মেন মিলের পর যদি গরম জল খেয়ে নেওয়া হয়, তাহলে ফ্যাট গলাতে সাহায্য করে
  • রাতে ঘুমোনোর আগে এক কাপ গরম জল খেয়ে নিলে রাতে উঠে টুকটাক খাবার খাওয়ার ইচ্ছে চলে যায়
  • মাসল রিল্যাক্স করতে কার্যকরী। এর ফলে শরীরের যে-কোনও ব্যথা থেকে আরাম পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত ঘুমোতেও সাহায্য করে
  • শরীরের বিষাক্ত পদার্থ ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বার করে দিতে সহায়তা করে
  • মুড সুইং হতে দেয় না
  • এছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে শরীর রাখে হেলদি এবং ফিট ।

বলিউডে পা রুক্মিণী মৈত্রর

রুক্মিণী মৈত্র বেশ কিছুকাল যাবৎ কাজ করে চলেছেন টলিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। যদিও তাঁকে বাংলার মানুষ টলিউডের সুপারস্টার দেবের বান্ধবী হিসেবেই বেশি চেনে। সম্প্রতি জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছিল যে, দুজনে নাকি শিঘ্রই ঘাঁটছড়া বাঁধতে চলেছেন। কিন্তু আপাতত সে গুড়ে বালি। কারণ এবার রুক্মিণীর  ডাক এসেছে মুম্বাইয়ে হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করার জন্য। সম্প্রতি বলিউড অভিনেতা বিদ্যুৎ জামওয়াল নিজে এই কথা ঘোষণা করেছেন। সিনেমার নাম ‘সনক: হোপ আন্ডার সিজ’।

মডেলিং দিয়ে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন রুক্মিণী। তবে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসার সূত্রপাত দেবের সংস্পর্শে এসেই। প্রথমবার ‘চ্যাম্প’ সিনেমায় দেবের সঙ্গে জুটি বেঁধে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে পদার্পণ করেন রুক্মিণী। ছ’টা ছবি করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। প্রত্যেকটিতেই চরিত্র নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। এবার হিন্দিতে!

রুক্মিণী মৈত্র বলছেন, “সকলের আশীর্বাদ চাই। ভীষণ নার্ভাস লাগছে। প্রত্যেকটি সিনেমায় কাজ করার আগে আমার এমন অনুভূতি হয়। বাংলায় বেশ কয়েকটি সিনেমা করার পরও নতুন ছবির ক্ষেত্রে প্রথমদিন সেই একই নার্ভাসনেস কাজ করে আমার মধ্যে। কারণ, দিনের শেষে দর্শকরা তো আমার অভিনয় দক্ষতাটা দেখেই আমায় বিচার করবে, তাই না! আশা করি, হিন্দিতেও দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারব।”

বিদ্যুতের ছবি ঘিরে ইতিমধ্যই বেশ চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। কারণ তাঁর ছবি মানেই যে অ্যাকশন প্যাকড সিকোয়েন্স থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিনেমাটির পরিচালনায় রয়েছেন কণিষ্ক শর্মা এবং প্রযোজনায় বিপুল শাহ।

‘সনক’ বস্তুত অ্যাকশন -থ্রিলার ধর্মী সিনেমা, যার সঙ্গে গল্পে প্রেম-রোমান্স-আবেগের পাঞ্চ দেওয়া হয়েছে বেশ মুনশিয়ানার সঙ্গে। বিপুল-বিদ্যুতের জুটি শুনে অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন যে, এই সিনেমা ‘কম্যান্ডো’র সিক্যুয়েল হতে যাচ্ছে।। তবে সেই ধারণা ভুল বলে উড়িয়ে দিয়েছেন নির্মাতারা। তাদের কথায়, ‘সনক’ একেবারে নতুন গল্প। চলতি বছরের শেষের দিকেই শুরু হবে ছবির শুটিং। বেশ কিছু বিলাসবহুল লোকেশনকে ইতিমধ্যেই বেছে নেওয়া হয়েছে। বাজেটও সাধারণের তুলনায় বেশি। রুক্মিণীর পাশাপাশি এই সিনেমায় দেখা যাবে আরেক বাঙালি অভিনেতা চন্দন রায় সান্যালকেও।

জ্বর মানেই করোনা-আক্রান্ত নন

মনে রাখবেন, সাধারণ ঠান্ডা লাগা থেকেও জ্বর আসতে পারে, আবার মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গি-আক্রান্ত হলেও জ্বর আসতে পারে। সেইসঙ্গে, লিভার ডিজিজ বা জন্ডিস-এর কারণেও গায়ে অনুভত হতে পারে জ্বর জ্বর ভাব। অতএব, এ ক্ষেত্রে মেনে চলুন চিকিৎসকের পরামর্শ। তাঁদের মতে–

যা যা করণীয়

  • ২৪ ঘন্টার বেশি যদি গায়ে জ্বর থাকে তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
  • কী হয়েছে  তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মতো যাবতীয় পরীক্ষা করান
  • লিভারকে ঠিক রাখুন। এরজন্য বেশী তেলমশলা-যুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করুন। শাকসবজি এবং ফাইবার-যুক্ত খাবার খান। বন্ধ করুন ধূমপান এবং মদ্যপান। আর লিভারকে ঠিক রাখার জন্য প্রতিদিন পান করুন তিন-চার লিটার জল
  • শরীরকে জোগান দিন প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেলস প্রভৃতি। এর জন্য মাছ, মাংস, টাটকা সবজি, সবরকম ফল এবং গ্রিন-টি খান নিয়মিত এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। কোনও ভাবে যেন শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমা না হয়
  • রাতে অন্তত আট ঘন্টা ঘুমোন
  • বাড়ির আশপাশে কোথাও জল জমতে দেবেন না। মশারি টাঙিয়ে শোবেন
  • তিনটে লেয়ার-যুক্ত মাস্ক পরবেন বাইরে বেরোলে এবং অন্যের সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবেন
  • থাইরয়েড থাকলে নিয়মিত ওষুধ খাবেন। আর ঠান্ডা লাগার হাত থেকে বাঁচতে, হালকা গরম জলে স্নান করবেন প্রতিদিন সকাল৷

কঠিন শারীরিক রোগ আপনার জীবনের সব দিকে প্রভাব ফেলতে পারে। আপনার সম্পর্ক,কাজকর্ম,ধর্মবিশ্বাস এবং আপনার সামাজিক মেলামেশা সবই প্রভাবিত হতে পারে। কঠিন অসুখ আপনাকে বিষণ্ন, চিন্তিত, ভীত বা ক্রুদ্ধ করে তুলতে পারে।কোনো ব্যক্তি যদি শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ হন, তবে তার দেখাশুনা করা খুব ক্লান্তিদায়ক কাজ। আপনি বিপযর্স্ত বোধ করলে, সাহায্য নিন।ডাক্তারের সঙ্গে কথা না বলে ঔষধ বাড়াবেন না, কমাবেন না বা বন্ধ করবেন না। এর সঙ্গে অন্য ভেষজ কিছু ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। যদি কোনো কষ্টকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, আপনার ডাক্তার বা নার্সকে জানান। মুখ বুজে সহ্য করবেন না

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব