তিলোত্তমা টরোন্টো (পর্ব ০৪)

আমাদের এর পরের গন্তব্যস্থল ছিল ডিসটেলারি ডিস্ট্রিক্ট। প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে। ডিসটেলারি ডিস্ট্রিক্ট-কে টরোন্টোর শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদনের সার্থক ঠিকানা বলা যেতে পারে। এখানে এসে প্রথম চোখে পড়ল ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপিয়ান স্থাপত্যকলা। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি ইমারতগুলো এক সময় হুইসকি বানানোর কারখানা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। এখান থেকে সারা পৃথিবীতে হুইসকি রফতানি করা হতো। তবে এখন এটাকে টুরিস্টদের প্রিয় সান্ধ্য বিনোদনের জায়গা বলা যেতে পারে। এখানে বিকেলের পর থেকে রোজ কিছু না কিছু লেগেই থাকে।

টুরিস্টদের বিনোদনের জন্য অনেক রাত পর্যন্ত এখানে নাচ, গান, নাটক— এসব চলতেই থাকে। আশেপাশে বিভিন্ন রকমের ও বিভিন্ন বাজেটের পানীয়ের দোকান আর রেস্তোরাঁ রয়েছে। এখানে টুরিস্টরা বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে অ্যালকোহল টেস্ট করে। তবে আরেকটি বিশেষত্ব হল এখানে গাড়ি নিয়ে ঢোকা যায় না। সম্পূর্ণ জায়গাটাই পদযাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত। এখানে ডিনার করে তারপর কিছু অনুষ্ঠান দেখে হোটেলে ফিরতে রাত ন’টা বেজে গেল।

আজ টরোন্টোতে আমাদের তৃতীয় দিন। আগে থেকেই অনেক কিছু পরিকল্পনা করা আছে। জানি না তার কতটুকু শেষপর্যন্ত ঘুরে দেখতে পারব। সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে সারাদিনের জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আজ আমাদের গন্তব্য স্থল নায়াগ্রা ফল্স। তবে তার আগে আরও অনেক জায়গায় যাবার পরিকল্পনা আছে। হোটেল থেকে বেরিয়ে কুইন এলিজাবেথ ওয়ে ধরে ১৩০ কিলোমিটার পথ ড্রাইভ করে পৌঁছোলাম মিসিসউগা বিচে। ১৩০ কিলোমিটার পথ আসতে দের ঘন্টারও কম সময় লাগল।

জায়গাটার নাম ‘নায়াগ্রা অন দ্য লেক’। এই সেই জায়গা, যেখানে বিখ্যাত নায়াগ্রা নদী এসে ওন্টারিও হ্রদে মিশেছে। এই নায়াগ্রা নদীর এক দিকে কানাডা, অন্য দিকে আমেরিকা। গাড়ি পার্ক করে একটু হেঁটে বিচের পথে যেতেই চোখে পড়ল মিসিসউগা ফোর্ট। ওন্টারিও হ্রদের ধারে এই ফোর্টের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ব্রিটিশ উপনিবেশ গড়ে তোলার আগে এখানে কানাডার আদিবাসীরা বাস করত। ১৮০৪ সালে মিসিসউগা পয়েন্টে প্রথম লাইট হাউজ তৈরি হয়। কিন্তু ১৮১৩ সালে ব্রিটিশ এই অঞ্চল দখল করে নেয়। আর তারপর থেকেই শুরু হয় অন্য এক ইতিহাস।

আমরা মিসিসউগা ফোর্ট থেকে হেঁটে মিসিসউগা বিচের দিকে গেলাম। ওন্টারিও হ্রদের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পেলাম। এখানে টুরিস্টদের ভিড় একটু কম। সেইজন্যই হয়তো এখনও সেই শান্ত, নির্মল বাতাবরণটা রয়ে গেছে। এখান থেকে চলে যেতে মন চাইছিল না। তবুও সব ভালো লাগার একটা শেষ থাকে। তাই আমাদেরও পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগোতে হল।

(ক্রমশ…)

ব্যঞ্জনে বাঙালিয়ানা (পর্ব-০২)

কুচো চিংড়ি দিয়ে কচুপাতার বড়া

উপকরণ : ১১/২ বাটি বেসন, ১ ছোটো চামচ আদা-রসুন পেস্ট, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জোয়ান, ১/২ ছোটো চামচ জিরেবাটা, ৩-৪টে কচুপাতা, ভাজার জন্য পর্যাপ্ত তেল, নুন প্রয়োজনমতো, টুথপিক।

ভাজার জন্য : ১ কাপ কুচো চিংড়ি ধুয়ে পরিষ্কার করা, ১ টেবিল চামচ আদা-রসুন পেস্ট, ১টা পেঁয়াজ কুচি করা, ১/২ ছোটো চামচ নুন, ১/৪ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ তেঁতুলের জল।

প্রণালী: তেঁতুলটা বাদ দিয়ে পুরের সমস্ত উপকরণ অল্প তেলে কড়ায় নেড়ে নিন। কচুপাতাগুলো ধুয়ে, রুমালের মতো টুকরো করে নিন। বেসন জল দিয়ে গুলে অল্প নুন দিয়ে একটা পাত্রে রাখুন। কচুপাতা বেসনে ডুবিয়ে, ভেতরে চিংড়ি পুর ভরে পোঁটলার মতো তৈরি করুন। প্রত্যেকটির মুখ টুথপিক দিয়ে আটকে দিন। এবার জলের উপর ঝাঁঝরি বসিয়ে এই কচুপাতার পোঁটলাগুলো ভাপিয়ে নিন। অবশিষ্ট বেসনে তেল বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত উপকরণ মিশিয়ে নিন। এবার কড়ায় তেল গরম করুন। প্রত্যেকটি কচুপাতার পোঁটলাকে বেসনে ডুবিয়ে তেলে ভেজে নিন। গরম গরম সার্ভ করুন।

কুড়মুড়ে বেগুন ভাজা

উপকরণ : ১টি বড়ো গোলাকার বেগুন, ১/২ কাপ চালগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ভাজার জন্য তেল, নুন পরিমাণমতো।

প্রণালী: বেগুন গোল গোল টুকরোয় কেটে নিন। নুন-হলুদ ও লংকাগুঁড়ো মাখিয়ে, কিছুক্ষণ রেখে দিন। এবার কড়ায় তেল গরম করুন। বেগুনের টুকরো চালগুঁড়ো মাখিয়ে ডোবা তেলে ভেজে নিন।

স্টাফড ঝিঙে

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম ঝিঙে, ১০০ গ্রাম পনির বা ছানা মিহি করে চটকানো, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ২ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ মৌরিগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ আমচুর পাউডার, নুন-মিষ্টি স্বাদমতো।

ফোড়নের উপকরণ : ৪টে লবঙ্গ, ৪টে গোলমরিচ, ১ ইঞ্চি দারচিনির টুকরো, ১টা বড়ো এলাচ, ১টা তেজপাতা, ২ ছোটো চামচ সরষের তেল।

প্রণালী: কড়ায় অল্প তেল দিয়ে ছানা অথবা পনিরের সঙ্গে সমস্ত মশলা দিয়ে নেড়েচেড়ে পুর বানিয়ে নিন। এবার ঝিঙে খোসা ছাড়িয়ে বড়ো বড়ো টুকরো করুন। মাঝখানটা ফালি করে পনিরের পুর ভরে রাখুন। ননস্টিক প্যানে তেল গরম করে ফোড়নের উপকরণ দিয়ে দিন। এবার সাবধানে পুরভরা ঝিঙের টুকরোগুলো ভেজে নিন। একটু ঢাকা দিয়ে রান্না করুন যাতে ঝিঙে নরম হয়ে যায়।

তিলোত্তমা টরোন্টো (পর্ব ০৩)

জার্মান সুরকার বাখ-এর অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে ইয়ো ইয়ো মা নদীর ধারের ঢেউ খেলানো ল্যান্ড স্কেপের জন্য এই পার্কের ডিজাইন তৈরি করেছিলেন। এই পার্কটি যদিও আমেরিকার বস্টনে তৈরি হবার কথা ছিল। কিন্তু কোনও কারণবশত সেটা না হওয়ায়, টরোন্টোর মেয়র বার্বরা হলের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত টরোন্টোতেই এই মিউজিক পার্ক তৈরি হয়।

পুরো পার্কটিকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সর্ব শেষে আছে ঘাস বিছানো সিঁড়ি, যার শেষ হয়েছে একটা মুক্ত মঞ্চে। কানাডার গ্রীষ্মকালে, সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এখানে অনেক রকমের সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আমরা কিছুক্ষণ একজন কানাডিয়ান গায়কের গান শুনে ওয়াটার ফ্রন্ট ট্রেইল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাছেই একটা রেস্তোরাঁতে ডিনার করে হোটেলে ফিরলাম।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে রওনা দিলাম টরোন্টো জু-র উদ্দেশ্যে। প্রায় আধ ঘণ্টা লাগল পৌঁছোতে। এখানে এসে প্রথমেই একটা মজার ব্যাপার চোখে পড়ল। এখানে গাড়ি পার্ক করার কোনও প্রয়োজন নেই। গাড়ি নিয়েই সবাই চিড়িয়াখানার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। ৭১০ একর জায়গা নিয়ে এই চিড়িয়াখানা তৈরি করা হয়েছে। এটাই কানাডার সব থেকে বড়ো চিড়িয়াখানা। এই চিড়িয়াখানাকে সাতটি ভৌগোলিক সীমারেখার ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে। তার মধ্যে আছে আফ্রিকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলেশিয়া, কানাডা, ইউরেশিয়া, ইন্দো-মালয় আর তুন্দ্রা।

চিড়িয়াখানার ভেতরে রয়েছে প্রায় দশ কিলোমিটার হাঁটা পথ। একদিনে সম্পূর্ণ চিড়িয়াখানা হেঁটে দেখা সম্ভব নয়। তাই গাড়ি নিয়ে গেলে সহজেই সব জায়গাগুলো ঘুরে দেখা যায়। এই চিড়িয়াখানা তৈরি হয়েছিল মানুষ আর পশুদের মধ্যে একটা মেল বন্ধন তৈরি করার জন্য। আমরা হয়তো অনেকেই জানি পৃথিবীতে অনেক পশু ইতিমধ্যেই অবলুপ্ত, আর কিছু বিলুপ্তির পথে। এই চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে বিপন্ন পশুদের অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে। এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত পাঁচ হাজারের উপর পশু রয়েছে।

ছোটো বাচ্চাদের মধ্যে এই চিড়িয়াখানা খুবই জনপ্রিয়। সময় কোথা দিয়ে কেটে যাবে বোঝার আগেই বিকেল হয়ে যাবে। চিড়িয়াখানার ভেতরে বিশ্রাম নেবার জন্য আবার ছোটো ছোটো পার্ক রয়েছে। আমরা বাইরে থেকে খাবার নিয়ে যাইনি বলে চিড়িয়াখানার ভেতরেই রেস্তোরাঁতে লাঞ্চ করে আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম।

চিড়িয়াখানা থেকে ফেরার পথে চোখে পড়ল আগা খান মিউজিয়াম। বাইরে থেকে দেখেই বুঝলাম, এর স্থাপত্য চোখে পড়ার মতো। তাই একবার ভেতরে না গিয়ে পারলাম না। ২০১৪ সালে তৈরি এই মিউজিয়াম ইসলামিক শিল্প সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে পৃথিবীর দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান ও প্রিন্সেস ক্যাথরিন আগা খানের সংগ্রহশালা থেকে প্রায় ১২০০ দুর্লভ বস্তু এই মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। এখানে টেরাকোটা, টাইল্স আর সেরামিকের পাশাপাশি বেশ কিছু দুর্লভ পারশিয়ান কার্পেট রয়েছে। ওইসব কার্পেটের নিখুঁত কারুকার্য আর বিভিন্ন রঙের মিশ্রণ শতাব্দী প্রাচীন এই শিল্পের সাক্ষ্য বহন করছে। একটি বড়ো ঝিনুকের গায়ে খোদাই করে লেখা কোরানের আয়াত সত্যিই দেখার মতো। আমার কাছে একে ব্যাখ্যা করার মতো সত্যি কোনও ভাষা নেই।

(ক্রমশ…)

ব্যঞ্জনে বাঙালিয়ানা (পর্ব-০১)

শুক্তো

উপকরণ : ৫-৬টা বিউলিডালের বড়ি, ১/২ কাপ টুকরো করা বেগুন, ১টা আলু টুকরো করা, ১/৪ কাপ মুলো টুকরো করা, ১/৪ কাপ বিন্স টুকরো করা, ২টো শুকনোলংকা, ২ টেবিল চামচ সাদা তেল,৩টি সজনাডাঁটা, ২টো করলা কুচি করা, ১টা কাঁচকলা টুকরো করা, ১ ছোটো চামচ পাঁচফোড়ন, ১ চা-চামচ সরষেবাটা, অল্প আদাবাটা, ১-২ টো তেজপাতা, ১/২ ছোটো চামচ চিনি, ১ চামচ ঘি, নুন ও চিনি স্বাদমতো।।

প্রণালী: প্যানে অল্প তেল দিয়ে বড়িগুলো ভেজে তুলে রাখুন। করলাগুলো দিয়ে ভেজে আলাদা রাখুন। আবার প্যানে তেল গরম করে, তেজপাতা ও শুকনো লংকা দিন। এবার বাকি সবজিগুলি ভেজে নিন। সবজি একটু নরম হলে, আদাবাটা, নুন ও চিনি দিন। জল দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে রান্না হতে দিন।

এবার অন্য একটি প্যানে তেলে পাঁচফোড়ন দিন। অল্প ঘি দিন। সেদ্ধ হওয়া সবজি এতে ঝোলশুদ্ধ ঢেলে দিন। সরষেবাটা জলে গুলে এতে ঢেলে দিয়ে একটু ঘন হতে দিন। অল্প ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।

পটলের দোরমা

উপকরণ : ৫০০ গ্রাম পটল, ১০০ গ্রাম নারকেলকোরা, ২টো সেদ্ধ আলু চটকানো, ১ ছোটো চামচ জিরেবাটা, ১ ছোটো চামচ আদাপেস্ট, ১/২ চা-চামচ গোটা জিরে, ১ ছোটো চামচ চিনি, ১ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১-২ টো গোটা শুকনোলংকা, ১টা লবঙ্গ, ১টা দারচিনি, ১টা ছোটো এলাচ, ২টো তেজপাতা, নুন স্বাদমতো, পটল ভাজার মতো পর্যাপ্ত তেল।

প্রণালী: পটলের খোসা পিলার দিয়ে হালকা করে ঘষে নিন। মুখের দিকটা কেটে, স্তুপ করে বীজ বের করে নন। এবার প্যানে তেল গরম করে বীজগুলো ভেজে নিন। এতে হলুদগুঁড়ো, অর্ধেক পরিমাণ জিরেবাটা ও আদাবাটা দিন। তারপর সেদ্ধ আলু চটকে দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। নারকেলকোরা দিয়ে দিন। প্রয়োজনমতো নুন মিষ্টি দিয়ে পুরটা তৈরি করে নিন। আলাদা পাত্রে রাখুন।

এবার কড়ায় তেল গরম করে পটলগুলো নুন-হলুদ মাখিয়ে ছেড়ে দিন। ভালো ভাবে ভাজা হলে তুলে রাখুন। ভাজা পটলের মধ্যে তৈরি করা পুর ভরুন। প্যানে তেল গরম করে জিরে ফোড়ন দিন। গোটা গরম মশলা দিন। সুন্দর গন্ধ বেরোলে অবশিষ্ট জিরেবাটা ও আদাপেস্ট দিয়ে কষতে থাকুন। নুন-মিষ্টি ও সামান্য জল ঢেলে দিন যাতে গ্রেভি তৈরি হয়। পুরভরা পটল এই গ্রেভিতে দিয়ে গা মাখা হলে নামিয়ে নিন।

মানুষের মন (শেষ পর্ব)

কথার মোড় ঘুরে যাওয়ায় আহির যেন জেলবন্দি জীবন থেকে মুক্তি পায় এমন একটা ভাব তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে। একটু নড়েচড়ে বসার পরে অপবাদের হাত থেকে বউদিমণিকে নিষ্কৃতি দেওয়ার অভিপ্রায়ে সে বলে ওঠে— লোকের কথায় কী আসে যায়? তাদের যা খুশি বলতে দিন। কারও মুখের কথায় কেউ অপয়া বা পয়মন্ত হতে পারে না। পৃথিবীতে সকলেই নিজ গন্তব্যে প্রত্যাগমনের জন্য নির্দিষ্ট সময় নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। সময় ফুরিয়ে গেলে সে চলে যায়। এইভাবেই নিরন্তর চলতে থাকে যাওয়া-আসা।

বিশু ও মেজদার মৃত্যু আকস্মিক হলেও তাঁদের অলিখিত অদৃষ্ট অনুযায়ী ওটাই ছিল ভবিতব্য। জীবনের সব ঘটনাই পূর্ব নির্ধারিত। সুতরাং কেউ যদি না জেনেবুঝে অপবাদ দেয় সেটা ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য করতে নেই। আপনার আত্মীয়েরা মানসিক ভারসাম্যতা হারিয়ে এসব কথা বলে ফেলেছেন। তাঁরা এখন অপ্রকৃতস্থ। সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে পরে একদিন তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করবেন তাঁদের ভুল। পুজো-আর্চ্চা করলেই যদি অদৃষ্টের চাকা পালটানো যেত তাহলে মানুষের জীবনে দুঃখের কোনও অস্তিত্বই থাকত না। সৃষ্টি-স্থিতি-লয় সবই যখন ঈশ্বরের হাতে তাহলে অযথা দুঃখ করে লাভ কি?

পুজো দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? মৃতজনেরা কি ফিরে আসবে আর? এগুলো কুসংস্কার ব্যতীত আর কিছু নয়। কয়েকটা মন্ত্র শুনিয়ে মানুষকে বোকা বানানোর একটা সুপ্রাচীন পদ্ধতি। পুজো-আর্চায় আমার একটুও আস্থা নেই। যত সব বুজরুকি আর প্রতারণা! দীর্ঘ দিন যাবৎ এক শ্রেণির মানুষ সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে নানা প্রকার ক্রিয়াকর্মের দ্বারা মানুষকে বঞ্চনার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পৃথিবীতে লৌকিক বা অলৌকিক বলে কিছু নেই, সবই আপেক্ষিক! যে যেমন ভাবে গ্রহণ করে।

সূর্যাস্তের কিছু পরেই আহির সেখান থেকে নিজে থেকেই বেরিয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু বউদিমণির একান্ত অনুরোধে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নৈশভোজন সেরে বেরোতে বেরোতে রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় নেমে আহির কখন যে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল তা সে নিজেও জানতে পারেনি। নিমেষে প্রচণ্ড এক ধাক্কায় মাথা ঘুরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। তারপর সব কিছুই আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল নিবিড় ঘন কুয়াশায়।

আহির অচৈতন্য অবস্থায় পিচ ঢালা রাস্তায় শুয়ে ছটফট করছিল। আশেপাশের পথযাত্রীরা ছুটে এসে প্রাথমিক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা সত্ত্বেও তার দিক থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে অগত্যা বাধ্য হয়ে পুলিশের সাহায্যপ্রার্থী হয়। পুলিশ জামার বুক পকেটে রাখা বউদির বাপেরবাড়ির উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি হাতে পায়। প্রেরকের নাম ঠিকানা লেখা ছিল তাতে। পুলিশের গাড়িতে আহির অচৈতন্য হয়ে শুয়ে ছিল। অতঃপর রামমোহন লোহিয়া হাসপাতালে সে স্থানান্তরিত হয়। প্রথম পাঁচদিন তাকে আইসিইউ-তে রাখা হয়। তখন কারওকেই সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারপর যেদিন তাকে প্রথম জেনারেল ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়, সেদিন তার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। পট্টিবাঁধা অবস্থায় সে শুয়ে ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন মহাকাশ যাত্রী। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল। তবু আহির তার একান্ত প্রিয় ও পরম শ্রদ্ধেয়া বউদিমণির উদ্দেশ্যে যে কথাটি অস্ফুট স্বরে ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছিল তা ছিল এইরকম— বউদি আপনি নিজেকে দোষী ভাববেন না। এ ছিল পূর্বনির্ধারিত।

আহিরের অসহায় মুখের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বউদির চোখ দুটো আবার জলে ভরে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে অশ্রু বিসর্জনের মাধ্যমে বউদিমণি নিজেকে পুনরায় অপয়া ভাবতে শুরু করেছিল কিনা কে জানে!

(সমাপ্ত)

তিলোত্তমা টরোন্টো (পর্ব ০২)

বাটা শু কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত থমাস বাটা-র পুত্রবধূ সোনিয়া বাটা ১৯৯৫ সালে এই মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই পৃথিবীর সব থেকে বড়ো শু মিউজিয়াম। একসময় স্থাপত্য শিল্পের ছাত্রী সোনিয়া বিয়ের পর স্থাপত্য শিল্প ছেড়ে জুতো সংগ্রহ এবং তাদের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সোনিয়ার নিজের সংগ্রহে তেরো হাজারেরও বেশি জুতো ছিল। এর অধিকাংশ‍ই যদিও রোজকার জীবনে ব্যবহার করার মতো নয়। কয়েক শো বছরের পুরোনো জুতো যেমন আছে এই মিউজিয়ামে, তেমনি এলটন জন-এর সেই বিখ্যাত সিল্ভার বুটও এখানের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। ২০১৮ সালে সোনিয়া বাটা মারা গেলেও তাঁর তৈরি এই মিউজিয়াম ভবিষ্যতেও আমার মতো হয়তো অনেক জুতোপ্রেমীর মনোরঞ্জন করবে।

এর পর গেলাম ‘কাসা লোমা”, স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ হল পাহাড়ের উপর বাড়ি। সমুদ্র থেকে প্রায় ১৪০ মিটার আর ওন্টারিও হ্রদের থেকে প্রায় ৬৬ মিটার উপরে অবস্থিত বলেই হয়তো দুর্গটির এরকম নামকরণ হয়েছিল। হেনরি পেলাট নামে একজন ব্যবসায়ী প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার খরচ করে ১৯১৪ সালে দুর্গটি বানান। ইউরোপ থেকে নিয়ে আসা ৩০০ শ্রমিকের তিন বছরের নিরলস শ্রমের ফল এই দুর্গ। যদিও বাড়িটির কাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ৯৮টি ঘর নিয়ে তৈরি এই দুর্গটি হেনরি পেলাট সপরিবারে থাকার জন্য তৈরি করেছিলেন। এটা কানাডার সব থেকে বড়ো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাড়ির মধ্যে পড়ে।

হেনরি পেলাট এক সময় সেনা বাহিনীতে চাকরি করতেন, তাই এই দুর্গের পরিকল্পনায় তার নিদর্শন পাওয়া যায়। এই দুর্গের ভেতরে সুড়ঙ্গপথ আর যুদ্ধ-প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র যেমন রয়েছে, তেমনি আবার অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য পাইপ অর্গান, সুইমিং পুল, বোলিং খেলার জায়গা-সহ আরও অনেক আমোদের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হেনরি পেলাট এই রাজকীয় দুর্গ বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর তাঁর আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ১৯২৩ সালে বাড়িটি নিলামে বিক্রি হয়। তারপর অনেক হাত ঘুরে এখন বাড়িটি ‘দ্য সিটি অফ টরোন্টো’র মালিকানায় আছে। টুরিস্টদের সাথে সাথে এই দুর্গটি সিনেমা, টেলিভিশন এবং অন্যান্য ফটো শুটিংয়ের জন্যও ব্যবহার করা হয়। হলিউডের অনেক বিখ্যাত ছবি এই কাসা লোমা দুর্গকে পৃথিবীর দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে। শিকাগো, আমেরিকান মিউজিকাল কমেডি ক্রাইম ফিল্ম, এরকমই একটা ছবি।

কাসা লোমা থেকে বেরোতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ স্পাডিনা অ্যাভিনিউ দিয়ে পনেরো মিনিট ড্রাইভ করে পৌঁছে গেলাম হারবার ফ্রন্টে। ওন্টারিও হ্রদের ধারে অপূর্ব সুন্দর জায়গা। টরোন্টো শহর পার্কের জন্যও বিখ্যাত। এরকমই একটা পার্ক হল টরোন্টো মিউজিক গার্ডেন। জলের ধারে এই পার্ক স্থানীয় এবং বহিরাগত সবার কাছেই খুব প্রিয়। ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার জুলি মেসারবি আর আমেরিকার প্রখ্যাত সেলিস্ট ইয়ো ইয়ো মা-র (Yo Yo Ma) যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয় বিশ্বের সেরা এই শিল্পকর্ম।

(ক্রমশ…)

মানুষের মন (পর্ব-০৪)

বউদিমণির কথা শেষ হয়ে গেলে আহির তাঁকে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলে— মৃত্যু ব্যাপারটা অবশ্যই দুঃখের, বিশেষত এই ধরনের অপমৃত্যু। কিন্তু এই মুহূর্তে অঘটনটাকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই। সবই ভাগ্য আর ভবিতব্যের খেলা, এরই নাম নিয়তি। এতে কারওর হাত নেই। এই বিশ্বসংসারে আপনজনের কি কখনও মৃত্যু হতে পারে? বিশু ছিল আমাদের একান্ত আপনজন। আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় ও চিরদিন সজীব হয়ে থাকবে। ওর মৃত্যু নেই। ও আমাদের দৃষ্টির অগোচরে চলে গিয়েছে শুধু, মনের আড়ালে যেতে পারেনি। মৃত্যু জিনিসটা আর কিছুই নয় পঞ্চভূতে গড়া এই শরীরের কল্পনা থেকে বেরিয়ে আপন সত্ত্বার গভীরে ডুবে যাওয়ার নামই মৃত্যু।

বউদিমণি চোখের জলের ধারায় ভেসে যাচ্ছিল। ভালো করে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেবলই কাঁদছিল। আহির বউদিমণির মুখপানে এমন ভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে যে, বিশু সম্পর্কে তার মুখে বলা যাবতীয় সান্ত্বনা বউদিমণির চোখের জলের ধারায় ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামীর মতো কিছু বলতে না পেরে আহির নিথর নিস্পন্দ অবস্থায় চুপ করে বসে থাকে। ভীষণ অসহায় লাগছিল নিজেকে। সে নির্বাক শ্রোতার মতো বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বউদিমণির বেদনাবিধুর অন্তরের কথাগুলো আগ্রহ সহকারে কেবল শুনতে থাকে। এছাড়া তার করণীয়ও কিছু ছিল না।

এরপর বউদিমণি যা ব্যক্ত করেন তা আরও ভয়ংকর ও সাংঘাতিক খবর— আমার মেজদা সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাড়ি আসতে গিয়ে দিল্লির ডিটিসি বাসের সঙ্গে অটো রিক্সার ধাক্কা লেগে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। বউদি গুরুতর অসুস্থ হয়ে এতদিন রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আমার বাড়িতে আসেনি, আমার বাপের বাড়ির আত্মীয়রা এসে বউদিকে হাসপাতাল থেকে সোজা লখনউ নিয়ে গিয়েছে। ওদের ধারণা আমি নাকি অপয়া। আমার বাড়িতে এলে কেউ আর বাড়ি ফিরতে পারবে না। ওরা স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জীবনে আর কখনও আমার বাড়িমুখো হবেন না।

আহির চিত্রার্পিতের ন্যায় স্থবির হয়ে বসে থাকে। বলার মতো কথা সে খুঁজে পায় না। বউদিমণির উদ্দেশ্যে তাঁর বাপেরবাড়ির দেওয়া নিদারুণ অপমান ও অপবাদে আন্তরিক সহানুভূতি জানাতে গিয়ে নিজের অজান্তে অন্তর্গভীর থেকে বেরিয়ে আসে সকরুণ দীর্ঘশ্বাস। বউদিমণির কান্নায় ঘরের বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে গিয়েছিল। বুকের খাঁচাটায় যেন কালবৈশাখীর ঝড় বইতে থাকে। এইরকম অসহনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তা আগে থেকে অনুধাবন করা যায়নি। ভীষণ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল পরিবেশটা। বুক ভরে ভালো করে শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল। কারণ বউদিমণির মুখে বলা তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাগুলো শুনতে যেমন কষ্ট হচ্ছিল। আবার অন্যদিকে বউদিমণির হয়ে তার বাপেরবাড়ির উদ্দেশ্যে কটু মন্তব্য প্রকাশ করতেও দ্বিধা হচ্ছিল। আহিরের যুক্তি তর্কগুলো নিমেষে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে আহিরের মনে হচ্ছিল তার পক্ষে সব কথা নীরবে শুনে যাওয়াটাই একমাত্র সঠিক কাজ। কোনও প্রকার মন্তব্য প্রকাশের অধিকার থেকে সে বঞ্চিত। এক কথায় আহিরের জীবনৃত অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ কারও মুখে কোনও কথা ছিল না।

একসময় বউদিমণিই নীরবতা ভঙ্গ করে বলে উঠেছিলেন— ভাবছি মা কালীর নামে একটা পুজো দেব। সত্যি, আমি ভীষণ অপয়া। আমার বাড়ির লোকেরা ঠিকই বলেছে। তা নাহলে এমন ঘটনা কখনও ঘটতে পারে?

(ক্রমশ…)

তিলোত্তমা টরোন্টো (পর্ব ০১)

ছোটোবেলায় ভূগোলের ছাত্রী হিসেবে কতই না গল্প শুনেছি পঞ্চহ্রদের দেশ কানাডার। তখন থেকেই মনের কোণায় একটা ইচ্ছে তৈরি হয়েছিল, ‘হয়তো কোনও দিন….’। আর সেই কোনও দিনটাই হঠাৎ করে চলে এল। কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির লোভে তিন সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমেরিকা আর কানাডার পথে। ঠিক করলাম এ যাত্রায় দুটো দেশেই দুটো করে শহর ঘুরে দেখব। অনেক চিন্তা ভাবনার পর ঠিক হল একদিকে টরোন্টো, ভ্যানকুভার আর অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক এবং ওয়াশিংটন ডিসি। আজ সুন্দরী টরোন্টোর কথা লিখব।

ওন্টারিওর রাজধানী টরোন্টো কানাডার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এটাই কানাডার সব থেকে জনবহুল শহর। প্রায় তিন মিলিয়ন লোকের বাস এই শহরে। বহুসংস্কৃতি এবং বহুজাতির মিলনক্ষেত্র বলতে যে-সব শহরের নাম আমাদের মনে আসে, টরোন্টো হল তারই একটি। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় টরোন্টোতে ১৭০ রকমের ভাষাভাষির লোক বাস করে। তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি টরোন্টোর সংস্কৃতিও মনোমুগ্ধকর।

টরোন্টো দিয়ে যাত্রা শুরু করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সিডনি থেকে টরোন্টোতে কোনও সরাসরি বিমান পরিষেবা না থাকায় স্টপ ওভার করে গেলে প্রায় ২৫ ঘণ্টা লেগে যায়। অনেক চিন্তা ভাবনার পর নিউ ইয়র্ক থেকেই যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা হল। দিন দশেক আমেরিকায় কাটিয়ে রওনা দিলাম টরোন্টোর পথে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্লেনে মাত্র দেড় ঘণ্টা লাগল। সকাল এগারোটা নাগাদ টরোন্টো পৌছে গেলাম। আগেই অনলাইনে গাড়ি বুক করা ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা হোটেলে চলে এলাম।

হোটেলে জিনিসপত্র রেখে আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম লাঞ্চ-এর ব্যবস্থা করতে। পাশেই ইটন সেন্টার। টরোন্টোর সব থেকে বড়ো শপিং মল। তবে ইটন সেন্টার শুধু একটা শপিং মল নয়, এটা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। সপ্তাহে প্রায় এক মিলিয়নের উপর লোকের পদধূলি পড়ে এখানে। পৃথিবী বিখ্যাত ২৩০টি রিটেল শপ ছাড়াও এই ইটন সেন্টার নজরকাড়া স্থাপত্য শিল্পের জন্যও বিখ্যাত। এখানের ফুড কোর্টে অনেকরকম পছন্দের খাবার পাওয়া যায়। সবার পছন্দের খাবার পেতে বিশেষ বেগ পেতে হল না।

লাঞ্চের পর আমার একটু ‘রিটেল থেরাপি’র দরকার ছিল। কিন্তু আমার ছেলের চাপে পড়ে আজকের মতো ইটন সেন্টারকে ‘গুড বাই’ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার মুখের করুণ অবস্থা দেখে আমার পুত্র বলল, “মাম, আমাদের হোটেল থেকে ইটন সেন্টার হেঁটে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। তুমি যে-কোনও সময় একা একাই এখানে চলে আসতে পারবে। তার চেয়ে বরং চলো তোমাকে বাটা শু মিউজিয়ামে নিয়ে যাই। ওখানে জুতো কিনতে না পারলেও তোমার মতো জুতোপ্রেমীর জুতোর প্রদর্শনী দেখে ভালো লাগবে।

গাড়িতে করে বাটা শু মিউজিয়ামে পৌঁছতে দশ মিনিটও লাগল না। ভেতরে ঢুকে মনে হল এ যেন এক অন্য গ্রহে এসে পড়েছি। ছোটোবেলা থেকেই আমরা বাটার জুতো পরে অভ্যস্ত। আজও মনে আছে ছোটোবেলার সেই একঘেয়ে চামড়ার জুতোগুলো। জুতো বানানোটাও যে একটা শিল্প হতে পারে, এই মিউজিয়ামে না এলে হয়তো অজানাই থেকে যেত।

(ক্রমশ…)

মানুষের মন (পর্ব-০৩)

বউদিমণি বলতে আরম্ভ করেন— খুব দুঃখের সঙ্গে একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, জানো আমাদের বিশু আর বেঁচে নেই, ও মারা গিয়েছে। একটু চুপ করে থেকে তিনি আরও জানান, খবরটা জানানোর জন্যে তোমার অফিসে ফোন করেছিলাম। কিন্তু তুমি তখন অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছিলে। ইচ্ছে থাকলেও সময়মতো খবরটা জানাতে পারিনি। বিশু চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে মারা গিয়েছে। সরকারি কাজে লখনউ থেকে ও আমার এখানেই আসছিল। সে রেল কর্মচারী ছিল।

বিশু বউদিমণির বড়ো বোনের একমাত্র ছেলে। ওদের লখনউতে বাড়ি। অফিসের কাজে ও প্রায়শঃই দিল্লি আসত। বউদিমণির বাড়িতে বসেই একদিন বিশুর সঙ্গে আহিরের আলাপ হয়েছিল, ক্রমে ঘনিষ্ঠতা। তারপর থেকে সে যখনই দিল্লি আসত, অন্তত একবেলার জন্যে হলেও আহিরের সঙ্গে দেখা করাটা তার কর্তব্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছিল। বিশু ভালো বাংলা বলতে পারত না। ওর মুখনিঃসৃত হিন্দি-উর্দু মিশ্রিত বাংলা কথাগুলি শুনতে ভারি অদ্ভুত লাগত।

কথাচ্ছলে এই কথাটি তার মুখে প্রায়ই বলতে শোনা যেত— দেখে নিও, একদিন বড়োই ধূম সে মেরি জনাজা নিকলেগি। তারপর হাসতে হাসতে বলে উঠত, “যাতি হ্যায় তো যা, জানাজা মেরি ভি লেতি যা/ ও মেরি মোহব্বত, বেজান শরীর কো ছোড়কর না যা’।

কথাটা উচ্চারণ করা মাত্র বউদিমণি তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠতেন। বউদিমণির রাগ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে বিশু তৎক্ষণাৎ মুখাবয়বে নিষ্পাপ হাসি ছড়িয়ে তার কথার অন্তর্নিহিত মানেটা লঘু করার চেষ্টা করত। অহেতুক তর্ক করতে খুব পছন্দ করত। যার তার সঙ্গে সে তর্ক জুড়ে দিত। হেরে যাওয়ার পরে যখন বলা হতো— মিছিমিছি এত তর্ক করো কেন? প্রতিবারই তো হেরে যাও।

বিশু বলত— -ফজুল ব্যাহেস করতে আমার বেহদ আনন্দ আতা হ্যায়, বহুত কুছ শিখনে কো মিলতা হ্যায়। আখির মেরা হি ফায়দা হোতা হ্যায়। ওর ছেলেমানুষী এবং ভিত্তিহীন যুক্তিতে উপস্থিত সকলে হেসে উঠত। হিন্দি ছবির প্রতি ওর ব্যক্তিগত অনুরাগের কথা জানতে চাইলে বিশু পরম উৎসাহিত হয়ে বলত — লচকে যব কমরিয়া তো সারা দুনিয়া হিলে লা৷ তাই হিন্দি ছবি আমাকে খুব বেশি আকর্ষণ করে। বাংলা সিনেমা জগতের মহানায়ক উত্তমকুমার আর উৎপল দত্তের অভিনয় ছাড়া তার নাকি আর কারওকে পছন্দ নয়। কাল, মহাকাল বা জীবন সম্বন্ধে তার নিজস্ব কোনও মতবাদ ছিল না, এই ব্যাপারে সে ছিল একেবারেই উদাসীন। বিশু ছিল এক বিচিত্র এবং অদ্ভুত মেজাজের ছেলে।

বিশু নেই কথাটা অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। বউদিমণি চোখের জল মুছতে মুছতে বলছিলেন — জীবন নাটকের এমন করুণ সমাপ্তি যে, কথাটা চিন্তা করলেই বুকটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। বাড়ির লোকেরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারল না অথচ মুখে ওর এই কথাটা লেগেই থাকত— দেখে নিও, একদিন বড়ি ধূম সে মেরি জানাজা নিকলেগি ওর ছোটোবেলা থেকেই আমার প্রতি টান ছিল অনেক বেশি তাই মারাও গেল দিল্লি ঢোকার মুখে গাজিয়াবাদ স্টেশনে। ওর আসল গন্তব্য ছিল আমার বাড়ি। দিল্লি আসার ব্যাপারে ওর কোনও অরুচি ছিল না। কাঁচাঘুম ভাঙিয়েও যদি কেউ ওকে বলত চল দিল্লি যাবি, ও তাতেই রাজি হয়ে যেত। এমনই শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ছিল আমার প্রতি!

(ক্রমশ…)

গল্পটি লিখেছেন অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়।

মানুষের মন (পর্ব-০২)

আত্মীয়স্বজনবিহীন সুদূর দিল্লি শহরে আহিরের এখন দাদা-বউদিই একমাত্র ভরসা। অনাত্মীয় হয়েও তাঁরা আত্মীয় সম। তাঁরা আহিরের স্থানীয় অভিভাবকে পরিণত হয়ে গিয়েছেন। আগের মতো এখন আর নিজেকে তেমন নিঃসঙ্গ বলে মনে হয় না। অফিসের সহকর্মীরা পর্যন্ত জেনে গিয়েছে যে, দিল্লি শহরে সে বাঁধা পড়ে আছে এক নিবিড় সম্পর্ক সূত্রে। তাঁরা নিকট আত্মীয় না হলেও পর নয়।

অফিসের কাজে আহিরকে মাঝেমধ্যেই বাইরে যেতে হয়। হঠাৎ করে বাইরে চলে যাওয়ায় আহির বেশ কিছুদিন যাবৎ দাদা-বউদির খোঁজ নিতে পারেনি। তাই ক’দিন ধরেই সে তার দাদা-বউদির কথা ভাবছিল। আবার কাজের শেষে নিজের আস্তানায় ফিরে এসে যাব যাব করেও যাওয়া হয়ে উঠছিল না।

আসল কথা একার সংসারে দৈনন্দিন কাজের চাপে ছুটির দিনগুলি সে কোনওমতেই হাতছাড়া করতে চাইছিল না। কিন্তু মন বলছিল, হয়তো এতদিনের অদর্শনে দাদা-বউদি উভয়ে নিশ্চয়ই তার উপর পাহাড়প্রমাণ অভিমান নিয়ে অপেক্ষায় বসে আছেন। দেখা হলে কীভাবে নিজের স্বপক্ষে যুক্তিগুলো একে একে পরিবেশন করবে, তারই মহড়া দিচ্ছিল সে মনে মনে। বলতে গিয়ে একটি কথাও যেন অসাবধানতাবশত বাদ না পড়ে। এরপর একটি অখ্যাত ছুটির দিনে সে স্থির করল, সেদিন তার যত কাজই থাকুক না কেন, তাকে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেই হবে। ইতিমধ্যে দীর্ঘ তিনমাস অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। এটা শুধু দাদা-বউদির নির্দেশ নয়, হুকুম।

আহির বড়ো বড়ো পা ফেলে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। দিনটি যদিও সোমবার, কিন্তু তার ছুটির দিন। সে নির্বিকার। কারণ সে জানে একবার বউদিমণির দরবারে গিয়ে পৌঁছোতে পারলে সব ভাবনার ইতি। উদরের নাম দামোদরের যাবতীয় ভরণ- পোষণের দায়িত্ব তখন বউদিমণির এক্তিয়ারে। এই ব্যাপারে নিজেকে সে অতিশয় ভাগ্যবান বলে মনে করে। কিন্তু সেদিন আহিরের আগমনে বউদিমণি দরজা খুলতেই তাঁর অপ্রত্যাশিত শুষ্ক পাণ্ডুর মুখের দিকে তাকিয়ে আহির ভূত দেখার মতো হতচকিত হয়ে যায়।

বউদিমণি দেখতে তেমন সুন্দরী নয়, তবে কুৎসিতও নয়। যদিও লাবণ্যহীন রূপের কোনও মূল্য নেই। কিন্তু সেই দিক থেকে তার বউদিমণি অতুলনীয়া। লাবণ্যে পরিপূর্ণ চেহারা বলতে যা বোঝায় বউদিমণি ঠিক সেইরকম। দেখা মাত্র শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। তদুপরি বউদিমণি একালের দিনের লেখাপড়া জানা শিক্ষিতা মহিলা। তাঁর বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখখানার দিকে অবাক বিস্ময় ভরা চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আহির জানতে চায়— ‘কী ব্যাপার ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে, আপনি কি অসুস্থ?’

আহিরের কৌতূহলাদ্দীপক প্রশ্নের জবাবে বউদিমণি তাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসতে অনুরোধ জানায়। তারপর প্রাথমিক কিছু কথাবার্তার পর একটু প্রকৃতস্থ হলে অস্ফুটস্বরে যে খবরটা বলতে বাধ্য হন, সেটা আর যাই হোক খবর মোটেই নয় বরং নিদারুণ এক দুঃসংবাদ ব্যতীত আর কিছু নয়।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব